ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

সময়-সময় বিশেষ কোনও কাজে যেতে হয়, নারায়ণগঞ্জ টাউনে। যখন কোনও কেনাকাটার জন্য টানবাজার যাই, চোখে পড়ে সিনেমা হলগুলো। এই টানবাজারে সিনেমা-হল ছিল তিনটি। প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জের প্রথম ‘হংস সিনেমা-হল ছিল, এই টানবাজারেই। এরপর ‘আশা’ ও ‘মাশার’ সিনেমা। ‘হংস সিনেমা-হলটি সাউন্ড সিস্টেম ও পরিষ্কার পর্দার জন্য ছিল বিখ্যাত। এখন আর সেই ‘হংস সিনেমা-হল নেই, এখানে বিশাল শপিংমল। ‘আশা ও মাশার’ সিনেমা-হল দুটিও দর্শক সংকটে কোনও একসময় বন্ধ হয়ে যাবে।
p20170822-224024 নারায়ণগঞ্জ টানবাজার ‘হংস’ সিনেমা-হল, এখন আর ‘হংস’ সিনেমা-হল নেই। ছবিতে দেখা যায় মস্তবড় শপিংমল, নাম ‘হক প্লাজা’। এটিই ছিল কোনও একসময়ের নারায়ণগঞ্জের বিখ্যাত ‘হংস’ সিনেমা-হল।

এরমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ‘বান্নি-হল’ নামে খ্যাত ‘ডায়মন্ড’ সিনেমা-হল। এখানে এখন তৈরি পোষাকের বড় মার্কেট, তা-ও বহুতল ভবন। ‘ডায়মন্ড’ সিনেমা-হলের পূর্বপাশেই ‘গুলশান’ সিনেমা-হল, এটিও কিছুদিনের মধ্যেই হয়ত বন্ধ হয়ে যাবে। নারায়ণপগঞ্জ টাউনে আসলেই, এসব সিনেমা-হলগুলোর দিকে তাকালেই মনটা নীরবে কাঁদে। মন কাঁদে এই জন্য যে, এসব হলগুলোতে আগে অনেক সিনেমা দেখেছি, তাই। একটা টিকিটের জন্য অনেক সময় মারামারিও করেছি।

মনে পড়ে সেদিনের কথা, যেদিন পাঠ্যবই কেনার টাকা দিয়ে দেখেছিলাম, ‘দি রেইন’ ছায়াছবি। সময়টা তখন ১৯৭৬ সাল, ষষ্ঠ শ্রেণী পাস করেছি মাত্র। থাকতাম বন্দর থানাধীন আদর্শ কটন মিলে। বই কিনতে এসেছি শুক্রবারের দিন বিকালবেলা। শুক্রবারে বইয়ের দোকান যে বন্ধ থাকে, তা আর খেয়ালে ছিল না। কালী বাজার ঘুরে বই না পেয়ে যাই, টানবাজার। তখন ‘আশা’ সিনেমা-হলের উপরে ‘মাশার’ সিনেমা-হল হয় নাই। টানবাজারে সিনেমা-হল ছিল শুধু ‘হংস’ সিনেমা আর ‘আশা’ সিনেমা-হল। এই ‘আশা’ সিনেমা-হলেই চলছে, তখনকার সময়ের অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত, ‘দি রেইন’ ছায়াছবি।

এটিই ছিল, ১৯৭৬ সালে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মুক্তিপ্রাপ্ত রঙিন চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রটি বাংলা এবং উর্দু দুই ভাষায় নির্মিত হয়েছিল। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, অলিভিয়া ও ওয়াসিম। সেসময় ‘দি রেইন’ চলচ্চিত্রটি পৃথিবীর ৪৬টি দেশে মুক্তি পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওয়াসিম-অলিভিয়া জুটি বেঁধে বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন। ‘বাহাদুর’ ছায়াছবি এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ‘দি রেইন’ চলচ্চিত্রটি দেখেছিলাম, পাঠ্যবই কেনার টাকা দিয়ে। বই ছাড়া খালি হাতে বাসায় ফিরে, মার খেয়েছি বড় দাদার হাতে।

এরপর ওয়াসিম-অলিভিয়া অভিনীত আরও অনেক ছায়াছবি দেখেছি। একসময় আমার বড় পর্দায় সিনেমা দেখার একটা নেশা হয়ে ওঠে। দেখেছিও দেশের খ্যাতিমান পরিচালকদের অনেক চলচ্চিত্র। দেখেছি আজিম-সুজাতা, রাজ্জাক-সুচন্দা, রাজ্জাক-কবরি, রাজ্জাক-ববিতা রাজ্জাক-শাবানা জুটির ছায়াছবি। দেখেছি, ফারুখ-কবরি, ফারুখ-ববিতা, ওয়াসিম-অঞ্জু ঘোষ, ইলিয়াস কাঞ্চন-রোজিনা,ইলিয়াস কাঞ্চন-অঞ্জু ঘোষ, ইলিয়াস কাঞ্চন-সুচরিতা জুটির বহু ছায়াছবি। চিত্রনায়ক আলমগীর-শাবানা ও খলনায়ক প্রয়াত জসিম অভিনিত ছায়াছবিও কম দেখিনি। শাবনুর-ফেরদৌস অভিনীত ছায়াছবিও দেখেছি অনেক। দেখেছি কলিকাতার বাংলা ছায়াছবি, উত্তম-চুচিত্রা জুটির অনেক ছবি। কলিকাতা চলচ্চিত্রের অনেক ছায়াছবির মধ্যে ‘করুণাময়ী’ চলচ্চিত্রটি উল্লেখযোগ্য ছবি। বঙ্গদেশের চলচ্চিত্র জগতের পুরানো প্রায় সকল নায়ক-নায়িকাদের ছায়াছবি-ই দেখেছি। সেসব স্মৃতিকথা আর লিখে শেষ করা যাবে না, এখন সবই স্মৃতি।

উল্লেখ করা যেতে পারে, আমার প্রথম ছায়াছবি দেখা ১৯৭২ সালে। চলচ্চিত্রটির নাম ছিল ‘মানুষের মান’ দেখেছি আমার মায়ের কোলে বসে। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছিলেন, সদ্য প্রয়াত নায়ক রাজ রাজ্জাক, নায়িকা ছিলেন ববিতা। আজ তাকে ভীষণভাবে মনে পড়ছে, স্মরণ করছি বিনম্র শ্রোদ্ধাবোধের সাথে। এর আগে চলে গেলেন, নায়ক মান্না, সালমান শাহ, আনোয়ার হোসেন-সহ অনেকেই। তাদেরকেও স্মরণ করছি গভীর শ্রোদ্ধায়। আমার মতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তারাই ছিলেন মানুষের মনেরমত অভিনেতা।

