ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

ছোট বেলায় সাধারণ বিজ্ঞান বইতে পড়েছিলাম, কর্পূর একটি উদ্বায়ী পদার্থ। কিন্তু তরল যে উদ্বায়ীতে পরিণত হতে পারে তা তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝি। ধরুন, আপনি সাজুগুজু করে মাখোমাখো অবস্থা। এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তো ওর দৃষ্টি হামলে পড়ে আপনার উপরে। কঠিন অবস্থা। এর মাঝে দেখা গেল হুট করে বৃষ্টি আপুনি এসে বাগড়া দিল। এক্কেরে থৈ থৈ অবস্থা। একটি বিশেষ জলযানে ভরসা ছাড়া আপনার আর কোন উপায় নাই। না হয় আস্তে ধীরে আসেন, তিনদিন দেরি হলি পরে আপনার বেতন কর্তন করবে। তিনদিন দেরি করা অত সোজা না! আর যদি লেটের তেলেসমাতিতে না যেতে চান তাহলে সাথে লুঙ্গি ফুঙ্গি কিছু একটা নিয়ে আসেন। কারণ পানি একটি উদ্বায়ী পদার্থ যাহা সূর্যের আলোতে বিকিরিত হয়ে আসমানে উড়াল দিব। অতএব আপনি ঠিক সময়ে আফিসে পৌঁছাতে চাইলে লুঙ্গিতে টাইট করে মালকোচা দিয়ে পানি ভাঙ্গতে হবে। যেহেতু পানি উদ্বায়ী পদার্থ এমনিতেই চলে যাবে সেহেতু সুয়ারেজ, নালা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত।

আমাদের কলিগ ফাহিম সাহেবের পরম সৌভাগ্য বলা চলে। কোমর পানিকে তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে লুঙ্গি পরে অফিসে হাজির। শুধু সামান্য একটু দেরি হয়েছে। বেশি না মাত্র আড়াই ঘন্টা!

গতকাল বারোটায় অফিস থেকে বের হই, সাপ্লায়ার ভিজিটে। সাড়ে চারটায় বিনা নোটিশে বৃষ্টি এসে হাজির। নবাবপুর টাওয়ারের সামনে মোটামুটি সাগর মহাসাগরের হাতছানি। লোকজন ব্যাপক বিনোদনে আছে। মাত্র আধা ঘন্টার বৃষ্টিতে তাদের সাগর না হলেও নদী দেখার সৌভাগ্যে হয়েছে। আসল বিনোদন তো এখনো শুরুই হয় নি।

সবই ঠিক ছিল, শুধু লোকজন নড়তে না পেরে হ্যাপায় পড়ে গেল। চারিদিকে থৈ থৈ পানি তার মাঝে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। এর নাম নাকি জ্যাম না চরম জ্যাম। চিন্তা করে দেখলাম ব্যাপার না, রাস্তা আরো বাকী আছে। এইটা জলাবদ্ধ তো কি হয়েছে আরো রাস্তা আছে না। বিধি বাম, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে আশপাশের রাস্তা দেখে ব্যর্থ মনোরথের ফিরে আসতে হল। উপান্তর না দেখে গলা ছেড়ে রিকশা, ভ্যান যা চোখে পড়ছে তাকেই হাঁকছি ‘মামা পানি পার’। আজকের জন্য মামারা আর ভাগনেদের দিকে তাকানোর ফুসরত পেলো না। অতি উৎসাহী দু’একজন ফাল মেরে ভ্যানে উঠতে গিয়ে যা হয়েছে তার নাম প্রপাতধরনীতল। পানিটা বড্ড বেরসিক কোমরের ঠিক নিচ পর্যন্ত উঠে গেল। রাস্তায় নামার আশা জলাঞ্জলি দিতে হল। কয়েক জনের আবার খারাপ লাগতেছিল, লোকজন এভাবে বিনোদনহীন দাঁড়িয়ে আছে! তারা বিনোদিত করার আশায় প্যান্টের যতটুকুন গোটানো যায় ততটুকু গুটিয়ে যুদ্ধে নেমে গেল। রীতিমত অন্ধ মাইর টাইপের হাত পা সামনে নিচ্ছে আর এদিক সেদিক হাড়তে বেড়াচ্ছে কোথাও কোন গর্ত নেই তো! হায়! সেলুকাস, এরা ভুলে গ্যাছে ড্রেন কেটে যে বঙ্গোপসাগরে নিয়ে যাবার মহাপরিকল্পনা চলতেছে তাহার কর্মযজ্ঞ শেষ হইয়াও হইল না শেষ। অতএব, দর্শক বিনোদিত হইল তাহাদের জলের ঘূর্ণির মাঝে হারাইয়া যাইতে। নাকানিচুবানি খাইয়া অতঃপর তাহারা স্বীকার করিল যে তাহারা কিন্তু ব্যথা পায় নাই।

