ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

একসময় বাঙালি সংস্কৃতিতে খুব পোক্ত বিষয় ছিলো মেহমানদারি । এখনোও আছে তবে ঢং ভিন্ন ! শুনতাম বাড়ির বৈঠকখানার পাশ দিয়ে পরিচিত কেউ যাবে আর একবেলা খেয়ে যাবেনা তা কি করে হয় ? এটা অন্যায় !

গ্রামে ও গঞ্জে পরিবার কর্তারা একসাথে হলেই নাকি গপ্পের বিষয় ছিলো রান্না । আহ্ কি যে স্বাদ সেই রান্না.. । এখনো মুখে আছে । এমন সুর সকল কর্তাদের মুখে থাকতো । কে কত স্বাদ নিয়ে বলে নিজের গিন্নির প্রশংসা করবে সেই রীতি আড্ডায় প্র্যাক্টিস হতো ।

সেই তো দুই দশক আগেও দেখেছি নামের সাথে কারো নাম মিলে গেলে মিতা বলে সম্ভোধন করতো । নিজ বাড়িতে এনে একবেলা খাওয়াতে পেরে নিজেকে সুখি মনে করতো । বন্ধুদের নিয়ে  আড্ডাটা হতো বন্ধুর বাড়িতে। আর মায়ের হাতের রান্না দিয়ে আপ্যায়ন। সে এক  অন্য রকম ভালোলাগার অনুভূতি।

বিয়ের কথা চলছে দুই পরিবারের। দুই পক্ষ তো রীতিমত খাবার যুদ্ধে লেগে যেতো। নিজ অঞ্চলের খাবার ঐতিহ্য রান্না করতে ভুল করতো না। শুনেছি খাবার দেখেও নাকি সম্পর্কের বন্ধন জোড়া লাগতো!

বলছি খাবার সংস্কৃতির গপ্পো। একসময় বাড়ির রান্না মানেই খাওয়া। নচেৎ উপোস থাকা। এই যে কিছু কথা বললাম তা কি সেই রুপে এখন আছে? আসলে নাই! সময় পাল্টেছে । ভিন্ন আচার মাঠে নেমেছে । পুরনো ঐতিহ্য মাঠ ছেড়েছে। এখন রেস্টুরেন্ট যুগ! বিয়ে বলেন আর যে কোন অনুষ্টান বলেন সবই রেস্টুরেন্ট কেন্দ্রিক ঘুরপাক খাচ্ছে।

1_Thai+Food+Fest+Sarina_AM_0026

রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতি মুলত নিষিদ্ধ খাবার বা অপ্রচলিত খাবারের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিলো। বলছি আঠারো শতকের দিকের কথা। তখনই বঙ্গদেশে প্রথম রেস্টুরেন্ট খোলা হয়। এটা ইংরেজ কাস্টোমারদের লক্ষ্য রেখে। ১৮৩০ এর দশকে বাঙালি তরুণরাও এই দিকে ঝুকে পড়ে। বাড়িতে যে খাবার পাওয়া যেতোনা তাই সেখানে খেতে যেতো। মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখায় তা দেখা যায়। মাংস পেটিস বিস্কুট এগুলি তারা কিনে খেতো। এসব রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি ছিলো ইংরেজ। এরপর কলকাতার মুসলিমরাও বাবুর্চি পেশায় যোগ দিতে থাকে। এভাবেই আজকের মুসলিম বাবুর্চি!

উনিশ শতকে এই বাবুর্চিরা শুধু ইংরেজ খাবারই রান্না করেনি সাথে মোগলাই, চপ-কাটলেট, মুর্গি-মাটন ও রান্না করতো। এছাড়া দেশি জনপ্রিয় খাবারগুলোও রেস্টুরেন্টে রান্না হতো। এভাবেই কিন্তু রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতির ইতিহাস বঙ্গদেশে শুরু!

আর এভাবেই বাঙ্গালির গৃহ আপ্যায়নের যে সংস্কৃতি ছিলো তা ঘর থেকে বাহিরে যাওয়া শুরু করলো! এরপর দেশ বিভাগের আগেই চীনারা বঙ্গদেশে কলকাতায় রেস্টুরেন্ট চালু করলো। পরবর্তীতে ঢাকাতেও শুরু হলো। কত দেশের ফুড যে পাওয়া যায় এখন আমাদের দেশে তা বলা মুশকিল । খাবারের স্বাদ ঐ দেশেরই আছে কিনা জানা নাই তবে এসব রেস্টুরেন্টে খেয়ে মানুষের গর্বের সীমা নাই।

এই রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতি আমাদের পারিবারিক বন্ধন ঐতিহ্যে সরাসরি আঘাত করেছে। হারিয়ে দিচ্ছে কত গল্পের সুর। এই রেস্টুরেন্ট মহামারি বেশি দেখা যায় ১৯৭০/৮০ দশকে। কিছু তরুণ বিদেশে উচ্চ শিক্ষিত হতে গিয়ে সেখানে কিছু স্বাদ জিহবাতে নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন। তাদের সেই স্বাদ খোজা থেকেই মুলত ফার্স্টফুড খাবারের যাত্রা শুরু হয় এদেশে। ভিন্ন দেশের ভিন্ন স্বাদ পরখ করা মন্দ না! কিন্তু বন্ধন শক্ত করে এমন ঐতিহ্য যে হারাচ্ছি। সেটাই ভাবছি!