ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

হাজার সাইরেনে যখন অতিষ্ঠ আমার কর্ণ কুহর তখনি ভাবলাম আর না, দু’দিন হলেও একটু জিরাতে দেব মস্তিষ্ককে।কিন্তু পূজোর এই ছুটিতে সবাই ঢাকার বাইরে,কক্সবাজার –বান্দরবন সব জায়গাতেই লোকে লোকারণ্য। এমন একটি নির্জন জায়গা খুঁজে বের করতে হবে যেখানে মানুষ তেমন নেই। মাথার ভেতর হাম হাম ঝরনা ক্রমাগত ডাক দিচ্ছিল, কিন্তু শারীরিক শক্তি বলে দিল –পারবি না। তাই আমার গাড়িটি যখন শ্রীমঙ্গলের ফিনলে চা বাগানে থামলো তখনি ঠিক করলাম মাধবপুর যাব। কিন্তু ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলন পৌঁঁছুতেই বেলা প্রায় শেষ, এই বেলা মাধবপুর গেলে অন্ধকার নেমে আসবে। শান্ত লেকের ছবি আর তোলা হবে না। মজার বিষয় হচ্ছে শ্রীমঙ্গলে রাত কাটানোর মত কোন হোটেল আমি বুকিং দিয়ে আসিনি, কিন্তু সাথে আছে ছোট বাচ্চা এবং বয়স্ক মা।

এবার আমি শ্রীমঙ্গল এসেছি একদম গ্রামে থাকার জন্যে। এখানকার মনিপুরী পাড়াগুলো ঘুরে দেখবো, তাদের জীবন ব্যবস্থা কাছ থেকে অনুভব করার চেষ্টা করবো। যদিও বাচ্চা সাথে নিয়ে কাজটা অনেক কঠিন হয়ে যায়, তবুও আমি সিদ্ধান্তে অটল। ড্রাইভারকে বললাম কমলগঞ্জের পথ ধরতে। ড্রাইভার সিলেটি, আমার মুখ দেখে জানতে চাইলো –ওটা কতো দূর? আমি তাকালাম আমার ভাইয়ের দিকে, সে উত্তর করলো-গাড়িতে প্রায় দু’ঘন্টা লাগবে। হিসেব করে দেখলাম প্রায় ৩৫ কি.মি. হবে। সূর্য তখন প্রায় পশ্চিমের পথে, আমরা রওনা দিলাম।

এতোকাল চা বাগান কেবল টেলিভিশনেই দেখেছে আমার মা, এই প্রথম চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে দেখলো-এতো বড় হয় গাছগুলো? আর এমন সুন্দর করে মাথাগুলো সমান তালে কাটলো কে? আমি হাসলাম-পাহাড়ের মানুষ অনেক পরিশ্রমি হয়,আর এই এলাকার সবগুলো চায়ের আগা সমান করে কাটা। সমুদ্রের মতোন ঢেউ তোলা চায়ের সারির মাঝ বরাবর আমরা ছুটে চলেছি। কিছুক্ষন পর পর পাখিদের কিচ কিচ আর বন্য প্রজাপতির আনাগোনা মুগ্ধ করে তুলছিল। আমরা নেমে পড়লাম খোলা আকাশের নীচে। চলতে থাকলো ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক ক্লিক, আমার মা যেন আমার মেয়ের মতোই বাচ্চা হয়ে গেল। বলার আগেই ছবি তুলতে প্রস্তুত, বহু বছর এমন খুশি হতে তাকে দেখিনি। রেইনট্রির আড়াল থেকে সূর্য তখন বিদায় নিচ্ছিল।

চান্দিয়া বাজার পাড় হয়ে আমাদের কলাবন পাড়া যেতে হবে। ওখানেই পিচ ঢালা পথ শেষ, এরপর পায়ে হাঁটার রাস্তা শুরু। পূজোর কারনে কিছু কিছু মন্দিরে তখন আলো জ্বলছিল, তা ছাড়া চারপাশে আর কোন আলো নেই যদিও বিদ্যুতের তার দেখতে পারছিলাম। এই অঞ্চলের মানুষ সারা দিন কাজ করে,খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যায়। নিকষ অন্ধকার ভেদ করে কেবল একটি চায়ের দোকান দেখা গেল।

