ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

p20170621-222138 অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়া নারায়ণগঞ্জ নিবাসী মোন্তাজউদ্দিন।

.

গত কয়েকদিন আগে রাজধানী গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া এলাকায় অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে ১৭ হাজার টাকা খুইয়েছেন নারায়ণগঞ্জ গোদনাইল এলাকার নিবাসি মোন্তাজউদ্দিন (৫৫) নামে একজন নিরীহ মানুষ। লোকটির গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। তিনি প্রতি দুইমাস পরপর, দুই তিনদিনের জন্য একবার দেশের বাড়িতে যায় সংসারের পরিবারপরিজনদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। ঐদিন বাড়ি থেকে আসার সময় বাস থেকে প্রথমে নামে ফুলবাড়িয়া বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ডে। বাস থেকে নেমে গুলিস্তান আসতেই পড়ে যায় অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে।

যে-ভাবে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছিল মোন্তাজউদ্দিন:

মোন্তাজউদ্দিন সেদিন ফুলবাড়িয়া বিআরটিসি বাস থেকে নেমে গুলিস্তানের দিকে আসিতেছিলেন, সামনেই ফুটপাতে সেন্ডেল বিক্রেতাদের সেন্ডেলের (জুতা) বাহার। সেখানে কমদামী বেশিদামী হরেকরকমের বাহারি সেন্ডেল দেখে, মোন্তাজউদ্দিন একজোড়া সেন্ডেল দামাদামি করে কেনার জন্য। দামাদামির একপর্যায়ে আটশ টাকায় একজোড়া সেন্ডেল কিনে ফেলে মোন্তাজউদ্দিন। সেন্ডেল দামাদামি করার সময়, মোন্তাজউদ্দিনের পাশে দুইজন লোক দাঁড়ানো ছিল, ওই দুইজন লোকই ছিল গুলিস্তান এলাকার অজ্ঞান পার্টির সদস্য। তা কিন্তু মোন্তাজউদ্দিন জানতেন না। না জানার কারণেই নিরীহ মোন্তাজউদ্দিন ওই দুইজন লোকের সামনেই মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে সেন্ডেল বিক্রেতাকে দেয়। টাকা দিয়ে সেন্ডেল নিয়ে আসতেই মোন্তাজউদ্দিনের দুইপাশে দুইজন লোক আড়াআড়িভাবে তার সাথে হাটতে থাকে। কাঁধে হাত দিয়ে এমনভাবে হাটছে যেন নিজেদের চেনাজানা মানুষ। যা দেখে লোকে বুঝে নিবে তারা তিনজন বন্ধুবান্ধব।

এভাবে চলতে চলতে মোন্তাজউদ্দিনকে অজ্ঞান পার্টির সদস্যারা বলছে, চাচা আপনি কোথায় যাবেন? আমরা আপনাকে পৌঁছে দিবো।

মোন্তাজউদ্দিন বলে, আরে বাবা, আমাকে তোমাদের পৌঁছে দিতে হবে না, আমি নিজেই নারায়ণগঞ্জের বাসে ওঠতে পারবো। তোমরা আমার কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে চলে যাও, না হয় আমি মানুষ ডাকবো। এই কথাই মোন্তাজউদ্দিনের শেষ কথা। তিনদিন পর্যন্ত মোন্তাজউদ্দিন আর কিছুই বলতে পারেনি। তার হুশ হয়েছে তিনদিন, তিন-রাত পর ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের সামনে ফুটপাতের এক রাস্তায়। যখন মোন্তাজউদ্দিনের হুশ হয়, তখন সে একফোঁটা পানির জন্য ছটফট করছিলেন। কিন্তু এই সুন্দর দুনিয়ার সুন্দর মনের কোনো মানুষ তার মুখে একফোঁটা পানি দেয়নি। এমনকি এভাবে অসুস্থ হয়ে তিনদিন ফুটপাতে পড়ে থাকা একজন মানুষকে কেউ নিকটস্থ হাসপাতালেও নেয়নি।

তিনদিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা মোন্তাজউদ্দিন যখন পানি পানি করে চিৎকার করছিলেন তখন সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় মুশলধারায় নেমে আসে বৃষ্টি। সেই কৃপাময় বৃষ্টির পানি পান করেই মোন্তাজউদ্দিন তার জীবন রক্ষা করেন। বৃষ্টির পানি পান করে যখন জীবন রক্ষা করলেন, তখন মোন্তাজউদ্দিন দেখেন তার পড়নে কিছুই নেই। তার জামা নেই পায়ের সমস্যা নিয়ে চলার হাতের লাঠিটিও নেই, আছে শুধু জাঙ্গিয়া। এদিকে মোন্তাজউদ্দিনের বাসার সবাই মোন্তাজউদ্দিনকে না দেখে, পাগলের মতো হয়ে সন্ধান করিতে থাকে নিকটস্থ সব জায়গায়। যাইহোক, পরবর্তী ঘটনায় আসা যাক। কীভাবে তার বাসায় ফেরা?

ফেরেশতার মতো তরুণরা, মোন্তাজউদ্দিনকে সাহায্য:

ফুটপাতে যখন মোন্তাজউদ্দিন হাউমাউ করে কাঁদছিলেন, তখন একদল তরুণ ফেরেশতা হয়ে হাজির হয়, মোন্তাজউদ্দিনের সামনে। ওই তরুণ দলের সদস্য সংখ্যা ছিল, ছয় থেকে সাতজন। মানুষ বেশী ফেরেশতারা তখন মোন্তাজউদ্দিনের জন্য রাস্তায় চলাচলকারী মানুষের কাছ থেকে টাকা ওঠানো শুরু করে দেয়। তরুণরা ওঠানো সাহায্যের টাকা দিয়ে মোন্তাজউদ্দিনের চলার লাঠি ও কিছু নগদ আর্থ তুলে দেয় মোন্তাজউদ্দিনের হাতে। এমন কি সেই ফেরেশতার মতো তরুণরা তাকে গুলিস্তান-নারায়ণগঞ্জের বাসে পর্যন্ত উঠিয়ে দিয়ে যায়। কথায় বলে, “তুমি নানুষ না ভাই, তুমি ফেরেশতা।” এঁদেরই বলে ফেরেশতার মতো মানুষ, এঁদেরকে বলে ফেরেশতা।

যখন মোন্তাজউদ্দিন বাসায় আসে

সেদিন মোন্তাজউদ্দিন নারায়ণগঞ্জ গোদনাইল তাঁতখানা আসার পর, তার পরিবারের লোকেরা তাকে পেয়ে অনন্দের কান্নায় আকাশ ভারী করে ফেলে। কেউ বলে, ‘আমরা তো তেমার আশা বাদই দিয়ে ফেলেছিলাম, কোনো খবর না পেয়ে। সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় তুমি আমাদের মাঝে ফিরে আসছ, এটাই আমাদের বড় পাওয়া।’

মোন্তাজউদ্দিন বাসায় ফিরেছে ঠিক, সবকিছু রেখে আসেছেন ঢাকা ফুলবাড়িয়া অথবা পঙ্গু হাসপাতালের কোনো এক অচেনা গলিতে। সাথে ছিল তার অসুখের ঔষধ, হাতের আঙ্গুলে ছিল তিন-চারটি দামী পাথরের আংটি, গলায় ছিল সোনার চেইন। অসাবধানতার কারণে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন মোন্তাজউদ্দিন। জানমাল সব হারিয়ে মোন্তাজউদ্দিন ১০/১২ দিন নিকটস্থ হাসপাতেলে চিকিৎসাধীন থেকে এখন একটু সুস্থ।

যা বলতে চাই:

আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা এখন লোকে লোকারণ্য। কেউ করছে ঈদের কেনাকাটা, কেউ যাচ্ছে নারীর টানে বাড়ি। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে রাজধানীর রাজা নামে খ্যাত অজ্ঞান পার্টির সদস্যবৃন্দরা। তাদের খপ্পরে পড়বে না, এমন কোনো গ্যারান্টি কেউ দিতে পারেনি, পারবেও না। তাই বর্তমান সময়ে সবাই অজ্ঞান পার্টির খপ্পর থেকে বাঁচতে একটু সতর্কতা অবলম্বন করুন।

