ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

শেয়ার বাজারে নিবন্ধিত নয় এমন যে কোন কোম্পানিকে বছর শেষে আয়-ব্যয়ের হিসেব করে লাভের উপর ৩৫% হারে আয় কর দিতে হয়। ঐ ব্যাবসায়ের কর্পোরেট ক্রেতারা ক্রয়কৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধের সময়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৫% হারে অগ্রীম আয়কর (যাকে ‘উৎসে কর কর্তন’ বলা হয়) হিসেবে কেটে রেখে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে দেয়। বছর শেষে কোম্পানি মোট আয়কর হিসেব করে তা থেকে ক্রেতারা যে কর কেটে রেখেছে তা বাদ দিয়ে বাকীটা সরকারের কাছে জমা দেয়। আয়কর সব সময়েই লাভের উপর আরোপ করা হয়; লাভ না হলে কর দিতে হয় না। তৈরী পোশাক রফতানীকারকদের ক্ষেত্রে ব্যাপার একেবারেই ভিন্ন। তাদের উৎসে কর কর্তনের হার এবারের বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছিল ১.৫% বর্তমান অর্থ বছরে যা ০.৬% রয়েছে। রাজস্ব বোর্ড থেকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করে বিভিন্ন পত্রিকা জানিয়েছিল যে ১.৫% টিকবে না। এই হার কমিয়ে ০.৮% করা হবে। বাজেটের উপর সমাপনী বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এই হার আরও নামিয়ে ০.৭% করেছেন। অন্যান্য রফতানিকারকদের জন্য উৎসে কর কর্তনের হার নির্ধারন হল ০.৭%। তৈরি পোশাক রফতানীকারকদের বার্ষিক আয়করের হার বর্তমানে অন্যান্য ব্যাবসায়ের মত ৩৫% যা এবারের বাজেটে ২০% করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

দেশের ভেতরে যারা পণ্য উৎপাদন এবং সরবরাহ করেন তাদের উৎসে কর ৫%;  রফতানীকারকদের জন্য ০.৭%। দেশের ভেতরে যারা পণ্য উৎপাদন এবং সরবরাহ করেন তাদের এবং অন্যন্য পণ্যের রফতানীকারকদের আয়কর ৩৫% আর তৈরী পোশাক রফতানীকারকদের জন্য ২০% – এ কোন বিচার? তৈরী পোশাক রফতানীকারকেরা ৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান করছেন, দেশের জন্য বছরে ২৫ বিলিয়ন ডলার আয় করছেন – এ কথা ঠিক। তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে; তাও মানি। অন্যান্য রফতানীকারকেরা কি সমান পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন না? অন্যান্য রফতানীকারকদের সঙ্গে কর হারের পার্থক্য থাকবে কেন? যারা পণ্য উৎপাদন করে দেশের অভ্যন্তরে বিক্রয় করেন তারা কি তৈরী পোশাক রফতানীকারকদের থেকে কম লোকের কর্মসংস্থান করছেন? তারা কি জাতীয় আয়ে  কম ভূমিকা রাখছেন? রফতানীকারকদের উৎস কর কেন দেশে বিক্রিত পণ্যের উৎপাদকের তুলনায় কম হবে? তৈরী পোশাক শিল্পের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কেন অন্যদের থেকে কম কর দেবে? এসব প্রশ্নের জবাব নেই।

বিগত শতাব্দীর ৮০’র দশক থেকে এদেশে তৈরী পোশাক রফতানী শুরু হয়। তখন থেকে এদের জন্য রাষ্ট্র কম কিছু করে নাই। ইপিজেড থেকে শুরু করে আইনি সুবিধা, কর সুবিধা, জমি সুবিধা, বিদেশীদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় চুক্তি সুবিধা থেকে রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তা (ক্যাশ ইনসেন্টিভ) পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। তৈরী পোশাক রফতানীকারকেরা ৯০’র দশকে রফতানী মূল্যের ২৫% পর্যন্ত নগদ সুবিধা পেয়েছেন। এখনো কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা নগদ সুবিধা পাচ্ছেন। এই নগদ সুবিধা নিয়ে কি ব্যাপক পরিমাণ দূর্ণীতি তারা করেছেন তার কিছু উদাহরণ শুনেছি সহকর্মী এবং বন্ধুদের কাছ থেকে যারা বিভিন্ন ব্যাংকে গিয়ে এই ক্যাশ ইনসেন্টিভের অডিট করেছেন এবং যারা বিভিন্ন গার্মেণ্টস কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। এমন উদাহরণও শুনেছি যে গার্মেণ্টস মালিকেরা খালি কন্টেইনার রফতানি করে ২৫% নগদ সুবিধা নিয়েছে রাষ্ট্রের কাছ থেকে। পানামা লিকসে যে ৫৬ জনের নাম পাওয়া গেছে এবং জিএফআই টাকা পাচারের যেসব উপায়ের কথা বলেছে তাতে ব্যাবসা-বাণিজ্যের খোঁজ-খবর যারা রাখেন তাদের সকলেই ধারণা করেন, দেশ থেকে গত দশ বছরে অবৈধ উপায়ে যে ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে তার প্রায় পুরোটাই করেছে এই গার্মেণ্টস মালিকেরা।

