ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

আজ ২৫শে ডিসেম্বার, যীশুখৃষ্টের জন্মদিন। পৃথিবীর সর্বত্র মহা আড়ম্বরে পালিত হচ্ছে ক্রীসমাস উৎসব, বাংলায় যা ‘বড়দিন উৎসব’ হিসেবে পরিচিত। ক্রীসমাস মানেই যীশুখৃষ্ট, ক্রীসমাস মানেই লাল- সবুজ, ক্রীসমাস মানেই ক্রীসমাস ট্রি, ক্রীসমাস মানেই স্যান্টা ক্লজ, ক্রীসমাস মানেই উপহার সামগ্রী, ক্রীসমাস মানেই সুস্বাদু কেক, ক্রীসমাস মানেই চকোলেট, ক্যান্ডী এবং ক্রীসমাসের ছুটি। ক্রীসমাস সীজন শুরু হতেই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা নিয়ে টানাপোড়েন থাকেনা, থাকে পক্ষকালব্যাপী ছুটির আমেজ। নভেম্বারের থ্যাঙ্কস গিভিং পর্ব শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে যায় ক্রীসমাসের জন্য রেডী হওয়া, ঘরে-বাইরে, হাটে-বাজারে সর্বত্র হৈ হৈ রৈ রৈ চলতেই থাকে। কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। বিপণী বিতান গুলো এই একটি সীজনেই রোজগার করে নেয় সারা বছরের উপার্জন যা দেশীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক সাফল্য নিয়ে আসে। অর্থনীতির সূচক উপরের দিকে উঠতে থাকে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোর মত গত একমাস ধরে আমেরিকার সর্বত্র দেখা যাচ্ছে শুধুই লাল আর সবুজের সমাহার। আমেরিকানদের ঘরে তো বটেই, স্কুল, কলেজ, দোকান-পাট সর্বত্রই বিশাল সাইজের ক্রীসমাস ট্রী সাজিয়ে রাখা হয়েছে, এবং তা সাজানো থাকবে নতুন বছর ২০১৩ আসা পর্যন্ত। সবুজ ক্রীসমাস ট্রির সাথে আছে টকটকে লাল রিবনে তৈরী বো, অথবা স্যান্টা ক্লজের লাল স্টকিংস, অথবা স্যান্টার মাথার লাল টুপী। এছাড়া রাস্তাঘাট সাজানো হয়েছে ছোট ছোট টুনী লাইট দিয়ে। টুনী লাইট দিয়ে ক্রীসমাস ট্রী, অথবা স্যান্টাক্লজের আদল বানানো হয়েছে, এমন কী স্যান্টার সাথে আসা রেইন ডিয়ার, ছোট ছোট এঞ্জেলও সাজানো হয়েছে। তবে যা কিছুই করা হোক না কেনো, লাল আর সবুজের ভেতরেই সব হচ্ছে। ক্রীসমাসকে ঘিরে লাল ও সবুজ রঙের একটি বিশেষ তাৎপর্য্য আছে। লাল রঙ যীশুর পবিত্র রক্তের প্রতীক যা যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার পর দেহ থেকে বেরিয়ে এসেছিল, আর সবুজ হচ্ছে চির সবুজের প্রতীক, যেমন চিরচেনা ক্রীসমাস ট্রী, চির সবুজ গাছ, যার পাতা শীতেও ঝরে পড়ে না।

বিপনি বিতানগুলোতে ক্রীসমাস ট্রী শুধু সবুজই হয় না, এদেশে সাদা বা লাল ক্রীসমাস ট্রীও সমান জনপ্রিয়। তবে বেশীর ভাগ আমেরিকানদের কাছে সবুজ এর উপর আর কথা নেই। যদিও যীশুর জন্মের সাথে ক্রীসমাস ট্রী’র কোনই যোগসূত্র নেই, তবুও ইতিহাসের হাত ধরে কীভাবে যেন ক্রীসমাস ট্রী পৃথিবীর সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

