ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

32_SSC+Result_HollyCross_AM_040517_0008

“পরীক্ষায় ১৭ বার ফেল করা ছেলেটাও ঘুরে দাড়াতে জানে, যদি তার লক্ষ্য সঠিক থাকে। হ্যাঁ ঠিক ধরে ফেলেছেন। আমি জ্যাঁক মা এর কথা বলছি। যিনি আলিবাবা ডটকম এর প্রতিষ্ঠাতা। বিশ্ব ধনীদের কাতারে একজন।”

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। আগের কয়েকবারের চেয়ে তুলনামূলকভাবে রেজাল্টে ধস নেমেছে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বুদ্ধিজীবী, সমলোচক সহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষদের ফেসবুক পোস্ট দেখলাম। নানান জনের নানান উক্তি। তবে সবার উপর প্রাধান্য পেয়েছে সার্টিফিকেট এর সেই সিজিপিএ কম-বেশি পাওয়ার গল্প। আর যে ছেলেটা ফেল করেছে তার তো মুখ দেখানো দায়! সমাজ ব্যবস্থা এখন ভাল ছাত্র খুঁজতে গিয়ে আসল মেধার মূল্যায়ন করছে না।

আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহ দেই না, আবার উৎসাহ দিলেও ছাত্র-ছাত্রীদের খামখেয়ালীপনায় সেই উৎসাহে টানাপোড়েন থেকে যায়। বিদ্যালয় থেকে শুধু পাসই করছে শিশুরা, কিন্তু অনেক নৈতিকতাবোধই এখন বিলুপ্তির পথে।

একটা সময় পরীক্ষায় পাস করলে এলাকার মানুষ দেখতে যেতো, এমন কি পাস করেছে এটা শুনেই খুশি। আর এখন যে স্কুলের বারান্দা টপকায়নি সেও বলে জিপিএ-৫  পেয়েছে কি না!

আমার স্পষ্ট মনে আছে এসএসসি তে ইংরেজি পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়া মাত্রই এক তুখোড় নেতার সাথে দেখা। তিনি স্কুলের গন্ডি কিংবা স্কুলের আশপাশ দিয়ে হেঁটেছেন কিনা সন্দেহ! বলে উঠলেন, “প্রশ্নটা দে তো?” আমি দিলাম। বললো, “সহজ প্রশ্ন, এ+ পাবি মনে হয়। ইজিই তো প্রশ্ন।” নীরবে হেসে চলে আসলাম। কত সহজে তিনি প্রশ্নের মান বুঝতে পারলেন। তবে ঘটনা হলো প্রশ্নটা উল্টো করে ধরা।

আমরা কেন যেন মানতে নারাজ যে সার্টিফিকেটের জিপিএ-৫ ই আসল যোগ্যতা নয়। আবার বলতে গেলে শিক্ষা মাধ্যমগুলো এখন জিপিএ মুখী। যে ভাল ছাত্র সে-ই জিপিএ-৫ পায় বলে চালিয়ে দিচ্ছি। অনেকটা হুজুগে মাতাল।

আমার এক পরিচিত লোকের ছেলে জিপিএ-৫ কিছুটা কম পেয়েছে। তিনি আফসোস করতে করতে প্রায় শেষ! মনে হয় যেনো ইচ্ছে করেই বোর্ড তাকে জিপিএ-৫ দেয়নি। আবার এক গার্ডিয়ান ব্রিফ করতেছে, “মেয়ে ঘুমের ঔষধ খেয়েছে সকালে। জিপিএ-৫ না পেলে মেয়েটা মুখ দেখাবে কি করে!”

এই যে ভূত, সে আমাদের আকড়ে ধরেছে। আমরা মনে করি এ+ জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। আসলে কিন্তু তা নয়। জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হলো আপনি কি হতে চান সেদিকে অগ্রসর হওয়া।

আমরা একটু বেশি আবেগপ্রবন। ধরুন, ১৬ কোটি বাঙালির মাঝে ২-৩ কোটি ক্রিকেট খেলা দেখে। কিন্তু আমরা সেটাকে ১৬ কোটি মানুষের নামে প্রচার করি। এমন যেন ১৬ কোটি মানুষের আত্মার সাথে মিশে আছে ক্রিকেট!

আমাদের আবেগটা ভিন্ন রকম। ধরুন, আপনি ডাক্তারের কাছে রোগী নিয়ে গেলেন। ডাক্তার চিকিৎসায় ব্যর্থ। ঠিকই তার বারটা বাজিয়ে ছাড়বেন। অথচ মরণঘ্যাতি ক্যান্সার থেকে রোগীকে সাড়িয়ে তুললে বড়জোড় পয়সা বাড়িয়ে দেবেন ডাক্তারকে। কিন্তু খাস নিয়তে ডাক্তারের জন্য দোয়াও করবেন না। এমন কি ডাক্তারের প্রচারণা কিংবা ভাল কাজের কারণে পুরষ্কার প্রাপ্তি সেটাও দুর্লভ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা যে ভাল শিক্ষার্থী,ভাল শিক্ষার্থী বলে চেচিয়ে গলা ফাটাচ্ছি। আমরা কি কখনো খুঁজতে চেয়েছি খারাপ শিক্ষার্থীর মাঝে বিরাজামান ভাল মানুষটাকে?

না আমরা চাইনি। আমরা শিক্ষাটাকে অহঙ্কার হিসেবে দেখি। আমরা স্কুলে যখন শিক্ষার্থী ভর্তি করি তখনই মনোভাব থাকে কিভাবে ছেলেকে প্রথম সাড়িতে রাখা যায় তার পরিকল্পনা। কিন্তু আসল কথা কি আমরা স্কুলে ভর্তি করিয়ে বলি না যে ছেলেটা কিংবা মেয়েটাকে একজন ভাল মানুষ হিসেবে তৈরি করে দিয়েন।

আমি বলি কি যারা অকৃতকার্য বা ফেল করেছে সম্ভাবনা তাদের মাঝেও বিরাজামান। যে ফেল করেনি, সে পাস করার চেষ্টা করেনি।

আমি সবসময় হেরে যাওয়া মানুষদের দলে। হারই মানুষকে জয়ের পথে অগ্রসর হতে অনুপ্রেরণা দেয়।

আমি কখনো যোগ্যতা সার্টিফিকেট দিয়ে মাপিনি। একজন কলা ব্যবসায়ী কলা বিক্রি করছে আর হিসাব করছে। উনি আটত্রিশ হালি কলা তেরো টাকা করে বিক্রি করে কয়েক সেকেন্ড এর মধ্যে দাম বললেন ৪৮১ টাকা। সবাই তো অবাক! বললাম, ‘কি করে এত তাড়াতাড়ি হিসেব করলেন?’ বললো, ‘হড়া লেহি না জানতে পারি মনু, হিসাবে পাক্কা। হারাইতে পারবা না তুমি।’  এবার বুঝুন যোগ্যতা মানুষের সার্টিফিকেটে লেখা থাকে না। কর্মই আপনার যোগ্যতা ঠিক করে দিবে। তাই নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। পৃথিবীর বিখ্যাত লোকগুলো এমএ- বিএ পাস নয়। তারা সকলেই ড্রপ আউট।

তাই ফেল মানেই হতাশ নয়। ফেল হলো সফলতার পথে একদাপ এগিয়ে যাওয়ার সংকেত মাত্র। আবারো বলছি, ভাল শিক্ষার্থী নয়, ভাল মানুষ চাই। ভাল মানুষ হলেই ভাল ছাত্র হওয়া যায়।