আজ যারা চলচ্চিত্রে অভিনয় করছে, তাদের দরকার, নায়ক রাজ রাজ্জাককে অনুসরণ করে অভিনয় করা। এই মহানায়ক অভিনীত বহু ছায়াছবি আমি দেখেছি। তার অভিনীত প্রায় সকল চলচ্চিত্রই ছিল সামাজিক ও মুক্তিযুদ্ধ কাহিনী নিয়ে। এখনকার দিনে আর সামাজিক চলচ্চিত্র বেশি একটা নির্মাণ হয় না। তাই মা-বাবা, ভাই-বোন নিয়ে কেউ সিনেমা দেখতে যায় না। কেন যায় না? বর্তমান চলচ্চিত্রে সামাজিকতার নামমাত্র ছোঁয়া নেই, তাই। আছে নায়িকাদের হাফপ্যান্ট পরিহিত বিকিনি সাজে কোমর দুলানো নাচ। আছে ভিনদেশী ছায়াছবির হুবহু নকল দৃশ্য আর অর্ধনগ্ন কাটপিসের ছড়াছড়ি।

ছবির প্রথমার্ধেই শুরু হয়, নায়ক-ভিলেনের অকথ্য ভাষায় গালাগালি। যা সভ্য সমাজে এই ভাষা সহজে ব্যবহার হয় না, শুনতেও ভালো লাগে না। চলচ্চিত্রে এই অশ্লীল ভাষা শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সাল থেকে, যা এখনও চলছে। সে-জন্যই দিনে-দিনে চলচ্চিত্র মুছে যাচ্ছে মানুষের মন থেকে। সিনেমা হলগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দর্শক অভাবে।

১৯৮০ সালের দিকে দেশের প্রতিটি শহরের আনাচেকানাচে বহু সিনেমা-হল গড়ে উঠেছিল। তখন খ্যাতিমান পরিচালকরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করত সামাজিক কাহিনী নিয়ে। তখনকার সময় মানুষ শত কষ্টের মধ্যে থেকেও সিনেমা দেখেছেন। নিজেও দেখেছি বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করে। তখন কোনও কোনও চলচ্চিত্র, একটা সিনেমা হলে ৫২ সপ্তাহ ব্যাপী একযোগে চলত। মানুষ ছিল সিনেমার পাগল, এই সুযোগে বিত্তশালীরা গড়তে থাকে সিনেমা-হল। আমি দেশের অন্যান্য শহরের কথা না বলে, নারায়য়ণগঞ্জের কথাই বলব।

প্রচ্যের ডান্ডি নায়ায়ণগঞ্জ শহরে সিনেমা-হল ছিল ৫টি। শহরের বাইরে তেমন কোনও সিনেমা-হল ছিল না। শুধু এশিয়ার সেরা পাটকল আদমজী নগরে ছিল একটি, নাম ছিল ‘মুন লাইট’ সিনামা। (‘মুন লাইট’ সিনেমা-হলটিও এখন নেই, হলের জায়গায় এখন ধুধু বালুচর)। এরপর মানুষের আগ্রহ দেখে, নারায়ণগঞ্জে সিনেমা-হল হয়ে যায় ১৫/২০ বা তার-ও বেশি। ওইসব সিনেমা-হল হওয়ার পর, হল-মালিকরা ২০০৪ সাল পর্যন্ত ব্যবসাও করেছে ভালো। ২০০৪ সালের পর থেকে সিনেমা-হলে নেমে আসে ধমকা হাওয়া। চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত হয় অর্ধনগ্ন নৃত্য আর নায়িকাদের বিকিনি সাজ। তাই চলচ্চিত্রে পড়ে যায় ধস, বন্ধ হতে থাকে সিনেমা-হল।

বর্তমানে প্রতিদিন কর্তব্য পালনে যেতে হয় গোদনাইল চৌধুরী বাড়ি। সেখানে একটা সিনেমা-হল আছে, নাম ‘বন্ধু সিনেমা-হল। সিনেমা হলটির সামনে গেলেই মনে পড়ে সেসময়ের কথা। ১৯৮৭ সালে যেসময় ‘বন্ধু সিনেমা হলটি চালু হয়েছিল। এই হলের সামনে থাকত, সকাল থেকে রাত ১টা পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য। সিনেমা-হল সংলগ্ন এলাকায় থাকত উৎসবমুখর পরিবেশ। থাকত বুট-বাদাম-সহ চটপটির দোকান আর হরেকরকমের খেলনার দোকান। এখন কিছুই নেই, শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘বন্ধু’ সিনেমা-হলটি। সিনেমা হলটি এখন বন্ধ, কোনও চলচ্চিত্র বা ছায়াছবি প্রদর্শন হয় না। দর্শক অভাবে প্রায় ২ বছর বন্ধ থাকার পর, হলটি এখন নিট কারখানা। হলের ভেতরে বসানো হয়েছে গার্মেন্টসের গেঞ্জি তৈরির মেশিন।
p20170822-224117 গোগনাইল চৌধুরী বাড়ি ‘বন্ধু’ সিনেমা-হল। এখন শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনও চলচ্চিত্র বা ছায়াছবি এখানে প্রদর্শিত হয় না। ‘বন্ধু’ সিনেমা-হল এখন গেঞ্জি তৈরির কারখানা।

একসময় এই সিনেমা-হলে একটা টিকিট কেনাকে কেন্দ্র করে লেগেছিল হুলুস্থুল। প্রায় সপ্তাহখানেক গোদনাইল এলাকায় বিরাজ করেছিল থমথমে অবস্থা। এখন আর সেই থমথমে অবস্থার আশংকায় মানুষের থাকতে হয় না। মানুষ এখন সিনেমা-হলের সামনেই যেতে চায় না। বর্তমানে আকাশপ্রযুক্তি হয়েছে মুক্ত, ঘরে বসেই দেখতে পারে দেশ-বিদেশের ছায়াছবি। ধনী-গরিব সবার ঘরে ঘরে ক্যাবল নেটওয়ার্ক সংযোগ। টিভি খুললেই দেখতে পায় বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি ছবি; যত চ্যানেল তত ছবি। নিজের ঘরে বসেই দর্শক আরাম-আয়েশে সেগুলো দেখছে।