ন্যাশনাল টি এস্টেট কাছেই, সুতরাং তাজা চায়ের স্বাদ নিতেই এই ঘন অন্ধকারে সবাই চায়ের কাপ হাতে বসে পড়লাম। নিভু নিভু করে ইলেট্রিক বাতি জ্বলছে, দু’একজন গ্রামের লোক বসে আছে গোল হয়ে। তাদের প্রশ্ন করেই জানলাম কলাবন পাড়া আরো আধ ঘন্টার রাস্তা। বেশ বৃদ্ধ একজনকে দেখে বেশ কৌতুহল হলো-আচ্ছা চাচা,আপনেদের এইখানে হাসপাতাল আছে? তিনি সামনের দিকে দেখিয়ে দিলেন, কিন্তু আমি অন্ধকারে কিছুই বুঝতে পারলাম না। তাই আবার শিওর হবার জন্য জানতে চাইলাম-ওখানে গেলে আপনারা ডাক্তার পান? তিনি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন।

ফিরতি পথে আমি সেই হাসপাতালে ঢুঁ মেরেছি এবং বুঝেছি –সুন্দরের হাত ছানিতে যে লোকালয়ে আমরা হাজার টাকা দিয়ে আনন্দ কিনতে আসি সেখানকার মানুষরা আসলেই খুব অসহায়। কলাবন পাড়ায় যে বাড়িতে আমরা ছিলাম সেটা আব্দুল মান্নান সাহেবের বাড়ি, এই এলাকার কন্ট্যাক্টর। তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন হাম হাম পাহাড়। ওখানকার আদিবাসীরা বলতো –হাম্মাম।হাম্মাম মানে ঝর্না,সেখান থেকেই নামকরন করা হয়েছে –হাম হাম।যে রাস্তা আমি পাড়ি দিলাম তাতে আর পথ হাঁটা সম্ভব না,ঘুমানো দরকার।আমাদের জন্য বিশাল খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে,তার আগে আমি ছুটলাম গোসল করতে।সে এক দারূন ব্যপার,কুয়োর ভেতর পানি। ওখান থেকেই রশি দিয়ে পানি তুলে তবেই না গোসল করা যাবে। কিন্তু  এই কাজ জীবনেও আমি করতে পারবো না। ছোট ছোট চোখের পুতুল পুতুল একটি মেয়ে আমাকে পানি তুলে দিল, আমি মাথায় পানি ছোঁয়াতেই মনে হলো ঝরণা থেকে স্বর্গীয় জল আমার শরীরে পড়ছে-কিযে ঠাণ্ডা। আমি দু’হাতে পানি খেয়ে নিলাম, মনে হলো কতো দিন যে এমন সুধা পান করিনি।

রাতে খুব অবাক হয়ে দেখলাম এরা কোন দরজা জানালা বন্ধ করে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম-চোর ডাকাত আসে না? ওরাও যেন খুব অবাক-না, আমাদের এইখানে কেউ খারাপ কাজ করে না। এই প্রথম আমার মনে হলো-আমি মানুষ নামক এক বিরাট জনপদে বাস করছি আর আমার ছোট মেয়েটা স্বর্গের পুতুলদের সাথে মেতে আছে।

কলাবন পাড়া থেকে পর দিন সকাল ৮ টায় রওনা হলাম মাধপপুরের পথে। এই বেলা ড্রাইভারকে বললাম- এবার চিনতে পারবা তো? সে খুব কনফিডেন্ট-হ্যাঁ, খালি চিনবো না। আমি নিজেই এইবার কেউ হাম হাম আস্তে চাইলে নিয়া আস্তে পারবো। আমি তাকে ভয় দেখিয়ে বললাম–শোন, হাম হাম ঝরনা আরো তিন ঘন্টা পায়ে হেঁটে। তুমি গাড়ি নিয়ে মাধবপুর গেলেই হবে।

