ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

চরিত্র যার আরবী অর্থ “আখলাক” ইংরেজি অর্থ “ক্যারেক্টার”। চরিত্র বলতে বুঝায় এমন মূল্যবোধ যা একজনের ভাবনা, চিন্তা, কর্ম, আচার, আচরণ ইত্যাদির সম্মিলিত রূপ। যাদের ভাবনা, চিন্তা, কর্ম, আচার-আচরণ ইত্যাদির সম্মিলিত রূপ ভালো তাদের বলা হয় চরিত্রবান। চরিত্রবানের বিপরীতে থাকে চরিত্রহীন। চরিত্রহীন শব্দটির অর্থ মন্দ চরিত্র বা মন্দ চরিত্রের অধিকারী। মন্দ বা খারাপ চরিত্র তখনই ধরা পরে যখন কারও কিছু ত্যাগ করা উচিত ছিল কিন্তু সে করেনি। যার যেটা করা ঠিক নয় সে সেটা করে ফেলল। যার যতদূর অধিকার তার বেশী সে আদায় করলো অথবা আদায় করার চেষ্টা করলো। এক কথায় অনধিকার চর্চা করা এবং অনধিকার চর্চা করার চেষ্টা করা চরিত্রহীনতা। এই চরিত্রহীনরাই প্রতারক, এই চরিত্রহীনরাই ধর্ষক, এই চরিত্রহীনরাই লম্পট, এই চরিত্রহীনরাই লুটেরা। এরাই দেশ ও জাতিকে বিভিন্ন স্থান থেকে অনবরত ধর্ষণ করে চলছে…..।

সহজ কথায় বলা যায় একজনের কোনটা করা উচিত বা উচিত নয় এই বিষয়ে সম্যক জ্ঞান ধারণ করা হলো চরিত্রবান লোকের বৈশিষ্ট্য। যার যে কাজ করা উচিত নয় সে কাজ করা ফেলা চরিত্রহীনতা। যার যেটা বলা উচিত নয় সেটা বলে ফেলা চরিত্রহীনতা। কথা ও কাজের ব্যালেন্স ঠিক না থাকাও চরিত্রহীনতা। তাহলে চরিত্রবান কে ? রাজনীতিবিদ! শিক্ষক! ডাক্তার! উকিল! ব্যবসায়ী! চাকুরে! হ্যা হতে পারে আবার নাও হতে পারে। তবে যারা মধ্যস্বত্ব-ভোগী তারা বেশি ভাগই চরিত্রহীন। যারা মধ্যস্বত্ব-ভোগী তারা চরিত্রহীন হওয়ার সম্ভাবনা ৯০%। অপরদিকে চরিত্রবান শ্রমিকরা। তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিশ্রম করে। চরিত্রবান কৃষকরা। তারা রোদে পুড়ে বৃষ্টির জলে ভিজে ফসল চাষ করে। চরিত্রবান রিকশা চালকরা। চরিত্রবান বাংলার মজুররা। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থ উপার্জন করে। তাদের চরিত্রহীন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। এই চরিত্রবানদের ঘাড়ের উপরে দাড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক জীবন। আর চরিত্রহীনরা সদা লুট করা নিয়ে ব্যাস্ত।

