ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

খুব বেশি হলে ক্লাশ ত্রিতে পড়ি, সালটা ঠিক মনে পরছে না এ মুহূর্তে। বাবা দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা একদম পছন্দ করতেন না। আর্লি টু বেড, আর্লি টু রাইজ -এই ছিল বাবার মূল মন্ত্র।তখন অবশ্য রাত জেগে ফেইসবুকিং করার পাঁয়তারা ছিল না, আর টেলিভিশন নামক কোন বাক্সের সাথে পরিচয় হয়ে ওঠেনি একদমই ।আমাদের বাড়িতে প্রথম টিভি এসেছিল আমি যখন ক্লাশ ফাইভে পড়ি ।এমন আহামরী এল সি ডি নয় ,চার কোনা একটা ছোট বাক্স যার ভেতর দিয়ে সাদা কালো দুনিয়া দেখা যায় । শৈশবের অনেকটা সময় কেটেছে রাজশাহীর পদ্মা পাড়ে ।ঐ সময় ডিশের চল ছিল না,টিভির গায়ের গোল একটা বাটন ঘোরালেই ভারতের চ্যানেল দেখা যেত ।আমরা খুব মনযোগ দিয়ে বিক্রম-বেতাল দেখতাম। আমাদের সমস্ত আনন্দের ভাগিদার হতেন বাবা ।

তখন শীতকালের রংটাও এমন ছিল না, নভেম্বর পরা মাত্রই কনকনে ঠান্ডা।আমরা তিন ভাই বোন লেপ মুরি দিয়ে পড়তে বসতাম। মা গরম গরম ভাত রান্না করে কেরোসিনের চুলো থেকে নামাতেন ,আর বাবা খাঁটি ঘিয়ে আলু ভর্তা করে তা গোল গোল করে আমাদের মুখে পুড়ে দিতেন ।সবাই মায়ের হাতের লোকমা খাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে থাকে,কিন্তু আমি অপেক্ষা করতাম বাবার জন্য ।রাজশাহীতে প্রবল শীত পড়ে ,সকাল বেলা মাঠের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত একদম দেখা যায় না।কিন্তু বাবা ঠিক ঠিক আমাদের ঘুম থেকে তুলতেন ।সবার শরীরে সরিষার তেল মেখে দিয়ে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতেন চুলোর আগুনের পাশে ।আমাদের গা যেইনা একটু গরম হয়েছে অমনি সবাইকে নিয়ে পুকুরে দিতেন ঝুপ। এই পুকুরটিকে সবাই বড় পুকুর বলেই জানে। সাহেব বাজার মাদ্রাসা পার হলেই এই পুকুর। সব চেয়ে অবাক করা বিষয়; কনকনে সকালে যখন আমরা পা ডোবাতাম পানিতে কীযে ঠাণ্ডা লাগতো, একদম ঠক ঠক করে কাঁপতাম। কিন্তু বাবার জোরাজুরিতে যেই না মাথাটা পানির নীচে দিয়েছি; অনুভব করতাম-আহ,কী নরম গরম। তখন আর আমাদের বাঁধা দিয়ে রাখা যেত না।ঘন্টা খানেক চলতো জলস্নান।

পদ্মা নদীর পাড়ে এমন জনবহুল তখন ছিল না, আমাদের স্কুল ছিল মাত্র কয়েকটা ঘর নিয়ে তাও আবার টিনের। নাম রিভারভিউ স্কুল ,তবে পড়া শোনার মান ছিল বেশ উন্নত। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময়, কেন যে ইচ্ছে করলো নদীতে পা ডুবিয়ে হাঁটতে। আমি আনমনে চলে গেলাম পদ্মার বালুর তীরে। বেলা হলেও শীতের কুয়াশা তখনো সরেনি,দূর থেকে পানির চিকচিক আলো আমার চোখে লাগছিল। আমিও মুগ্ধ নয়নে এগুচ্ছি, হঠাৎ মনে হলো আমার ডান পা’টা কেউ নীচ থেকে টেনে ধরছে ।আমিতো খুব অবাক-বালুর নীচে আবার কে! কিছু সময় পর উপলব্ধি করলাম আমি ক্রমশ বালুর ভেতরে ডুবে যাচ্ছি।এতোক্ষণে বুঝেছি আমি চোরাবালিতে আটকে গেছি।আমার স্কুল ব্যাগ পড়ে গেল দূরে ,আমার কোমর পর্‍্যন্ত তখন বালুতে ঢাকা। আমি চিৎকার করে কান্না করার চেষ্টা করছি, কিন্তু গলা দিয়ে ভয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছে না।আমার চারপাশ জুরে অন্ধকার নেমে আসছে যেন,আমি এদিক ওদিক তাকাচ্ছি যতোদূর চোখ যায়। হঠাৎ দূর থেকে উঁচু লম্বা একজন মানুষকে দৌড়ে এগুতে দেখলাম। আমি জানিনা আমি কোন শব্দ করেছিলাম কীনা ,কিন্তু মানুষটা ক্রমান্যয়ে আমার দিকেই আসছে ।যখন সে খুব কাছে ঠিক আমার হাতের নাগালে ,তখন আমার দু’হাত মুস্টিবদ্ধ তার করোতলে ।আমি সম্বিত ফিরে পেলাম-এই হাত আমার বাবার হাত ।

