ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

গুলশান ট্রাজেডির দিন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “আমার উপর আস্থা রাখুন”। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার উপর আস্থা রেখেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। জানি আপনিই পারেন দেশ থেকে ৭১ এর পরাজিত শত্রুদের, ধর্ম ব্যবসায়ী এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে হারিয়ে দিয়ে হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় লালিত বাঙালিকে তার প্রিয় স্বদেশ ফিরিয়ে দিতে। আপনার উপর আস্থা রেখেই এগিয়ে এসেছি অনেকটা পথ। যুদ্ধাপরাধীরা আজ শুধু দেশেই নয় শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করেও তারা বিশ্বব্যাপী ধিকৃত হয়েছে আপনার সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণেই। আপনার জন্যেই আজ জামায়াত-বিএনপি স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘৃণিত। এখানেই শেষ নয়। রাজনীতি চলমান একটি বিষয়। প্রকাশ্য রাজনীতিতে জামায়াত-বিএনপি ভূমিকা রাখার অবস্থায় না থাকলেও সহিংসতা থেমে নেই। যত জঙ্গি ধরা পরেছে তার প্রায় প্রতিটির পরিচয় জামায়াত-শিবির। জেএমবি, এবিটি, আইএস, আল-কায়দা বাহ্যিক পরিচয় মাত্র। এদের প্রত্যেকের হাতেখড়ি হয়েছে শিবিরের কাছে। এদের অধিনায়কেরা সকলেই জামায়াত থেকে আসা। জঙ্গিবাদী সহিংসতা কে ঘটাচ্ছে তা আর আজ বিবেচ্য বিষয় নয়। জঙ্গিবাদ স্বদর্পে এগিয়ে চলছে – এটাই বাস্তবতা।

এই বাস্তবতার সুযোগে সুশীলেরা বলছেন জামায়াত-বিএনপি’র সঙ্গে জাতীয় ঐক্যমত্য গড়ে তুলে জঙ্গিবাদ দমনের পদক্ষেপ নিতে। এরা সেই লোক যারা পেট্রোল বোমা হামলার সময় বলেছিল হামলাকারীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে, ক্ষমতা ছেড়ে দিতে। কেউ কেউ বলছেন জামায়াত ছেড়ে আসলে বিএনপি’র সঙ্গে এক প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে জঙ্গিবাদের মোকাবেলা করতে। জামায়াতের ঔরসে বিএনপি’র জন্ম। বিএনপি’র রাজনীতি জামায়াতের সঙ্গে আষ্টে-পৃষ্ঠে বাঁধা। বিএনপি জামায়াতকে ছেড়ে রাজনীতি করতে পারে না। যদি তারা পারত তবে ‘১৩ সালের সহিংসতার পর তারা কিছুতেই জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করত না। বিএনপিতে জামায়াতের প্রভাব এত বেশি যে জামায়াত নেতার বিএনপি’র যুগ্ম-মহাসচিব পদ পেতে সময় লাগে না। তারেক জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এখন জামায়াতে বিলীন। বিএনপি’র সমর্থকেরা এখন জামায়াতের সুরেই কথা বলে। জামায়াত ছাড়া বিএনপি এখন ভাষানী’র ন্যাপ বা মুসলিম লীগের মত ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে বিলীন। জামায়াত-বিএনপি’র রাজনীতি জঙ্গিবাদের চাষাবাদ করেছে সেই ৭৫ সাল থেকে। জঙ্গিচাষীদের সঙ্গে জঙ্গি দমনে ঐক্য হতে পারে না। এদের সঙ্গে কোন রকম রাজনৈতিক সমঝোতা মানে ৩০ লক্ষ শহীদের আর ৪ লক্ষ বিরঙ্গনার অবমাননা; চণ্ডিদাসের, লালনের, নজরুলের, রবীন্দ্রনাথের মানসে গড়া বাঙালির মৃত্যু ঘণ্টা।

