ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

ক’দিন আগে মজুমদার জুয়েল এর সঞ্চালনায় টিভি চ্যানেল ‘ডিবিসি নিউজ’ এর অনুষ্ঠান ‘মুক্তচিন্তা’ দেখছিলাম। ওইদিনের পর্বের শিরোনাম ছিলো- ফুটপাত তুমি কার? রজধানী সহ সমগ্র দেশের শহরগুলোতে পাকা সড়কের পাশে জনসাধারণের জন্যে নির্মিত এই পথটিতে যখন মানুষ হাটতে পারেনা, গড়ে ওঠে নানান প্রতিষ্ঠান- এবং তার মালিকানা দাবী করেন বিভিন্ন ব্যক্তি এবং মহল, তখন এই প্রশ্নটি আসা খুবই সঙ্গত। তথ্যমতে রাজধানী ঢাকার ১৬৮ কিলোমিটার ফুটপাতের ১০৮ কিলোমিটারই বেদখলে।

ফুটপাতে  দলীয় কার্যালয়…

ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণের হিসাব অনুযায়ী, উত্তরে ৬৭টি এবং ৩৯টি অবৈধ রাজনৈতিক ও বিভিন্ন সংগঠনের কার্যালয় আছে। এর সবই সরকারি জমি দখল করে করা।
সিটি করপোরেশনের তালিকা অনুযায়ী, উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের জসীমউদ্দীন রোডে শ্রমিক লীগ, ৬ নম্বর সেক্টরের বিডিআর মার্কেটের সামনে হকার্স লীগ, খিলক্ষেত বাজারে আওয়ামী লীগ, নিকুঞ্জে শ্রমিক লীগ এবং রেললাইনের পাশে বিশ্বরোডে শ্রমিক লীগের কার্যালয় করা হয়েছে।

একইভাবে ফুটপাত ও সরকারি জায়গায় মিরপুরে সনি সিনেমা হলের পূর্ব দিকের রাস্তার পাশে, মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে, মিরপুর ১২ নম্বর বাস ডিপো, বিআরটিসি অফিসের পেছনে আওয়ামী লীগের তিনটি কার্যালয় রয়েছে। বনানী রেলক্রসিংয়ের পূর্ব দিকে সরকারি জমি দখল করে আওয়ামী লীগের কার্যালয় তৈরি করা হয়েছে। এর পাশেই শহীদ শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ নামের আরেকটি সংগঠনের কার্যালয়।

একইভাবে বনানীর চেয়ারম্যানবাড়িতে ফুটপাত দখল করে ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যানবাড়ি ইউনিট কার্যালয় তৈরি করা হয়েছে। মহাখালী রেলক্রসিংয়ের পাশে রেলের জায়গা দখল করে ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগের কার্যালয় তৈরি করা হয়েছে। আগারগাঁও বিজ্ঞান জাদুঘরের পাশে সিটি করপোরেশনের জমি দখল করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, যুবদলের আলাদা কার্যালয় করা হয়েছে।

দক্ষিণে ৩৯টি অবৈধ কার্যালয়: দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল ১-এ পরিবাগ মসজিদের সামনে রয়েছে রিকশা শ্রমিক লীগ পরিবাগের কার্যালয়। অঞ্চল ২-এর অধীনে খিলগাঁও জোড়পুকুর মাঠের সামনে বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ, সবুজবাগে আওয়ামী লীগ, রাজারবাগ বড়দেশ্বরী মন্দিরের সামনে আওয়ামী লীগ, দক্ষিণ মুগদাপাড়ায় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, স্টেডিয়ামের কাছে ওয়ার্ড ছাত্রলীগের কার্যালয় আছে।

সিটি করপোরেশনের তালিকা অনুযায়ী, অঞ্চল-৩ এলাকায় রসুলবাগ পার্ক এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের; পলাশী বাজারের ভেতরে পলাশী বাজার সমিতি ও আওয়ামী লীগের, বেড়িবাঁধ বাগানবাড়িতে যুবলীগের কার্যালয় করা হয়েছে। অঞ্চল ৪ ও ৫-এও এমন বেশ কটি কার্যালয়কে চিহ্নিত করেছে সিটি করপোরেশন। সরকারের পতিত কোনো জায়গায় প্রথমে রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের একটি সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়। কয়েক দিন পর সেখানে অস্থায়ী ঘর তুলে আড্ডা বসে। এর ফাঁকে স্থাপনা শক্ত করা হয়। ধীরে ধীরে একটি-দুটি করে আশপাশে দোকান তুলে তা ভাড়া দেওয়া হয়। আর রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে বিভিন্ন সময় এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা তোলা হয়।

গোপীবাগ রেলক্রসিংয়ের পাশে ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কার্যালয়। সরকারি জমি দখল করে এসব কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। গত সোমবার সরেজমিনে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে দেখা গেছে, দলের নেতা-কর্মীরা ওই কার্যালয়ে বসে লুডু খেলছেন।

