ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

jpg-300x199

এনালগ দিনগুলো আসলেই মিস করার মতো। বর্তমান সময়ে আধুনিকতা আর ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোয়ায় চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া, যোগাযোগ সহ আমাদের প্রত্যহিক জীবন প্রবাহ সহজ থেকে সহজতর হচ্ছে।

আজ থেকে আরো এক যুগ আগেও আমাদের প্রত্যহিক চলাফেরা এতাটা সহজ ছিল না। আব্বু সৌদিআরব ছিল, ফোনে কথা বলার জন্য পাশের বাড়ির কলেজের প্রফেসরের বাসায় ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা লাগত। আম্মু আগে থেকেই কি কি প্রয়োজনীয় কথা বলবে সব লিখে রাখত। মাসে ১/২ বার ফোন করত আব্বু। এর মাঝেও যোগাযোগ হত, তবে তা চিঠির মাধ্যমে। তখনকার সময় আমার কাছে ফোনের চেয়ে চিঠিকেই বেশি সুবিধাজনক মনে হত।

আম্মুকে দেখতাম আব্বুর কাছে চিঠি লিখছে, খালা সুগন্ধি কাগজে খালুর কাছে চিঠি লিখত। এটা বলছি ১০-১২ বছর আগের কথা, তখন হয়ত দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণিতে পরি। কিন্তু আমার ৭ম/৮ম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায়ও অনেক চিঠি দেখেছি, অনেক চিঠি লিখেছিও। প্রেমিক-প্রেমিকার চিঠি। যাকে লাভ লেটার বা প্রেমপত্র বলি।

যাই হোক সেই প্রেমপত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল তার রূপসজ্জা এবং সিকিউরিটি ব্যবস্থা। রূপসজ্জা বলতে বিভিন্ন সুগন্ধি এবং নকশা করা কাগজ। সেটা সম্ভব না হলে সাধারণ কাগজেই নিজ হাতে নকশা করা হত। আর সিকিউরিটি হিসেবে একটা নির্দিষ্ট রকমের ভাঁজ করা হত। এই ভাজ শুধু কপত-কপতিরই জানা। অন্যকেউ তাদের সেই পত্র দেখলেই তারা টের পেয়ে যেত। এই পত্র আবার বিভিন্ন বাহকের মাধ্যমে আসল জায়গায় পৌঁছাত। আমি স্কুলে থাকা অবস্থায় এলাকারই একজনের সাথে প্রেম হয়েছিল। আমার সেই চিঠি আমার বা তার হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমার এবং তার সকল বন্ধু বান্ধবির পড়া হয়ে যেত।

প্রেমপত্রের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে উভয়ই হাতের লেখার ক্ষেত্রে খুব যত্নশীল থাকত। যতটা সম্ভব সুন্দর করা যায়। তারপরো সম্ভব না হলে অন্য কাউকে দিয়ে লেখিয়ে নিত। ছোট থেকেই চিঠি লিখতে আমার খুব ভালো লাগত। আম্মুর সাথে আব্বুকে আমিও চিঠি লিখতাম। হাইস্কুলে পড়া অবস্থায় অনেক বন্ধুর চিঠির সাক্ষি আমি নিজেই। কিন্তু চিঠি লেখায় এত পটু হয়েও আমার নিজের প্রথম প্রেম পত্র ১৩ বারের পর ফাইনাল করতে পেরেছিলাম। যেকোন কারণেই হোক সেই প্রেমপত্র আর আমার কাজে লাগেনি। অন্য এক বন্ধু সেই প্রেমপত্র দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে দিয়েছিল।

অপ্রাপ্ত থেকে এবার প্রাপ্তিতে আসি। আব্বুর কাছে লেখা আমার দাদির একটা চিঠি দেখেছিলাম। চিঠিতে দাদি অল্প কথায় এক পৃষ্ঠায় যেভাবে তার ছেলের ভালোমন্দের খবর এবং সঠিক ভাবে চলার জন্য যেইসব উপদেশ দিয়েছিলেন, আমার মনে হয়েনা কোন ভালো উপন্যাসের চেয়ে কোন অংশে কম। তার হাতের লেখার ভেতর দিয়ে মনে হচ্ছিল ছেলের জন্য সবটুকু ভালোবাসা উপচে পরছিল। আমার হয়তো আমার মা অথবা আমার মা’র হয়তো আমার কাছে চিঠি লিখতে হবে না। তবে হলফ করে বলতেই পারি চিঠির ভেতরকার সেই ভালোবাসাময় আকুতি আসলেই মিস করার মত।

তবে যাই হোক তখন প্রেম ভালোবাসা বা যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা কঠিন ছিল। কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যে আসল প্রেমটুকু থাকত। একটি চিঠি পাওয়ার পর আরেকটি চিঠির জন্য যেই অপেক্ষা কিংবা প্রতিটি চিঠি লেখার ক্ষেত্রে যেই প্রেমটুকু থাকত তা এখনকার ঘন্টার পর ঘন্টা ফেসবুক চেটিং কিংবা মোবাইলে কথার মধ্যে নেই। স্কুলে পড়া অবস্থায় সিনিয়র বা বন্ধুরা একটু কথা বলার জন্য খালি পেটে স্কুলের টিউশনির অনেক আগেই এসে বসে থাকত স্কুলে। সেখানে বাহ্যিক আনন্দ কম থাকলেও মনের দিক দিয়ে তা ছিল পরিপূর্ণ। প্রতিদিন একটি করে চিঠি আদান প্রদানের প্রেম আমি দেখেছি। প্রতিটি চিঠিও আমি পড়েছি। সেই চিঠিগুলোর মধ্যে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না কোনটিরই অভাব ছিল না। বিশ্বাস না হলে, হঠাৎ বৃষ্টি’ ছবিটা আরেকবার দেখে নিন। আবারো হয়তো চিঠি লিখতে ইচ্ছা হবে।