ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

bg20160719215243
ছবিসূত্র: গুগল

কদিন থেকে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হল, আপীল বিভাগ কর্তৃক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত মামলায় রায়ের পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনা। এই রায়ের পর থেকে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের হাতে আর থাকল না। কোন বিচারকের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠলে বা তিনি কর্ম পরিচালনায় শারীরিক-মানসিক ভাবে অক্ষমতার জন্য অযোগ্য হলে তাকে অপসারণ করবেন তদন্ত সাপেক্ষে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’।

আমি সন্মানিত বিচারকদের স্বাধীন ভাবে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার পক্ষে তবে তিনারা যে ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক ভাবে নৈতিক মান দণ্ডের ক্ষেত্রে শত ভাগ সৎ এটা প্রমাণ দিতে হবে। না পারলে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা বিচার বিভাগকে আলোকিত না করে কলুষিত করবে। আর এমন বিচারক যারা নৈতিক মানদণ্ডের ক্ষেত্র অসৎ তাদের অপসারণের ক্ষমতা বিচারপতিদের হাতে তথা ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ এর হাতে দিলে, কাউন্সিল যে শতভাগ সঠিক ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বা করবেন তা কি ভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে? আর এই নিশ্চয়তার জন্য কি করণীয় তাও ভাবা দরকার।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে, জনগণ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সেখানে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ সুপ্রিম অথোরিটি ভোগ করবেন কি ভাবে? এটা তো শুধু বিচারপতিদের অপসারণের বিষয় না, এটাতে অনেক বিষয় জড়িত আছে। আমি বা আমরা জনগণ, আমাদের জন্য আমাদের প্রতিনিধিদের দ্বারা মহান সংসদে একটা বিল পাশ হল কিন্তু উচ্চ আদালত তা বাতিল করলেন। তাহলে আমরা জনগণ আমাদের ক্ষমতা কার হাতে থাকল? বিচার বিভাগের কাছে কি অসহায়ত্বে পরিণত হল না সংসদ তথা আইন বিভাগ! এটা তো হতে পারে না। আমরা জনগণ আমাদের আত্মসম্মানের বিষয় জড়িত এটাতে। আমরা আমাদের ক্ষমতা কেন রাষ্ট্রিয় কর্মচারীদের হাতে রাখতে যাব? তবে ক্ষমতার অপব্যবহার যেন না ঘটে সেই বিষয়টা সন্মানিত বিচারপতিরা জনগণের পক্ষে দেখতে পারেন, সতর্ক করতে পারেন কিন্তু বাতিল করতে পারেন না।

যেহেতু রাষ্ট্রপতি সবার ঊর্ধ্বে। তার অনুমোদন ছাড়া কোন বিল আইনে পরিণত হয় না। তাহলে আপনি সুপ্রিম কোর্ট সেই বিল বাতিল করার কে? সুপ্রিম কোর্ট আপনি তো রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান। আপনি কি রাষ্ট্রপতির চেয়েও বড়? এখন সুপ্রিম কোর্ট বা তার বিচারপতিগণ বলতে পারেন, সংবিধান আপনাদেরকে এই ক্ষমতা দিয়েছেন। তাহলে আমরাও বলব, সংবিধান এটা জনগণের, জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা সৃষ্ট রাষ্ট্রের জীবন বিধান। তাহলে, আমরা জনগণ আমাদের স্বার্থে কেন সংসদের মাধ্যমে সংবিধানের সংশোধন বা সংযোজন করতে পারব না???