দক্ষিণ মুগদাপাড়া ৬ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) অফিসার্স কোয়ার্টার ও ওয়াসার পানি সরবরাহ কেন্দ্রের মাঝে একটি স্থানে সরকারি জমিতে আওয়ামী লীগের সুসজ্জিত কার্যালয়। স্থায়ীভাবে সেখানে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

পরিবাগ মসজিদের সামনে ফুটপাতের ওপর টিন দিয়ে কার্যালয় নির্মাণ করেছে রিকশা শ্রমিক লীগ। পরপর দুই দিন গিয়েও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। কার্যালয়টিতে তালা লাগানো ছিল। কার্যালয়ের পাশে এক খাবারের দোকানদার বলেন, ‘আগে এইটা যুবলীগের অফিস আছিল। হেগো থাইকা শ্রমিকরা নিছে।’
মালিবাগ রেললাইনের পাশে রেলের জমির ওপর কার্যালয় নির্মাণ করেছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। সেখানে গেলে কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক রায়হান মিয়া দাবি করেন, এ কার্যালয় সরকারের অনুমতি নিয়েই করা হয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সোহরাব হোসেন দাবি করেন, তাঁদের সংগঠনের কোনো অবৈধ কার্যালয় নেই। তবে অবৈধ কার্যালয় স্থাপনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

৮২ ভাগই চলাচলের অনুপযোগী…

রাজধানীর ৪৪ শতাংশ রাস্তায় কোন ফুটপাত নেই। আর যে সব স্থানে ফুটপাত আছে তার ৮২ ভাগই চলাচলের অনুপযোগী। যে কারণে পথচারীদের হাঁটতে গিয়ে নানা রকম বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, গাজীপুর, পুরাতন ঢাকাসহ ৬টি এলাকায় পরিচালিত গবেষণার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, নগরীতে অধিকাংশ মানুষ হেঁটে যাতায়াত করলেও নগর পরিকল্পনায় হাঁটাকে প্রাধান্য না দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। ফলে ঢাকা শহর আজ যানজটের শহরে রুপ নিয়েছে। একই সঙ্গে শহরে জ্বালানী দূষণ ও দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কারণে হুমকির সম্মুখিন হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ। জনমত জরিপের উদ্বৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, নগরে চলাচলকারী প্রায় ৭৯ শতাংশ মানুষ যানবাহনের গতিকে বিপদজনক মনে করেন। তারা পথচারীর নিরাপদে ও স্বচ্ছন্দে হাঁটার পরিবেশ তৈরিতে ফুটপাতকে প্রাধান্য দিয়ে রাস্তা নির্মাণ, ফুটপাত থেকে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর, রাতের বেলায় বাতির ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টয়লেট ব্যবস্থা করার কথা বলেন। আরো বলা হয়, যাতায়াতের মূল উদ্দেশ্য গাড়ি নয়, মানুষ ও মালামাল একস্থান হতে অন্য স্থানে পরিবহন করা। কিন্তু পরিকল্পনায় গাড়িকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমরা শহরকে অনিরাপদ করে ফেলেছি। ক্র্যাচ, সাদা ছড়ি ও হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিও উপেক্ষিত হচ্ছে। তাই পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা জরুরি। সভায় বক্তারা বলেন, হাঁটার জন্য ফুটপাতকে দখলমুক্ত করতে হবে। যানজটমুক্ত শহর গড়ে তুলতেও ফুটপাতকে হাঁটা-চলার উপযোগী করা প্রয়োজন। বর্তমানে ফুটপাতগুলো জনগণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহার উপযোগী নয়।

 ভুল নকশায় চলাচল অযোগ্য  ফুটপাত…

খামারবাড়ির টিঅ্যান্ডটি মাঠ থেকে তেজগাঁও কলেজ পর্যন্ত ফুটপাতটির বেশকিছু অংশ ভাঙা। কোথাও কোথাও প্রস্থ পাঁচ ফুটেরও কম। ফুটপাতটি ধরে ফার্মগেটের দিকে কিছুটা এগোতেই রাজধানীর সবচেয়ে বড় ফুট ওভার ব্রিজগুলোর একটির অবস্থান। এর বিশাল সিঁড়ি দখল করে আছে সড়কের দুই পাশের ফুটপাত।

ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ার পরও মতিঝিলের ফুটপাতগুলোর প্রস্থও পাঁচ ফুটের কম। স্বল্প প্রশস্তের এ ফুটপাতগুলো আবার হকারদের দখলে।

ফার্মগেট-মতিঝিলই শুধু নয়, একই অবস্থা পুরো রাজধানীর অধিকাংশ ফুটপাতেরই। কোথাও প্রস্থ কম, কোথাও আবার মূল সড়ক থেকে ফুটপাতের উচ্চতা অনেক বেশি। ফুটপাতের ওপর রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিলবোর্ড। রয়েছে ফুটওভার ব্রিজ, ডাস্টবিন ও ম্যানহোল।

ফুটপাতের এ ভুল নকশায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে পথচারীদের। যদিও রাজধানীর প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ যাতায়াত করে হেঁটে, ফুটপাত দিয়ে।