আর এক অর্থে, যে ত্যাগী বা ত্যাগ করার মানসিকতা অর্জন করেছে তিনি চরিত্রবান। যখন কারো কোন কিছু ত্যাগ করার কথা কিন্তু ত্যাগ করতে পারেনা বা ত্যাগ করেনা তাকে চরিত্রহীনতা বলে। তাকেই হীনচরিত্রের অধিকারী বলা হয়। এই হিসাবে যে প্রয়োজনের বেশী খায় সেও চরিত্রহীন। যে প্রয়োজনের বেশী কথা বলে সেও চরিত্রহীন। যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কালো পথে উপার্জন করে সেও চরিত্রহীন। যার যেটা করার অধিকার নাই সেটা যে করে সে চরিত্রহীন। এই চরিত্রহীনরা কথা-কাজের দ্বারা দেশ-জাতিকে কলঙ্কিত করে চলছেই।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে, যার যেটা দায়িত্ব বা কর্তব্য সেটা পালন করাটায় চরিত্রবান। আর যার যেটা দায়িত্ব বা কর্তব্য সেটা পালন না করাটায় চরিত্রহীনতা। যেমন- পিতা বা মাতা’র যে দায়িত্ব সন্তানের প্রতি তা যদি তারা পালন না করে, তাহলে তারা চরিত্রহীন পিতা বা মাতা। স্বামী বা স্ত্রী তারা যদি তাদের নিজেদের প্রতি যে দায়িত্ব এবং কর্তব্য তা যদি পালন না করে বা দায়িত্ব- কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন না হন তাহলে তারা চরিত্রহীন স্বামী বা স্ত্রী । সন্তানদের পিতা-মাতা’র প্রতি যে দায়িত্বও কর্তব্য তা যদি সন্তানরা পালন না করে তাহলে তারা চরিত্রহীন সন্তান। বন্ধু’র সাথে বন্ধুর যে দায়িত্বও কর্তব্য তা যদি কেউ এড়িয়ে চলে বা পালন না করে তাহলে সে চরিত্রহীন বন্ধু। একজন প্রেমিক বা প্রেমিকা তাদের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য তা যদি এড়িয়ে চলে বা পালন না করে তাহলে সে চরিত্রহীন প্রেমিক বা প্রেমিকা। একজন শিক্ষক-ছাত্র যদি তাদের নিজেদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন না হন বা পালন যদি না করেন তাহলে তারা চরিত্রহীন। বিক্রেতা-ক্রেতা যদি তাদের নিজেদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন না হন বা পালন না করেন তাহলে তারা চরিত্রহীন বিক্রেতা-ক্রেতা। এই ভাবে প্রতিবেশী, এলাকাবাসী, নাগরিকগণ; এক কথায় আমরা সবায় একই সাথে অনেকগুলি সম্পর্কের মধ্যে জড়ায়ে থাকি। সেই সকল সম্পর্কগুলির নিজস্ব কতগুলি দায়-দায়িত্ব আছে। সেই দায়-দায়িত্ব গুলি সম্পর্কে যারা কর্তব্য পরায়ণ নয় তারায় চরিত্রহীন। যারা অনৈতিক সম্পর্কের অনুশীলন করে বা করার চেষ্টা করে তারাই চরিত্রহীন। এই চরিত্রহীনরাই খুন করে প্রতিটি সম্পর্ককে।

কাজের ক্ষেত্রে, কেউ চরিত্রবান বা চরিত্রহীন হতে পারে । আমরা প্রত্যেকে জীবন-জীবিকার তাগিদে নানা ভিন্ন ভিন্ন কর্মের সাথে জড়িত। যেমন কেউ লেখক, কেউ বিচারক, কেউ শিক্ষক, কেউ ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ উকিল, কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ সৈনিক, কেউ শ্রমিক, কেউ মজুর, কেউ কৃষক ইত্যাদি। সবার কাজের নির্দিষ্ট ক্ষেত্র আছে। সেই কর্ম ক্ষেত্রে নিজস্ব দায়-দায়িত্ব থাকে। সেই দায় দায়িত্বগুলি যারা সঠিক ভাবে পালন করেনা তারায় চরিত্রহীন। এই চরিত্রহীনদের দ্বারা লুট হচ্ছে জাতির ভবিষ্যৎ …।

বলার ক্ষেত্রে, কেউ চরিত্রবান বা চরিত্রহীন হতে পারে । যেমন বলার শক্তি আছে মানেই বলতে হবে তা ঠিক না। এই বলার উপরে নির্ধারণ করা যায় ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব। পাত্রে কতখানি জল আছে তা জানা যায় পাত্রে টোকা দিলে ঠিক তেমনি একজন ব্যক্তির কথা শুনলেই বুঝা যায় তার ব্যক্তিত্ব কেমন। বলার ক্ষেত্রে উচিত অনুচিতের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে নচেৎ চরিত্রহীন হতে হবে। তবে হ্যাঁ, একজনের রসবোধ থাকতেই পারে। না থাকাই একটু অস্বাভাবিক। রসবোধ সম্পূর্ণ মানুষকে একজন রসিক মানুষ বলা হয়। এই রসিক মানুষকে ব্যাঙ্গ অর্থে লুচ্চা বা লুইচ্চা বলা হয়। লুচ্চামি মানে কিন্তু চরিত্রহীনতা নয়। লুচ্চামি মানে নির্দিষ্ট সীমানা অতিক্রম না করে কোন কিছু বলা। একজন রসিককে জানতে হবে তার বলার সীমানা কতদূর পর্যন্ত। নতুবা বেশী রসবোধের কারণে চরিত্রহীন হতে সময় লাগবেনা। তবে কবি সাহিত্যিক লেখক ছাড়া আর সবের জন্য লুচ্চামি চরিত্রহীনতা। এই চরিত্রহীনদের দ্বারা আজ বিচারনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সব সবকিছু টিজিং-এর শিকার হচ্ছে।