জঙ্গিবাদ দমনের জন্য প্রথমেই দরকার সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন। মাসাধিককাল ধরে আপনি সাধারণ মানুষকে জঙ্গিবাদ দমনে এগিয়ে আসার জন্য আহবান জানাচ্ছেন। আপনার আহবানে তখনই মানুষ স্বতঃস্ফুর্ত সাড়া দেবে যখন দেখবে সরকারের প্রতিটি বাহিনী সত্যিকারের আন্তরিকতা নিয়ে জঙ্গিদমনের জন্য কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে মানুষ সে আস্থা পাচ্ছে না। এক সাংবাদিক বন্ধু জানালেন, পুলিশ রিমান্ডের সময় জঙ্গিরা ধর্মের বাণী আওড়ানো শুরু করলে পুলিশ থমকে যায়; তথ্য উদ্ধার হয় না। সাঁড়াশী অভিযানের নামে হাজার হাজার মানুষকে নির্বিচারে গ্রেফতার করার ফলে জঙ্গি দমনে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বেশিরভাগ মানুষ বুঝে নিয়েছে, জঙ্গি দমনের নামে এটা পুলিশের ঈদ খরচ সংগ্রহ অভিযান। সাঁড়াশী অভিযানে সত্যিকারের জঙ্গি যা ধরা পড়েছে, অস্ত্রশস্ত্র যা উদ্ধার হয়েছে তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। নির্বিচার গ্রেফতারের ফলে সরকার সে প্রশংসা পায়নি; জঙ্গিবাদীরা এই প্রচেষ্টাকে বিরোধী দমনের অভিযান হিসেবে প্রচার করার সুযোগ পেয়েছে; সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন হয়নি।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী বক্তব্যে সাধারণ মানুষ জঙ্গিবাদ প্রশ্নে বিভ্রান্ত হয়ে আছে। জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের সদিচ্ছা নিয়েও সংশয় আছে জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের। সাধারণ মানুষকে অবশ্যই জানাতে হবে কারা, কিভাবে এবং কি উদ্দেশ্যে দেশে জঙ্গিবাদের চাষাবাদ করেছে; জঙ্গিবাদের মাধ্যমে তাদের কি কি অর্জন হয়। সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দূর করতে পারলে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন হবে; জঙ্গি দমন সহজ হবে। সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য দরকার একটা সমন্বিত ব্যাবস্থা। সে ব্যবস্থায় জঙ্গিবাদী জামায়াত এবং তাদের দোসর বিএনপিকে ঘোষণা দিয়ে বাদ দিয়ে সমাজের অন্য সকল মানুষের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষক, ক্রীড়াবিদ, পেশাজীবী, সুস্থ ধারার রাজনীতিবিদ এক মঞ্চে কথা বললে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হবে। সমাজের অবিভাবকেরা সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য কথা বলবেন; জঙ্গিবাদের ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলবেন; জঙ্গিবাদ দমন দেরী হলে পরবর্তী পরিস্থিতি কি হতে পারে সে সম্পর্কে কথা বলবেন।

জঙ্গি দমনের জন্য সাধারণের সমর্থন এবং আস্থা অর্জন প্রথম কাজ। এ কাজ করার জন্য ১৪ দল, বাম রাজনীতির অন্যান্য দল, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ গ্রামে-গ্রামে, পাড়ায়-পাড়ায়, থানায়-থানায়, জেলায়-জেলায়, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল-মিটিং, সমাবেশ করতে পারে। আগামী দুই মাসের মিধ্যে প্রধানমন্ত্রীর অন্তত ২০টি সমাবেশ করা উচিৎ। মিছিল-মিটিং-সমাবেশের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একটা বিপ্লব ঘটাতে হবে। এতে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে; জনগণ গুলশান হামলায় হারিয়ে ফেলা মনোবল ফিরে পাবে; আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ফিরে পাবে; জঙ্গি দমন সহজ হবে। এর সঙ্গে দরকার শক্তিশালী এবং দক্ষ বিশেষ বাহিনী। নিয়মিত বাহিনী থেকে জনবল নিয়ে বড় বাহিনী করা যাবে না। তাতে সাধারণ অপরাধ বেড়ে যেতে পারে। অতিসত্বর এই বিশেষ বাহিনীর জন্য জনবল নিয়োগ করা দরকার। বাহিনীটি এত বড় হবে যে প্রতিটি থানায়, গ্রামে, পাড়ায় এদের উপস্থিতি থাকবে। ঘরে ঘরে গিয়ে জঙ্গি খুঁজে বেড় করে আনতে হবে। নৌ, বিমান, স্থল বন্দর গুলোতে এদের উপস্থিতি থাকতে হবে যাতে একটি জঙ্গিও বিদেশ থেকে দেশে ঢুকতে না পারে। নতুন নিয়োগ দিতে যে সময় লাগে সে সময়ের জন্য স্বেচ্ছা-সেবক বাহিনী গঠন করা যেতে পারে। এ কাজে স্কাউট, রোভার স্কাউট, ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মীরা অংশ নিতে পারে।

বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল-ফিতরের আনন্দ আজ পথহারা। ঈদের আনন্দের স্থানে পূরণ করেছে শোক, জঙ্গিবাদী আতঙ্ক। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বাঙালি এবার ঈদের আনন্দে যোগ দেবে। বাঙালির মানস নিশ্চিন্ত করতে এখনি নিতে হবে পদক্ষেপ। দেরী করার আর সময় নেই। ১৩ সাল থেকে নতুন পর্বের জঙ্গিবাদী রাজনীতি শুরু হয়েছে। প্রতিকারের ব্যবস্থা হয়নি এখনো। সরকার সিদ্ধান্তহীনতায়, বিভ্রান্তিতে কাটিয়েছে অনেকটা কাল, নিয়েছে কিছু ভুল পদক্ষেপ। তাতে শক্তি পেয়েছে জঙ্গিরা এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা। আর কোন ভুল পদক্ষেপ নয়। সকল মিত্রকে সঙ্গে নিয়ে এবার জোড়াল পদক্ষেপ দেখতে চায় শুধু এদেশের ১৬ কোটি মানুষই নয়, সমগ্র বিশ্ব। স্বাধীনতা বিরোধীদের জঙ্গিবাদের কাছে পরাজিত হবে না ৭১ এর বিজয়ী বীরেরা।