ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

০১) বহু বছর আগেকার কথা-এক সময় ব্রিটেনের ইয়র্কশায়ারে রবিনহুড নামে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তার কাম-কাজ ছিলও একটু ব্যতিক্রমধর্মী। ব্যতিক্রম এই কারণে যে, তিনি ধনীদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা স্বর্ণ ইত্যাদি লুট করে নিয়ে এসে সেগুলো গরীবদের মাঝে বণ্টন করতেন। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে রবিনহুড বেশ ভালো কাজই করতেন। রবীনণহুড এর এই কাজ ছিলও বেশ রোমাঞ্চকর এবং চাঞ্চল্যকর।তার এই কাম-কারবার নিয়ে পরবর্তীতে অনেক টিভি সিরিয়াল যেমন হয়েছে, একই সাথে সিনেমাও হয়েছে। প্রযোজক-পরিবেশকরা তার এই চরিত্র চিত্রায়িত করে বেশ কামাই কামিয়েছেন।রবী্নের এই চরিত্র বলা যায়, ব্রিটিশ চিত্রে এক বিশাল মাইল ফলক হয়ে আছে। এখনো বাচ্চা-কাচ্চারা এবং জোয়ান-বুড়োরা রবিনহুড বেশ আরাম-আয়েশেই টিভি ও সিনেমা পর্দা কিংবা কার্টুন দেখে থাকেন।

প্রশ্ন হলো, রবিনহুড এর এই কাম-কাজ কতোটুকু বৈধ ছিলো ? কতোটুকু আইনগত ভাবে স্বীকৃত ছিলো?

ল-নিয়ে যারা ব্রিটেনে পড়াশুনা করে থাকেন কিংবা যারা এই পেশায় জড়িত, তাদের প্রত্যেককেই রবিনহুডের এই এপিসোড( সিনেমা টিভিতে জনপ্রিয় হওয়াতে এই শব্দটি সেখান থেকে ধার নেওয়া) তাদের ল এন্ড স্ট্যাচু এর অংশ হিসেবেই পড়ে থাকেন। ব্রিটেনের আইনের পেশার যে কেউই সহজেই অবগত আছেন যে, তাদেরকে এই সব পড়তে হয়, আইনের বৈধতা তথা জুরিসপ্রুডেন্স এবং ক্রিমিন্যালোজি ও সাধারণ আইন ( সিভিল ল) বুঝানো এবং কি কারণে ও কেন, কোন বিষয় নেহায়েৎ জরুরী অথচ সময়ের ও কালের প্রয়োজনীয় হওয়া স্বত্বেও কেন তা ক্রিমিনাল আইনের অংশ এবং কেন তা সিভিল ল এর মতো মনে করা যাবেনা, তা স্পষ্ট করার জন্যই আইনের ছাত্র-ছাত্রীদের সেসব পড়ানো হয়ে থাকে।

উপরের প্রশ্নের সঠিক জবাব পেতে হলে আমাদেরকে একটু পেছনে ফিরে থাকাতে হবে, এবং সেটা প্রকৃত আইনের রেফারেন্স নিয়েই দেখতে হবে। কেননা, সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হয় আইনের ধারা। আইনি কাঠামো ও বাধ্য-বাধকতা যদি না থাকে এবং আইনের প্রয়োগ ও ব্যবহার যদি না থাকে তবে সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে অশান্তি ও জংলীদের শাসন ঝেঁকে বসে। প্রতি নিয়ত খুন, ধর্ষণ, অপহরণের মতো নানাবিধ দুষ্টু ব্যধি সমাজে বাড়তে থাকে।

এখন দেখা যাক, রবিনহুড এর বিষয়ে ব্রিটিশ আইন ও আদালত কি ফায়সালা দিয়েছে। প্রখ্যাত আইনজীবী স্যামূয়েল হুগ তার ক্রিমিনোলোজী জুরিসপ্রুডেন্স-এ দেখিয়েছেন, রবিনহুড এর কাজ ছিলো জনকল্যাণ তথা গরীব মানুষের জন্য। এক্ষেত্রে আমরা এখানে শুধু জনকল্যাণ বিষয়টি যেমন দেখবো, একই সাথে জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথা সামাজিক ও শৃঙ্খলার সাথে নিরাপত্তা সংক্রান্ত জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও দেখতে হবে।এখানে আপাত: রবিনহুডের কাজ জন-গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও এটা মূলত ক্রিমিনাল এক্টিভিটির অংশ, কেননা রবীণ নিজে আইন ভঙ্গ করেছেন, অপরাধ যেমন করেছেন, অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে সেটাকে উৎসাহিত করেছেন। তিনি এতে জন-নিরাপত্তাও বিঘ্নিত করেছেন।আইন প্রয়োগকারী কোন সংস্থা রবীনের এই অপরাধ বিশেষত আদালত তাই এটাকে সিভিল-ল এর অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনা। আর সিভিল-ল স্বীকৃতি না পাওয়াই প্রমাণ করে রবিনহুড চুরি ও ডাকাতির মতো কাজ করে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ ও গর্হিত কাজ করেছেন।