রাজশাহীতে আমাদের বসবাস বাবার সরকারি চাকরী সূত্রেই ।তিন বছরের জন্য বাবা বিস্ফোরক পরিদর্শক হিসেবে এখানে দায়িত্ব পালন করছেন।রাজশাহীকে এক কথায় আমের দেশ বলা যেতে পারে ।পদ্মার তীরে অবস্থিত প্রায় ৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিভাগীয় শহর রাজশাহী। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এ শহরের উত্থান। আগে এ জেলার সদরদপ্তর ছিল নাটরে। ১৮২৫ সালে সেটি নাটর থেকে রাজশাহীতে স্থানান্তরিত হয়। রেশম উৎপাদন কেন্দ্র এবং পদ্মা নদীর তীরবর্তী শহর হওয়ায় ইংরেজ বণিকদের সহজেই নজর কাড়ে রাজশাহী।শহরের প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলো হলো – সাহেববাজর, রানীবাজার, রেশমপট্টি, ঘোড়ামারা, হাতেমখানা, দরগাপাড়া, কুমারপাড়া, বোয়ালিয়া ইত্যাদি। ১৮৭৬ সালে রাজশাহী পৌরসভা ও ১৯৯১ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয় রাজশাহী শহর।

ছোটবেলার সেই পদ্মা পাড়ের চিত্র এখন বদলে গেছে ।রাজশাহী শহরের পাশে পদ্মার তীরে ইংরেজি ‘টি’ আকৃতির বাঁধ এখন শহরের অন্যতম বেড়ানোর জায়গা। পদ্মার শীতল বাতাসের পরশ নিতে প্রতিদিন বহু মানুষ এখানে জড়ো হন। পদ্মায় এখন পানি এসেছে। এখান থেকে নৌকা ভাড়া করে তাই ঘুরে আসা যায় পদ্মার কোনো চর।

আমার ছেলেবেলার টিনের ঘরের রিভার ভিউ এখন বৃহদাকার বিল্ডিং-এ রূপ নিয়েছে ।বড় অক্ষরে নাম খোদাই করা হয়েছে।পাশের সেই ছোট গাছগুলো বড় হতে হতে নুয়ে এসেছে রাস্তার উপর। স্মৃতির পুকুরে এভাবে সাঁতরে পার হতে ভীষন নস্টালজিক লাগছিল।

সারা জীবন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনে এসেছি।এবারই প্রথম ঘুরে এলাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় ।মুক্তিযুদ্ধের সাবাশ বাংলাদেশ স্মারক ভাস্কর্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার সবুজ চত্বরে মুক্তাঙ্গনের উত্তরপাশে অবস্থিত। রাকসু এবং দেশের ছাত্রজনতার অর্থ সাহায্যে শিল্পী নিতুন কুন্ড এই ভাস্কর্যটি বিনা পারিশ্রমিকে নির্মাণ করেন। ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ উদ্বোধদন করেন। এই স্মৃতিস্তম্ভে আছে দুজন মুক্তিযোদ্ধার মূর্তি। একজন অসম সাহসের প্রতীক, অন্য মুক্তিযোদ্ধার হাত বিজয়ের উল্লসে মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে পতাকার লাল সূর্যের মাঝে।

%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%9f

বিসিক শিল্প নগরীর পাশ দিয়ে যখন হেঁটে যেতাম তখন অনেক সময় উড়তে থাকা রেশম হাতে এসে ধরা দিত ।রাজশাহী শহরের বিসিক শিল্প এলাকায় আছে বেশ কিছু রেশম শিল্প। পোকা থেকে রেশম তৈরির কলাকৌশল দেখা যাবে এখানে। তুলনামুলক কম দামে এখান থেকে রেশমের কাপড়ও কেনা যায়।

