ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

একটি মানবদেহে প্রাণের অস্তিত্ব কয়টি? এর সঠিক উত্তর যদি হয় একটি, তবে মানব দেহে বাস করা কয়েকশ ট্রিলিয়ন অণুজীবকে গণনার বাইরেই রাখতে হবে। সত্যিই তাই। বিজ্ঞানীদের হিসাবে মানবদেহে সর্বমোট মানবকোষের সংখ্যা ৩৭.২ ট্রিলিয়ন আর মানবদেহে বাস করা অণুজীবের সংখ্যা এর চাইতেও ১০ গুন্ বেশি। কিন্তু সংখ্যায় বেশি হলে কি হবে? মানবকোষের তুলনায় ব্যাকটেরিয়ার ক্ষুদ্রাকৃতির কারণে এদের ওজন মানবদেহের শতকরা ১ থেকে ৩ ভাগ মাত্র। বিভিন্ন প্রজাতির অণুজীব বাস করে মানবদেহে, যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক, যার মধ্যে ব্যাকটেরিয়ার প্রাধান্যই সবচেয়ে বেশি।

ডাচ বিজ্ঞানী লিউয়েনহুক এর গবেষণার সূত্র ধরে মানবদেহে এসব অণুজীবের বাস ও এদের বৈচিত্রের কথা অল্পবিস্তর জানা আছে সেই ১৬৮০ সাল থেকেই। কিন্তু গত এক যুগ ধরে ডিএনএ সিকুয়েন্সিং প্রযুক্তির অবিশ্ব্যস্য অগ্রগতির কারনে, অণুজীবরাজ্যের এমন সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে, যা আগে কখনো জানা ছিলোনা। উন্নত প্রযুক্তির ডিএনএ সিকুয়েন্সিং এর মাধ্যমে এখন যেমন মানুষের জিনোম সিকুয়েন্স জানা একদম সহজ হয়ে গেছে, তেমনি জানা যাচ্ছে মানবদেহে বাস করা হাজারো প্রজাতির অণুজীবের জিনোম সিকুয়েন্স, সমষ্টিগতভাবে ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘মাইক্রোবায়োম’।

জানা গেছে মানবদেহে বাস করা ব্যাকটেরিয়ার জিন এর সংখ্যা মানুষের জিন এর চেয়েও ১০০ গুন্ বেশি। ব্যাকটেরিয়ার জিনোম পর্যালোচনা করে বলা যাচ্ছে কার শরীরে কত বিচিত্র রকমের ব্যাকটেরিয়া আছে, তুলনা করা যাচ্ছে প্রতিটি মানুষের অণুজীববৈচিত্র্য। মজার তথ্য হলো, পৃথিবীতে একজন মানুষের জিনোম সিকোয়েন্স যেমন আরেকজন মানুষের থেকে আলাদা, তেমনি একজন মানুষের অণুজীবরাজ্যের গঠন আরেকজন মানুষের চেয়ে একদম আলাদা। একারণেই আজকাল বিজ্ঞানীরা এই অণুজীবরাজ্যের মাইক্রোবায়োমকে নাম দিয়েছে মানুষের দ্বিতীয় জিনোম।

অণুজীব মানেই কিন্তু জীবাণু নয়। জীবাণু হলো শুধুই সেসব অণুজীব যেসব মানব দেহে বা অন্য কোনো প্রাণীদেহে অথবা উদ্ভিদে সংক্রমণ ঘটায় ও রোগের সূচনা করে। সত্যি বলতে, মানবদেহে বাস করা উপকারী অথবা নির্দোষ অণুজীবের সংখ্যার তুলনায় জীবাণুর সংখ্যা খুবই নগন্য। এসব অণুজীব আমাদের শরীরের স্থায়ী অতিথি এবং এদের সাথে আমাদের সম্পর্কটাও শান্তিপূর্ণ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার। একদিকে এরা যেমন আমাদের খাবারে ভাগ বসিয়ে শক্তি সংগ্রহ করে ও নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে, বিনিময়ে এরা আমাদের জটিল খাদ্য হজমে সাহায্য করে এবং আমাদের জন্য ভিটামিন তৈরী করে সরবরাহ করে, যা মানব দেহ নিজে করতে সক্ষম নয়। এছাড়াও এরা আমাদের অন্য জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা কে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়তে শেখায়।