০২) আমার আজকের প্রসঙ্গে আসার আগে আরো একটি জরুরী বিষয়ের অবতারণা করা বিষয়ের সাথে প্রয়োজনীয় হওয়াতে তুলে ধরছি। কেননা, এই বিষয়ের অবতারণা ছাড়া আজকের প্রসঙ্গ সঠিকভাবে উপস্থাপিত হবেনা বলে আমার ধারণা।

ইংল্যান্ডের নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড বহু বছরের পুরনো এবং যার প্রচার সংখ্যা মিলয়নের অধিক উপরে। রুপার্ট মারডক নামক আমেরিকান ধনকুবের এই নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড এক সময় কিনে নেন এবং অনেক নামকরা সাংবাদিকদের তার এই পত্রিকায় কাজের সুযোগ করে দেন। ফলে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড প্রচার ও প্রসারে এবং খ্যতিতে শীর্ষে চলে যায়।

কিন্তু বাধ সাধে গত বছরের ফোন হ্যাকিং তথা ব্যক্তিগত টেলিফোন হ্যাকিং এর ঘটনা।যার ফলে শত বছরের পুরনো এই সংবাদপত্রটি শুধু বন্ধই হয়নি, এনিয়ে অনেক ইনকোয়ারী হয়েছে, এখনো চলছে, মামলাও হয়েছে, ধনকুবের রুপার্ট মারডককে ইনকোয়ারী কমিশনের সামনে এসে সাক্ষ্য দিতে হয়েছে। নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড এর রেবেকা ব্রুককে পুলিশ জিজ্ঞেস করেছে, শেষ পর্যন্ত তার জেল দণ্ড ও হয়েছে। এই টেলিফোন হ্যাকিং এর কারণে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা এন্ড্রো হ্যাকিং-এ জড়িত না থেকেও শুধুমাত্র অবগত থাকার কারণে পদত্যাগ করতে হয়েছে, ইনকোয়ারী কমিশনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কারণ ব্রিটিশ, আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে এই হ্যাকিং একটা জঘন্য অপরাধ। কারণ রাষ্ট্র মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের যেমন নিরাপত্তা দিবে, একই সাথে ব্যক্তি অধিকার রাষ্ট্র বিরোধী ও জনস্বার্থ-শৃঙ্খলা বিরোধী না হলে আইন তার প্রটেকশন করবে। টেলিফোন হ্যাকিং এর ঘটনায় ব্রিটিশ মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রধান স্যার ইয়ানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে এবং ক্ষমা চাইতে হয়েছে। অবশেষে ইনকোয়ারী কমিশনের সামনে যেতে হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ব্রিটেন-এর হ্যাকিং বিরোধী আইন কি জনস্বার্থ বিরোধী ? এক্ষেত্রে আদালত স্পষ্ট হ্যাকিং-কে আইন ও জন-স্বার্থ-বিরোধী বলেই এটাকে অপরাধ হিসেবে নিয়ে নানা দণ্ড ও জরিমানার বিধান রেখেছে।যদি তই হয়, তবে সে আইন অবশ্যই জন-স্বার্থ বিরোধী নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও চালু অব্যাহত রাখার সহায়ক বলেই সকলের অভিমত। গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে খ্যাত ব্রিটেনে যে আইন জন-স্বার্থের পক্ষে বলে সারা বিশ্বে স্বীকৃত, সেই একই অপরাধের কারণে বাংলাদেশে কেন দণ্ড এবং অপরাধ হিসেবে গণ্য হবেনা?

এই প্রশ্নের আলোকে এখন আমরা দেখি অতি সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারপতির সাথে আরেকজনের স্কাইপ সংলাপ প্রকাশ কতোটুকু যুক্তি ও আইন সঙ্গত ? এখানে ব্যক্তি মাহমুদুর রহমান কিংবা বর্তমান সরকারের পক্ষ নেওয়া নয় বরং সম্পূর্ণ আইনগত ভাবে বিষয়টি অর্থাৎ হ্যাকিং অপরাধ কিনা আমরা সেটাই এখানে দেখবো।

সন্দেহ নাই সম্পাদক মাহমুদুর রহমান একজন গুণী এবং সম্মানী ব্যক্তি। তিনি সংবাদ পত্রের সম্পাদক হিসেবে যে কাজটি করেছেন, স্কাইপ সংলাপ প্রকাশ করেছেন, সেটা বাংলাদেশের সংবাদ পত্রের জগতে একটা মাইল ফলক হয়ে থাকবে। তিনি অবশ্যই যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের গলদ তুলে ধরেছেন। সেজন্য অবশ্যই তিনি ধন্যবাদের যোগ্য। আমার পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা তিনির প্রতি। এই গেলো ব্যক্তি মাহমুদুর রহমান। কিন্তু আমার প্রশ্ন ব্যক্তি নয়, মাহমুদুর রহমানের কাজ, আমি আবার পয়েন্ট-আউট করছি কাজ (কর্ম) কে। তিনি যে কাজ করেছেন সেটা কতোটুকু এথিক্যাল, আইনসম্মত এবং অবশ্যই জনস্বার্থের সাথে সম্পর্কিত।

তার আগে আরো একটি কথা বলে নেওয়া ভালো, মহাজোট সরকারের সবচাইতে বড় ব্যর্থতা হলো হ-য-ব-র-ল করা। এতো বড় একটা আন্তর্জাতিক মানের কাজে তারা হাত দিয়েছে, ডিজিটাল বাংলাদেশের ধোয়াতুলে তারা ক্ষমতায় এসেছে, অথচ এখন পর্যন্ত নেই কোন একটা ওয়েব সাইট, নেই এর কোন সত্যিকারের ডিজিটালাইজড কোন কর্মকাণ্ড। না হলে ফোন হ্যাকিং এর এই কাজ অপরাধ কি অপরাধ নয়, আইন সম্মত কি আইন বহির্ভূত- তা অন্তত অর্ধেকের কিছু বেশী জনগণ মোটামুটি একটা স্বচ্ছ ধারণা পেতো। আজকে এই বিষয় নিয়ে সারা দেশে যে ঝড় এবং সংবাদ পত্রের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং সুশীল সমাজের ও সরকারের হর্তা-কর্তারা পর্যন্ত অন্ধকারের কানা গলিতে হাটতেননা। আমি এখানে এই পর্যায়ে প্রিয় পাঠককে একেবারে নির্মোহ এবং অন্ধ আবেগ বহির্ভূত হয়ে সম্পূর্ণ আইনি দৃষ্টিতে দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিষয়টিকে দেখার আহবান জানাচ্ছি, অন্য কোন উদ্দেশ্য এখানে নিহিত নেই।

উপরের সব আলোচনা থেকে আমরা এখন দেখবো, মাহমুদুর রহমান স্কাইপ হ্যাকিং প্রকাশ করে কি আইন লঙ্গন করেছেন কি করেননি ?

