ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

 

Banglee Nari

মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা মর্যাদার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, সফিউরের মহান জীবন দানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের পর এক যুগ অতিক্রম করেছি আমরা। অমর একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শুধু বিশ্বের সকল মাতৃভাষাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না, স্বীকৃতি দিচ্ছে এসব ভাষাবাহিত সংস্কৃতিকেও। আর সেখানেই বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনে জীবনদানের মাহাত্ম নিহিত। আজ তাই আমাদের মহান একুশে বিশ্বব্যাপী বৈষম্যহীন মানবীয় সংস্কৃতির ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের সূতিকাগার, যার জয়জয়কার বিশ্বময়।
অমর একুশের মাহাত্ম আজ বিশ্ব মানবতার রোল মডেল। প্রশ্ন জাগতে পারে- বাংলাদেশ কি পেরেছে অমর একুশের এমন মাহাত্ম তার সর্বাঙ্গে ধারণ করতে? এর উত্তর সকলের জানা। ফেব্রুয়ারি এলেই মাসব্যাপী নানান আয়োজন। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত এ আয়োজনের সীমানা। একরকম উৎসবমূখর হয়ে ওঠে সারাদেশ। এসব আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা ও যথার্থতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণের দৃষ্টিগোচর না হলেও দীর্ঘমেয়াদী মানদণ্ডে এর গুরুত্ব অপরিসীম। তবে আমার লেখার বিষয়বস্তু এসব উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে নয়।

ফেব্রুয়ারি এলেই মাতৃভাষা বাংলা প্রসঙ্গ নিয়ে হইচই শুরু হয়। সরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে শিক্ষা ব্যবস্থা, চলচ্চিত্র, ফেসবুক স্টাটাস, এমনকি রাস্তার সাইনবোর্ড পর্যন্ত আমাদের মাতৃভাষা এখনো উপেক্ষিত ও অবহেলিত ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন বিষয়ে উদ্বিগ্নদের জন্য দু’টি সুখবর উল্লেখ করতে চাই। এক. গত ০১ জানুয়ারি সরকার ডট বাংলা ডোমেইন উদ্বোধন করেছে ও দুই. বাংলা ভাষার ডিজিটাল যাত্রার সহায়ক ১৬টি টুল উন্নয়নের জন্য সরকার ১৫৯ কোটি ২ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে। সরকারের এ উদ্যোগ দু’টিকে স্বাগত জানাই। ছাপাখানা ও অনলাইনে বাংলা ব্যবহার পদ্ধতির আধুনিকায়নের বিপক্ষে আমি নই। তবে এক্ষেত্রে স্মরণ রাখা ভালো, প্রেস বা ছাপাখানার যান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে অতীতে কখনো কোন মাতৃভাষার উন্নয়ন হতে দেখিনি বা হওয়ার খবরও শুনিনি।

শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নয়, বিশ্বের সকল দেশের জন্যই যার যার মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা ও চলচ্চিত্র ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এ দু’টি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন প্রায় শুন্যই বলা চলে। অথচ শিক্ষা ও চলচ্চিত্র এ দু’টি খাত বাংলাদেশকে দিতে পারে বিশ্বব্যাপী মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মর্যাদা। দরকার শুধু সদিচ্ছা ও সময়োচিত উদ্যোগের বাস্তবায়ন। দেশীয় চলচ্চিত্রের উন্নয়ন প্রশ্নে বাংলা ভাষা ও এ ভাষা বাহিত সংস্কৃতি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে আমি বিশ্বমানের শিক্ষাক্রমকেই প্রাধান্য দিতে চাই। মাতৃভাষায় জ্ঞান অর্জনের বিপক্ষে আমি নই। কিন্তু বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা এখনই দেশব্যাপী কার্যকর করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। দেশের এলিট সোসাইটির সন্তানরা বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জনের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। বিদেশ মুখীতার এ সংখ্যার পরিমাণ দিনদিন বাড়ছে। বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য যাদের বৃত্তি প্রদান করা হয় তাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যকই দেশে ফিরি আসেন। আবার বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরের বাসভবনের ‘ওয়াসরুম’ পরিস্কার করে যারা উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে আমরা দেশে তাদের সংবর্ধিত করি, মাথায় তুলে রাখি। এবারতো নতুন বছরের যাত্রা শুরু হয়েছে ভুলে ভরা পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়ার মধ্য দিয়ে। আর পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া যেন হালের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অসঙ্গতি বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তরের একে অপরের দোষাদোষী এখন প্লে-গ্রুপের শিক্ষার্থীদেরও জানা। এর সবকিছুই পরিবর্তন সম্ভব, দরকার শুধু সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছা। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের নামে সরকারি সংস্থাগুলোর আর কোন নতুন নাটক দেখতে চাই না। তৃতীয় বিশ্বের এ দেশের জনশক্তিকে বিশ্বমানের দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে এখনই বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন চাই। এক্ষেত্রে মাতৃভাষায় শিক্ষাব্যবস্থার অজুহাতও গ্রহনযোগ্য হতে পারে না।

