ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

 

আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে এই ২০১২ সালেও জামায়াতের রাজনীতি করা প্রসঙ্গে অনেককিছু বলার আছে। অনেক ক্ষোভ চাপা পড়ে আছে, কিন্তু তা এখন বের হয়ে আসতে চাইছে এখন যখন এই পাকিস্তানপন্থী দলটি এখন পাগল হয়ে উঠেছে।

কারনটা আর কিছু নয়; যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে, কয়েকটি মামলার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। এই বিচারে জামায়াতের প্রাক্তন আমীর, পাকিস্তানপ্রেমী, শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা গোলাম আযম, আল-বদরের হোতা নিজামী-মুজাহিদ-কামারুজ্জামান, ছ্যাঁচড়া চোর ও বর্তমানে তথাকথিত বিশ্বখ্যাত আলেম সাঈদী ওরফে দেইল্যা রাজাকার, বাচ্চু রাজাকার, চট্টগ্রাম আল-বদরের প্রধান মীর কাশেম (মিডিয়া মোগল), জল্লাদ কাদের মোল্লা গংদের সাজা হবে।

তাহলে জামায়াতে ইসলামী চলবে ক্যামনে? সমর্থকদের কান্নাকাটি এখন ক্ষোভে পরিণত হচ্ছে আর সেটাকে কাজে লাগাতে দলটি তার মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রামের মাধ্যমে প্রায় ৩০ লাখ সমর্থকদের চাঙ্গা করতে ব্যবহার করছে। ৭ই নভেম্বর গো আযমের জন্মদিনে তার স্ত্রী একটি কলামে বলেছেন, “মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে নিজস্ব স্বার্থ চরিথার্থ করার উদ্দেশ্যে সরকার এই প্রহসনের বিচারের নাটক মঞ্চস্থ করছে। যুগে যুগে নবী-রাসুলগনসহ ইসলামি আন্দোলনের সিপাহসালারদের উপর এরূপ নির্যাতন সবসময়ই হয়েছে–এটা নতুন কিছু নয়।”

তাদের প্রধান মিত্র বিএনপির মির্জা ফখরুল সাম্প্রতিককালের জামাত-শিবির-পুলিশের সংঘর্ষের পর সরকারের সমালোচনা করে বুঝিয়ে দিয়েছে জামায়াতের উপর আক্রমন হলে, ধড়পাকড় হলে তারা প্রতিবাদ করে যাবে। হাজার হোক, স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার (গতকাল আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বললেন) বলে কথা। জামায়াত আগে কি করেছে সব বাদ। এখন যেহেতু রাজনীতি করছে (শুরু সেই জিয়ার আমলে, বঙ্গবন্ধু এটিকে ১৯৭২ সালে নিষিদ্ধ করেছিলেন), সুতরাং তাদের মিটিং-মিছিল করতে দিতে হবে। তার উপর আবার এই বিচারে বিএনপির প্রধান পৃষ্ঠপোষক, বিজ্ঞ (দুর্বৃত্ত) আইন বিশারদ, টাকার কুমীর সাকা চৌ সাহেব আছেন, যিনি কিনা আবার দলের প্রধান খালেদার উপদেষ্টা।

যুদ্ধাপরাধের (বা মানবতাবিরোধী অপরাধের) অভিযোগে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিচার শুরু হলেও স্বাধীনতাযুদ্ধে দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে তাদের প্রিয় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারনা ও গনহত্যায় সাহায্য করার জন্য “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী”র বিচার কবে হবে সেটা নিয়ে এখনও সংশয় রয়ে গেছে।

যেখানে এদের বাংলাদেশেই থাকার কথা না (রাজনীতি তো দূরের কথা) সেখানে জামায়াতের নেতারা বাংলাদেশের মন্ত্রী-এমপি হয়, এর চেয়ে বড় আফসোস আর কি থাকতে পারে?