শহীদ ক্যাপ্টেন বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর সড়কের দ্বীনেভদ্রা এলাকায় মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি অম্লান স্মৃতিসৌধ। রাজশাহীর কেন্দ্রস্থলে নির্মিত ১৯৯১ সালের ২৬ মার্চ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। স্থপতি রাজিউদ্দিন আহমদ। সৌধে মোট তিনটি স্তম্ভ আছে। প্রতিটির গায়ে ২৪টি করে ধাপ। যেগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত আন্দোলনের ক্রমবিবর্তন ও স্বাধীনতার ফসল। মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের নির্দেশ করা হয়েছে স্তম্ভের গায়ের  ৩০টি ছিদ্রের মাধ্যমে। প্রতিটি স্তম্ভে রয়েছে ১০টি করে ছিদ্র।

বেদিমূলে রাখা আছে নীল শুভ্রপাথরের আচ্ছাদন। যা দুই লাখ নির্যাতিত নারীর বেদনাময় আর্তির কথা ইঙ্গিত করে। সৌধের চূড়ায় রয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্রের লালগোলক। যা স্বাধীনতা যুদ্ধের উদীয়মান লাল সূর্যের প্রতীক।

%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ad

এই শহরে গরম পরে সাংঘাতিক, তবে আজ খুব বাতাস বলে সে রকম গরম লাগছেনা ।রাজশাহী সরকারী কলেজের কাছে দরগা পাড়ায় রয়েছে এ অঞ্চলের দরবেশ পুরুষ শাহ মখদুমের (র) সমাধি। ১২৮৭ সালে তিনি বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আসেন। ১৩১৩ সালে চিরকুমার এ দরবেশ মৃত্যুবরণ করেন। আলীকুলী বেগ ১৬৩৫ সালে তার সমাধির উপরে এক গম্বুজ বিশিষ্ট সৌধ নির্মাণ করেন। প্রতিবছর আরবী মাসের ২৭ রজব এখানে উরস অনুষ্ঠিত হয়। আর ১০ মহররম এখান থেকে বের হয় তাজিয়া মিছিল।

%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%98%e0%a6%b0

আমি বগুড়া হয়ে রাজশাহী গিয়েছিলাম বাসে ।কিন্তু যারা ঢাকা থেকে যাবেন সড়ক, রেল ও আকাশপথে রাজশাহী যাওয়া যায়। ঢাকার কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে গ্রীন লাইন ও দেশ ট্রাভেলসের এসি বাস যায় রাজশাহী। ভাড়া ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকা। ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী যে কোনো বাসে চড়ে পুঠিয়া নামা যায়। রাজশাহী থেকে পুঠিয়ার দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। রাজশাহী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে নাটোরগামী বাসে চড়ে আসতে হবে পুঠিয়া।

এছাড়া ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে শ্যামলি পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ন্যাশনাল ট্রাভেলস, বাবলু এন্টারপ্রাইজ প্রভৃতি পরিবহনের বাস রাজশাহী যায়। ঢাকার কমলাপুর থেকে রোববার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন সিল্কসিটি এক্সপ্রেস। মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ১১টা ১০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পদ্মা এক্সপ্রেস। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউনাইটেড এয়ারের বিমান যায় রাজশাহীতে।

আমি যথারীতি পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেলেই ছিলাম।এখানকার রূম খুব পুরনো বলে বেশ বড় বড় । রাজশাহী ঘুরতে হলে সবাইকে শহরেই থাকতে হবে আর না হলে ক্যাম্পাসে যদি কোন পরিচিত থাকে । এ শহরে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের বেশ কিছু হোটেল আছে। এসব হোটেলে ২শ’ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিভিন্ন মানের রুম পাওয়া যাবে।

সাহেব বাজারে হোটেল মুক্তা ইন্টারন্যাশনাল, বিন্দুরমোড় রেল গেইটে হোটেল ডালাস ইন্টারন্যাশনাল, গণকপাড়ায় হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনাল, মালোপাড়ায় হোটেল সুকর্ণা ইন্টারন্যাশনাল, সাহেব বাজারে হামিদিয়া গ্রান্ড হোটেল, শিরোইলে হকস্‌ ইন, লক্ষীপুর মোড়ে হোটেল গ্যালাক্সি, সাহেব বাজারে হোটেল নিউ টাউন ইন্টারন্যাশনাল এই গুলো খুব পরিচিত নাম ।

রাজশাহী শহরের অন্যতম আকর্ষনীয় বিষয় হচ্ছে -ভাষা।এতো শুদ্ধ প্রতিটি উচ্চারণ ,মনে হয় এই বুঝি কেউ বাংলা ভাষার উপর কোর্স করে এসেছেন। রাজশাহী অঞ্চলে অপরিচিতজনদের সাধারণত মামা বলে সম্বোধন করেন। অনেকেই প্রথমে মামা ডাক শুনে চমকে উঠতে পারেন।তবে পদ্মা পাড়ের সাধাসিধে এই মানুষগুলোর সাথে সময় কাটাতে মন্দ লাগবে না।