গৃহিণীরা নিরিবিলি বসে অথবা কাজের ফাঁকে দেখছেন পছন্দের ছবি। এরমধ্যে দেশের সব গৃহিণীদের পাগল বানিয়ে রেখেছে ভারতীয় চ্যানেলগুলো। তারমধ্যে গৃহিণীদের জন্য ‘স্টার জলসা’ হলো অন্যতম। আর যুবকদের জন্য রয়েছে অর্ধনগ্ন প্রদর্শিত শতাধিক চ্যানেল। আগেকার সময় একটা গ্রামে বা মহল্লায় একটা টেলিভিশন খুব কম মানুষেরই ছিল। শীতলক্ষ্ম্যা নদী পার হয়ে টিভি দেখতে আসতাম, চিত্তরঞ্জন কটন মিলের শ্রমিকদের ক্লাবে। আর এখন পথেঘাটে, হাট-বাজারের দোকানে, বাস, লঞ্চ, স্টিমারেও টেলিভিশন লাগানো থাকে। মোট কথা রেললাইনের পাশে বস্তিঘরে থাকে কালার টেলিভিশন। বর্তমানে কিছু-কিছু টেলিভিশনে ইন্টারনেট বা ওয়াইফাই সংযোগও থাকে। তা হলে মানুষের সিনেমা দেখার দরকারই পড়ে না, মহল্লার চা-দোকানে বসেই যেকোনও ছায়াছবি দেখছে। যদি এসব না থাকত, তা-হলে মানুষ সিনেমা-হলে গিয়ে সিনেমা দেখত। আমি ওইসব ভারতীয় চ্যানেলকে দোষারোপ করছি না, শুধু দায়ী করছি আমাদের ব্যর্থতাকে। আমরা ডিজিটাল যুগে পা রেখেও পারছি না, সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে। সিনেমা-হল মালিকরাও দায়ী করছেন, ভালো মানের চলচ্চিত্র না পাওয়াকে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র:
১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকেই বোঝায়। স্বাধীনতার পরে চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে ছিলেন, আলমগীর কবির উল্লেখযোগ্য। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র হল; ‘ধীরে বহে মেঘনা, সূর্য কন্য, সীমানা পেরিয়ে, রূপালী সৈকতে, মোহনা, পরিণীতা ও মহানায়ক। জানা যায়, স্বাধীনতার বছর ১৯৭১ সালে এদেশে ৮টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এর মধ্যে নজরুল ইসলামের স্বরলিপি, অশোক ঘোষের নাচের পুতুল, আলমগীর কুমকুমের স্মৃতিটুকু থাক। আর খান আতাউর রহমানের সুখ দুঃখ সামাজিক চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য। এ-সব আলোড়ন সৃষ্টি করা চলচ্চিত্রগুলো নিজেও উপভোগ করেছি। কিছু বিটিভিতে, কিছু সিনেমা হলে বসে।

১৯৭২ সালে আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ জহিরুল হকের ‘রংবাজ’। সুভাষ দত্তের ‘বলাকা মন’ ও ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশেষভাবে জাগিয়ে তোলে। এই সুস্থ ও সৃজনশীল ধারায় ১৯৭৪ সালে নির্মিত হয় নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’। ১৯৭৫ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘লাঠিয়াল’, খান আতার ‘সুজন সখী। ১৯৭৬ সালে ছ’য়টি চলচ্চিত্র বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ধারণাকেই পাল্টে দেয়। যেমন; রাজেন তরফদারের ‘পালঙ্ক’ হারুনর রশীদের ‘মেঘের অনেক রঙ’, আলমগীর কবিরের ‘সূর্য কন্যা’, কবীর আনোয়ারের ‘সুপ্রভাত’, আবদুস সামাদের ‘সূর্যগ্রহণ’ এবং আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমনি’।
p20170822-224038

নারায়ণগঞ্জ ২নং রেল গেইট সংলগ্ন ডায়মন্ড সিনেমা-হলের পূর্বপাশে ‘গুলশান’ সিনেমা-হল। দর্শক অভাবে এই সিনেমা হলটিও হয়ত কিছু দিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, ডায়মন্ড সিনেমা হলটির এখন চিহ্ন নেই। সেখানে এখন বহুতল বহুতল ভবন।

মনে পড়ে ‘নয়নমনি’ চলচ্চিত্রটির কথা। যে-সময় চলচ্চিত্রটি আমাদের নারায়ণগঞ্জের ডায়মন্ড সিনেমা-হলে মুক্তি পেয়েছিল। এটি দেখতে গিয়ে পড়েছিলাম বিপাকে। আমরা সংখ্যায় ছিলাম তিনজন, টিকিট সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল আমার। আমি বুকিং এর সামনে গেয়ে লাইন ধরে আছি। বুকিং খোলার পর লেগে যায় হুলস্থুল, পাড়াপারি আর মারামারি। কেউ কেউ মাথার উপর দিয়েও হামাগুড়ি দিয়ে পড়ছে। কিছু দুষ্টু ছেলে দুষ্টামি করে এই হুলুস্থুলের মধ্যে ছেড়ে দেয়, দেশি (মাইট্টা পোড়া) সাপ। হায়! হায়! হুড়াহুড়ি তখন চরম আকারে রূপ নেয়। বুকিং এর সামনে চার পাঁচটি সাপ লাফাচ্ছে, কিলবিল করছে। তার পরও কেউ আর সাপের দিকে তাকাচ্ছে না, সবার লক্ষবস্তু হলো বুকিং। মানুষের পাড়ায় সাপ গেল মরে, বুকিং হয়ে যায় বন্ধ। এরপর সব টিকিট চলে যায় ব্ল্যাকারের হাতে। মানুষ চৌগুণ দাম দিয়ে কিনছে টিকিট, আমরা শুধু চেয়ে-চেয়ে দেখছি। আমাদের কাছে টাকা ছিল সীমিত, তাই ‘নয়নমনি’ না দেখে বাসায় এলাম ফিরে। পরদিন আবার নারায়ণগঞ্জ গিয়ে অনেক চেষ্টার পর, তিনটে টিকিট কিনে দেখেছি ‘নয়নমনি’। আজও চোখের সামনে ভেসে উঠে ফারুখ-ববিতা আর খলনায়ক এটিএম সামছুজ্জামানের অভিনয়ের দৃশ্য।

একসময় আলমগীর কবিরের ‘সীমানা পেরিয়ে, ছায়াছবি দেখতে পাগল হয়ে যাই। টিকিট কেনার টাকা জোগার করতে গিয়ে ৫ টাকা মুজুরিতে কাজ করেছি। আর আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে দেখতে গিয়ে, বুকিং এর সামনে খেয়েছি ব্লেডের খোঁচা। সেসময় আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সারেং বৌ’ শিল্পসফল চলচ্চিত্র হিসেবে নন্দিত হয়েছিল। এমন আরও অনেক চলচ্চিত্র দেখা আছে, যা লিখে শেষ করা যাবে না। আর এখনকার চলচ্চিত্রের নাম হয়, ‘খাইছি তোরে’, ‘নগ্ন হামলা’, ‘যাইবি কই’ ইত্যাদি ইত্যাদি। তখনকার সময়ে গ্রামবাংলা আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ হতো। সেসব চলচ্চিত্রের মতো এদেশে আর কখনও চলচ্চিত্র নির্মাণ হবে কি না, জানি না। যদি না হয়, তা হলে মানুষও সপরিবার নিয়ে সিনেমা-হলে যাবে না। যাবে, যদি অন্যান্য দেশের মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করে; তা হলে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিজ-এ যা আছে, বর্তমানে আমাদের দেশের বিএফডিসিতেও তা আছে: জানা যায়, পাঁচটি ডিজিটাল এডিটিং প্যানেল, একটি কালার গ্রেডিং মেশিন রয়েছে। পুরাতন শব্দ ভবনের দ্বিতীয় তলায় সেগুলো স্থাপন করা হয়েছে। আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। কালার দেখার জন্য বড় পর্দার প্রজেকশন আছে।

