ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

ছুটি ছুটি ছুটি .
গরম গরম রুটি;
এক কাপ চা,
সবাই মিলে খা।

খুব জনপ্রিয় স্লোগান ছিল আমাদের যেদিন স্কুল ছুটি হয়ে যাবার ঘোষনা কানে আসতো । সেলুলয়েডের ফিতের মতোন একটা একটা করে আমার চোখের সামনে ভাসতে থাকে দূরন্ত বেলার দিন। এখনকার বাচ্চাদের মতোন ইট-পাথরে শহুরে জীবন আমাদের ছিল না।বাবা সরকারী চাকরী করতেন , বড় হয়েছি সরকারী কলোনীতে। তিন ভাই-বোন ছিলাম পিঠা পিঠি ,বাবা তখনো প্রমশোন পেয়ে বড় অফিসার হননি।আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন নামক কোন যন্ত্র ছিল না।তাই  কার্টূন বা নাটক দেখার জন্য একজনের বাসায়ই পুরো কলোনী ঝাঁপিয়ে পড়তাম। বিরক্ত? নাহ, ওই শব্দটি কা্রো জানা ছিল না। মনে পড়ছে- সুরভী, সূবর্না আর বিন্তি আপু, দীপা আপু্র কথা ,একটা একটা করে মুখ আরো স্পষ্ট হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে ।আমাদের সময় ছেলে বন্ধু বা মেয়ে বন্ধু বলে আলাদা কোন শব্দ ছিল না।কলোনী ভর্তি ছেলেমেয়েরা একসাথেই মাঠে ছুটে যেতাম দাড়িয়াবান্ধা অথবা কানামাছি খেলতে ।কোন ছেলে কোন মেয়ের গায়ে অশ্লীলভাবে হাত দিয়েছে ; এমনটা ছিল স্বপ্নের অতীত । তবে মাগরিবের আজান পড়লে ঠিক ঠিক ঘরে ফিরে বই নিয়ে বসাটা ছিল বাধ্যতামূলক। কেবল ঈদের দিন আর পূজোর দিন ছিল আমাদের পূর্ণ দিবসের স্বাধীনতা ।স্পষ্ট মনে আছে , এক ঈদে সকালে কিছুই খেলাম না।কারন ,একটা আন্টি ছিলেন যিনি খুব মজা করে পুডিং আর কাস্টার্ড করতে পারতেন,আমাদের মায়েরা অতোটা তখনো এ ব্যপারে রপ্ত ছিলেন না।আমরা পাঁচ বন্ধু সেই আন্টির বাসায় নামাজের পর পরই উপস্থিত হলাম, আন্টি বিষয়টা বুঝতে পারলেন ।এরপর থেকে প্রত্যেক বছর আমাদের জন্য স্পেশিয়াল পুডিং থাকতো, এমন আর একটা আন্টি ছিলেন যার হাতের চটপটি না হলে আমাদের ঈদ সম্পূর্ন হতোনা। এভাবে কেটে যেত সকাল থেকে সন্ধ্যা। ঈদের জামা কেউ কাউকে দেখাতাম না -এটা খুব প্রাচীন একটা প্রচলন ছিল।আমাদের মায়েরাও নাকি তার বান্ধবীরা বাড়িতে এলে বালিশের নীচে বা খাটের তলায় নতুন জামা লুকিয়ে রাখতেন।এমন জমকালো মার্কেটতো তখন ছিল না, একই রঙের কাপড় কিনে আম্মা তিন ভাই-বোনকে জামা বানিয়ে দিতেন।মনে আছে আমি কলেজে পড়ার সময়ও মায়ের হাতে শেলাই করা কাপড় পরেছি । কলোনীর টিন এজ ভাই-বোনরা খুব সুন্দর করে সাংস্মৃতিক অনুষ্ঠান করতো ।চুনোপুটি হিসেবে আমাদের মাঝে মধ্যে মাইক্রোফোন দেওয়া হতো ছড়া  বলার জন্য।পুরো কলোনী নেমে আসতো সেই সব অনুষ্ঠান দেখার জন্য।

image

এখনতো দেখি মিউজিক সিস্টেম না হলে কোন অনুষ্ঠানই জমে না। তাও আবার বিজয় দিবসে হিন্দী গান বাজতে শুনি। মৃত্যূদিবসে ঘটা করে গরু জবাই দেওয়া হয়, কোনটাযে বিয়ে বাড়ি আর কোনটা মরা বাড়ি তাই নিয়ে আজকাল বড় বিচলিত থাকি। এখন বাচ্চাদের  জন্য বাহারী পদ সাজানো থাকে টেবিলে,  কিন্তু তাদের দুই হাত ব্যস্ত মোবাইলে অথবা কম্পিউটারে। মুখে তুলে খাওয়ার জন্য বিধাতা আর একটা হাত দিলে বড্ড ভালো হতো। তারা সপ্তাহে একবার তাড়া দেয় -মা , কে এফ সি চলো।ওখানে বাচ্চাদের খেলার জন্য এক ফুটের একটা গেমস জোন আছে,আর আছে কালো রঙের পেপসি।তাদের কাছে পুরো পৃথিবীটা একটা চারকোনা বাক্সের মধ্যে। এদের দোষ দিয়ে লাভ নেই ,নগরের বুক চিড়ে যে বিশাল অট্টালিকা করার নামে আধুনিক বস্তি বানিয়ে চলেছি  আমরা তারই ফার্মজাত উৎপাদন এরা। কেবল ইংলিশ মিডিয়ামে পাঠিয়ে ইংরেজ বানানোর এক অন্ধ প্রতিযোগিতায় নেমেছি। সেখানে কোন মাঠ নেই, নেই স্বয়ংসম্পূর্ণ লাইব্রেরী, নিঃশ্বাস নেবার জন্য নেই একটি বিশাল আকাশ। এক চিলতে ঘরের কোনেই  আটকে গেছে আমাদের বাচ্চাদের শৈশব।