ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

গত শতাব্দির সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনার উল্লেখ করতে বলা হলে মনে হয়, সবাই কম্যুনিজম তথা মার্কসবাদের উত্থান- পতনকেই উল্লেখ করবে | কেননা, এর উত্থান যেমন বিস্ময়কর ঠিক একইভাবে পতনও তেমনই বিস্ময়কর | সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় মার্কসবাদীরা যখন ক্ষমতা দখল করে, তখন থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত সারা বিশ্বে মার্কসবাদ-কম্যুনিজম তথা সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রা ছিল অব্যহত | বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর ইউরোপ, এশিয়া, দক্ষিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় একে একে অনেক দেশেই মার্কসবাদী-কম্যুনিষ্টরা
ক্ষমতা দখল করে | তখন সারা বিশ্বের বিপ্লবী বামপন্থী বুদ্ধিজীবী তথা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা মার্কসবাদীরা একে মানবতার বিজয়, শোষণ- নিপিড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে
শ্রমিক-কৃষক তথা মেহনতি মানুষের বিজয়, সর্বহারা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর শাসন ইত্যাদি নানা নামে প্রচার করত | একইসাথে তাদের প্রতিপক্ষকে সর্বদা বুর্জোয়া, সাম্রাজ্যবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল
মৌলবাদী ইত্যাদি নামে গালা-গালি দিতেই তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড নিহিত ছিল |

তাদের ধারণা ছিল, একদিন পৃথিবীর সমস্ত জায়গায়ই কম্যুনিজম কায়েম হবে, ধর্ম ইতিহাসের আঁস্তাকুরে ঠাঁই নেবে, ব্যক্তি মালিকানা বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না | অথচ সময়ের নির্মম পরিহাস, আজ কম্যুনিজম তথা মার্কসবাদই আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত | সোভিয়েত ইউনিয়নসহ (বর্তমান রাশিয়া) পূর্ব ইউরোপের সমস্ত সম্যুনিষ্ট সরকারগুলোর পতন ঘটেছে | কম্যুনিষ্ট বিশ্বের প্রতীক
‘বার্লিন প্রাচীর’ ধসে গেছে, ওয়ার’শ জোট (War sow Pact) এর বিলুপ্ত ঘটেছে, কম্যুনিষ্ট পার্টির সম্পত্তি হয়েছে বাজেয়াপ্ত, বাজার অর্থনীতিসহ কায়েম হয়েছে ধর্মীয় স্বাধীনতা | মার্কসবাদ যে ধর্মকে আফিমের সাথে তুলনা করেছিল, আজ কম্যুনিজমের আফিম থেকে মানুষ মুক্তি চায় | মার্কসবাদীদের মতে “সৃষ্টিকর্তা যদি থেকেও থাকেন, মানুষের উচিৎ নিজেদের স্বার্থে তাঁর মূলোৎপাটন করা |” এখন দেখা যাচ্ছে, মার্কসবাদীদের ভগবানরা অর্থাৎ মার্কস, এঙ্গেলস, লেলিনরাই নিজেদের নীতি, মতবাদ ও মূর্তিসমেত জনসাধারণ কর্তৃক মূলোৎপাটিত হচ্ছে | বলা হতো মেহনতি তথা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সরকার অথচ সোভিয়েত ইউনিয়নের (রাশিয়ার) দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আটাশ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ১.৫০ কোটি কম্যুনিষ্ট পর্টির সদস্য ছিল | যার মধ্যে আবার শতকরা ২জন মাত্র কট্টরপন্থী | অবশ্য মার্কসবাদী এক নেতার কথাতেইতো আছে, “জনগণ নয়, বন্দুকের নলই সমস্ত ক্ষমতার উৎস |” সুতরাং সাধারণ মানুষকে ধোকা
দিয়ে আর কয়দিন রাখা যায়?

যে শোষণ- নির্যাতনের বিরুদ্ধে কম্যুনিজম, সেই কম্যুনিষ্ট পার্টি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় জনগণ নিস্পেষিত | মার্কসবাদ যে সরকারকে অস্বীকার করেছে, সেই সরকারই হয়েছে সমস্ত
মার্কসবাদী কর্মকাণ্ডের নিয়ামক | আবার মার্কসবাদ যে সব কিছুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাবি, করে, আসলে বিজ্ঞান সম্বন্ধে যাদের কোন ধারণা নাই, তারাই মূর্খের মত এই দাবি করতে পারে | কেননা বিজ্ঞান কোন অপার্থিব, অলৌকিক বা অপ্রাকৃতিক কোন কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে অক্ষম | কেননা, তাহলে মানুষ আর রোবট (Robot)-এ কোন পার্থক্য থাকত না | আসলে মার্কসবাদের এই বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে মনে হয়, মার্কসবাদ সম্বন্ধে যে বলা হত, “মানব চরিত্রের ভুল ব্যাখ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত” বা “কিছু মানুষকে কিছু দিনের জন্য বোকা বানান যায়, কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানান যায় না |” কেননা আশ্চর্যের বিষয় যে, অর্থনৈতিক কারিগরী বা প্রযুক্তিগত উন্নতির জন্য যা কিছু দরকার তার সমস্ত কিছু মওজুদ থাকা সত্বেও
সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো অন্যান্য অসমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর তুলনায় দিন দিন সর্বক্ষেত্রে পিছিয়েছে |

জীবনযাত্রার মান পাশ্চাত্যের সাথে আসমান-জমিন ব্যবধানে ঠেকেছে | প্রথমদিকে অবশ্য বলা হতো, এগুলো বুর্জোয়া সাম্রাজ্যবাদীদের প্রচার সর্বস্ব কিন্তু আজ সেই বুর্জোয়া সাম্রাজ্যবাদীদের কাছেই সাহায্যের জন্য হাত পাততে হচ্ছে |