এরা বাংলাদেশ মানে না, এর সংবিধান মানে না, গনতন্ত্র মানে না, দেশীয় আইনব্যবস্থা মানে না–কিন্তু এই ২০১২ সালেও এরা এদেশে আছে। এ লজ্জা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের, সকল জীবিত মুক্তিযোদ্ধার, সকল শিক্ষিত পেশাজীবীর যারা এদের দুঃসাহসকে এত বছর সহ্য করেছে। এখনকার বিএনপির কোন লজ্জা নাই, কেননা তারা দলের প্রতিষ্ঠাতার দেখানো পথেই জামায়াতকে সাহায্য করছে।

সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলোঃ এদের ইসলামের জন্য এত দরদ! কিন্তু ‘৭১ সালে ওরা তো শুধু হিন্দু বা অন্য ধর্মের মানুষদের মারেনি, পাকিস্তান সেনাবাহিনী তো মুসলামনদেরও মেরেছে, ধর্ষন করেছে, পঙ্গু করে দিয়েছে।

আমাদের নির্বাচন কমিশন এদের প্রতি বড়ই সহায়। গত ২০১০ সাল থেকে এ মাসের ৪ তারিখ পর্যন্ত ৪ বার জামায়াতকে নোটিশ দেয়া হয়েছে গঠনতন্ত্রের ৮টি ধারা সংশোধনের জন্য। ওরা তার থোড়াই কেয়ার করে।

ইসলাম ও পাকিস্তানকে জড়িয়ে জামায়াতের নেতাদের দেয়া দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এখানে আপনাদের সাথে শেয়ার করছিঃ
* “খোদাবি বিধান বাস্তবায়নের সেই পবিত্র ভূমি পাকিস্তান আল্লাহর ঘর। আল্লাহর এই পূত পবিত্র ঘরে আঘাত হেনেছে খোদাদ্রোহী কাপুরুষের দল। এবারের শবে কদরে সামগ্রিকভাবে ইসলাম ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরিচালিত উল্লেখিত যাবতীয় হামলা প্রতিহত করে, সত্যিকারের শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার এই তীব্র অনুভূতি আমাদের মনে সত্যিই জাগবে কি?” – মতিউর রহমান নিজামী (দৈনিক সংগ্রাম, ১৬ নভেম্বর/১৯৭১)

* “দেশের সাম্প্রতিক সংকট ও দুস্কৃতিকারীদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের দরুণ যে সব পাকিস্তানি প্রাণ হারিয়েছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী লোক জামায়াতে ইসলামীর সাথে জড়িত। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ও ইসলামকে এক ও অভিন্ন মনে করে।” – গোলাম আযম (দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ সেপ্টেম্বর/১৯৭১)

গো আযম ১৯৭১-এর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে নুরুল আমিন ও খাজা নাজিমুদ্দিনকে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের তখনকার গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানের সাথে দেখা করে পাকিস্তান সরকারের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। তার দুইদিন পর গো আযম একাই টিক্কা খানের সাথে দেখা করে। এপ্রিলের ৭ তারিখে খায়রুদ্দিনের নেতৃত্বে শান্তি কমিটি প্রতিষ্ঠিত হলে তার অন্যতম প্রধান নেতা হয় গো আযম। এপ্রিলের ১৫ তারিখে এর নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি। একুশ সদস্যের কমিটি হয় এবং এর নেতারা আবার টিক্কা খানের সাথে দেখা করে এপ্রিলের ১৬ তারিখে।

জুনের ১৬ তারিখে গো আযম তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে রাজাকার বাহিনী গঠন করার প্রস্তাব দেয় এবং সরকারকে আনূরোধ জানায় পাকিস্তানের স্বার্থে তাদের অস্ত্র দিতে।

গতকাল আমাদের দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায় রচিত হয়েছে। টিভি ও পত্রিকা দেখে যতটুকু দেখলাম তার সারাংশ নিচে দিলামঃ

* শেখ হাসিনাঃ যুদ্ধাপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে জঙ্গী তৎপরতা চলছে, এসব চলতেই থাকবে। জনগনকে তা ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে।