অজ্ঞান পার্টির টার্গেট

বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন অথবা যেকোনো কেনাকাটার জন্য শপিংমলগুলোর সামনে এদের আনাগোনা বেশি থাকে। এরা সংঘবদ্ধ দল কয়েকটা ভাগে বিভক্ত হয়ে জায়গায় জাগায় অবস্থান নেয়। একেক গ্রুপের সদস্য সংখ্যা তিন থেকে চার বা এরও কমবেশি হতে পারে। তারা মানুষের চলন-বলন দেখেই বুঝে নিতে পারে মানুষটির বুদ্ধিমত্তা কেমন হবে, তাকে কাবু করা বা তাদের খপ্পরে ফেলা যাবে কি-না। মানুষের চলনভঙ্গি দেখেই তাঁরা ঠিক করে ফেলে তাদের টার্গেট, এরপরই শুরু অপারেশন।

আপনার করনীয়

১। কেনাকাটা করার সময়ও এই গ্রুপের সদস্যরা খুব সামনাসামনি থেকে আপনাকে ফলো করবে, সাথে টাকাপয়সা কেমন আছে এরা তাও অনুমান করে করে ফেলবে। এদের সামনে বা সামনে থাকা কোনো লোকের উপস্থিতিতে টাকা-পয়সা বের করবেন না।

২। আপনার সাথে বেশি টাকা থাকলে তা সাবধানে বের করুন।

৩। টাকা এক জাগায় না রেখে তা কয়েকটি ভাগে ভাগ করে রাখতে পারেন। এতে ছিনতাইকারী বা পকেটমারের কবলে পড়লে, শুধু এক জায়গার রাখা টাকাই খোয়া যাবে। আর বাকি বিভিন্ন জায়গার টাকা থেকে যাবে, একেবারে নিঃস্ব হবার কারণ নেই।

৪। অপরিচিত লোক কাছে এসে বন্ধুর মতো বা অসহায়ত্বের ভাব দেখালেও, তার কথায় কান না দেওয়াই ভাল।

৫। খেয়াল রাখুন, শরীর ঘেঁষে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কি না, থাকলে ঝটপট সেই স্থান ত্যাগ করুন।

৬। এদিক-সেদিক, সামনে-পিছে লক্ষ্য করুন, আপনার দিকে কেউ বেশি বেশি তাকাচ্ছে কি-না। যদি এমন হয়, যত দ্রুত সম্ভব স্থান ত্যাগ করুন।

৭। লোভে পড়ে অপরিচিত কারও কাছ থেকে কিছু না খাওয়াই ভাল, খেলেই বিপদ অনিবার্য।

৮। ব্যাগ বা অন্য কোনো ভারি মালামাল নিয়ে যাওয়ার সময়, কষ্ট হলে কেউ সাহায্য করার জন্য আগিয়ে আসতে পারে। বলতে পারে, আপনাকে টিকেট নিয়ে দিচ্ছি, গাড়ির সিট নিয়ে দিচ্ছি বা এখানে বসুন, এখানে আসুন বিশ্রাম করুন, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এমন কেউ আসলে, তার বাড়িয়ে দেয়া সাহায্যের হাত বা তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ফিরিয়ে দিন। এতে সে যেই হোক না কেন আপনাকে বিপদে ফেলতে পারবে না।

৯। নিজের কোনো সাহসের দুর্বলতা থাকলে তা কাউকে বুঝতে দিবেন না, সাহস দেখিয়ে চলুন।

১০। আপনার দুর্বলতার ভাব দেখেই অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা আপনার পিছু নিতে পারে, তা এড়িয়ে চলুন। না হয় মোন্তাজউদ্দিনের মতো অবস্থা হতে আর দেরী হবে না।

শেষ কথা

আসন্ন পবিত্র ঈদ উপলক্ষে জনস্বার্থে উপর উল্লেখিত পরামর্শগুলি বিবেচনায় রাখুন। দুস্কৃতিকারীদের ছলনা থেকে বাঁচতে হলে রাস্তাঘাটে, হাটবাজারে, স্টেশনে, ব্যস্ততম শহরের অলিগলিতে সাবধানে চলাচল করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।

নিজে সতর্কতা অবলম্বন করুন, দুস্কৃতিকারিদের কবল থেকে রক্ষা পেতে অপরকে পরামর্শ দিন। মনে রাখবেন, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা ওদের স্বার্থ হাছিলের জন্য খুনখারাবি করে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করে না। তাই আবারও বলছি, অজ্ঞান পার্টির খপ্পর থেকে সাবধান!