ক্যাটেগরিঃ জানা-অজানা

 
60_greentea_080915_0005

 

জীবন ও চা যেন একই  মোড়কে। বন্ধুর সাথে বাসার বাহিরে দেখা। সাথে সাথেই আপনি চায়ের দোকান খোঁজা শুরু করবেন। আড্ডা সেখানেই হবে। আবার বাসায় যখন আড্ডা তখনও  হাতে চায়ের কাপ! আর সেই চা নাকি একসময় গ্রামে গঞ্জে হাটে বাজারে চা কোম্পানিগুলো ফ্রি খাওয়াতো। শুধু অভ্যাস করার জন্যে। সেই অভ্যাস এখন পাকাপোক্ত। চা এখন বাঙালির খাবার সংস্কৃতির অংশ!

আমার চা ভালো লাগে। স্বাদের  খোঁজ দিতে পারবোনা। মুজতবা আলী দিয়েছেন কিনা সেটা জানা নাই । তবে পথে ঘাটে বা স্টেশন যাই বলুন চায়ের দোকানটাই খুঁজি । যে স্টলের চা ভালো লাগে সেই দোকানদারকে অবশ্য একটা ধন্যবাদ দেই।

গতকাল রাতে হালুয়াঘাট থেকে ফেরার পথে চা খাবো তাই এক স্টলে  থামলাম । উনি শুধু লাল চা বানিয়ে খাওয়ান। আমি বললাম তাহলে? সেই দেখিয়ে দিলো ঐ স্টলটার চা ভালো। সেখানেই দুধ চা পাবেন। বুঝলাম চা বিক্রেতারা এখন শিল্পী। যে লাল চা ভালো তৈরী করতে পারে সে সেটাই করে! সেই চা বিক্রেতা দুধ চা বানাতে অনিচ্ছুক।

উপমহাদেশে চা প্রবর্তক ইংরেজরাই। তবে চা এসেছে প্রতিবেশি চীন থেকে। প্রথম চায়ের দোকান লন্ডনে। তখন অর্থাৎ ১৬৫৭ সালের দিকে ইংরেজদের কাছে কফি বেশ জনপ্রিয় ছিলো।

যদিও ইউরোপের অন্যান্য দেশে চাও জনপ্রিয় । ইংরেজরা ব্যবসায়ী তাই চায়ের এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে চা আমদানী শুরু করলো । সেই চা আমদানীর দাম পরিশোধ করতেই ইংরেজরা (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি) চীনে আফিম চাষ শুরু করলো । মানে আফিম রপ্তানী আর চা আমদানী।

একটু বলে নেই । চা আবিষ্কার হয় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১০৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী শাংদের রাজত্বকালে ঔষধি পানীয় হিসেবে। এছাড়া আরেকটি গল্পও আছে!

২০৩৭ খ্রিস্ট্রপূর্বাব্দের দিকে শেনাং নামের চীন সম্রাট একটি নিয়ম করেন । তা হলো পানি গরম করে পান করতে হবে । এরকম এক সময় শেনাং এর জন্যে পানি ফোটানো হচ্ছিলো । তখন সেই পানিতে উড়ে এসে কিছু পাতা পড়ে । এতে পানির রঙ পরিবর্তন হয়  এবং আগ্রহ করে সম্রাট সেই পানি পান করে । তিনি নাকি ভালো স্বাদ অনুভব করেছিলেন ..! যদিও এসব গল্পের  ভিত্তি শক্ত নয়।

কলকাতায় চা প্রচলন শুরু হয় ১৮০০ সালের আগেই সম্ভবত । তবে বাঙালিরা কখন চা খেতে শুরু করেন তা স্পষ্ট নয় । বঙ্কিমচন্দ্রের সময়েই চা ইংরেজি শিক্ষিতদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠে । তবে এটি বিলাসিতা বা বদঅভ্যাস নামেই পরিচিতি পায় ।

এরপর বিভিন্ন বাঙালি লেখক বা বিজ্ঞানী এই চা অভ্যাস নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন । প্রফুল্লচন্দ্র রায় ‘চা পান,না বিষ পান? ‘ নামে সেই সময় একটি বইও প্রকাশ করেন ।

ভারতবর্ষে চা জন্মে ১৮২৩ সালেরও আগে। তখনি আসামে চা গাছ আবিষ্কৃত হয় (বুনো গাছ হিসেবে)। পরে ১৮৩৪ সালের দিকে লর্ড বেন্টিংক ভারতবর্ষে চা ব্যবসার অনুমোদন দেন । সেই যে শুরু এখনো তা চলছে।

এখন গল্প আড্ডা বা প্রশান্তি যাই বলেন সবকিছুর সাথেই চা । গ্রাম আর শহর নাই সবখানেই চা স্টল আছে । এই স্টলগুলোতেই থাকে জমজমাট আড্ডা ও গল্পের আসর । বাংলা সাহিত্যের লেখাতেও চা উঠে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার উপন্যাস গল্পে এই চা প্রসঙ্গ এনেছেন। এমনকি গানও লিখেছেন এই চা নিয়ে –

হায়,হায়, হায় দিন চলে যায়
চা-স্পৃহচঞ্চল চাতক দল চলো চলো চলো হে ।….

আমাদের কবি নজরুল ইসলামও  চা নিয়ে গান লিখেছেন । ইদানিং তো টিভি নাটকের নামও হয় চা দিয়ে।

যদিও চা বিদেশি বস্তু এরপরেও বাঙালি খাবার সংস্কৃতিতে সেই চা এখন অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই পানীয় খাবারের অর্থনৈতিক ইতিহাস আছে, আছে  কিছু গল্প! রাস্তা বা ঘাটের পাশে ছোট্ট এই চা দোকানটি যেন আড্ডা বা গল্পের প্রাণকেন্দ্র। বিষয় হালকা বা সিরিয়াস তাতে কিছু আসে যায় না তবে সেখানে গরম চা থাকতেই হবে। চায়ের চুমুক আর গল্প! আহ্ থাকুক এই ঐতিহ্য।


তথ্য-
অনির্বাণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা থেকে *
পত্রিকা নেট উইকিপিডিয়া ও বই (হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি)