ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

পিতা-মাতা’র সাথে ভুল বুঝাবুঝি বা দ্বন্দ্ব হতেই পারে। পিতা-মাতা’র সাথে ভুল বুঝাবুঝি বা দ্বন্দ্ব একেবারে না হওয়াটাও এক ধরনের অ-স্বাভাবিকতা। কেউ যদি বলেন, পিতা-মাতা’র সাথে তার কোন দিন কোন প্রকার রাগ-জিদ হয়নি বা মনমালিন্য হয়নি বা ঝগড়া করেননি, তাহলে বুঝবো আপনি ডাহা মিথ্যা কথা বলছেন। আমি ব্যক্তিগত ভাবে বাবা-মা’র প্রতি রাগ-জিদ করি না, তা কিন্তু না। তার একটা মাত্রা আছে। কারণ তাদের চাওয়া পাওয়া গুলির সাথে আমার চাওয়া পাওয়া সব সময় মিলে না। অনেকেরই অনেক বিষয়ে মিলে না। সব কিছুর মূলে থাকে স্বতন্ত্রতা ও জেনারেশন গত দ্বন্দ্ব। পিতা-মাতা’রা এক জেনারেশানের আর আমরা তার সন্তানরা অন্য জেনারেশানের। তাই পিতা-মাতা’র সাথে সন্তানদের দ্বন্দ্ব হওয়া স্বাভাবিক। তার মানে এই না যে পিতামাতা ’র সাথে নিষ্ঠুরতম আচরণ করতে হবে!

পৃথিবীর প্রতিটা মানুষই স্বতন্ত্র। নিজ গুনে, নিজ স্বভাবে, নিজ আচরণের কারণেই মানুষ অন্য মানুষের থেকে আলাদা। তাই সন্তানরা যে পিতা-মাতা’র সকল কথা মেনে চলবে, এমন ভাবনা ভাবাও পিতা-মাতা’র জন্য নির্বুদ্ধিতা। কিন্তু মানা না-মানার একটা অদৃশ্য হিসাব-নিকাশ থাকবে। তার একটা অদৃশ্য সীমানা থাকবে। এই অদৃশ্য হিসাব নিকাশ, অদৃশ্য সীমানা নির্ধারিত হয় পারস্পরিক ভালবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকে। পারস্পরিক ভালবাসার ঘাটতি যেখানে, সেখানে কোন সীমানা থাকে না। সেখানে সম্পর্কের নামে থাকে শুধু সংঘাত।

পরিবারের সদস্য-দের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্প্রীতি, শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া থাকলে সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব। যে পরিবারে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও বোঝাপড়া নাই, সেই পরিবারের পিতা-মাতা’রা সন্তানের সাথে নিষ্ঠুরতম আচারণ করে বা সন্তানরা পিতা-মাতা‘র সাথে নিষ্ঠুরতম আচরণ করে।

সবার আগে দরকার সন্তানের পিতা-মাতা’র অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যে সুসম্পর্ক। যদি স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যে পারস্পরিক আন্তরিকতা ও বোঝাপড়া না থাকে, তাহলে তার কু-প্রভাব পরে পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতি, বিশেষ করে সন্তানদের প্রতি। যার থেকে সন্তানদের মধ্যে শূন্যতা, ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়। যার ফলে ঐ সকল পরিবারের বেশি ভাগ সন্তানরা হয়ে যায় অনৈতিক। ঐ সকল পরিবারের অনেক সন্তানরা, হয়তবা তাদের পিতা-মাতা’র প্রতি জন্মানো শূন্যতা, রাগ, ক্ষোভ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ তাদের পিতা-মাতা’র প্রতি করে না; কিন্তু তারা সমাজের অন্য কারও প্রতি ঠিকই তার মনে জন্মানো শূন্যতা, ক্ষোভ, রাগ ও হতাশার প্রকাশ ঘটায়। যার মূল সৃষ্টি কিন্তু পরিবারে। এমন পরিবারের বেশি ভাগ সন্তানরা হয়ে যায় নেশাগ্রস্ত, হয়ে যায় খুনি, সন্ত্রাসী, জঙ্গি বা অন্য কোন অনৈতিক মানসিকতার। আমরা সমাজে অনৈতিক, বিকৃত মানসিকতার মানুষদের উপর জরিপ চালালে দেখব এদের অধিকাংশেরই সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবার ছিল না। এদের বাবা-মা’র মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সু-সম্পর্ক ছিলনা।

পিতা-মাতাদের অসৎ উপার্জন, অনৈতিক চলাফেরা সন্তানদের মনে প্রভাব ফেলে। এই সকল পরিবারের সন্তানরা পিতা-মাতা’কে অসৎ জেনেই বড় হয়। এই পরিবারের সন্তানরা পিতা-মাতা’কে সম্মান করে না। এই সকল পরিবারের পিতা-মাতা’রা শারীরিক ভাবে সন্তানদের কাছ থেকে লাঞ্ছিত হয় বা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

সন্তানদের সকল প্রকারের অনৈতিক ও নিষ্ঠুর আচারনের জন্য বেশি ভাগ ক্ষেত্রে, প্রথমত পিতামাতারা দায়ি। পরবর্তিতে নিষ্ঠুর আচারণ সংগঠনের কারণে সন্তানরা দায়ি হয়ে যায়। আপনি সন্তানদের সময় দিবেন না। আপনি আপনার সন্তানদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তুলবেন না। শুধু শাসন করার বেলাতে ষোল আনা। এটা তো চলবে না। সন্তানদের সাথে বাবা-মা’দের বন্ধুর মত মিশতে হবে। সন্তানদের চাওয়া পাওয়ার মূল্যায়ন করতে হবে। ভুলে জান, আপনার পিতা-মাতা’রা কেমন আচরণ আপনাদের সাথে করছেন, আর তা আপনার সন্তানদের সাথে প্রয়োগ করতে আসেন না!

সর্বত্র যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, তা এসে আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলিতেও ছোঁয়া দিয়েছে এবং দিচ্ছে। তাই সন্তানের সাথে পিতা-মাতা’র সম্পর্ক আগের মত বেড়া জাল দিয়ে ঘিরে রাখা চলবে না। ঘিরে রাখবেন তো আপনি নিজেই ঘেরার মধ্যে আটকা পরে থাকবেন। তাই মা-বাবা’র যতদূর সম্ভব সেই ঘেরা জাল ছিঁড়ে ফেলে সন্তানদের সাথে বন্ধুর মত মিশতে চেষ্টা করুন। আমার বিশ্বাস, আপনার সন্তান যে কোন চরম মুহুর্তেও আপনার সাথে কোন প্রকার অনৈতিক হবে না।

-মশিউর রহমান