ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর। সারাদিন দৌড়ের ওপর ছিলাম। তখন দেশ উত্তাল ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। পেট্রোল বোমার আতঙ্কে রাজধানীবাসী। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে তখন এক ভয়াবহ অবস্থা। আমার এর আগে বার্ন ইউনিটে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আমার সহকর্মী অনেকে নিয়মিত সেখানে যেতেন। ওইদিন আমি গীতা সেন নামে এক ভদ্রমহিলার খোঁজ নিতে বার্ন ইউনিটে গিয়েছিলাম। উনি বাসে করে সদরঘাট থেকে কাওরানবাজার আসার পথে পেট্রোল বোমার শিকার হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে বার্ন ইউনিটে দেখতে যাওয়ায় আলোচিত ছিলেন গীতা সেন। তার ফলোআপ করার দায়িত্ব ছিল আমার পরদিন অবশ্য রিপোর্টটা আমার পত্রিকার লিড নিউজ হয়েছিল।

RICKSHAW WALLAH

যাই হোক, বার্ন ইউনিটের ভয়াবহ পরিস্থিতি আমার আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। সারাদিন অনেক জায়গায় মুভ করতে হতো। সবসময় ভয়ে থাকতাম কখন পেট্রোল বোমা গায়ে এসে পড়ে। ওই রাতে ৮ নম্বর লোকাল বাসে করে ফার্মগেট থেকে শ্যামলী যাচ্ছিলাম। আমাদের বাস যখন মানিক মিয়া এভিনিউয়ে এমপি হোস্টেলের সামনে ঠিক তখনই বাসের পেছনে চিৎকার ‘আগুন, আগুন’। কে চিৎকার দিল দেখার সময় নেই। যে যেভাবে পারে চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে পড়ল। কেউ জানালা ভেঙ্গে বাস থেকে লাফ দিয়েছে। আমি বাসের গেটের কাছেই ঝুলছিলাম। ঠাণ্ডা মাথায় পেছনে তাকিয়ে দেখি কোনো আগুনের চিহ্নই নেই। ড্রাইভার বাস থামিয়ে দিয়েছে। নেমে দেখি ৭-৮ জন রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছে রাস্তায়। পুলিশের গাড়ি চলে এসেছে। কিন্তু ফাজলামিটা কে করল তা সনাক্ত করা গেল না। বাস আবার ছাড়বে। কিন্তু বাসে আর ওঠার মতো সাহস হচ্ছিলনা। রিকশা খুঁজতে লাগলাম। একটা রিকশা পেলাম। ওই বাসের এক যাত্রী তিনিও শ্যামলী যাবেন। তাকে নিয়ে রিকশায় উঠলাম। আমার সহযাত্রী পাভেল ভাই। মতিঝিলে রেস্টুরেন্ট চালান। জাফরানি হান্ডি ওনার রেস্টুরেন্টের নাম। বিরিয়ানির দোকান। ওনার সঙ্গে গল্প করতে করতে শ্যামলী পৌছে গেলাম। দু’জনের ভিজিটিং কার্ড বিনিময় হলো। এরপর যার যার গন্তব্যে চলে গেলাম।

এরপর আসল ঐতিহাসিক ৫ই জানুয়ারি। নির্বাচনের ইতিহাস সবার জানা। আমার ডিউটি ছিল খিলক্ষেতের কুর্মিটোলা হাই স্কুল। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ৮টা বেজে গেছে। চীফ রিপোর্টার একের পর এক ফোন দিচ্ছেন। তাড়াহুড়ো করে বের হলাম। রাস্তায় লেগুনা আর রিকশা ছাড়া কিছু নেই। একটা লেগুনায় উঠে মহাখালী আসলাম। সেখানে শুধুই রিকশা। খিলক্ষেত যেতে চাইছে না কেউ। আমার সঙ্গে রিকশা খুঁজছিলেন অভিনেতা ডা. এজাজ। উনি গাজীপুর যাবেন। কিন্তু কোনো রিকশাই গাজীপুর যাওয়ার মতো সাহস করছে না। এমনকি এয়ারপোর্ট বা উত্তরাও না। আমি এজাজ ভাইকে বললাম, চলেন পুলিশের গাড়িতে করে সামনে এগোতে থাকি। উনি রাজি হলেন না। বললেন, এ অন্যায় আবদার করতে পারব না। এটা বলে ওনার সেই ভঙ্গিতে হেলেদুলে চলে গেলেন। আমি একটার রিকশা পেলাম। আইসিডিডিআরবি’র ডাক্তার সানা ভাই এবার আমার পার্টনার হলেন। তার সঙ্গে গল্প করতে করতে খিলক্ষেত পৌঁছে গেলাম। সারাদিন একটা ভোটকেন্দ্রেই অবস্থান করলাম। ঐতিহাসিক ভোট শেষ হলো ৪টায়। আমি ভোট গণনা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। গণনা সন্ধ্যায় শেষ হয়ে গেল। এবার অফিসে যেতে হবে।

আবার সেই রিকশাযুদ্ধ। কেউ যেতে চায় না। মহাখালী পর্যন্ত একটা রিকশা পেলাম। এক ভদ্রলোক আমার পার্টনার হতে চাইলেন। রাজি হয়ে গেলাম। রিকশায় উঠে ওই লোক শুধু ফোনে কথা বলছিলেন। বুঝলাম ব্যবসায়ী। দোকানের খোঁজ নিচ্ছিলেন। ওনার ব্যস্ততা শেষ হলে পরিচয় জানতে চাইলাম। উনি যা জানালেন এতে আমার বুকটা ধক করে উঠল। উনি জাফরানি হান্ডির সেই পাভেল ভাই! যার সঙ্গে ২১ ডিসেম্বর রাতে রিকশায় উঠেছিলাম। উনিও খিলক্ষেতে একটা কাজে এসেছিলেন। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মাত্র পনের দিনের মাথায় একটা অপরিচিত লোকের সঙ্গে ভিন্ন এলাকায় আবার দেখা! কিন্তু পরিস্থিতিও এক। রিকশা শেয়ারিং। দুজনেই অবাক আমরা। এটা কিভাবে সম্ভব! যাই হোক মহাখালী পৌছার পর দুজন আবার নিজ নিজ গন্তব্যে চলে গেলাম। এরপর আরও কখনও পাভেল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়নি। তার রেস্টুরেন্টে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কখনও যাওয়া হয়নি। অবশ্য উনি বলেছিলেন, আমার অফিসে স্পেশাল পার্সিয়ান বিরিয়ানি পাঠাবেন টেস্ট করার জন্য। সেই অপেক্ষায় আছি।