শব্দ গ্রহণের বিষয়ে তিনটি ডাবিং, মিক্সিং ও রি-রেকর্ডিং মেশিন বসানো হয়েছে। সেখানে শব্দ গ্রহণের যাবতীয় কাজ করা যাবে। পাঁচটি সনি এফ-৫৫ ক্যামেরা ও একটি রেড ক্যামেরাও আছে। এরই মধ্যে দুটি অ্যালেক্সা ক্যামেরা আছে। যা ১৭ ইঞ্চি মনিটর আছে দেখার জন্য। প্রয়োজনীয় সব ধরনের লেন্স, জুমলেন্স, একাধিক ফিলটার, আধুনিক ট্রাইপড। সঙ্গে আছে ম্যাকের কম্পিউটার ডাটা ট্রান্সফারের জন্য। ক্যামেরায় ওয়াইফাই আছে, যাতে রিমোট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

শুনেছি বিএফডিসিতে আরো রয়েছে, দূরনিয়ন্ত্রণযোগ্য ৪০ ফুটের সর্বাধুনিক দুটি ২০ ফুট ট্রলি, যা ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘোরানো যায়। এসি-ডিসি দুটোই আছে, যে কারণে পাহাড়ি বা দুর্গম অঞ্চলেও এগুলো ব্যবহার করা যায়।

বর্তমান সরকার এখন বাংলাদেশকে ডিজিটাল করতে সব-রকম প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনকে (বিএফডিসি) ঢেলে সাজানো হচ্ছে। অ্যানালগ যন্ত্রপাতিকে রূপান্তর করা হচ্ছে ডিজিটালে। একটি চলচ্চিত্র শুটিং থেকে শুরু করে লাইট, ক্যামেরা, ডাবিং, এডিটিং, কালার মিক্সসহ সব কাজই করা যাবে এই প্রতিষ্ঠানে। শুনেছি সামনে ছবি মুক্তির কন্ট্রোল প্যানেল চালুর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, তা-হলে আমাদের ব্যর্থতা কোথায়? এতো আধুনিক যুগের, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও, ভালো মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে না কেন?

অথচ আগেকার সময়ে সনাতনী যন্ত্রপাতি দিয়েও দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছিল বঙ্গদেশের চলচ্চিত্র। স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল, ১৯৭৬-১৯৭৯ সালে। ওয়াসিম-ওলিভিয়া অভিনিত ‘দি রেইন’ ছিল কোনও একসময়ের সাড়াজাগানো চলচ্চিত্র। এরপর মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর যৌথ নির্মাণে তৈরি হয়েছিল,’ ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’। এটিও চলচ্চিত্রকে নতুন করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এ ছাড়াও ২০০৩ সালে তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মাটির ময়না’ অস্কার পুরস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য পেশ করা হয়েছিল। চূড়ান্ত পুরস্কারের জন্য মনোনীত না হলেও এটি বেশ গুরুত্ববহ ছিল।

কারণ এটিই প্রথম বাংলাদেশী ছবি যা অস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রেরণ করা হয়। এরপর দুই বছর কোন বাংলাদেশী ছবি অস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। ২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছরই বাংলাদেশ থেকে একটি চলচ্চিত্র অস্কারের জন্য পেশ করা হচ্ছে। ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত পেশ করা সিনেমা তিনটি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’, আবু সাইয়িদের ‘নিরন্তর’ এবং গোলাম রাব্বানী বিপ্লবের ‘স্বপ্নডানায়’। এখন আর এ-সব শোনা যায় না, পত্রপত্রিকায় চলচ্চিত্র নিয়ে কেউ বেশি কিছু লেখে না। আগেকার সময়ে চলচ্চিত্র নিয়ে দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখত। খবরের কাগজের ভেতরের পাতায় চলচ্চিত্র নিয়ে নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হতো। আরও ছিল বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা, নাম ছিল ‘চিত্রালী’। এই চিত্রালী পত্রিকার সব খবরই ছিল চলচ্চিত্র আর চিত্রতারকাদের নিয়ে। খবরের কাগজের ভেতরের পাতার নাম থাকত, ‘রূপালী তারার দেশে’। সেই পাতায় লেখালেখি হতো নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে চলচ্চিত্রের হালচাল নিয়ে। এখন আর তা হয় না, এখন খবরের ভেতরের পাতায় থাকে শুধু বিজ্ঞাপন। চলচ্চিত্র নিয়ে হয় না, পত্রিকায় ও রেডিও টেলিভিশনে সম্প্রচার। পত্র-পত্রিকায় দেওয়া হয় না, চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন। আগে একটা চলচ্চিত্র বা ছায়াছবি মুক্তি পাবার অনেক আগে থেকেই, রেডিওতে শোনা যেত ছায়াছবির এডভার্টাইজ।

শোনা যেত মুক্তি পাবে এমন ছায়াছবির আংশিক গান ও কাহিনীর সংলাপ। ওইসব এডভার্টাইজ শুনেই মানুষ সিনেমা দেখার জন্য উদ্ধৃত হতো। চায়ের দোকানে, ঘরে-বাইরে আলোচনা চলত চলচ্চিত্র নিয়ে। প্রতিযোগিতা চলত কার আগে কে দেখবে আসন্ন মুক্তি পাওয়া ছায়াছবিটি। এখন আর এসব শোনা যায় না, গবেষণা হয় না চলচ্চিত্র নিয়ে। এখন গবেষণা হয়, তামিল চলচ্চিত্র নিয়ে আর ভারতীয় হিন্দি ছায়াছবি নিয়ে। মনে পড়ে ১৯৮৪/৮৫ সালের কথা, যখন এই বঙ্গদেশে ভিসিআর এসেছিল, সেসময়ের কথা। একটা হিন্দি ছায়াছবি দেখার জন্য সারারাত জেগে থেকেছি। সময়-সময় পুলিশের দৌড়ানও খেয়েছি বহুবার।

এখন আমাদের হাতের মুঠোয় থাকে পৃথিবীর সব দেশের ছায়াছবি। যেকোনও ছায়াছবি মুক্তি পাবার আগেই ইউটিউবে সেই ছায়াছবির সব গানই পাওয়া যায়। পাওয়া যায়, মুক্তির আশায় যেই চলচ্চিত্রযটি সেন্সরবোর্ডে লাইন ধরে আছে, সেটিও। সবরকম এবং সব-দেশের পূন্য দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও ইউটিউবে পাওয়া যায়। আগেকার সময় বিটিভিতে মাসে একটা ছায়াছবি দেখানো হতো। সপ্তাহের শুক্রবারে রাত ৮টা বাংলা সংবাদের পর, শুরু হতো পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি। (সন্ধ্যাবেলা থেকেই টেলিভিশনের সামনে, পিঁড়ি রেখে জায়গা দখল করে রাখতাম) আর এখন, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন চ্যানেলে ২৪ ঘণ্টাই দেখানো হয় বাংলা ছায়াছবি। তা হলে আমারা সিনেমা-হলে যাব কেন? যাওয়ার দরকারই পড়ে না। দরকার হতো, মনও চাইত সিনেমা-হলে যাবার, যদি ডিশএন্টেনার সংযোগ না থাকত।