নিজস্ব সমৃদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতিতে ঐতিহ্যমণ্ডিত বাঙালি জাতি। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির গুণগত বৈশিষ্ট্য ও এর অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য বিশ্বব্যাপী পূজনীয়। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সর্বাধিক সংবেদনশীল গণমাধ্যম চলচ্চিত্র আমাদের দেশে ৮ দশক অতিক্রম করলেও নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য পরিচয় বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অবশ্য আমাদের চলচ্চিত্র এ পথে কখনো অগ্রসরও হয়নি। বাংলা চলচ্চিত্র মানেই হলিউডের চলচ্চিত্রের মতো গতানুগতিক পুনরাবৃত্তির পুনরাবৃত্তি। আর তাই বাংলা চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপীতো নয়ই, দেশের অভ্যন্তরেও একটি স্বতন্ত্র্য শিল্প হিসাবে দাঁড়াতে পারেনি। অবশ্য বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি বাংলা চলচ্চিত্রকে শিল্প ঘোষণা করেছে। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, শিল্পের স্বাতন্ত্র্য সার্টিফিকেট বা কাগুজে অনুমোদন সর্বস্ব হতে পারে না।

আমাদের দেশজ সঙ্গীত, সাহিত্য, অঙ্কন, ভাস্কর্য ও নৃত্যের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য যুগ যুগ ধরে বাঙালিকে করেছে ঋদ্ধ ও গৌরবান্বিত। সুপরিচিত এ শিল্পকলাগুলোতে বাঙালির নিজস্ব ঢং সকলের অতি চেনা, যা বিশ্বের অন্য যে কোন জাতির সঙ্গীত, সাহিত্য, অঙ্কন, ভাস্কর্য ও নৃত্যের বৈশিষ্ট্যের তুলনায় বৈচিত্র্যমণ্ডিত। কিন্তু আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের এমন নিজস্ব শিল্প পরিচয় এখনো গড়ে ওঠেনি। নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রদর্শন পর্যন্ত বহুল যন্ত্রনির্ভরতার কারণে কেউ কেউ চলচ্চিত্রকে শিল্প বলতে রাজি নন। কিন্তু পর্দায় দর্শক যা দেখেন তার রূপচিত্র বহু আগে গ্রথিত হয় ওই চলচ্চিত্রের স্রষ্ঠা নির্মাতার মন, কল্পনা ও কুশলতায়। বলা যেতে পারে, চলচ্চিত্র মানুষের সৃষ্টির পটভূমিতে নতুন ভাষা যুক্ত করেছে। আর তাই চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনে ব্যবহৃত সবকিছু দর্শকের জন্য প্রদর্শনের উপযোগী করার উপায় ও উপকরণমাত্র। শব্দ বা বাক্যগুচ্ছ দিয়ে কথাশিল্পীর পক্ষে যে মনোরম ও উপভোগ্য সৃষ্টি সম্ভব নয়, ক্যামেরার জীবন্তচিত্র দিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র তা করতে পারে অতি সহজেই। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো চলচ্চিত্র শিল্পের ভাষা আন্তর্জাতিক, যা অন্য কোন শিল্পের এমনতর বহুজাতিকসূলভ আবেদন নেই। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনতাকে চলচ্চিত্রই পারে নিমিষে অসাড় বা আন্দোলিত করতে।

