ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

ঢাকা থেকে বেশিরভাগ মানুষ চট্টগ্রাম আসে কক্সবাজার যাওয়ার জন্যে। অন্য জেলার মানুষও চট্টগ্রামে যদি এসে থাকে কারণ সেই কক্সবাজার। সমুদ্র দেখার ইচ্ছা! কলকাতার অনেকেই বাংলাদেশের কথা বলতেই বলে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কথা। ওদিকে কলকাতা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ বা আরো পরে মালদহের মানুষ দীঘায় যায় সমুদ্র দেখতে। সেখানেও সেই বঙ্গোপসাগর। সমুদ্রের প্রতি মানুষের তীব্র আকর্ষণ।

20170624_122106

.

আমরা যারা সাগর পাড়ের মানুষ আমাদের কাছে সমুদ্র কেমন ছিল?

সমুদ্র কি তখনো বোঝার বয়স হয়নি। অল্প হাঁটতে শিখেছি। কথা বেশ বলতাম। সবাই বলাবালি করত নতুন বেড়িঁবাধ হয়েছে। কি সেই বেঁড়িবাধ আর কেমনই বা দেখতে কেউ বলতে পারত না। আমাদের ঘর থেকে সমুদ্র খুব দূরে নয়। নৌকা চলার শব্দ শুনা যেত। ভোর বেলা ঘুম ভেঙেছে বা রাতে ঘুমাতে গেছি নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ স্পষ্ট শোনা যেত। আর প্রতিদিন সকাল হলেই জেলে পাড়ার কিছু মানুষ মাছ নিয়ে আসত।

অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ

.

মা সকালে বলত “জাইল্যে বেডা/বেডি দেখিলে কইস” সমুদ্র শব্দটা তখনো জানি না। জানতাম “দইজ্জেরকুল” থেকে এই মাছ আসে। যে শব্দ শুনি সেটা নৌকা চলার শব্দ আর সেই নৌকা দিয়েই মাছ ধরে। কিন্তু সমু্দ্রে আবার কেমন করে মাছ ধরে যে এত ছোট মাছ ও ধরা পড়ে? আমাদের ঘরের পাশেই ছিল পুকর। মা বরশি বসাত। আমরা “বরকি” বলতাম। মাটি কুঁড়ে কেঁচো লাগাতাম বরশির মুখে। আমরা বলতাম “কেঁইচ্চে”। ওতে কখনো তো চিংড়ি মাছ ধরা পরেনি। অনেক রকম মাছ দশ টাকার দিত। সেটাকে কেউ বলত “গুরে মাছ” কেউ বলত “ইঁচে মাছ”।

তো এই সমুদ্রজ্ঞান নিয়ে বাবার সাথে জেদ বেঁড়িবাধ দেখতে যাব। বাবার সাইকেল ছিল। বাংলা সাইকেল যেটাকে বলে। বাবার পিছনে আমি শক্ত করে ধরে আছি। কিছু দূর না যেতেই চাকার ভেতর পা ঢুকল। এরপর আর কি হলো জানি না। যখন জানি তখন শহরে ডাক্তারের রুমে। লাগানো হলো ব্যান্ডেজ। দু মাস হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হলো। তারপর আমি আর সমুদ্র গেছি কি মনে নেই। নানু বাড়িতেই নিয়মিত হয়ে গেছিলাম। মাঝখানে বাবার এক্সিডেন্ট এর কারণে নিয়ে গেল গ্রামে। গ্রামে তখন আমি নতুন। ছেলেরা শহরের কাক বলে ক্ষেপাত। “শউরগে কাক” এরকম বলত। গ্রামে গিয়ে দেখলাম আসলে তারা কাক নয়।

20170624_122119

.

খুব ছোট হলেও অনেকেই জাল নিয়ে সমুদ্রে যায়। আস্তে আস্তে আমিও যেতে থাকলাম। “পেলন জাল” নামে এক ধরনের জাল নিয়ে সবাই মাছ ধরত। ওদের মাছ ধরা দেখতাম। সবাই মাছ নিয়েই ফিরত। মাছ নানাভাবে ধরা হতো। নতুন যে বেড়িবাঁধ হলো তার আগে একটা বেড়িবাঁধ ছিল। সেটা কোথাও পুরো ভেঙ্গে গেছে কোথাও অল্প। ওখানে গর্তের পানিতে বাঁধ দিয়ে পানি সেঁচা হতো। আমরা গাঁতা বলতাম। আমিও সেঁচতাম। নতুন বেড়িবাঁধ করার জন্যে কয়েক জায়গা থেকে মাটি কাটা হয়। সেগুলো ছোট ছোট পুৃকুরের মত হয়ে গেছে। সেখানে তীরে ও কোণার মত জায়গাগুলোতে হাতড়ে ও জাল ঠেলে মাছ ধরত। কত রকম মাছ পাওয়া যেত। আর যারা বয়সে বড় তারা খালে নেমে পড়ত নয়ত জোয়ারের মধ্যেই জাল ঠেলত সেই পেলন জাল দিয়ে। আর কিছু মানুষ ছিল পেশাদার।

20170624_124954

.