দরকার হতো যদি হাটবাজারে, দোকানে লোড ডাউনলোডের দোকান না থাকত। এখন সবই পাওয়া যায় হাতের নাগালেই, আবার নিজের পকেটেই থাকে ইন্টারনেট সংযোগ। যখন যা মন চায়, তখন তা-ই দেখতে পারি। এই দেখাই শেয দেখা নয়, আমাদের দেখতে হবে চলচ্চিত্রের উন্নয়ন। ভাবতে হবে দেশের কথা, চিত্রজগতের পরিচালকদের শুনতে হবে দর্শকদের কথা। দর্শক কী চায় আর কী চায় না। সেদিকে একটু খেয়াল রেখে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেই, চলচ্চিত্রের সোনালী দিন ফিরে আসবে। চলচ্চিত্রের এই সোনালী দিনের আশা করতে হলে,আমাদের নির্মাণ করতে হবে ডিজিটাল চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে হবে আমাদের আর্থসামাজিক গণমানুষের কথা।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দিবস:
আমরা জানি, ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প, বাণিজ্য, ত্রাণ ও দুর্যোগ কল্যাণমন্ত্রী ছিলেন। তিনি মন্ত্রী থাকাকালে প্রাদেশিক পরিষদে এফডিসি বিল উত্থাপন করেন। তার পর-পরই এফডিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। চলচ্চিত্র নির্মাণের পূর্ণাঙ্গ স্টুডিও প্রতিষ্ঠার দিনটিকে বর্তমান সরকার জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস ঘোষণা করেছে। সেই থেকেই প্রতিবছর ৩ এপ্রিল ‘জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস।

এই দিবসটিতে আমাদের শ্লোগান থাকতে হবে, ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণ। বিদেশি চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ, ডিশএন্টেনায় বাংলা ছায়াছবি সম্প্রচার বন্ধ। ভারতীয় চ্যানেল বন্ধ কর। মা-বোনদের জীবন বাঁচাও, যুবসমাজ রক্ষা কর। করতে হবে, করতে হবে।

ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণে চিত্রপরিচালকদের জন্য কয়েকটি টিপস্

• নকলকে কেউ পছন্দ করে না, আর নকলের কোনও গ্যারান্টিও নেই। সুতরাং তামিল ছায়াছবি ও হিন্দি ছায়াছবির হুবহু নকল বন্ধ করতে হবে।
বিদেশিদের দেখাদেখি অর্ধনগ্ন বা কাটপিস বন্ধ করতে হবে।

• বর্তমানে চিত্রজগতে নায়ক-নায়িকার খুবই অভাব। নতুন নতুন নায়ক-নায়িকা খুঁজে বের করতে হবে। প্রয়োজনে নাটক, মডেল বা মিউজিক ভিডিও থেকে তারকাদের বেছে নিতে হবে। তবে তারা অভিনয়ে ঠিক উপযোগী কি না, সেটা অবশ্যই ইন্টার্ভিউর মাধ্যমে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে একেবারে নতুনদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

• শুধু নায়ক-নায়িকার অভাবই নয়, অভাব পড়েছে কৌতুকাভিনেতারও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু কৌতুকাভিনেতা আছে, যারা সরাসরিভাবে চিত্রপরিচালকদের স্মরনাপন্ন হতে পারছে না। আগ্রহীদের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসার আহ্বান জানানো যেতে পারে।

• বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে খলনায়কেরও খবই অভাব রয়েছে। বর্তমানে ‘মিশা সওদাগর’ ছাড়া খলচরিত্রের কথা ভাবাই মুশকিল। ‘মিশা সওদাগর’ একদিন না-ও থাকতে পারে, তখন কী হবে? তখন হয়ত চলচ্চিত্র নির্মাণ একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যাবে। আগে যাদের দেখেছি, তাদের মধ্যে অনেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে করেছেন। পুরানো যারা আছেন, তারা আজ বয়সের ভারে দমে গেছে। একসময় এশিয়ার সেরা খলচরিত্রভিনেতা চিলেন, খলনায়ক ‘জসিম’। তিনি এখন প্রয়াত, চিত্রজগত থেকে দূর জগতে। কাজেই, নতুন নতুন খলনায়কও খুঁজে বের করতে হবে। তা-ও টেলিভিশনে, রেডিওতে, পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে।

• ফাইটিং দৃশ্যে সীমাবদ্ধতা থাকতে হবে। একজন নায়ক ২০/২৫ জনকে যেন না মারতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কেননা, এখন ডিজিটাল যুগ, এসব ফু-ফা দৃশ্য মানুষ আর দেখতে চায় না। মারামারিরও একটা সীমা থাকা উচিৎ। আগেকার সময়ের ‘রাজ্জাক’ অভিনীত রংবাজ কেমন ছিল? ঠিক তেমনই হওয়া চাই।

• নায়িকাদের পোষাকের প্রতি নজর রাখতে হবে। কেননা, এটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এদেশে অশ্লীলতা অনেকেই পছন্দ করে না। অন্তত নায়িকাদের হাফপ্যান্ট পঢ়ে অভিনয় করা বন্ধ করতে হবে। ২০০৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এমন হেয়েছিল যে, বাংলা চলচ্চিত্র যেন হলিউড চলচ্চিত্র। সেসময় এই বাংলা চলচ্চিত্র হলিউড চলচ্চিত্রকেও হার মানিয়ে ছেড়েছিল। তখন চিল চিত্রনায়িকা ‘মৈয়ুরী’ ‘ঋতুপর্ণা’র যুগ। সেই থেকে এখনও চলছে নায়াকাদের হাফপ্যান্ট, নাইট ড্রেস পঢ়ে অভিনয়। এসব পোষাক অনতিবিলম্বে পরিহার করতে হবে।

• চলচ্চিত্রের কাহানী সংলাপ দেশের সমাজ থেকে নিতে হবে। হয়ত শহরের, হয়ত গ্রাম্যতা। আমাদের সোনার বাংলায় অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে। এতো সুন্দর জায়গা থাকতে আমরা বিদেশে গিয়ে শুটিং করব কেন? আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি, আমাদের দেশের কুড়েঘরে বসেই শুটিং করব। আগেকার সময়ে কী দেশের জায়গায় শুটিং করা হয় নাই? যা করেছে, সেসব শুটিং বিশ্বসেরাও হয়েছে। তাই চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে আমাদের দেশকে ভালোবেসে।

• পরিচালকদের সিনেমা-হল মালিকদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে হবে। চলচ্চিত্রের ব্যাপারে সিনামা হল-মালিকদেরও অনেক অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। চলচ্চিত্রের জন্য সিনেমা হল-মালিকদের পরামর্শ একান্ত জরুরি।

• চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। এই বঙ্গদেশে আগেকার সময় সনাতনী পদ্ধতিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও বিশ্বপ্রসিদ্ধ হয়েছিল। আর এখন-তো ডিজিটাল যন্ত্রপাতি, সব কিছুই অত্যাধুনিক। যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও, আমাদের সামাজিকতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