মাধবপুর যাবার জন্যে আমাদের আর শ্রীমঙ্গল যেতে হয়নি, প্রায় ২১.৭ কিলোমিটার পথ গাড়ি টান দিয়েই চলে গেলাম। লেকের কাছাকাছি যেতেই মা চিৎকার করে উঠলো-প্রজাপতি সিনেমার শ্যুটিং কি এইখানে হইসে? আমি মনে করতে পারছিলাম না,কারন খুব খেয়াল করে ছবিটা দেখা হয়নি। তবে এই লেকের পদ্মের সাথে আমার পরিচয় বহু দিনের। শান্ত একটা স্রোত খেলা করে সব সময় এখানে। শুকনো পাতারা সারাক্ষন ভেসে বেড়ায় লেকের পানিতে, আমরা টুক টুক করে উপর দিকে উঠতে লাগলাম। প্রকৃতির কি বিচিত্র আয়োজন, যেন খুব যত্ন করে কোন এক শিল্পী এঁকে রেখেছে আকাশ-মেঘ-গাছ আর লেকের স্বচ্ছ জলরাশি। এখানে তেমন লোকের আনাগোনা নেই, মাধবপুরের নির্জনতায় ডুব দিয়ে থাকা যায় দিনের পর দিন। খুব সুন্দর মোটেল আছে, ইচ্ছে করলে পূর্নিমা রাতে কেউ রুম ভাড়া করে লেকের পানি দেখে রাত কাটাতে পারে। কিন্তু আমাকে সব ঘোরাঘুরি আজই শেষ করে ঢাকায় ফিরতে হবে।

madhoppur
যদিও ফুল তোলা নিষেধ তবু একটা পদ্ম তুলে চুলে গুঁজে নিলাম,আমাকে দেখে আমার হিংসুটে মেয়ে সেটা কেড়ে নিয়ে নিজের মাথায় গুঁজতে গেল। কিন্তু,না পেরে ফুল ফেলে দিল না ।সারা পথ পদ্ম হাতে নিয়ে সে বসে থাকলো,আমরা মাধবকুন্ডের পথে রওনা দিয়াম। শহরের রাস্তা ফেলে একসময় গাড়ি মাটির পথ ধরলো, দু’ধারে তখন কাটা পাহাড়। বোঝাই যাচ্ছে পাহাড় কেটে রাস্তা করা হয়েছে। শ্রীমঙ্গল এসে দেশের প্রখ্যাত জল প্রপাত দেখবোনা তা কি করে হয়।সময় যেতে লাগলো, রাস্তা থেকে ধূলো উড়তে আরম্ভ করে দিল,আমরা নাক চেপেই পথ এগুলাম।

md3
মাঝে মাঝে চায়ের বাগান দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়,আবার পরক্ষনেই রাস্তার ঝাঁকিতে সব গুলিয়ে যায়। এমন করেই পৌঁছে গেলাম মাধবকুন্ডে, বেলা দু’টোয়। পূজোর ছুটি বলেই হয়তো শত শত গাড়ি মাধপকুন্ডের গেইটে, জন-প্রতি ৪০ টাকা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। পর্যটন কর্পোরেশন ইটের রাস্তা বিছিয়ে দিয়েছে সবাই যেন ভালো ভাবে হেঁটে জলপ্রপাত দেখতে পারে। চেয়ে দেখলাম ছেলে বুড়তো আছে,হুইল চেয়ারে করে অনেক অসুস্থ রোগীরও আগমন ঘটেছে। বাবা মায়ের প্রতি সন্তাদের এই ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করে দিল। আমি ক্রমাগত মায়ের ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত, সবাই বাবা-মাকে আনন্দ দিতে পারে না। আমি পেরেছি,এই চান্স মিস করতে চাই না।ছোট ছোট পাথরে ধাক্কা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জল প্রপাতের জল,আর এই অল্প পানিতেই চলছে আনন্দ-আড্ডা আর ফটো তোলা। বেশ অনেক গুলো মাটির জন্তু বানিয়ে রাখা হয়েছে, কোনটা কুমীর আবার কোনটা বাঘ। পর্যটকদের আকর্ষণ করবার জন্য বেশ ভালোই আয়োজন করা হয়েছে এখানে,বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য ইকো পার্ক ভীষন কাজের একটা জায়গা।এখানে ঢুকতে জন প্রতি ১০ টাকা লাগে, মন্দ না –মাটির ঈগল দেখে মুগ্ধ হয়ে বাচ্চারা খেলছে।m4
বেশ কয়েকটা সাইন বোর্ডে বড় বড় করে লেখা আছে-আপনারা ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না, প্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু এখানে সেখানে চিপসের প্যাকেট দেখে আমার মনে হলো-খাওয়া দাওয়াই আমাদের দায়িত্ব,এরপর কারো কোন কিছু করতে নেই। আবর্জনা সঙকুল জল প্রপাত আমার আর ভালো লাগলো না।এমনিতেই ঝরনার নিচে বেড়া দেওয়া মানুষ রূপী বান্দরদের কন্ট্রোল করার জন্য। পানিতে না নামতে পারার যন্ত্রনা নিয়েই আমরা শ্রীমঙ্গল রওনা হলাম।

