ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

“নেলসন ম্যান্ডেলার চেয়েও বেশি জেল খেটেছেন”

ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে অনুশীলন সমিতির সংগ্রাম স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে । সেই অনুশীলন সমিতির কর্মকান্ড ময়মনসিংহেও ছিলো । এবং খুবই কার্যকরী ছিলো । আর এই সমিতির সৈনিক ছিলেন আমাদের জেলার ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী ! আজ ছোট্ট পরিসরে তার সম্পর্কে জানাবো…।

ময়মনসিংহের জেলা স্কুলের ছাত্র মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। ইতিহাস পড়ুয়া ময়মনসিংহবাসীরা হয়তো নামটির সাথে পরিচিত । ১৯০৮-১৯৪৬ সন পর্যন্ত ৩০ বছর জেলে ছিলো। জেলখানায় যত ধরনের শাস্তি আছে তা তিনি ভোগ করেছেন।

ভারত স্বাধীনতায় যেসব বিপ্লবী রয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম আমাদের ময়মনসিংহের মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী । দেশপ্রেম কেমন হতে হয় তার জীবনী পড়লেই বুঝা যাবে । সচ্ছল জীবনেও মোটা কাপড় পড়তেন। শুধু দেশের পণ্য ব্যবহার করবে বলে।

ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার কাপাসাটিয়া গ্রামে ১৮৮৯ সালের মে মাসে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি বলতেন “আমার স্বপ্ন সফল হয় নাই, আমি সফলকাম বিপ্লবী নই । আমার ব্যর্থতার কারণ, আমার দুর্বলতা নয় । আমি কখনও ভীরু ছিলাম না_আমার জীবনে কখনও দুর্বলতা দেখাই নাই । আমি আমার চরিত্র নির্মল ও পবিত্র রাখতে সক্ষম হইয়াছি । অর্থলোভ আমার ছিল না । এক সময় হাজার টাকা আমার কাছে আসিয়াছে, কিন্তু সে টাকা নিজের ভোগ-বিলাসের জন্য ব্যয় করি নাই।

মৃত্যুভয় আমার ছিল না, যে কোনো বিপথজনক কাজে হাত দিতে আমি পশ্চাৎপদ হই নাই । আমার স্বাস্থ্য ভাল ছিল, আমি কখনও অলস ছিলাম না, কঠিন পরিশ্রমের কাজে কখনও বীত হই নাই, যখন যে কাজ করিয়াছি, আন্তরিকতার সাথে করিয়াছি।

আমার ব্যর্থতার কারণ পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আমার ব্যর্থতার কারণ একজন দক্ষ ও সফলকাম বিপ্লবীর যতটা ধীশক্তি ও জন-গণ-মন অধিনায়কতার যে ব্যক্তিত্ব থাকা আবশ্যক তাহার অভাব”

সবসময় নিজেকে এভাবেই উপস্থাপনা করতেন। খুবই বিচক্ষন মানুষ ছিলেন। ১৯০৬ সালে তিনি ‘অনুশীলন সমিতির সাথে সরাসরি যুক্ত হন। বিপ্লবী দলে যুক্ত হয়ে একনিষ্টভাবে দলের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যান।

এই যে ভারত স্বাধীন হলো সেখানে তার বিপ্লবী কর্মকান্ড কম অবদান রাখেনি । তিনি ১৯০৮ সালে নারায়নগঞ্জে গ্রেফতার হন । পরে ৬ মাস জেল খাটেন । এরপর ঢাকা আসেন । আবার আরেকটি মামলায় পালিয়ে বেড়ান । ১৯১২ সালে হত্যা মামলায় গ্রেফতার হন । কিন্তু প্রমাণের অভাবে ছাড়া পান । এরপর….

১৯১৪ সালে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীকে আবারও ব্রিটিশ পুলিশ কলকাতা থেকে গ্র্রেফতার করে । গ্র্রেফতারের পর এসময় তাকে বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয় । এই মামলার মাধ্যমে তাকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় । তাকে আন্দামানে প্রেরণ করা হয় । শুরু হয় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জালড়া ।

১৯২৪ সালে আন্দামান সেলুলার জেল থেকে মুক্তি পান । জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পরামর্শে তিনি দক্ষিণ কলকাতার জাতীয় স্কুলের ভার-দায়িত্ব গ্রহণ করেন । কিন্তু ১৯২৭ সালে তাকে আবারও ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে । ১৯২৮ সালে এ তাকে ভারতে এনে নোয়াখালি জেলার হাতিয়া দ্বীপে নজরবন্দী করে রাখা হয় কারন তখন তাকে ব্রহ্মদেশের মন্দালয় জেলে পাঠানো হয়েছিলো।

অতপর ১৯৩০ সালে তাকে আবারও ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে । এসময় তাকে একটানা ৮ বছর কারাবাস করতে হয় । এবার তাকে বিভিন্ন জেল ঘুরিয়ে কুখ্যাত বকসার বন্দিশালায় রাখা হয়। ১৯৩৮ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন।

১৯৪২ সালে তিনি ‘ভারত-ছাড়’ আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হন । মুক্তি পান ১৯৪৬ সালে । ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে অংশ নেন । ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের বিভিন্ন শর্তে রাজনীতি ছাড়েন ।

১৯৭০ সালে ৯ আগস্ট ভারতে চিকিৎসা  করতে গিয়ে মারা যান । শেষ হয় ময়মনসিংহের এক বিপ্লবীর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস । ভারতের  স্বাধীনতা অর্জনের খাতায় যার অবদান চিরস্মরণীয় থাকবে । মনে রাখবে এই বিপ্লবের রাজনৈতিক দিনগুলির ইতিহাস ।

তথ্য সহায়তা-নেট ও পত্রিকা (কিশোরগঞ্জ.কম/শেখ রফিক/উইকিপিডিয়া/অনুশীলন সমিতি তথ্য)