হুড়মুড় করে এবি ব্যাংক থেকে ছয়-সাত জন নেমে এসে হোম্বিতোম্বি শুরু করল। এই রিকশা, এই খালি টাইপ বলে হাঁকডাক দিচ্ছিল। তাহারা শীঘ্রই তাহাদের ভুল বুঝিতে পারিল। আজ অন্য আর দশটা দিনের মত ভ্যানওয়ালা, রিকশাওয়ালাদের বিচার করলে হবে না। আজকে তাদের ঈদের আমেজ। মনের মত দাম হাঁকানোর তো দিন আজই। এবি ব্যাংকারদের কন্ঠ মোলায়েম হয়ে আসল। এই যে ভাই, রিকশাওয়ালা ভাই, ভ্যানওয়ালা ভাই, বলে কন্ঠে মধু বর্ষণ হতে লাগল। আহ! নারী বড়ই সম্মোহন শক্তিধারী। এক ভ্যানওয়ালাকে রাজী করিয়ে ফেলল। মোটামুটি আমাদের কাছাকাছি আসতে ভ্যানওয়ালার ছ্যাড়াব্যাড়া অবস্থা। আমি অনাহূত কিন্তু নির্লজ্জের মত সবার আগে আমি ভ্যানে বসে গেলাম। এক ভদ্রলোক প্রতিবাদ করল, আমরা সবাই একসাথের, আপনি এখানে বসতে পারেন না। এখানে মেয়েছেলে আছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে হাই তুললাম, মনে হয় এখানে ঘুমানোর জন্য উঠছি এমন একটা ভাব নিলাম। ভদ্রলোক তার প্রবল আপত্তি আরো জোরালো করল। কিন্তু আমি নির্বিকার! নির্লিপ্তভাবে পা দোলানের মতলব যখন আঁটছি তখন মনে হল আরে নিচে তো পানি। আমি স্পষ্ট করে বলে দিলাম, কোন দিগধারি করে লাভ নাই, আমি নামছি না, আপনাদের সাথেই যাচ্ছি। মিনমিন করে কি যেন বলল। অবশেষে আমাদের ত্রিচক্রযান গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করল। ‘বিসমিল্লাহে মাজরেহা ওয়া মুরছেয়া ইন্না রাব্বি লা গাফুরুর রহিম’ বলে রওয়ানা দিলাম। কোন রকম অনিষ্ট সাধন ছাড়াই নিরাপদে ল্যান্ড করলাম। যাক অবশেষে দুইশত মিটার পথ অতিক্রম করে ডাঙ্গায় অবতরন করলাম। দুইশত মিটার পথ কিন্তু কম না। আপনি মনে করেন হেঁটে নূন্যতম এক মিনিট তো লাগবেই!

কষ্টেশিষ্টে গুলিস্তান পর্যন্ত হেঁটে আসলাম। কিন্তু হায়! এখানে তো পৃথিবী থমকে আছে। কী গাড়ি, কী রিকশা, কী ভ্যান, কী মানুষ, সব থমকে আছে। তখন মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, আমাকে হাঁটতে হবে। কোন রকমে পরনের শোয়ের উপর দিয়ে যাচ্ছে। এবার আর শোও রক্ষা করতে পারল না। রাস্তায় পানি তারও উপরে। এক পুলিশ ভাইর দয়া হল। রিকশা, ভ্যান একটা কিছু ঠিক করে দিবেন বলে একে ওকে আটকাচ্ছিলেন। লাভ হল না। চোখ মুখ খিঁচে একজনকে গালিও দিলেন। তার গালি শুনে পিছনে কেউ একজন অট্রহাসি দিলেন। আমি চমকে উঠলাম। এতো দেখি পুলিশ, মেয়ে পুলিশ। এ মেয়ের মুখে মিনমিনে হাসি মানাত না। এর জন্য অট্রহাসি হচ্ছে একেবারে সোনায় সোহাগা। স্নিগ্ধ পেলবতার মাঝে এরকম অট্রহাসি খারাপ না। এরকম হাসির মাঝে ও স্নিগ্ধতা মাখানো থাকে। জীবনে এরকম হাসির জন্যও কেউ কেউ মরতে পারে!

মোজা খুলে সু’র মাঝে চালান করলাম। ফকিরাপুল, রাজারবাগ হয়ে খিলগাও রেললাইন পর্যন্ত সোজা হেঁটে চলে আসলাম। লোকজন সার্কাসের বিনোদন পাচ্ছে। দুই হাতে সু, প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গোটানো, শার্ট ইন করা আবার চোখে চশমাও আছে। এরকম একটা ছেলে লোকজনের সামনে দিয়ে পানি ভেঙ্গে এগুচ্ছে। ব্যাপক বিনোদন। পায়ের তলার পাথরকণায় পা কেটে গেল না ছড়ে গেল তা দেখার সময় ছিল না। রেলগেট এসে সিএনজি পাওয়া গেল। কোন রকমে দক্ষিণ বনশ্রী পৌঁছে গেলাম রাত সাড়ে আটটায়। যাক, অবশেষে তো বাসায় আসা গেল। এই বা কম কিসে। শুধু সামান্য একটু টেকনিক্যাল সমস্যা হয়েছে। পায়ে জুতা পরতে পারি নাই বলে আজ অফিস কামাই করতে হয়েছে। বাসায় ঘুমানো কিন্তু খারাপ না।

রুবু মুন্নাফ

০২-০৮-২০১৭
দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা।