ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

প্রতিটা ঘটনা ঘটার পিছনে অবশ্যই একটি কারণ থাকে। ঘটনা যখন খানিকটা ঘটে তার উপর ভিত্তি করে আমরা তার সঠিক কারণ খোঁজ করি, ঘটনা গুলি কেন ঘটছে। ইউক্রেনে যে ইউক্রেনীয় সরকার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে চলমান বিরোধ চলছে তার কারণ কি? বিদ্রোহীদের ক্রিমিয়ার দখলের কারণ কি? পশ্চিমারা কেন বা ইউক্রেন সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে আর রাশিয়া বা কেন বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে ? এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রিমিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও ইউক্রেনীয় বিষয়ে এতো সচেষ্ট কেন?

এই বিষয় গুলি উপলব্ধি করা একেবারে যে কঠিন তা না। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিপর্যয়কারী ঘটনা, পুতিনের এমন উপলব্ধিকে স্বাগত জানাতেই হয়। তার এই উপলব্ধি থেকে তিনি একটি ‘জাতীয় ইউনিয়ন’গড়ার চিন্তা ভাবনা করছেন। যে ‘জাতীয় ইউনিয়ন’হবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে অধিকতর উন্নত এবং সুসংগঠিত। আর এই জাতীয় ইউনিয়ন গঠিত হবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পরিবর্তিতে যে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে তাদের নিয়ে। কিন্তু ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান রাশিয়ার সেই পরিকল্পনায় বাঁধ সাধে। এতে ইউক্রেন এবং ক্রিমিয়া বিষয়ে রাশিয়া হস্তক্ষেপ করেন। রাশিয়া ইউক্রেনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন।

রাশিয়ার ক্ষমতায় পুতিনের দীর্ঘ মেয়াদী অবস্থান সোভিয়েত পরবর্তি রাশিয়াকে তার সেই পতনের সময়ের নিম্নগতির অর্থনীতি থেকে বেড়িয়ে এনে ঊর্ধ্বগতির দিকে ধাবিত করেছে। রাশিয়া চায় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মধ্যে পূর্ব-ইউরোপ নিয়ে একটি অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা। যা হবে সুবিশাল ইউরেশীয় ইউনিয়ন।

ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয় ২৯শে মে ২০১৪ সালে। কাজাখস্থানের রাজধানী আস্তানায় স্থপতি সদস্য রাষ্ট্রসূমহ বেলারুশ, রাশিয়া, কাজাখস্থান মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরতার মধ্যদিয়ে। উদ্দেশ্য একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা এবং তাদের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে জীবন যাত্রার মান উন্নত করা। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের সমন্বয়ের মাধ্যমে কমিউনিটি রাষ্ট্রগুলির মধ্যে গতিশীলতা বৃদ্ধি করা। এই লক্ষে একটি ইউনিফায়েড পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ, কাস্টমস পরিবিধান তৈরি, শুল্ক ব্যবস্থা, সমান শর্ত ভিত্তিতে উদ্যোগ ও উৎপাদন কর্মকাণ্ড কাঠামো এবং শক্তিশালী বাজার গঠন ইত্যাদি।

বেলারুশ, রাশিয়া, কাজাখস্থান, কিরগিজস্থান, তাজিকিস্থান এবং আর্মেনিয়া ইত্যাদি, মিলে ইউরেশীয় আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অঞ্চল গঠন করা, একটি বিস্তৃত বাণিজ্য এলাকা তৈরি করা এবং এদের ভিতরে আর্থিক লিংক সৃষ্টি করে। সহজ বাণিজ্য-বিস্তৃতির জন্য একটি একক সাধারণ মুদ্রাও তৈরি হবে। যার নাম “ইউরেশীয় রুবল”।

