ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

১.

একজনের প্রতি অন্যজনের ভালোলাগা থাকবে। ভালোবাসাও থাকবে। এই ভালোলাগা এই ভালোবাসা শুধু একজনের জন্য কেন, দশজনেরও জন্যেও থাকতে পারে বা তারও বেশি। ভালোবাসা-হীন পরিবার, সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বজগত চলতে পারেনা। ভালোবাসার বন্ধনে আমরা সবায় বন্দি –পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এবং বিশ্বজগতের প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যে। ভালোবাসা থাকবে এবং থাকতেই হবে। এই ভালোবাসার উপরে ভর করে আমরা আদিম অন্ধকার পৃথিবীকে আজ আলোকিত করেছি। এই ভালোবাসার উপরে ভর করে আমরা নিত্য নৈমিত্তিক সংগ্রাম করে যাচ্ছি অনন্তের পথে। ভালোবাসা থাকতেই হবে। বরং একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা না থাকাটায় অন্যায়। কিন্তু এই ভালোবাসার সাথে সাথে ত্যাগের মানসিকতা থাকতে হবে। এই ত্যাগের মানসিকতা না থাকলে বিপত্তি ঘটে। সেই বিপত্তিতে কলুষিত হয় আমাদের মানবিকতা। কলুষিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্র।

এমনি এক ত্যাগ-হীন ভালোবাসার বিপত্তিকর ঘটনায় আরও একবার কলুষিত হল আমাদের মানবিকতা ও আমাদের রাষ্ট্র। দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে মারা গেল রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার রিশা। গত রোববার (আগস্ট ২৮, ২০১৬) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

কে এই দুর্বৃত্ত? মেয়েটির মা জানিয়েছিলেন, তিনি ও তাঁর মেয়ে ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেটের একটি দরজির দোকান থেকে সালোয়ার-কামিজ বানাতেন। যোগাযোগের জন্য তাঁর মুঠোফোন নম্বর রেখেছিলেন ওই দোকানে। ওই নম্বরে ফোন করে দোকানের কর্মচারী ওবায়েদ তাঁর মেয়েকে উত্ত্যক্ত করতেন (সূত্র: প্রথম আলো)। রিশাকে ভালোলাগছে দরজি কর্মচারী ওবায়েদের, এর জন্য রিশাকে-ও তার ভালোলাগতে হবে এটা ভাবায় ওবায়েদের চরম অন্যায়। উত্যক্ত করা-তো পরের কথা। রিশা অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। ভবিষ্যৎ তার সম্ভাবনাময়। একটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটল। অবশ্যই খুনির বিচার হতে হবে। খুনিকে শাস্তির পেতে হবে।

তাই বলে, দরজির দোকানের কর্মচারীদের ভালোলাগা ও ভালোবাসা থাকবে না তা ভাবাও অমানবিক। তারও ভালোলাগা ভালোবাসা থাকবে কিন্তু সেই সাথে ত্যাগের মানসিকতা থাকতে হবে। যেটা ঐ দরজি দোকানের কর্মচারী ওবায়েদ দেখাতে পারেনি। অনেকে দেখাতে পারেনি। যেমন পারেনি আফসানার হত্যাকারীরা, পারেনি তনুর হত্যাকারীরা।

আমাদের পরিবারে সন্তানদের, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দিতে হবে ত্যাগের মানসিকতার। আমাদের পাঠ্যবই-এ, আমাদের সাহিত্যে, আমাদের সংস্কৃতিতে, আমাদের নাট্যকলা-শিল্পে-চলচ্চিত্রে প্রভৃতিতে ত্যাগের মানসিকতার চর্চা ও তার মহত্ত্বের উপরে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু আইন করে সমাজকে রক্ষা করা যায়না, নৈতিকতার শিক্ষা ছাড়া। একজন মনিষী বলেছেন, Law doesn’t and can’t cover all the grounds of morality. তাই নৈতিকতার শিক্ষা আমাদের সন্তানদের, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের বেশি বেশি করে দিতে হবে।

২.

রিশার হত্যাকারীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মঙ্গলবার তার সহপাঠীরা আবার সড়ক অবরোধ করে৷ এর আগে সোমবারও তারা একই কর্মসূচি পালন করে৷ এই রকম বহু কর্মসূচি আমরা দেখলাম আফসানা ও তনু হত্যার পরে। তনু হত্যার পরে সারাদেশ প্রতিবাদ করেছে। অথচ গত পাঁচ মাসেও তার খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি। তনুর পোশাক থেকে ধর্ষণের আলামতসহ যে তিন ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা পাওয়া গেছে, তা-ও গত সাড়ে তিন মাসে সন্দেহভাজন কারও সঙ্গে মেলাতে পারেনি সংস্থাটি (সূত্র: প্রথম আলো)।

কি দুর্ভাগ্য আমাদের! কত হতভাগা জাতি আমরা! এই বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি থেকে আমারা আজও বেড়িয়ে আসতে পারিনি। আজও আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠান ও বিচারালয় ক্ষমতাবানের পক্ষে কথা বলে। সেখানে বিচার প্রত্যাশীরা দুর্বল হলে, সমাজের নিম্নশ্রেণীর হলে, তার আর সু-বিচার পাবার সম্ভাবনায় নাই! আমরা কোন পথে হাঁটছি! রাষ্ট্র নতুন প্রজন্মকে কি শিক্ষা দিচ্ছে??

revolution

বিচারহীনতার যে অপসংস্কৃতি চলছে; এই দায় কার ? আমরা কাদের উপরে সমাজের দায় বর্তায়? তারা কতখানি তাদের উপরে অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে? এই সব আমরা নাগরিক হিসাবে আমাদের জানতে হবে। জানার অধিকার আমাদের আছে। আমাদের সব কিছু জানাতে হবে। কারণ তারা তা জানাতে বাধ্য। এই সমাজ, এই দেশ আমাদের। আমরা জনগণ, এই সমাজের, এই দেশের যত প্রতিষ্ঠান আছে আমাদের জন্য। ঐ প্রতিষ্ঠানের কোন কর্মচারী বা কর্মকর্তা, ওদের জন্য আমরা না। আমরা জনগণ আমাদের জন্য ওরা। আমরা কেন বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ওদের স্যার বলবো?? ওরা আমাদের স্যার বলবে, কারণ আমরা মালিক সম্প্রদায়। আমাদের অধিকার আমাদেরই আদায় করে নিতে হবে। এর জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। আমাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আমাদের অধিকার পূরণ না হলে প্রতিবাদ করতে হবে। প্রতিবাদের ভাষায় কান ঝালাপালা করে দিতে হবে। তাতে কাজ না হলে পরিবর্তন করতে হবে। সমাজের ও রাষ্ট্রের প্রতিটা স্তরে পরিবর্তন করতে হবে। পরিবর্তন না হলে বিচারহীনতার যে অপসংস্কৃতি চলছে, অনিয়মের যে অপসংস্কৃতি চলছে, তা থেকে আমরা বেড়িয়ে আসতে পারবো না।

–মশিউর রহমান

কবি ও ব্লগার