• চলচ্চিত্রের দুর্দিনকে সুদিনে আনতে হলে, নতুন নতুন কৌশল অবলম্ব করতে হবে। চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার আগে থেকে রেডিও টেলিভিশনে এডভার্টাইজ করতে হবে। এডভার্টাইজিং-এ থাকতে হবে, আগেকার জহিরুল ইসলামের মতন বজ্রকন্ঠ।

• অনেক ছায়াছবিতে দেখা যায়, একটা গানের দৃশ্য ধারণের জন্য দুই-তিন জাগায় যাওয়া হয়। দুই-তিন জায়গার দুই-তিনটা দৃশ্য ধারণ করতে সময় লেগেছে ৩ সেকেন্ড করে ৯ সেকেন্ড। এই ৯ সেকেন্ড সময়ের দৃশ্য দিয়েই পুরো একটা গান এডিটিং করে দেখানো হয়। এতে দর্শক হয়ে ওঠে বিরক্ত, দর্শকের হয়ে যায় মন খারাপ। দর্শকের বিরক্ত মানে সিনেমার প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে ওঠো। কাজেই দুই-তিন জাগায় না গিয়ে, এক জায়গাতেই একটা গানের দৃশ্য ধারণ করলেই ভালো। যেমনটা আগেকার সময়ে হয়েছিল। এ বিষয়টিও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মাথায় রাখতে হবে।

• রাস্তাঘাটে চলতে গেলে বিপদ আসতেই পারে, তা স্বাভাবিক। নায়িকা বিপদে পড়েছে, নায়ক বাবাজী উদ্ধার করবে বাস্তবে যে-ভাবে হয় সে-ভাবে। কিন্তু_ আকাশ থেকে উড়ে এসে নায়িকা মা-মনিকে উদ্ধার করল; তা যেন না হয়। মানুষ এমন দৃশ্য পছন্দ করে না, মানুষ চায় বাস্তব দৃশ্য।

• মারামারির দৃশ্য ধারণের সময়ও খেলাল রাখতে হবে, কাল্পনিক মারামারি যেন না হয়। নায়কের এক লাথিতে গুণ্ডারা যেন আকাশে ওঠে না যায়। নায়কের হাতের সংস্পর্শে দেয়াল যেন ভেঙ্গে না পড়ে। তা হলে ওই চলচ্চিত্রটাই ভেঙ্গে পড়বে। মানুষ এখন সবই বুঝে, বোকা মানুষ এখন আর নেই। যারা আছে, তারা এখন মৃত্যুর দুয়ারে। কারণ, তাদের এখন বয়স হয়েছে। তারা এখন সিনেমা দেখতে যায় না, যায় তাদের ছেলেপিলে। আর এখনকার বেশিরভাগ ছেলেপিলেরা শিক্ষিত, মেধাবী, বোকা নয়।

• আগেকার সময়ে চলচ্চিত্র বা ছায়াছবি ছিল সাদাকালো, ১৯৭৬ সালের দিকে হয়েছে আংশিক রঙিন। তবু চলচ্চিত্রকে স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করেছিল সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। আমরা বর্তমান ডিজিটাল যুগে পা রেখেও চলচ্চিত্রের কালার মানানসই করতে পারছি না। ভারতীয় তামিল বা হিন্দি ছবির কালার আয়নার মতো থাকে ঝকঝকা। আর আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের কালার সেই আমলের সাদা-কালো ছবির মতনই। বুঝি না, এখানে ডিফারেন্সটা কোথায়? শুনেছি কিছু অর্থ বাঁচানোর জন্য কমদামী ফিল্ম ব্যবহার করা হয়। যদি তা-ই হয়, তা-হলে বুঝব; এই সামান্য অর্থ বাঁচানোর কারণে আজ চলচ্চিত্রের এই অবস্থা। চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় চিত্রপরিচালকদের এ-দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বেশি দামী ফিল্ম ব্যবহার করতে হবে।

• কোনও একসময় এদেশে একটা চলচ্চিত্রের নাম নিয়ে লেগে গিয়েছিল কাড়াকাড়ি। যেমন, ‘শান্ত কেন মাস্তান’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘বাবা কেন চাকর’। এই ‘কেন’ নিয়ে চিত্রপরিচালকরা লেগে যায় রশি টানাটানিতে। এমন আরও অনেক নাম আছে, যেসব নাম নিয়ে এদেশে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছিল। যা ছিল সিনেমা প্রেমীদের মাঝে এক বিরক্তির দীর্ঘশ্বাস। একজন পরিচারকের একটা চলচ্চিত্র আলোড়ন সৃষ্টি করলে, অন্য পরিচালক হিংসায় মরে। আর তখনই সেই নাম নিয়ে উঠেপড়ে লেগে যায়। তা_কিন্তু ঠিক নয়, এসব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

• যেকোনও কর্ম শিখতে হলে আগে দরকার হয় শিক্ষাগ্রহণ, পরে দরকার হয় প্রশিক্ষণ। জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতে দক্ষ চলচ্চিত্রশিল্পী তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে তা নেই। একজন অভিনেত্রী-অভিনেতা অভিনয় শুরুর আগে, তার জন্য অভিনয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিনয় করে দর্শকের মনে স্থান নিতে হলে, তার অভিনয়ও থাকতে হবে মন-মাতানো। তাই অভিনয় প্রশিক্ষণের বিকল্প নাই, থাকা চাই অভিনয় শিক্ষা ব্যবস্থা। যেসব অভিনয় শিল্পীরা অভিনয়ে দুর্বল, তাদের জন্য কোর্স দরকার। এজন্য সিনিয়র শিল্পীদের কাজে লাগানো যেতে পারে। তাদের মাধ্যমে কর্মশালা করা যেতে পারে।

চলচ্চিত্র বাঁচাতে সরকারের প্রতি দাবি:
• প্রতিবছর জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়। সেই বাজেটে দেশের নানারকম সমস্যার কথা ভেবে ভর্তুকি দেওয়া হয়। যেমনটা দেওয়া হয় কৃষিখাত-সহ আরও নানারকম খাতে। সিনেমাশিল্পকে মাজা_সোজা করে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। এবং এ শিল্পের ওপর থেকে সব ধরনের ভ্যাট, ট্যাক্স প্রত্যাহার করে নিতে হবে। প্রয়োজনে চলচ্চিত্রকেও ভর্তুকির আওতায় আনতে হবে।

• আকাশপ্রযুক্তির ডিশএন্টেনায় বাংলা ছায়াছবি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। শুধু বিটিভিতে প্রতিমাসে একবার একটি করে ছায়াছবি সম্প্রচার করা হবে।
আনাচেকানাচে গড়ে ওঠা লোড-ডাউনলোডের দোকান নিষিদ্ধ করতে হবে। বিশেষ করে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো বন্ধ করতে হবে। ভারতীয় চ্যানেল বন্ধ হলে সরকারের লাভ হবে দু’টো। (এক) দেশীয় চলচ্চিত্রের উন্নতি হবে। (দুই) যুবসমাজ সুস্থ্যধারায় জীবন গড়তে পারবে। বছর বছর দেশের মেয়েরা স্টার জলসা সিরিয়ালের পোষাকের জন্য প্রাণ হারাবে না। তাই আমাদের চলচ্চিত্র আর যুবসমাজ বাঁচাতে ভারতীয় টিভি চ্যানেল নিষিদ্ধ করতে হবে।