ইউরো-জনের তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে একটি শক্তিশালী আর্থিক ইউনিয়ন প্রয়োজন। ব্যাংকিং এবং বাণিজ্যে প্রসারতার জন্য। সদস্যরা তাদের অর্থ, ব্যাংকিং অর্থনৈতিক বিষয়ক সর্বশেষ তাদের গণতান্তিক সার্বভোমত্ত বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য একটি  সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ইউনিয়ন প্রয়োজন অনুভব করে । আর তা হল ইউরেশীয় ইউনিয়ন।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, দুর্বল বাজার ভিত্তিক পশ্চিমা পক্ষপাতীত্ব সংঘাত এবং রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী ও জাতীয়তাবাদী সংঘাত ইত্যাদির কারণে রাশিয়ার দ্রুত চাপ বা প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে ইউরেশীয় ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার এবং বাস্তবায়ন জোরদার করার। বিশেষ করে ইউক্রেনের উপর ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্টের প্রভাব রাশিয়ার উদ্বেগের কারণ। রাশিয়ার কাঁচামাল বা জ্বালানী শক্তি রপ্তানি পাইপলাইন সম্পর্কিত অর্ধেকের বেশি ইউক্রেনের উপর দিয়ে। তাই ইউক্রেনের উপর রাশিয়া কোন ভাবেই পশ্চিমা প্রভাব মেনে নিবে না। রাশিয়া তার নিজের প্রভাব যে কোন মূল্যে বজায় রাখবে।

একটি পরিকল্পনা বুঝতে এবং বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন হয় গুরুতর চ্যালেঞ্জ এবং বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি। এই পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্তি যা রাশিয়ার বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ হিসাবে। যার কারণে পুতিন খুব বেশী চাপ প্রয়োগ করেছিলেন পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকেভিচকে। ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে যেন ইউরেশীয় ইউনিয়নে যোগদান করে।

অনুরূপ ভাবে রাশিয়া এবং তার ব্রিকস্ অংশীদার ব্রাজিল, চীন, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা মিলে ব্রিকস্ উন্নয়ন ব্যাংক তৈরি করেছে। যা পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের একটি বিকল্প হিসাবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
ইন্টারনেট অ্যাক্সেস দ্বারা রাশিয়া এবং অন্যান্য উদার রাষ্ট্রগুলি আমেরিকার নজরদারীতে পড়তে পারে তাই তারা তাদের জাতীয় নিয়ন্ত্রিত নিজস্ব তথ্য নেট ওয়ার্ক তৈরি করছে। রাশিয়া এবং চীন বিকল্প আন্তর্জাতিক পেমেন্টে সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছেন যা swift এর বিকল্প।

ইউরেশীয় তৈরিতে তার সদস্য রাষ্ট্রগুলি পশ্চিমাদের সাথে বাণিজ্য, আর্থিক, অর্থনৈতিক, পেমেন্ট, যোগাযোগ, এবং রাজনৈতিক লিঙ্ক সূমহে কম বাঁধা পরবে বা প্রভাব মুক্ত হবে। ফলে ইউরেশীয় এবং ব্রিকস দেশগুলির মধ্যে পশ্চিমাদের প্রভাবমুক্ত হয়ে অবাধ ভাবে স্বয়ংক্রিয় হবে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন। ফলে বিশ্ব ব্যাংক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আমেরিকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক হুমকি ধমকি মুক্ত অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সামাজিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করবে।
মধ্য এশিয়াতেও পুতিন তার প্রভাব ধরে রেখেছেন এবং সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করছেন। তার উচ্চাভিলাষী দৃষ্টি ভঙ্গি এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে শিল্প এবং বাণিজ্যে যে গতিশীলতার অভাব ছিল তা সফলতার দিকে এবং শক্তিশালী উৎপাদক হিসাবে ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান।

রাশিয়া, চীন এবং ইরানের মত সংশোধনবাদী শক্তিগুলি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ভাবে প্রস্তুত, আমেরিকা বা পশ্চিমাদের সৃষ্ট যে কোন অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায়। বর্তমানে এই ইউরেশীয় ইউনিয়ন, ব্রিকস এবং সংশোধনবাদী শক্তি এই সব কিছুর মুলে রাশিয়া।

-মশিউর রহমান