ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 
clam-national-flag

জাতীয় পতাকার ব্যবহার দেখুন। আমরা কতটা পতাকা অবমাননা করতে পারি তার প্রমাণ মিডিয়া পাড়া থেকে শুরু করে পথে ঘাটে ঘরে। আজ প্রশ্ন একটাই স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে শিখেছি কি জাতীয় পতাকার ব্যবহার? তবুও বড় বড় কথা, হালের ফ্যাশন দেশ প্রেমিক আমরা।

যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আচ্ছা বলুন তো, আমাদের জাতীয় গাছ কোনটি? আর জাতীয় ফুল কোনটি। চেষ্টা করুন, মন্তব্যে জবাব দিন, অন্তত খুঁজে বের করুন। দেশকে ভালোবাসি বলে কথা। মাঝেেমাঝে এমন এলোমেলো প্রশ্নগুলোই কষ্ট দেয়। ভালোবাসার প্রেয়সী বিচ্ছেদ হলে তেমন ব্যথা অনুভব করি না যতোটা এই এলোমেলা প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে না পাওয়ায় যন্ত্রণা।

বিজয়ের মাসে টিভি চ্যানেলে গানের অনুষ্ঠানের মঞ্চ তৈরী করা হয় জাতীয় পতাকা দিয়ে। কত সাজসজ্জা, একেকজন শিল্পী গান পরিবেশনে পদপিষ্ট করে চলে স্বাধীনতা। মোবাইল কোম্পানি রবির মাধ্যমে লাখো মানুষের দ্বারা পতাকা উত্তোলন করা হয়, গ্রিনিজ বুকে বাংলাদেশের নাম লেখা হয়, কিন্তু তার পরবর্তী অবস্থা কেউ কি দেখেনি, স্বাধীন দেশের পতাকা পায়ের নিচে।

বিজয়ের আনন্দে ঘরের পোষা কুকুর বিড়ালের গায়েও জড়ানো হয় জাতীয় পতাকা! অশালীনভাবে শরীরে জড়ানো হয়। এরই নাম কি দেশ প্রেম। ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই বীরাঙ্গনা কি এজন্যই জীবনের সবটুকু উজাড় করে ছিল?

আসলে আমরা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার নিয়ম সম্পর্কে অবহিত নয়। যে যেভাবে পারছে উড়িয়ে যাচ্ছি জাতীয় পতাকা। ২০১০ সালের জাতীয় পতাকা উত্তোলন নীতিমালা অনুযায়ী, জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হলে বিভিন্ন নৌযান, মোটরযান ব্যতীত সন্ধ্যার পূর্বেই নামানোর বিধি রয়েছে। তাছাড়া জাতীয় পতাকা সর্বদা (কোন বিশেষ দিবস ব্যতীত) সবার উপরে, সোজা দন্ডে, মুক্তভাবে উড়াতে হয়। গাড়ি বা নৌযানের খোলা অংশ ঢাকার জন্য জাতীয় পতাকা ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ। এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও নামানোর ক্ষেত্রে সব সময় সম্মানের সহিত উঠাতে কথাও বর্ণিত রয়েছে ।

নীতিমালাতে এসব বিধি ছাড়াও পতাকার মাপের কথাও উল্লেখ করা আছে। আর এই নীতিমালা কেউ অবমাননা করলে ৫,০০০ টাকা জরিমানাসহ দন্ডবিধির কথাও রয়েছে। আইন থাকা স্বত্তেও যত্রতত্র পতাকার ব্যাবহার এবং উত্তোলন করার পর না নামানোর দৃশ্যপট ছিল চোখে পড়ার মত।

নীতিমালা অনুসারে পতাকার মাপ ১০:৬। তাছাড়া ভবনে ব্যবহারের জন্য পতাকার মাপ ১০:৬, ৫:৩, ২.৫ ও ১.৫ এবং মোটর গাড়িতে ব্যবহারের জন্য ১৫ ইঞ্চি: ৯ ইঞ্চি ও ১০ ইঞ্চি: ৬ ইঞ্চি -এর কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে নগরীতে বিক্রি হওয়া পতাকাগুলোর মাপও ঠিক নেই। সরেজমিনে পতাকা বিক্রেতাকে পতাকার মাপ সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন, তাদের জানা নেই। যারা এগুলো তৈরী করেন তারা বলতে পারবেন। অন্যদিকে যারা এ পতাকা তৈরীর কাজের সাথে যুক্ত আছেন, তারাও ঠিক মাপটি বলতে পারেন না।

জাতীয় পতাকা তৈরীর ক্ষেত্রে পতাকায় সবুজের অধিক্যতার মাঝে বাম দিক হতে ১০:৬ অনুসারে দৈর্ঘ্য ১০ এর মধ্যে ৪.৫/৫.৫ ও প্রস্থে ৬ এর মধ্যে ৩/৩ এর ছেদ বিন্দুতে লাল বৃত্তের কেন্দ্র থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে বিক্রি হওয়া পতাকাতে সেটি না থাকায় নানাভাবে জাতীয় পতাকার অবমাননা করা হচ্ছে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।