• কিছু-কিছু নায়ক-নায়িকা এদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, বর্তমানে বিদেশে বসবাস শুরু করেছে। কয়েকজননের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে; বাংলার মানুষের হৃদয়ের মণি, শাবানা। ব্যবসাবহুল চলচ্চিত্র ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র নায়িকা, অঞ্জু ঘোষ। এমন আরও অনেক আছে, তারা এখন বাংলার মাটিতে পা রাখে না। অথচ এই দেশেই হয়েছিল তারা প্রতিষ্ঠিত। স্বীকার করি যে, তারা এখন নায়িকার ভূমিকায় আনফিট। মায়ের ভূমিকাও-তো করতে পারে! তাদের দেখে, তাদেরই ভক্তরা সিনেমা হলে যাবে। তাদেরকে দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানানোর জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ রইল। আর ভবিষ্যতে কোনও নায়কনায়িকা যাতে বিদেশ পাড়ি না জমায়, সেদিকেও সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে। উল্লেখ করা যায় যে, ভারতীয় কোনও অভিনেতা-অভিনেত্রী ভিনদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে না। এই রীতিটা শুধু আমাদের দেশের নায়ক-নায়িকাদের বেলায়ই প্রযোজ্য হয়ে উঠেছে।

চলচ্চিত্র আর সিনেমা-হল বাঁচাতে হল-মালিকদের যা করতে হবে:
• মানুষকে সিনেমা-হল মুখি করতে হলে, সিনেমা-হলের পরিবেশ সুন্দর করতে হবে। যাতে মানুষ আরাম আয়েশে বসে চলচ্চিত্রের বিনোদন উপভোগ করতে পারে। সিনেমা-হলের কর্মচারী কর্তৃক কোনও দর্শক যেন নাজেহাল না হয়। মাসে একবার চিত্রজগতের নায়ক-নায়িকাদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে। নায়ক-নায়িকারা মাসে একবার আসলে দর্শক সংখ্যা এমনিতেই বেড়ে যাবে।

• যেই চলচ্চিত্র বেশি হিট হয়, সেই চলচ্চিত্রের দর্শকও বেশি হয়। দর্শদের উপস্থিতি বেশি দেখে অনেক সিনেমা-হলে বুকিং বন্ধ রাখে। আর অসাধু কর্মচারীগণ টিকিট বিক্রি করে দেয় বাইরে, দর্শক পড়ে যায় বিপাকে। যেকোনও ছায়াছবি চলাকালীন সময়ে এমনটা যেন না-হয়, সে-দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

• সিনেমা-হলের চারপাশ সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। প্রতিটা শো শেষ হওয়ার পর, হলের ভেতরে দর্শকদের ফালানো বাদামের খোসা, চিপস এর পেকেট, আইসক্রিমের কাঠি ইত্যাদি সাথে সাথে পরিষ্কার করতে হবে।

• শো শেষ হবার আগে থেকেই হলের সামনে দর্শকদের ভিড় জমে। অনেক হলেই অপেক্ষারত দর্শকদের বসার ব্যবস্থা নেই। প্রত্যেক সিনেমা-হলের সামনে দর্শকদের জন্য বসার ব্যবস্থা করতে হবে।

• আগেকার সময় সিনেমা হল-মালিকরা সদ্য মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র, নিজ খরচে প্রচার করত। হয়ত ভ্যানগাড়ি, না হয় কোনও ট্রাক বা বেবিট্যাক্সিতে। কিন্তু_এখন আর তা হয় না, শোনা যায় না ছায়াছবি প্রচারের ব্যান্ডপার্টির বাজনা। দর্শকদের হলমুখি করতে সিনেমা হল-মালিকদের ছায়াছবির প্রচারাভিযান চালাতে হবে।

সেন্সর বোর্ডের কার্যকাল ও ভূমিকা:
জানা যায়, বাংলাদেশের ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের কার্যকাল এক বছর। এই বোর্ড সরকারি ও বেসরকারি স্তরের বিশিষ্ট ১৫ জন ব্যক্তি নিয়ে গঠিত। সেন্সর বোর্ডের নীতি অনুযায়ী এ বোর্ডের সভাপতি পদাধিকার বলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সচিব। আর সহ-সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের একজন সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি চলচ্চিত্র সেন্সর আপিল কমিটিও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প বর্তমানে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড বর্তমানে স্থানীয়ভাবে নির্মিত এবং বিদেশি কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, তথ্যচিত্র, খণ্ডচিত্র (ট্রেইলর), বিজ্ঞাপনচিত্র, এমনকি পোস্টারেরও সেন্সর করে থাকে। চলচ্চিত্রের ছাড়পত্র বোর্ডে সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। আবার তারা মনে করলে, কোনও চলচ্চিত্রের ছাড়পত্র প্রত্যাহারও করে নিতে পারে। তবে মূল বিষয় হলো, বাংলাদেশের সেন্সর বোর্ড পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত।

ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের কাছে দাবি:
• নতুন চলচ্চিত্র ছাড়পত্র দেওয়ার আগে ভালো করে দেখে নিতে হবে। দেখতে হবে, চলচ্চিত্রটিতে কোনপ্রকার অশ্লীলতা, রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপ, এবং নকলের ছোঁয়া আছে কি না। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে তৈরি করা চলচ্চিত্রের দিকেও খেলাল রাখা দরকার। ওইসব চরিত্র দেখে দেশের সোনার ছেলেরা যেন সন্ত্রাসী না হয়। নায়িকাদের পোষাকের দিকেও লক্ষ্য রাখা জরুরী। আমাদের দেশটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, সামান্য একটা আপত্তিকর দৃশ্যের জন্য আলামত শুরু হতে পারে। এসব বিষয়ে ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের সজাগ দৃষ্টি থাকতে হবে।

• মুক্তি পাওয়া ছায়াছবির পোস্টারের দিকেও খেয়াল রাখা দরকার। ১৯৮৯ সালের দিকে চলচ্চিত্রে অকথ্য ভাষায় গালাগালি শুরু হবার পর, ছায়াছবির পোস্টারের দৃশ্যও পাল্টে যায়। একটা মুসলিম প্রধান দেশের রাস্তাঘাটে, এখানে-সেখানে সিনেমার পোস্টার লাগানো হয়। সেসব পোস্টার নিয়েও সময়-সময় সমালোচনর জন্ম হয়েছিল। কারণ ছিল, অর্ধনগ্ন আর নায়িকাদের বিকিনি সাজের ছবি সংবলিত পোস্টার। তাই ছায়াছবির পোস্টার অনুমোদন দেওয়ার সময় এ-দিকে একটু খেয়াল রাখতে হবে।