বাংলা চলচ্চিত্রের গুণগতমান ও নিজস্ব সত্ত্বা প্রসঙ্গ এলেই অনেককে বলতে শোনা যায়- উন্নত নির্মাণ প্রযুক্তি, বাজেট স্বল্পতা প্রভৃতি সীমাবদ্ধতার কথা। এ প্রসঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ সংশ্লিষ্টদের জন্য উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে রাশিয়ার চলচ্চিত্র। বিলুপ্তপ্রায় নির্মাণ প্রযুক্তি ও অতিকায় ক্ষুদ্র বাজেট দিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র দিয়ে বিশ্বব্যাপী তাদের জাতিগত মেধাসত্ত্বার পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। চলচ্চিত্র দিয়ে সংস্কৃতিগত জাতিসত্ত্বার পরিচয় দিয়েছে ফ্রান্স, জার্মান, ইতালি, ইংল্যান্ড, ইরান এমন অনেক জাতি।

হলিউডের অনুকরণপ্রবণ বাংলা চলচ্চিত্র যুগ যুগ ধরে বাঙালির স্বতন্ত্র্য জাতিসত্ত্বাকে পদদলিত করে চলেছে। অথচ বিষয়টি সবসময়ই উপক্ষিত, যেন বাংলা চলচ্চিত্রকে মহিমামণ্ডিত করার মতো আমাদের কোন নিজস্ব সংস্কৃতিই নেই। অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগেও এ নিয়ে তেমন কোন শক্ত প্রতিবাদ লক্ষ্য করি না। আর তাই প্রশ্ন ওঠে- বাঙালি কি সংস্কৃতিহীন কোন উপজাতি? না, বাঙালি সংস্কৃতিহীন উপজাতি নয়। আমাদের সংস্কৃতিগত নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের রয়েছে গ্রহনযোগ্য প্রমাণ। তবে বৃহত্তম গণমাধ্যম চলচ্চিত্রে কেন তা উপেক্ষিত?

আমরা দেখেছি- আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ভূলুন্ঠিত করতে কখনো আরব্য সংস্কৃতি, কখনো পশ্চিমা সংস্কৃতি আমদানি করা হয়েছে। আমার ভীষণ আশ্চর্য লাগে, যখন দেখি বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় অস্বীকারকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে গণতন্ত্রের দোহায় দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতি করতে দেয়া হয়। বাঙালির জাতিগত পরিচয় কোনভাবেও কোন রাজনৈতিক দলের মেন্যুফেষ্টোর আলোকে নির্ধারণের বিষয় নয়। বরং বাংলাদেশে যারা রাজনৈতিক দল করবে তারা কেন বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত হবে না- তা রাষ্ট্রের কাছে জানতে চাই। জানতে চাই- বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় অস্বীকারকারীদের রাজনীতি বাংলাদেশে কেন অবৈধ হবে না?

বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী প্রায় ৩০ কোটি। ভাষাগত সমৃদ্ধি ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা- এই উভয় দিক দিয়েই বাংলাভাষার অবস্থান বিশ্বের মধ্যে সেরা সাতে। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী বাংলা চলচ্চিত্রের একটা বৃহৎ মার্কেটপ্লেস বা ক্ষেত্র বিদ্যামান রয়েছে, শুধু এই ক্ষেত্রটাকে তৈরি করে নিতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে যাবতীয় উদ্যোগ নিতে হবে রাষ্ট্রকেই। এ দায়ভার কেবলই রাষ্ট্রের।

আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার জয়লাভ, ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপায়ন ও জাতীয় ক্রিকেট দল আমাদের একেক ধরনের গৌরবদীপ্ত অর্জন এনে দিতে পারে। কিন্তু এসব অর্জন বাঙালিকে এনে দিতে পারবে না শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা। অথচ বিশ্বমানের শিক্ষার বাস্তবায়ন ও অনুকরণহীন বাংলা ভাষাবাহিত সংস্কৃতির নিজস্ব চলচ্চিত্র সত্ত্বার অর্জন হবে স্বাধীনতা উত্তর যে কোন অর্জনের চেয়ে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। যা বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে বিশ্বদরবারে সন্দেহাতীতভাবে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে করবে সমাসীন।

 

প্রাচ্য পলাশ : চলচ্চিত্র নির্মাতা
ই-মেইল: prakritatv@gmail.com
ফেসবুক: www.facebook.com/theprachyopalash
ইউটিউব: PRAKRITA TV