রাস্তার দু’পাশ থেকে নুয়ে আসা গাছের সারি দেখেই বুঝে ফেললাম লাউয়াছরা পাড় হচ্ছি।এখানকার সব চেয়ে আকর্ষনীয় জায়গা আমার চোখে রেল -স্টেশন,একবার তাকিয়ে থাকলে মনে হবে কোথায় যেন হেঁটে চলে যাচ্ছি ঠিকানাবিহীন। বেশ কয়েকটা বাঁক পড়ে এই রাস্তায় ,খুব সাবধানে পথ চলতে হয় নইলে অপর পাশ থেকে গাড়ি মেড়ে দিতে পারে। সূর্য নুয়ে পড়ছে,তার শিতল আলোয় আলোকিত বনের সবুজ গাছ।দু’ধারে সাজানো জঙ্গল পেছনে ফেলে আমরা ছুটে চললাম শহরের পথে।

কিভাবে যাবেনঃ ঢাকা থেকে সকালে আর রাতে দুটো ট্রেন যায় সিলেট পর্যন্ত, ওটা শ্রীমঙ্গল নামিয়ে দেবে । তাছাড়া সায়দা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস ছাড়ে এক ঘন্টা পর পর, এনা পাবেন মহাখালীতে। ভাড়া ৩৫০-৪০০ টাকার মধ্যে।

কোথায় থাকবেনঃ শ্রীমঙ্গলেই অনেক হোটেল আছে,আগ থেকে বুকিং করে যেতে হবে সিজনে। তাছাড়া আছে চা বাগানের রিসোর্ট ,যদি সরকারি চাকুরে কেউ থাকে তবে তো কথাই নেই; বুকিং দিয়ে দেবে।

মনে রাখবেনঃ  যেখানেই যাবেন আগে থেকে পরিকল্পনা করে বের হবেন।কোথায় যাবেন এবং রাতে কোথায় থাকবেন তা ঠিক করা না থাকলে পুরো ভ্রমণ মাটি।কারন কোথাও ঘুরতে গিয়ে যদি হোটেল খুঁজতে বসেন তাহলেতো সময়টাই শেষ।আর গাইড হিসেবে অবশ্যই পরিচিতের রেফারেন্স নিন,কারন অনেকেই বলবে তারা চিনে ।কিন্তু স্পটে গিয়ে দেখা যায় আপনাকেই গাইডকে গাইড করতে হচ্ছে।আসা –যাওয়ার টিকেট আগেই কেটে রাখুন,নইলে ঘুরতে গিয়ে আমার মতোন বাচ্চাকে নিয়ে স্টেশনে বসে থাকতে হতে পারে।সম্ভব হলে যেখানে যাচ্ছেন সেখান কার স্থানীয় কারো ফোন নম্বর নিয়ে নিতে পারেন,যে কোন তথ্য দিয়ে সে আপনাকে সাহায্য করতে পারবে।

পরিশেষে, আমাদের দেশ শুধু সুন্দর বললে কম বলা হবে।এখানে এমন সব অঞ্চল আছে যা নিয়ে আমরা প্রচণ্ড গর্ব করতে পারি।কিন্তু আমাদেরই অবহেলায় প্রকৃতি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তাদের বাঁচিয়ে রাখা আমাদেরই কর্তব্য। শুভ হোক ঘোরাঘুরি।