চিত্রপরিচালকদের কাছে দর্শক কী চায়?
• দর্শক যে পরিবর্তনটা চায় তা-হল; দর্শক নতুন গল্প ও আধুনিক নির্মাণ, দু’টিই তারা দাবি করে। দাবি করাটা তাদের অধিকার। দর্শক চায় সামাজিক ও বাস্তব কাহিনী। দর্শক চায় আয়নার মতো ঝকঝকে ছায়াছবি আর নতুন নতুন নায়ক-নায়িকাদের অভিনীত চলচ্চিত্র। দর্শক চায় হাসি-গানে ভরা মন-মাতানো ছায়াছবি। দর্শক চায় রাজ্জাক শাবানার মতো পারদর্শী অভিনেতা-অভিনেত্রী। বর্তমানে চিত্রজগতে হাসানোর মানুষ খুবই কম। চিত্রপরিচালকদের উচিৎ নতুন নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কৌতুকাভিনেতা খুঁজে বের করা।

সিনেমা-হল বন্ধ, এর মূল কারণ দর্শক সংকট:

দেশের সিনেমা হল-গুলোতে এখন দর্শকখরা চলছে। দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়ায় ছবি চালিয়ে খরচ ওঠানো হয়ে পড়েছে মুশকিল। তাই হল-মালিকরা এখন কঠিন সময় পার করছে। নারায়ণগঞ্জ-সহ সারা দেশেই সিনেমা হল-গুলো দেখতে পরিত্যক্ত বাড়ির মতো! কোনও কোনও সিনেমা-হল এখন বড় শপিং মল। সামনে গেলে বুঝাই যায় না যে, এখানে কোনও একসময় সিনেমা-হল ছিল। যেগুলো আছে সেগুলো ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দর্শক সংকটে। অনেক মালিক সিনেমা-হল বন্ধ করে রেখেছেন, লোকসানের ভয়ে। আবার অনেকে বন্ধ করার চিন্তাও করছেন।

জানা যায়, আগে নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে মোট ১ হাজার ৪৩৫টি সিনেমা-হল চালু ছিল। দেশে ২০১১ সালেও চালু সিনেমা-হলের সংখ্যা ছিল ৬১৮টি। ২০১১ সালের কথা, তখন আমি সিরাজগঞ্জ চালা ও বেকুচিতে চাকরি করি। তখন দেখেছি, সিরাজগঞ্জ জেলার চালা ও বেলকুচি থানার সাতটি সিনেমা-হল। এসব প্রায় সবগুলো সিনেমা-হলেই আমি সিবেমা দেখেছি। কিছুদিন আগে জানতে পেরেছি, সেখানে সাতটি সিনেমা-হলের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে চারটি। এর কারণ শুধু একটাই, তা হলো দর্শক সংকট।

আমি কোনও একসময় চট্টগ্রামে চাকরি করেছি। শহরের কর্ণফুলী সিনেমা-হল ও জলসা সিনেমা-হলে সিনামা দেখেছি। জানা যায়, এই দুটি সিনেমা-হলসহ আরো বেশ কয়টি হল বন্ধ হয়ে গেছে, প্রায় দুই বছর আগে। আরও জানতে পারলাম, শুধু ঢাকা বিভাগে বন্ধ সিনেমা-হলের সংখ্যা ২৩০টি। তারমধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলোর সংখ্যাও কম নয়। দর্শক সংকটে দেশের বিভাগীয় শহরের সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কোনও এক সময় এদেশে সিনেমা হলই থাকবে না।

আগে বছরে ৯০ থেকে ১০০টি নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। এটা গত কয়েক বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে চিত্রজগতে নায়ক-নায়িকা, কৌতুকাভিনেতা, খলনায়কের অভাবের মধ্যে নতুন চলচ্চিত্রও নির্মাণ হচ্ছে কম। সিনেমা হল-মালিকেরা পাচ্ছে না নতুন ছবি। পুরানো ছবি মানুষ আর দেখতে যায় না, তাই দর্শক সংকট চলছেই। কোনও ছুটির দিনে বা বন্ধের দিনে সিনেমা-প্রেমী মানুষ যায় সিনেমা দেখতে। তখন যদি দেখে সেই গত সাপ্তাহের ছবিই চলছে, তা হলে কী হয়? দর্শক মন খারাপ করে চলে আসে। তাই সিনেমা-হল বাঁচিয়ে রাখার জন্য হল-মালিকদের চাই সপ্তাহে নতুন-নতুন ছবি।

আর নতুন নতুন চলচ্চিত্র উপহার দিতে হলে, চিত্রপরিচালকদের নিতে হবে নতুন কৌশল। জানা যায়, চলতি বছর চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে মাত্র ২০টি। যে-খানে আগে মুক্তি পেতো ১০০টি, তা-হলে সিনেমা হল-মালিকদের চাহিদা পূরণ হবে কী করে? চিত্রপরিচালকরাও পারছে না, চাহিদা পূরণ করতে। কেন পারছে না? পারছে না এই কারণে যে, সিনেমা-হলে দর্শক সংকট। তাই তারা নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণে হিমশিম খাচ্ছে।

শেষ কথা:
এ অবস্থায় দেশের মানুষের বিনোদনের প্রাচীন ও জনপ্রিয় এ খাতকে এখন রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ মুহূর্তে চলচ্চিত্র ও সিনেমা-হল বাঁচাতে হলে, দরকার চিত্রজগতের সবাইর সম্মিলিত প্রচেষ্টা। কী কারণে আজ চলচ্চিত্রের এই বেহাল দশা, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার। দর্শক কী চায় আর কী চায় না, তা-ও বিবেচনায় রাখতে হবে চিত্রপরিচালকদের। বিএফডিসিতে অত্যাধুনিক কোনও যন্ত্রপাতির প্রয়োজনে সরকারের সহযোগিতা চাওয়া দরকার। একই সাথে চলচ্চিত্রের এই দুর্দিনে দরকার, সরকারকেও এগিয়ে আসা।

পাশাপাশি ডিজিটাল চলচ্চিত্র ও সিনেমা-হলের সোনালি দিনের আশা নিয়ে কাজ করা। আমাদের ভাবতে হবে, ডিজিটাল বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে। এই চলচ্চিত্রের সাথে জরিয়ে আছে দেশের কোটি মানুষের জীবন জীবিকা। সেই চলচ্চিত্র আর সিনেমা-হলের জন্য নতুন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। বাঁচিয়ে রাখতে হবে চলচ্চিত্রশিল্পকে। বাঁচাতে হবে সিনেমা-হলসহ এর সাথে জরিত সকলকে। তাই বলছি চলচ্চিত্র আর সিনেমা-হল বাঁচাতে হলে, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা একান্ত জরুরী। না হয় এই চলচ্চিত্রশিল্প আর সিনেমা-হল, কোনও একদিন রূপকথার গল্পে পরিণত হবে।