* সৈয়দ আশরাফঃ জামায়াত পাগল হয়ে গেছে, সময় শেষ। রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ মাঠে থাকবে। সবাই শেষ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিন। খালেদার উদ্দেশ্যে বলেন, মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হয়ে থাকলে জামায়াতকে ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আসুন। কোন সচেতন মানুষ এদের পক্ষ নিতে পারেনা।

* স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঃ জামায়াতের ১২০০ গ্রেপ্তার হয়েছে, প্রয়োজনে আরো করবো, তবু দেশদ্রোহীদের নির্মূল করে ছাড়বো। জনগনের উচিত এরা যেখানেই গ্যাঞ্জাম পাকাবে, ঘেরাও করে পুলিশে ধরিয়ে দিন।

* নূহ-উল-আলম লেনিনঃ জামায়াতের দুঃসাহসের উৎস বিএনপি। জামায়াতের সাথে তত্বাবধায়ক ইস্যুতে জোট করে আওয়ামী লীগ ভুল করেছিল, পরে সেই চুক্তি বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি শোধরায়নি। জামায়াত গোয়েন্দা/পুলিশের কাছ থেকে আগে-ভাগে খবর পায়। নিষিদ্ধ করলে জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে। ‘৭৫ পরবর্তী সরকার জামায়াতকে রাজনীতি করতে দিয়েছিল।

* আমীর খসরু (বিএনপি): জামায়াত বিএনপি’র স্ট্র্যাটেজিক এলায়েন্স, শুধু নির্বাচন সংক্রান্ত জোট, আদর্শগত নয়। আশরাফের বক্তব্য রাজনৈতিক। সরকারের জোটেও বিভিন্ন মতের দল আছে, স্বোইরাচার এরশাদ আছে। গনতান্ত্রীক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবাইকে রাজনীতি করার সুযোগ দিতে হবে।

* শাহরিয়ার কবীরঃ জামায়াতের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় পাকিস্তান জামায়াতের প্রধান মওদুদীর দ্বারা, যিনি এই উপমহাদেশে ইসলামী সন্ত্রাসের লালন-পালনকারী। তার ফাঁসি হয়েছিল, কিন্তু সৌদি আরবের চাপে তা কার্যকর করতে পারেনি পাকিস্তান। মওদুদী গনতন্ত্রকে কুফরী মনে করে, নাৎসীবাদী ধ্যান-ধারনায় বিশ্বাস করে, ইসলামে নয়। জামায়াত ‘৭১-এ দলীয় সিদ্ধান্তে গনহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন নামে জামায়াতের ১০০টি জঙ্গী সংগঠন আছে। জঙ্গী সম্পৃক্ততার জন্য জামায়াতের বিচার হওয়া উচিত। ধর্মের পবিত্রতার জন্য জামায়াতের বিচার হওয়া দরকার।

* মুজিবুর রহমান: জামায়াতের এই সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল গতকাল বলেন উগ্র জঙ্গীবাদী চিন্তা-চেতনার সাথে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কোন সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কখনো সাংঘর্ষিক রাজনীতি করে না। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। কাজেই কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রশ্নই আসেনা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সকল কর্মসূচি সংবিধান ও গণতন্ত্র সম্মত। জামায়াতে ইসলামী সবসময়ই গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

* আফিফা আযম (৭ তারিখে): গ্রেপ্তারের পূর্বে আপনি বলেছিলেন যে, “শহীদ হওয়ার জযবা নিয়েই ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়েছি। জেল, জুলুম, নির্যাতন, ফাঁসি এগুলোকে আমি ভয় পাই না। আমাকে ফাঁসি দিলে শহীদের মর্যাদা পাবো ইনশাআল্লাহ”। আমরা আপনার মৃত্যুর আশঙ্কায় দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত নই। প্রকৃত ঈমানদারগণ কখনো মৃত্যুকে ভয় করে না। কেবল, এই বৃদ্ধ বয়সে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে জালেমগণ আপনার উপর যে জুলুম করছে তা দেখে হৃদয়ে বেদনা বোধ করি। করুণা হয় নির্বোধ জালেমদের জন্য।”