ইদানীং মনে হচ্ছে আমরা সবাই কম বেশি চরিত্রহীন হয়ে পড়ছি। অতিরিক্ত লোভের কারণে আমাদের বিভিন্ন সম্পর্কগুলির মধ্যে যে ভারসাম্য রক্ষা করা উচিত, সেই ভারসাম্য রক্ষা করার বোধ শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সেই লোভ হতে পারে অতিরিক্ত খাওয়ার বিষয়ে। অতিরিক্ত কোন কিছু পাওয়ার বিষয়ে। অতিরিক্ত কোন কিছু লাভ করার বিষয়ে। অতিরিক্ত টাকা উপার্জন করার বিষয়ে। সেই লোভ হতে পারে কোন অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পরার বিষয়ে। সেই লোভ হতে পারে অনুচিত কোন কিছু পাওয়ার আশা বা আকাঙ্ক্ষা করার বিষয়ে। আমাদের একটা বিষয় মাথায় রাখা উচিত  অনৈতিক বা অনুচিত কোন কিছু অনুচিত উপায়েই অর্জন করতে হয়। সেই অনুচিত উপায় ধীরে ধীরে অমানবিক করে তোলে। যার প্রভাব ব্যক্তি জীবনে, সমাজ জীবনে, নাগরিক জীবনে এবং কর্ম জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলে। সব কিছুর মুলে একটা অতৃপ্তি কাজ করে। সেই অতৃপ্তি মানসিক বৈকল্যর দিকে ঠেলে দেয়। মানসিক বৈকল্যর কারণে আজ আমরা সবায় সবার জন্য হুমকি। বলেই আজ আমরা কোন সম্পর্কের কাছেই নিজেরা নিরাপদ নয়। প্রতিনিয়ত আমরা মানসিক ভাবে খুন হচ্ছি বা করছি। আর শাররিক ভাবে! আজ স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হয়, স্ত্রীর হাতে স্বামী। সন্তানের হাতে পিতামাতা, আর পিতামাতার হাতে সন্তান। চাচার হাতে ভাতিজা, আর ভাতিজার হাতে চাচা। বন্ধুর হাতে বন্ধু। প্রেমিকার হাতে প্রেমিক, আর প্রেমিকের হাতে প্রেমিকা। ছাত্রের হাতে শিক্ষক, শিক্ষকের হাতে ছাত্র। চলছে খুনের মহা উৎসব। কোথাও নিরাপত্তা নাই। কোন কিছুতেই নিরাপত্তা নাই এবং সব লুট হয়ে যাচ্ছে …।

আমরা আমাদের জীবনের কোন না কোন ক্ষেত্রে সবাই অনধিকার চর্চার কারণেই হউক বা ত্যাগ না করার মানসিকতার কারণেই হউক বা যা বলা উচিত নয় তা বলার কারণেই হউক আমরা সবাই চরিত্রহীন। আমাদের নানামুখী সম্পর্কের ক্ষেত্রে, নানামুখী কর্মের ক্ষেত্রে, নানামুখী বলার ক্ষেত্রে সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। এই সীমানা নির্ধারণ করতে হবে নৈতিকতার বিচারে। এই সীমানা নির্ধারণ করতে হবে মানবিকতার বিচারে। আমাদের চরিত্রের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। ইচ্ছা করলেই আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের চরিত্রের উন্নয়ন ঘটাতে পারি। মনে রাখতে হবে যে চরিত্রবানরাই ধার্মিক। ধার্মিক বলতে কোন সুনির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীকে বুঝানো হচ্ছেনা। ধার্মিক বলতে চরিত্রবানদের বুঝানো হচ্ছে। এই চরিত্রবান যে কোন সমাজের, যে কোন দেশের, যে কোন সম্প্রদায়ের, যে কোন ধর্মের হতে পারে। যারা চরিত্রবান তারাই ধার্মিক।

জয় হউক মানবতাবাদের।

 

-মশিউর রহমান

কবি ও ব্লগার
mashiur00001@gmail.com
(বানানের রীতি লেখকের নিজেস্ব )