বাংলাদেশেও ফোন হ্যাকিং এর জন্য একটি আইন রয়েছে। যদিও তার প্রসার ও প্রচার খুব একটা আছে বলে মনে হয়না। কেননা, ফোন হ্যাকিং করার মতো ঘটনা এবং অবস্থা বাংলাদেশে একেবারেই নতুন। তাছাড়া ইন্টারনেট সেবা এখন পর্যন্ত সব স্তরের জনগণের জন্য সহজলভ্য ও সর্বসাধারণের জন্য উপযোগীও হয়ে উঠেনি। এই অবস্থায় হ্যাকিং এর মতো ঘটনা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে বাংলাদেশের মতো অবস্থায় ও বিরাজমান অবস্থার প্রেক্ষিতে কতোটুকুই-বা সঙ্গত বা গ্রহণযোগ্য সে প্রশ্ন রয়ে যায়।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখের দাবী রাখে যে, স্কাইপ সংলাপ প্রযুক্তি মাত্র ১০ / ১২ বছরের বয়সী এই প্রযুক্তিকে হ্যাক করা যেমন সম্ভব, একই সাথে কম্পিউটার এনালিস্টরা দেখিয়েছেন কি ভাবে মোবাইল ম্যাসেজ ট্র্যাকিং করে অপরাধী সনাক্ত ও মোবাইল ম্যাসেজ হ্যাক করে ব্যক্তি প্রাইভেসি ক্ষুণ্ণ করা যায়, ব্রিটেনের নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড তার জ্বলন্ত উদাহরণ। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, কথিত স্কাইপ সংলাপ কি অদল-বদল করা হয়েছে-অডিও ট্রান্সক্রিপ্ট চ্যঞ্জের মাধ্যমে, যেমন করে সাঈদীর অডিও হ্যাক হয়েছে ? আসলে এখানে আমাদেরকে বিবেচনায় নিতে হবে অপরাধকে, কার্যকে।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন রাতারাতি তৈরি হয়ে গেছে, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের হ্যাকিং এর পর-পরই যুদ্ধাপরাধের বিচারের কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর ফোন হ্যাকিং প্রকাশিত হয়ে আগেরকার হ্যাকিং এর সাথে তুল্য করে কতিপয় হিপনোসিস এবং যুক্তি দাড় করানোর চেষ্টায় আমার কাছে মনে হচ্ছে, এই ভাবে অপরাধ একের পর এক হিসেবে যদি চলতে থাকে, তাহলে মানুষের ব্যক্তিগত কোন প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা বলে কি কিছুই থাকবে? সব কিছুই কি জন-স্বার্থের মতো বিশাল এবং একক (ইউনিক)হিসেবের মানদণ্ডে বিশেষায়িত সুবিধায় পার পেয়ে অপরাধ এবং সাইবার ক্রাইম-কে উস্কে দিবেনা?

এখন দেখি, মাহমুদুর রহমান হ্যাকিং প্রকাশ করে কি অপরাধ করেছেন ? আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় তিনি তা করেননি। কিন্তু ক্রিমিনাল আইন জুরিসপ্রুডেন্স এবং দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সাইবার ক্রাইম, ইন্টারনেট নীতি-মালা, ক্রিমিনোলজী জুরিসপ্রুডেন্স অনুযায়ী বিচারের তিনি এটা অপরাধমূলক কাজ করেছেন বলে গণ্য। কেননা, জনস্বার্থে কিছু প্রকাশ আর প্রাইভেসি বা ব্যক্তি মানুষের গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থ- এই দুই অবস্থা এবং মূলত দুটি মুখ্য উপাদানের মধ্যে একটা সীমানা আছে- সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমারদেশ এবং মাহমুদুর রহমান ব্যক্তির গোপনীয়তার যে ইউনিভার্সাল রাইট এবং বিশ্বমানবতার স্বীকৃত নিয়ম-কানুন, সেটা এখানে ক্ষুণ্ণ করেছেন। তাছাড়া, ব্যক্তি গোপনীয়তা, জনস্বার্থ এবং ফ্রিডম অব স্পীচ হাত ধরাধরি করে চলে। ফ্রীডম অব স্পীচ-এর অবশ্যই কিছু লিমিটেশন থাকা উচিৎ । এমন কোন কিছু করা উচিৎ নয় যা রাষ্ট্রের আইন-কানুনকে প্রশ্ন-বিদ্ধ করে তুলে। কারণ এ রাষ্ট্র আপনার আমার সকলের। এটা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি যেমন নয়, তেমনি আমার যখন-তখন যা ইচ্ছা খুশী আমি তাই করতে পারিনা। আমাকে সে জন্য কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। যদি আমি সে সবের ধার ধারিনা তবে আমি নিশ্চয় সামাজিক জীব বলে দাবী করতে পারিনা। আর যে বা যিনি তা নন, রাষ্ট্র বিজ্ঞানী এরিস্টটল তাকে বলেছেন হয় দেবতা না হয় পশু। আমরা সকলেই মনুষ্য-জীব। কেউই যেমন আইনের ঊর্ধ্বে নই, তেমনি আমরা কেউই ফেরেশতা নই, দেবতুল্য ও নই। মানুষ বলেই ভুল-ত্রুটি থাকবে। আর প্রথমবারের মতো ত্রুটি এবং একেবারে নয়া বিষয় হিসেবে মাহমুদুর রহমান যেমন ক্ষমা সুন্দর সহানুভূতি দাবি করতে পারেন, ঠিক তেমনি জনগণকে হ্যাকিং এর মতো ক্রাইমকে ক্রাইম হিসেবেই মেনে নিতে হবে।

আজকে একটা অপরাধকে আমরা সবাই বাহবা দিয়ে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে আরেকটা জঘন্য হ্যাকিং এর মতো অপরাধ সমাজে ও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে আমরা কেউই একজন মা, একটি পারিবারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ইজ্জতের ও নিরাপত্তার কোন ধার ধারতে-ছিনা। কেননা উদাহরণ হিসেবে আগের হ্যাকিং কে সামনে নিয়ে এসে দ্বিতীয় হ্যাকিং কে হালাল করার চেষ্টা করতেছি। কিন্তু উভয় হ্যকিংই সমান অপরাধে অপরাধী।এখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সাথে জন-স্বার্থের নিরাপত্তাটি গৌণ, আইনি দৃষ্টিতে টিকেনা। আর টিকেনা এই কারণে যে, রবিনহুডের অপরাধ যেমন একটা ক্রাইম হিসেবে গণ্য, রুপার্ট মারডক যেভাবে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়ে ক্রাইমের সহযোগী, রেবেকা ব্রুক যেভাবে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডে থেকে হ্যাকিং করে ক্রাইম করেছেন, একই অপরাধে মাহমুদুর রহমান হ্যকিং প্রকাশ করে ক্রাইম করেছেন আইনের দৃষ্টিতে, আমি এখানে আবারো বলছি, মাহমুদুর রহমান এর কাজকে যা তিনি প্রকাশ করেছে, সেটাকে দেখতে হবে কোন অবস্থাতেই ব্যক্তিকে এখানে প্রাধান্য দিলে চলবেনা ।

যুক্তির কষ্টিপাথরে যদি মেনে নেই এবং কেবল মাত্র বিরোধিতার কারণে মেনেও নেই তিনি এটা জনস্বার্থে এই হ্যাকিং-কৃত সংবাদ-এর সংলাপ প্রকাশ করে জনস্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এক্ষেত্রে এখানে তিনি কোন অন্যায় করেননি। যদি এই অবস্থায় তিনির এই কাজকে আমরা আইন সম্মত বলে স্বীকৃতি দেই, তাহলে-তো ইতিমধ্যে চলে আসা রবীনহূডের সহ দস্যু বন-হুরের চুরি, ডাকাতির কাজকেও বৈধতা দিতে হয়। এখানে জনস্বার্থের বিষয়টি ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তার কাছে খুব একটা বড় করে দেখার কোন অবকাশ নেই। আমি আগেই বলেছি, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং মহাজোট সরকারের ব্যর্থতা আছে, কিন্তু তাই বলে দেশের প্রচলিত আইন-কানুনকে হেয় প্রতিপন্ন করা কারো কাছে সুচিন্তিত কাজ বলে মনে হয়না। আজকে সেটা যদি বৈধ হয়, তাহলে প্রভার সিডি প্রকাশ কিংবা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর কথিত সংলাপ হ্যাকিংকেও বৈধতা দিতে হবে- অথচ তা সমাজ ও রাষ্ট্রের আইনের সুস্পষ্ট লঙ্গন। রাষ্ট্রের জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং তার জনগণের ব্যক্তিগত প্রাইভেসির নিরাপত্তার সাথে সাধারণ জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কতোটুকু জন-গুরুত্বপূর্ণ সেই সব আইনের ব্যখ্যার আলোকে আদালতকে স্বীকৃতি দেওয়ার এখনি প্রয়োজন। নতুবা সাইবার ক্রাইম সমাজে বেড়েই চলবে।

একই কারণে উইকিলিক্স-এর তার-বার্তা প্রকাশ এখন পর্যন্ত আদালত ও আইন কর্তৃক স্বীকৃত নয়। যদিও জুলিয়াস এসাঞ্জ অনেক যুগান্তকারী তারবার্তা প্রকাশ করে সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলে ফেলে দিয়েছেন। একই প্রেক্ষাপটে আমাদের মাহমুদুর রহমানও আমাদের দেশে সাড়া জাগিয়েছেন, সেজন্য তাকে ধন্যবাদ। তাই বলে তার কাজের স্বীকৃতি বা সাইবার ক্রাইমকে আইনি মর্যাদা দেওয়ার কোন আইন সঙ্গত কারণ আছে বলে মনে করা ঠিক হবেনা।

প্রিয় পাঠক চূড়ান্ত বিচারের ভার আপনাদের উপর। কিন্তু সত্য ও সুন্দরের চর্চা এবং আইনের শাসন ছাড়া দেশ জাতি ও সমাজের বুকে শান্তি শৃঙ্খলা বয়ে চলেনা বা আনয়ন করা সম্ভব নয়।

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ , ইউ,কে ।
Salim932@googlemail.com
31st Dec.2012.