যারা বড় বেলুনের মত একটা জাল গলা সমান পানিতে বসিয়ে পোনামাছ সংগ্রহ করত। আর এক ধরনের জাল ছিল যেটা সোজা করে বাঁশ বা অন্য কিছু দিয়ে দাড় করানো থাকত সারা বছর। জোয়ারের পানি ঢুকলে মাছ আটকে যেত। জোয়ার যাবার পর মাছ গুলো নিত। আমার দাদাও এই জাল বসাত। এটাকে বলতাম বাঁডা জাল। এই মাছ ধরতে যাওয়াতে মজার ব্যাপার ছিল। আমার মাছ ধরা বিশেষ ভাল লাগত না। আমি অপেক্ষা করতাম কখন জোয়ার আসবে। জোয়ার আসলে সবাই মাছ ধরা বাদ দিয়ে চড়া খাওয়ার খেলায় ব্যস্ত হতো। পাড় থেকে নিচের দিকে গেছে এরকম জায়গা গুলোতে পানি দিয়ে পিচ্ছিল করে পাথর গুলো সরিয়ে বেশিরভাগ সময় কাপর খুলেই উপর থেকে নীচে নামতাম। ছোট বেলায় এটা ছিল সবচেয়ে আনন্দের খেলা। যত খেলতাম জোয়ারের পানি বাড়ত। সেই জায়গাটা পানিতে চলে গেলে আমরা নামতাম না আর। বড় যারা ছিল তারা তখনো খেলে যেত।

20170624_125054

.

কেউ ফুটবল নিয়ে গেলে পানির মধ্যেই চলত বল কার হাত থেকে কে নেবে সেই খেলা। অনেক সময় ঢেউয়ের মধ্যে নেমে যেতাম সবাই। কেউ কেউ সাহস দেখাতে একটু দূরে চলে যেত। এই সমুদ্রে নেমে একটু একটু করে দূরে যেতে যেতেই সাহসের যত বাড়বাড়ন্ত আজ। জোয়ার বাড়তে বাড়লে চলে যেতাম সেই পুকর গুলোতে। সেখানে আবার খেলা শুরু। ডুব দিয়ে একজন লুকোবে তাকে যে চোর সে খুঁজে বের করবে। এটা কে “মরিচ” খেলা বলতাম। এই পুকুরে কখনো কখনো জেলেরা নৌকা রাখত। কজন উঠে পা দিয়ে নাড়িয়ে সে নৌকা চালাতাম। কখনো উল্টো দিয়েও চলে আসতাম। যখন ফেরার বেলা হতো খুব ক্লান্ত সবাই। বিল হয়ে ফিরলে লোকের ক্ষেতে নেমে কাঁচা টমেটো ( আমরা বলতাম খাট্টাবায়ুন), বাঙি ( আমরা বলতাম বাঁই), ঢ়েড়স ( আমরা বলতাম বেন্ডি) খেয়ে নিতাম। ওই দুপুর বা বিকেলের উত্তপ্ত সময়ে ‍কি আনন্দই না ভর করত শরীর ও মনে। এর বেশিরভাগ করতাম প্রাইমারী স্কুলে।

20170624_115906

.

হাইস্কুলে গিয়ে পড়ার চাপে প্রতিদিন সেই সুযোগ আর হতো না। শুধু শুক্রবার ফুটবল খেলার অজুহাতে সবাই যেত মূলত সমুদ্রে গোসল করতেই। এক সময় আমরা আরো বড় হয়ে গেলাম। সুমদ্র তীরে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড হলো তারপর থেকে গোসল ও বন্ধ। এরপর সমুদ্র যাওয়া হতো সূর্যাস্তের সময়। নয়ত রাতের বেলা জোয়ার দেখতে। অনেক বেশি বর্ষায় যখন ঢেউগুলো দৈত্যকার হতো নয়ত ভোর বেলা যখন নৌকা গুলো ধোঁয়া ছড়িয়ে শব্দ করে ছুটে দিন শুরু করত সাগরে। তারপর? সমুদ্র আমার কাছে ঢাকার বা মালদহের সেই মানুষদের মতো। সমুদ্রে যেতে হয়।

যে জীবন ছিল সমুদ্রেরই সেটা হারিয়েছে। আমিও কিন্তু আজকাল সমুদ্রে যাই। আমার ছোটবেলার দইজ্জেরকুলে অার বেন্ডি খাওয়ার মত মজাটা আর নেই। বাকী জোয়ার-ভাটা সব আসে যায় একূল ওকূলে…