টাকা পাচার করার জন্য তাদের রয়েছে বেশ সহজ পদ্ধতি। হংকং, সিঙ্গাপুর, লন্ডন বা অন্য কোন ‘কর স্বর্গে’ একটা বিদেশী নামে অফিস খোলার সামর্থ্য থাকলেই যথেষ্ট। তৈরী পোশাকের ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান ক্রেতা ঐ কর স্বর্গে অবস্থিত অফিসের নামে পণ্য পাঠানোর জন্য এলসি খোলে। ধরা যাক এই এলসির মূল্য ১০০ ডলার এবং সামান্য লাভসহ পণ্য উৎপাদনের মূল খরচ (আমদানি করা কাপড়, এক্সেসরিস, শ্রমিকের মজুরি, অফিস খরচ, ইত্যাদি) ৮০ ডলার। কর স্বর্গে অবস্থিত অফিস তখন ঐ ১০০ ডলার এলসির পণ্য প্রেরণের জন্য বাংলাদেশে অবস্থিত মূল কোম্পানির নামে ৮০ ডলার মূল্যের অন্য একটি এলসি খোলে। এই ব্যাবস্থায় দেশে আসল ৮০ ডলার; পাচার হয়ে গেল ২০ ডলার। দেশে কম ডলার আনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল কম কর দেয়া। এমনিতেই তাদের করের হার কম তার উপর কম আয় দেখানোতে তাদের আরও কম কর দিতে হয়।

বাজেট নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করেন ব্যাবসায়ীরা এবং সুশীল সমাজের অর্থনীতিবিদেরা। এরা বাজেট উচ্চাভিলাষী হয়েছে, বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং যেসব ক্ষেত্রে নতুন কর ধার্য করা হয়েছে বা যেসব ক্ষেত্রে করের হার বাড়ানো হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করতে করতে বাজেট প্রতিক্রিয়ার সময়টা পার করেন। এই কথার অর্থ এই নয় যে সরকার বেশি কর চাপালে তার সমালোচনা তারা করবেন না। যেখানে কর বসানো হয়নি বা যেখানে কর বসানো দরকার তা নিয়ে কোন ব্যবসায়ীকে বা সুশীল অর্থনীতিবিদকে আলোচনা করতে আজ পর্যন্ত দেখি নাই। ব্যবসায়ীরা নিজেদের উপর কর বাড়ানোর কথা বলবেন না – এটা স্বাভাবিক। কিন্তু অর্থনীতিবিদেরা? তারা কেন তৈরী পোশাক রফতানীকারকদের উপর অযৌক্তিক ভাবে কম কর আরোপের কথা বলেন না? তারা কেন অন্যান্য রফতানীকারকদের সঙ্গে গার্মেণ্টস মালিকদের একই কাতারে বিবেচনা করেন না? গণমাধ্যম এত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে অথচ এই অন্যায় নিয়ে কাউকে আলোচনা করতে দেখি নাই; সরকারী কিংবা বিরোধী কোন রাজনৈতিক নেতাও এই অর্থনৈতিক অনাচার নিয়ে কথা বলেন না। সুশীল অর্থনীতিবিদ, কর্পোরেট মিডিয়া আর রাজনীতিবিদ সকলের মাথাই বিক্রি করে দেয়া আছে বড় টাকার কাছে। রাজনীতিবিদেরা নয় বস্তুত দুনিয়াটা চালাচ্ছে বড় টাকার মালিকেরা।