আমরা জানি, একটি উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধানই রাষ্ট্রের মূল আইন। বাংলাদেশের সংবিধানে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ সংক্রান্ত কোন বিধান ১৯৭৬ সালের ৮ নভেম্বরের আগে ছিল না, কোন বিচারকের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠলে সংসদে প্রস্তাব উপস্থাপন করার পর উক্ত প্রস্তাব দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য দ্বারা পাশ হতে হত। যে নিয়মে সংবিধান পরিবর্তন করা হয়। এটা একটা উন্নত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। সরকার চাইলেই সহজে কোন বিচারককে অপসারণ করা সম্ভব না। এই প্রসঙ্গে একটা বিষয় উল্লেখ্য, গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় আজ পর্যন্ত কোন বিচারকে অপসারণ করা হয়নি। তারপরেও কেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ !!! ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ যদি সন্মানিত বিচারপতিগণ আপনাদের এতই ভাল লাগে তাহলে আপনারা বিচারকগণ এই ব্যবস্থা রাখেন, কিন্তু এই ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ ব্যবস্থা সংসদে বিল আকারে পাশ হতে হবে এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাগবে। সেই সাথে আপনাদের কাছ থেকে কিছু ক্ষমতা নতুন আইন পাশের মাধ্যমে কেড়ে নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। আপনারা মহান সংসদে পাশ হওয়া আইনের শুধু পজিটিভ এবং নেগেটিভ দিক ব্যাখ্যা করতে পারবেন, রাষ্ট্রপতিকে বিলে অনুমোদন না দেওয়ার জন্য বলতে পারবেন কিন্তু কোন আইন পাশ হওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে বাতিল করতে পারবেন না।

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এর জন্ম হয়ে ছিল বাংলাদেশে সংসদের অনুপস্থিতিতে। বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়টি ৭২ এর সংবিধান অনুযায়ী সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় সংসদের হাতে এবং ৭৫ সালের রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির হাতে থেকেছে। কিন্তু যখন জিয়াউর রহমান অগণতান্ত্রিক পথে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন তখন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সায়েম সংসদ ভেঙ্গে দিয়েছিলেন, এটা ১৯৭৬ সালের ৮ নভেম্বর। ঠিক তখন একটা সংকট সৃষ্টি হয়, বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা তো সংসদের হাতে! আর সংসদ যদি জীবিত না থাকে তাহলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা কোথায় থাকবে??? এই সংকট নিরসনের জন্য জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২৯ নভেম্বর এক সামরিক ফরমান জারি করেন এবং উক্ত ফরমানে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয় ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে ‘ কাছে। ফলে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ গঠন করা হয়। আমাদের বুঝতে হবে যে, ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ এর জন্ম রহস্য কি, কেন এবং কোন স্বার্থে। যখনই অগণতান্ত্রিক সরকার অবৈধ পথে ক্ষমতা দখল করেছে তখনই সংসদ তার কার্যক্রম হারিয়েছেন আর তখনই ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ এর প্রয়োজনীয়তা দেখো দিয়েছে। এর আর একটা বড় প্রমাণ ডঃ ফখরুদ্দীন আহমেদ এর সেনা সমর্থিত সরকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল অধ্যাদেশ, ২০০৮ পাশ করেন। কারণ তখনও সংসদ জীবিত ছিল না। অবৈধ ভাবে ক্ষমতা দখলের ফলে যে সংকট সৃষ্টি হয় তা থেকে উত্তরণের জন্য ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ কিন্তু যখন সংসদ ব্যবস্থা ফিরে আসল তখন তো সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল স্বাভাবিক ভাবেই তার প্রয়োজনীয়তা হারায়। বিচারক অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে বা সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় সংসদের হাতে এমনিতেই চলে যায়। তাই ষোড়শ সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তাই ছিল না! বাতীলের প্রশ্নও তাই ওঠে না। আমার মতে, দুটায় ভুল সিন্ধান্ত। কিন্তু দুইটায় আমরা দেখলাম !!
যাই হউক উপরোক্ত বিষয়গুলা প্রেক্ষিতে আমার মনে হয়েছে, আপীল বিভাগের রায়ে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ মানে, যখন অবৈধ ভাবে ক্ষমতা দখল তখন সেই ক্ষমতার বৈধতার উপায় ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ । তাহলে আমি এটা বুঝতেই পারি যে, বিচার বিভাগ ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ এর মাধ্যমে প্রচ্ছন্ন ভাবে রায় দিয়ে দিলেন বর্তমান সরকার অগনতান্ত্রিক অবৈধ সরকার!!!

আমি বিশ্বাস করি সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচার বিভাগকে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তা অবশ্যই সংবিধানের মধ্যে দিয়েই। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, জনগণের ক্ষমতা ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে এমন সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে কখনও গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। তাই সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, জনগণের ক্ষমতা ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ না করে বিচার বিভাগ কি ভাবে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে তার জন্য আইন, বিচার ও নির্বাহী সকল বিভাগকে নিয়ে সম্বলিত ভাবে উপায় খুঁজে বের করতে হবে।।।

-মশিউর রহমান
কবি ও ব্লগার