এসব অণুজীবের বাস মূলত: মানবদেহের বাহ্যিক আবরণে, অথবা সেসব অঙ্গে, বাইরের পরিবেশের সঙ্গে যার রয়েছে নিত্যনৈমিত্যিক যোগাযোগ বা আদান প্রদান, যেমন পরিপাকতন্ত্র, মুখগহ্বর, ত্বক অথবা যোনি। এক একটি অঙ্গে, নিদৃস্ট প্রজাতির অণুজীবেরা খাপ খাইয়ে নেয় সে অঙ্গের নির্ধারিত পরিবেশে, এবং গড়ে তোলে সে অঙ্গের একান্তই নিজস্ব অণুজীবরাজ্য। কাজেই বিভিন্ন অঙ্গে বাস করা অণুজীবরাজ্যের গঠনও ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির। মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে অণুজীবের ঘনত্ব ও বৈচিত্রের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বৃহদন্ত্রে, তাই এদের নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ ও গবেষণাও অনেক বেশি। জেনে রাখা ভালো যে সুস্থদেহে, মানুষের রক্তপ্রবাহ অথবা শরীরের অভ্যন্তরীণ সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মূলত: অণুজীববিহীনই থাকে এবং এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংক্রমিত হলে এমনকি উপকারী অণুজীবও মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

শিশু যখন মাতৃগর্ভে থাকে, জীবাণুবিহীন পরিবেশেই থাকে বলে ধরে নেওয়া হয়, এবং মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে, মায়ের সাথে শিশুর অণুজীব বিনিময়ের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমান নেই। কাজেই, জন্মের সময়ই নবজাতক শিশু প্রথম সংস্পর্শে আসে মায়ের যোনিতে, ত্বকে অথবা পরিপাকতন্ত্রে বাস করা অণুজীবদের। ধারণা করা হয় যে, এর প্রস্তুতি হিসেবে, গর্ভকালীন সময়ে মায়ের যোনি ও পরিপাকতন্ত্রের অণুজীবরাজ্যের গঠন ও বৈচিত্রে অনেক পরিবর্তন আসে, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের উপযোগী। শিশুর জন্মের পরও মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে মায়ের সাথে নবজাতক শিশুর অণুজীব-বিনিময় ঘটে। এভাবে, একের পর এক খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে শিশুদেহের অণুজীববৈচিত্র্য সহজ থেকে জটিলতর হতে থাকে, এবং তিন বছর বয়সে তা পরিণত অণুজীবরাজ্যের আকার ধারণ করে বলে গবেষণায় প্রকাশ। সাধারণভাবে অণুজীবরাজ্যের গঠন ও বৈচিত্র্য বেশ স্থায়ী, যদিও তা খাদ্যাভ্যাস, ঔষধ, রোগব্যাধিসহ আরো অনেক কারণে প্রভাবিত হতে পারে।

মানবদেহের অণুজীবরাজ্য অথবা ‘মাইক্রোবায়োম’ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও বিস্ময়কর দিকটি হলো এর সাথে বিভিন্ন জটিল রোগব্যাধির সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যা এতদিন এবিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবনারও অতীত ছিল। যদিও পরিপাকতন্ত্রীয় কিছু রোগ, যেমন দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, ‘ইরিট্যাবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস)’ বা ‘ইরিট্যাবল বাওয়েল ডিজিজ (আইবিডি) এর মতো কিছু রোগের সাথে, বৃহদন্ত্রে স্থায়ীভাবে বাস করা অণুজীবের ভারসাম্যের বিচ্যুতি যে দায়ী সে কথা জানা আছে অনেকদিন ধরেই।

অনেকসময় এন্টিবায়োটিক সেবনের পার্শপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বৃহদন্ত্রের অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া মরে যায়, যাতে ‘সি ডিফিসিল’ নামে এক ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি ঘটে, যা দীর্ঘকাল স্থায়ী ডায়রিয়া রোগের কারণ ঘটায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এধরণের ডায়রিয়া এন্টিবায়োটিক দিয়ে আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়না, তাই এর চিকিৎসা করা ভীষণ কঠিন হয়ে যায়। সাম্প্রতিককালে, এর এক অদ্ভুত সমাধান আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। আর তা হলো, এসব রোগীর বৃহদন্ত্রে সুস্থ মানুষের মল-প্রতিস্থাপন করা। উদ্দেশ্য হলো সুস্থ মানুষের মলে থাকা অণুজীব দিয়ে রোগীর বৃহদন্ত্রের হারানো অণুজীব-বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা। অবিশ্ব্যাস্য হলেও সত্যি, এ চিকিৎসার ব্যববহারে এপর্যন্ত শতকরা ৯০ ভাগ সাফল্য পাওয়া গেছে। মল-প্রতিস্থাপন করে একই ধরণের সাফল্য আন্ত্রিক প্রদাহজনিত রোগ, আইবিডির ক্ষেত্রেও পাওয়া গেছে।