জাতীয় পতাকা’র প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই ‘জাতীয় পতাকা’কে অবমাননা করছেন কেউ কেউ। এতে করে ভঙ্গ হচ্ছে জাতীয় পতাকার প্রচলিত আইন। এমনকি পতাকা তৈরীতেও মানা হচ্ছেনা নিয়োম কানুন।জাতীয় পতাকার জন্যে প্রণীত আইনে বলা আছে, জাতীয় পতাকা উড়ানো যাবে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এছাড়া সরকার কর্তৃক অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণই শুধুমাত্র রাত্রিকালীন সময়ে জাতীয় পতাকা উড়ানোর ক্ষমতা রাখেন।

আইনে আরোও বলা আছে, জাতীয় পতাকার প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এবং গাড়িতে পতাকা লাগানো যাবে শুধুমাত্র চেসিস বা রেডিয়েটর ক্যাপের সাথে। গাড়ি বা যানবাহনের সামনের দিক বা পেছনের দিকে এদের গায়ের সাথে সেঁটে দিয়ে জাতীয় পতাকা লাগানোটাও হলো আইনের পরিপন্থী। পাশাপাশি আইনে এও বলা আছে, জাতীয় পতাকাকে কখনোই কোন বস্তুর সাথে আটকে রাখা যাবেনা, পতাকা থাকবে সবসময় শূণ্যে-মুক্ত অবস্থায় এবং এটি কোন অবস্থাতেই মাটি স্পর্শ করবে না। পতাকার গায়ে লিখার ব্যাপারটিও আইনের পরিপন্থী। ২০ জুলাই ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে একটি বিল পাশ হয় যার দ্বারা এই আইনে শাস্তির বিধান সংযোজন করা হয়। পাশ হওয়া সেই বিলে আইন অমান্যকারীদের জন্যে ১ বছরের কারাদন্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তির বিধান রাখা হয়।

অতীত কথাগুলো বারংবার আঘাত করে চলে, কেন ধিক্কার দেয় প্রতিধবনিত শব্দ, স্বাধীনতা আজ তুমি কোথায়? উষ্ণরক্তের ঘ্রাণ আজও কথা বলে, প্রতিবাদী সুর তোলে, আজও হুংকার দিয়ে বলে, সবুজ প্রকৃতি ও তারুণ্যের বেঁচে থাকা, উদীয়মান সূর্যটা আজ কোথায় ?

সবুজের মাঝে সাদা কালোর ধুলো, লাল বৃত্তের মাঝে পশুত্বের মুখোচ্ছবি, একি কথা? স্বাধীনতা তুমি কি বেঁচে আছো? তুমি দেখছো, অনুভব করছো, তোমার সন্তানের ভালবাসা! আজ চলে বলী দিয়ে হলি খেলা। পশুত্বের ভালবাসা, সন্তানেরা ভুলে গেছে, সার্জারী করা সন্তান কতটা মাতৃত্ব অনুভব করতে পারে? আজ বুঝে গেছি, স্বাধীনতা মরে গেছে, বিধবার সাদা শাড়ী হয়ে গেছে রঙীন, স্বাধীনতা মরে গেছে।

স্বাধীনতা তোমায় প্রশ্ন করি।।
স্বাধীনতা তুমি কোথায়?
কোথায় তোমার শহীদ-বীরাঙ্গনা
কোথায় তোমার বুদ্ধিজীবি সেনা
কোথায় তোমার প্রতিশ্রুতির জনতা
লাল সবুজের পতাকা।
স্বাধীনতা তোমায় প্রশ্ন করি।।
স্বাধীনতা তুমি কোথায়?
কোথায় তোমার জয় বাঙলা, বাঙলা জয়ের ধ্বনি

ফেসবুকে জাতীয় পতাকা ব্যবহারকারীদের বলতে চাই, দেশকে ভালবাসুন, দেশের মানুষকে ভালবাসুন; আবেগ কখনোই ভালোবাসা বহন করে না। বিজয় মাসে ফেসবুকে বানভাসির মতো ভাসছে দেশপ্রেম আজকাল। আসলে আমরা ফেসবুকে লোক দেখানো নাকি দেশকে ভালবাসি? প্রকৃত কথা হলো প্রকৃতপক্ষে আমরা কেউ দেশকে ভালবাসি না বলেই দেশের জাতীয় পতাকাকে অবমাননা করি অতি সামান্য আবেগে। একের পর এক, দিনের পর দিন।

দেশকে ভালবাসা মানে এই নয় যে জাতীয় পতাকাকে জলছবির রূপে এনে নিজের ছবি যুক্ত করে প্রদর্শন করা। দেশকে যদি ভালোবেসে থাকেন দেশের জাতীয় পতাকার ব্যবহার করার প্রয়োজন মনে করেন তাহলে একটি জাতীয় পতাকার পূর্ণ ছবি যুক্ত করুন আপনার ফেসবুক প্রোফাইলে। জলছবি কখনোই আমাদের স্বাধীনতার কথা বলে না। লাল সবুজের মাঝে আর অন্য কিছু যুক্ত হলে সেটা আর লাল সবুজ থাকে না। জাতীয় পতাকার মান বেঁচে থাকে না, মরে যায় স্বাধীনতা।

সবুজ রং বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতি ও তারুণ্যের প্রতীক, বৃত্তের লাল রং উদীয়মান সূর্য, স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারীদের রক্তের প্রতীক। ১৯৭২ সালের ১৭ই জানুয়ারী আমাদের জাতীয় পতাকা সরকারীভাবে গৃহীত হয়।

আসুন আমরা যেন আর কেউ আমাদের জাতীয় পতাকার রঙ খর্ব না করি। ত্রিশলক্ষ শহীদ ভাই-বোনদের অবমানা না করি।