খৃষ্টধর্ম প্রচারিত হওয়ার পূর্বে, ‘পেগান’ জনগোষ্ঠির অধিকাংশই ছিল প্রকৃতির পূজারী। গাছ-পালা, লতা-পাতা, সব কিছুর মাঝেই তারা ঈশ্বরকে দেখতে পেতো। খৃষ্ট ধর্ম প্রচারিত হওয়ার কালে, পেগানদের অধিকাংশই খৃষ্ট ধর্মের অনুসারী হয়ে যায়। তারাই সর্বপ্রথম ক্রীসমাস ট্রি’র তিনকোনা আকৃতিতে স্বর্গমুখী রূপ খুঁজে পায়। অর্থাৎ ত্রিকোন ক্রীসমাস ট্রি’র সরু ও তীক্ষ্ম শীর্ষদেশ আকাশমুখী হয়ে স্বর্গের অবস্থান (ট্রিনিটি) নিশ্চিত করে, যেখানে ঈশ্বর, ঈশ্বর পুত্র (যীশু খ্রীষ্ট) এবং পবিত্র আত্মারা বাস করেন। সেই থেকেই ক্রীসমাস বা যীশু খৃষ্টের জন্মোৎসবের সাথে ক্রীসমাস ট্রী’ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ক্রীসমাস ট্রি ব্যবহারের রেওয়াজ প্রচলিত ছিল জার্মানীতে, পরবর্তিতে বৃটেনের তৃতীয় জর্জের স্ত্রী, কুইন শার্লট ১৮৩৫ সাল থেকে সমগ্র বৃটেনে ক্রীসমাস উৎসবের সময় ক্রীসমাস ট্রি সাজানোর রীতি চালু করেন। ১৮৪১ সালের দিকে ক্রীসমাস ট্রি ব্যবহার আরও বেশী জনপ্রিয় হতে থাকে এবং ১৮৭০ সাল থেকে আমেরিকাতেও শুরু হয় ক্রিসমাস ট্রি’র ব্যবহার। আমেরিকানরা বরাবর হুজুগপ্রিয়, যখন যা ভালো লাগবে, সেটাতেই মজে যাবে। এই ক্রীসমাস ট্রি কালচার আমেরিকাতে প্রবেশের সাথে সাথেই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ক্রীসমাস ট্রি নানা অর্নামেন্ট, লাইট দিয়ে মাসব্যাপী সাজিয়ে রাখা তেমনই একটি জনপ্রিয় ব্যাপার। গাছগুলো সাজানো হয়, চমৎকার করে। গাছের গায়ে ঝুলিয়ে দেয়া হয় ছোট ছোট সুদৃশ্য ঘন্টা, স্যান্টা ক্লজের এক জোড়া মোজা, স্যান্টার মাথার টুপী, হাতের দস্তানা, ক্যান্ডি কেইনসহ আরও কত কিছু।

ক্রীসমাস ট্রি ছাড়া ক্রীসমাস উৎসবের সবচেয়ে বড় আইকন হচ্ছে স্যান্টা ক্লজ। স্যান্টা ক্লজ বলতে ছোট ছোট শিশুরা অজ্ঞান। তারা মনে করে, স্যান্টা ক্লজ বাচ্চাদের পরম বন্ধু, স্যান্টা ক্লজ খুব দয়ালু। ক্রীসমাসের সময় সুদূর উত্তর মেরু থেকে স্যান্টা বুড়ো তার পিঠে বাচ্চাদের জন্য উপহারের বোঝা নিয়ে আসে, প্রতি বাড়ী বাড়ী যায়, সে বাড়ীর বাচ্চাটির জন্য উপহারটি রেখে দিয়ে চলে যায়। কোথায় যায় স্যান্টা? স্যান্টা কোথাও থামেনা, পৃথিবীর যত শিশু আছে, তাদের প্রত্যেকের কথা স্যান্টা জানে। কাজেই স্যান্টাকে দৌড়ের উপর থাকতে হয়। তবে ভাগ্য ভালো, স্যান্টা আসে শ্লেজ গাড়ীতে চড়ে। নয়টি রেইন ডিয়ার চালায় স্যান্টার শ্লেজ। তাই ভারী শরীরখানা নিয়ে স্যান্টাকে হাঁটতে হয় না। স্যান্টা এত মোটা কেনো? এ প্রশ্ন যে কোন বাচ্চাকে করা হলে, খুব সহজে উত্তর দেয়, সবার বাড়ীতে গিয়ে স্যান্টাকে ‘দুধ আর কুকী’ খেতেই হয়, তাই স্যান্টা অমন মোটা হয়ে গেছে। শিশু মনের আধুনিক উত্তর।

ক্রীসমাসের মূল আনন্দ হয় ক্রীসমাসের আগের সন্ধ্যায়, ২৪শে ডিসেম্বার, যা ক্রীসমাস ইভ’ নামে পরিচিত। খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীরা তাদের জন্য নির্ধারিত চার্চে যায়, সেখানে ধর্মীয় সঙ্গীত হয় (কেরল, গসপেল), প্রার্থণা সভা হয়, সবার সাথে সবার দেখা সাক্ষাৎ হয়। চার্চে ফিস্ট হতে পারে, যার যার বাড়ীতেও উৎসবের ভোজ আয়োজন হয়ে থাকে। খাবারের মেন্যু যার যার দেশীয় রীতিতে হয়ে থাকে। যেমন ‘সিসিলি’ তে ক্রীসমাস ইভ’ পার্টিতে বারো রকমের মাছ খাওয়া হয়। ইংল্যান্ড, জার্মানী, ফ্রান্স,অস্ট্রিয়া বা আমেরিকাতে খাওয়া হয়, টার্কী অথবা হাঁস, পর্ক এবং বীফ, গ্রেভী, আলু, সব্জী এবং ব্রেড, ডেজার্টে দেয়া হয় ফ্রুট কেক, ক্রীসমাস পুডিংসহ আরও অনেক কিছু। ক্রীসমাস ডে’তে সকলেই থাকে হ্যাপী মুডে, ছুটির আমেজে। ভোর সকালেই বাচ্চারা ঘুম থেকে জেগে, এক দৌড়ে ছুটে যায় ক্রীসমাস ট্রীর নীচে। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করে, স্যান্টা ক্লজের রেখে যাওয়া রকমারী উপহারের রঙ বেরঙের প্যাকেট। চোখে লেগে থাকা ঘুম উবে যায়, যত দ্রুত সম্ভব প্যাকেট খোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শিশুরা শুধু উপহার পেয়েই বসে থাকেনা, স্যান্টা এসেছিল কি না, তা পরখ করে দেখার জন্য কিচেনে গিয়ে ঢুকে। সেখানে আগের রাতে রেখে দেয়া দুধের গ্লাস এবং কুকীর প্লেট পরখ করে দেখে, দুধশূণ্য গ্লাস আর কুকীশূণ্য প্লেট দেখে তারা আনন্দে নেচে উঠে। যার সাথে দেখা হয়, তাকেই ডেকে বলে, স্যান্টা তার বাড়ীতে এসেছিল! ( ওদের কেউ কেউ হয়তোবা আন্দাজ করে, ড্যাডি বা মাম্মি দুধ ও কুকী খেয়েছে, তবুও ওরা মুখে তা স্বীকার করে না)।এরপর সারাদিনই চলে খানাপিনা আর স্যান্টার কাছ থেকে পাওয়া উপহার নিয়ে মাতামাতি।

শুরুতে ক্রীসমাস শুধুমাত্র খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীরা পালন করতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও ক্রীসমাসের আনন্দ উদযাপনে শরীক হয়। স্যান্টা ক্লজও তার ভুবনজয়ী ‘হো’ হো’ হো’ হাসি ছড়িয়ে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত চষে বেড়ায়। ধর্ম-বর্ণ, জাতি, গোত্র নির্বিশেষে সব বাড়ীর চিমনি বেয়ে রান্নাঘরে ঢুকে, ক্রীসমাস ট্রির নীচে বাড়ীর বাচ্চাদের জন্য গিফট রেখে, তার জন্য সাজিয়ে রাখা দুধের গ্লাস এক চুমুকে সাবাড় করে দিয়েই আবার চিমনি দিয়ে বের হয়ে যায়। এভাবেই কোমলমতি শিশুদের মনে স্যান্টা উদারতা, মমতা, পরমত সহিষ্ণুতা, ভদ্রতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সকলকে ভালোবাসার মন্ত্রবীজ দিয়ে যায়।

২০১২ সালের ক্রীসমাস ইভে স্যান্টা নিশ্চয়ই আবারও সকলের বাড়ী ঘুরে ঘুরে শিশুদের মাথায় তাঁর স্নেহস্পর্শ বুলিয়ে গেছে। স্যান্টা নিশচয়ই প্যালেস্টাইন থেকে শুরু করে কানেকটিকাট, কানেকটিকাট ঘুরে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান, ভারত সর্বত্রই চষে বেড়িয়েছে আর সকল সুখী ও দুঃখী শিশুর কানে কানে ভালোবাসা, আদর, মমতার মন্ত্র শুনিয়ে গেছে। মন্ত্র শুনিয়ে গেছে নতুন বছরের, মন্ত্র শুনিয়েছে নতুন জীবনের, মন্ত্র শুনিয়েছে ভালোবাসার, মন্ত্র শুনিয়েছে আনন্দের। স্যান্ট ক্লজ নিশ্চয়ই তার ভুবনজয়ী ‘হো’ হো’ ‘হো’ হাসির সাথেই বলে গেছে,
আই উইশ ইউ মেরী ক্রীসমাস, উই উইশ ইউ মেরী ক্রীসমাস!!!

***
ফিচার ছবি: মুস্তাফিজ মামুন/ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/ ঢাকা, ডিসেম্বর ২৪, ২০১২ (লিংক)

৯ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. আসাদুজজেমান বলেছেনঃ

    স্যান্ট ক্লজ সম্ভবত আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় মিথ, সবচেয়ে বড় বন্ধুও…….যিনি আছেন কি নেই, তার থেকেও বড় কথা- প্রিয় এক বন্ধু যিনি অবশ্যই হয় পরিচিত কিম্বা অপরিচিত আদলে উপহার নিয়ে আসবেন..।
    এ কথা ভাবতে ভালো লাগছে, পরম বন্ধু সান্টা হয়তো বড়দিনে আমার কাছে এসেছে লেখিকার বেশে উপহার হিসাবে সুন্দর একটি লেখা নিয়ে..।
    মেরী ক্রীসমাস প্রিয় রীতা রায় মিঠু।।।

  2. নীলকন্ঠ জয়

    নীলকন্ঠ জয় বলেছেনঃ

    স্যান্ট ক্লজ তো সকলের মাঝেই বর্তমান।ভালো যা কিছু তা তারই প্রতিচ্ছবি।
    শুভ বড়দিন,আনন্দে রঙ্গীন,হোক চীর অমলিন।

  3. রীতা রায় মিঠু বলেছেনঃ

    প্রিয় ব্লগটীমের সদস্যবন্ধুরা, হ্যাপী মেরী ক্রীসমাস! আমার এ লেখাটিকে ‘ফীচার পোস্টের’ মর্যাদা দিয়ে শিশুবন্ধু ‘স্যান্টা ক্লজকে’ স্বীকৃতি দিয়েছো। তোমাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। বর্তমান সময়ে একজন সত্যিকারের স্যান্টা ক্লজের উপস্থিতি জরুরী ভিত্তিতে কাম্য। বড়দের হানাহানি, যুদ্ধ-বিবাদের ‘বলি’ হচ্ছে নিষ্পাপ, সরল, কোমলমতি শিশুরা। একমাত্র স্যান্টা ক্লজই পারে, নিষ্ঠুর-যুদ্ধবাজ, মানসিক বিকারগ্রস্তদের কবল থেকে ‘আগামী’র নায়কদেরকে উদ্ধার করতে!
    সবাইকে হ্যাপী মেরী ক্রীসমাস! পৃথিবীর সকলে সুখী হোক!

  4. রীতা রায় মিঠু বলেছেনঃ

    হৃদয়ে বাংলাদেশ, নুরুননাহার শিরীন, আসাদুজজেমান, নীলকন্ঠ জয়, তানভীর নির্ঝর, টুম্পা, বোতল বাবা———
    ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ!!!!!!!!

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...