বৃহদন্ত্রে বাস করা অণুজীবের ভারসাম্যহীনতা শুধু পেটের পীড়া নয় শরীরের অন্যান্য অংশকেও প্রভাবিত করে, যেসব অংশে স্বাভাবিকভাবে অণুজীবদের অনুপ্রবেশ করার কোনো সুযোগ নেই। ইঁদুর ও মানুষের উপর পরীক্ষা করে এবিষয়ে অনেক নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে। বৃহদন্ত্রের ভেতরের দেয়ালে স্থায়ীভাবে বাস করা অণুজীব আমাদের খাদ্যের উপাদানগুলোকে ভেঙে নানা ধরণের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে যা মানবদেহে ঘটা নানাপ্রকার রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটায়। আবার এসব অণুজীব সর্বোক্ষনিকই বৃহদন্ত্রের মানবকোষের সাথে মিথষ্ক্রিয়ারত, যা আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, মেটাবলিজম ও স্নায়ুবিক প্রক্রিয়া কে প্রভাবিত করে। কাজেই বৃহদন্ত্রে স্বাভাবিক অণুজীব বৈচিত্রে ব্যাতিক্রম ঘটলে তা স্থূলতা, ডায়বেটিস, এজমা, এলার্জি, ক্যান্সার, এমনকি মানসিক ও স্নায়ুতাত্ত্বিক রোগেরও কারণ হয়।

অণুজীবরাজ্যের ভারসাম্যহীনতার সাথে সম্পর্কিত এসব রোগের উপশমের উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞদের উপদেশ হলো, মানবদেহে, বিশেষত বৃহদন্ত্রে অণুজীবদের সুস্থ্ ও স্বাভাবিক বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা। যদিও বৃহদন্ত্রে সুস্থ্ মানুষের মল-প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসা এখনো সহজলভ্য নয় এর বিকল্প হিসেবে রয়েছে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। গবেষণায় দেখা গেছে যেসব ব্যাক্তি উচ্চ ক্যালোরি সম্পন্ন শর্করা ও চর্বিযুক্ত খাবারের উপর নির্ভরশীল, তাদের তুলনায় শাকসবজি ও আঁশযুক্ত ফলমূল-নির্ভর ব্যক্তিদের বৃহদন্ত্রে অণুজীববৈচিত্র্য বেশি এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যাও অনেক বেশী। এছাড়াও রয়েছে উপকারী ব্যাকটেরিয়া সমৃদ্ধ খাবার দই বা উপকারী ব্যাক্টেরিয়ার সমন্বয়ে তৈরী ‘প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট’, যা আজকাল বাণিজ্যিকভাবে খুব সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। প্রোবায়োটিকে যত বেশি ব্যাকটেরিয়া, আর যত বেশি তার প্রজাতি, তত বেশি তার গুন। আজকাল প্রোবায়োটিক ব্যবহারে পেটের পীড়া, ডায়বেটিস এমনকি বিষন্নতাসহ অনেক রোগের উপশমের নতুন নতুন তথ্য আসছে গবেষণাগার থেকে, তাই এর জনপ্রিয়িতাও বাড়ছে দিন দিন।

যদিও এসবের সবকিছুই বিতর্কের উর্দ্ধে নয়, সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে, মানবদেহের অণুজীবরাজ্যের ভূমিকার পক্ষে প্রমানের পাল্লা দিন দিন ভারীই হচ্ছে। এছাড়াও বর্তমানে মাইক্রোবায়োম নিয়ে গবেষণা যে রকেট গতিতে এগুচ্ছে, তাতে রহস্যময় এ রাজ্যের চমকপ্রদ সব উন্মোচিত তথ্য, মানব দেহের আরো অনেক রোগ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা যে পাল্টে দেবে তা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।