রাজধানীর মোট ট্রিপের (যাতায়াত) প্রায় ১৮ শতাংশ হয় হেঁটে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তৈরি ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানের খসড়া অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে মোট ট্রিপ হয় প্রায় সাড়ে তিন কোটি। এর মধ্যে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ হয় হেঁটে। বাকি ট্রিপের ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয় ব্যক্তিগত গাড়িতে, ৩৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ বাসে, ৩৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ রিকশায়, দশমিক ২৫ শতাংশ রেল ও নৌপথে এবং দশমিক ১৪ শতাংশ অন্যান্য মাধ্যমে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার প্রায় কোনো অঞ্চলেই সঠিক পরিকল্পনায় ফুটপাত হয়নি। রাজধানীর অধিকাংশ ফুটপাতই সড়ক থেকে দেড় ফুটের বেশি উঁচু। যদিও সারা বিশ্বে তা ৬-৯ ইঞ্চি হয়ে থাকে। প্রস্থেও আদর্শ মানের চেয়ে কম রাজধানীর অধিকাংশ ফুটপাত।

আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, ফুটপাতে হাঁটার অংশটি এমন হবে, যাতে দুজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী পাশাপাশি চলতে পারে। এছাড়া চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়, এমন কোনো প্রতিবন্ধকতাও সেখানে থাকতে পারবে না।

রাজধানীর বিভিন্ন ফুটপাত ঘুরে দেখা যায়, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ধানমন্ডি সাতমসজিদ সড়ক পর্যন্ত ফুটপাতটিতে হাঁটাও দুষ্কর। উঁচু-নিচু, ভাঙাচোরা ফুটপাতের ওপরই রয়েছে বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম বুথ।

আমাদের দেশে ফুটপাত নির্মাণের পরিকল্পনা ও নকশায় বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। ফুটপাতগুলোর কোথাও উঁচু, কোথাও আবার নিচু। এছাড়া ফুটপাত দখল করে নানা স্থাপনাও রয়েছে। এতে পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচল সম্ভব হয় না। এ সমস্যা সমাধানে এখন যেটা প্রয়োজন, তা হলো সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ।

বাণিজ্যিক অঞ্চলের ফুটপাতের জন্যও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পৃথক আদর্শ মান রয়েছে। আইটিডিপির তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক অঞ্চলে ফুটপাতের মূল অংশের (চলাচলের জন্য) প্রস্থ হবে ন্যূনতম ৮ দশমিক ২ ফুট। এর সঙ্গে ফ্রন্টেজ ও ফার্নিচার জোন যোগ করলে বাণিজ্যিক অঞ্চলে ফুটপাতের প্রস্থ হবে কমপক্ষে ১৬ দশমিক ৮ ফুট। অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক অঞ্চলের জন্য ফুটপাতের মূল অংশের প্রস্থ হবে ১৩ দশমিক ১২ ফুট। ফ্রন্টেজ ও ফার্নিচারসহ এ ধরনের বাণিজ্যিক অঞ্চলে ফুটপাতের প্রস্থ হবে ন্যূনতম ২১ দশমিক ৩ ফুট।

ভুল নকশার পাশাপাশি রাজধানীর ফুটপাতগুলো চলাচলের অনুপযোগী হওয়ার আরো কিছু কারণ রয়েছে। ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানেও বিষয়টি উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রধান সমস্যা হচ্ছে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা। এতে অপ্রশস্ত ফুটপাতগুলোর ধারণক্ষমতা আরো কমে আসছে। এছাড়া ফুটপাতজুড়ে রাখা হচ্ছে নির্মাণসামগ্রী। রিকশাস্ট্যান্ড ও যানবাহনের গ্যারেজ হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে কোনো কোনো ফুটপাত। রয়েছে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলও।

ফুটপাত যে কারণে দখলমুক্ত করা যাচ্ছেনা…

সরকারের প্রচেষ্টা, সিটি করপোরেশন মেয়রদের নানামুখি তৎপরতার পরও দখলমুক্ত হচ্ছে না রাজধানী ঢাকার ফুটপাত। উল্টো দিনের পর দিন অবৈধ দখলদারদের কব্জায় যাচ্ছে ঢাকার ফুটপাতগুলো। বসানো হচ্ছে বিভিন্ন দোকানপাট। ফুটপাতে দোকান বসানোর নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, দুই সিটির অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পুলিশের কতিপয় দুর্নীতিবাজ সদস্য। বিনিময়ে প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক চাঁদা হিসেবে তারা নিচ্ছেন ৫০ থেকে ১৫০ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ২৫০ টাকা।

দেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের বিপরীত পাশের ওসমানী উদ্যান সংলগ্ন সড়কের ফুটপাতে বসানো হয়েছে সারি সারি দোকান। মূল সড়কে ভ্যানে সাজিয়ে রেখেছেন নানা পসরা। প্রেসক্লাব ও সচিবালয় সংযোগ সড়কটির ফুটপাতেরও একই অবস্থা। কিছুদিন আগেও তিন থেকে চারটি দোকান দেখা গেলেও এর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্রের আশপাশের এলাকার যদি এই অবস্থা হয়, রাজধানীর অন্যান্য অঞ্চলের অবস্থা তাহলে কী সহজেই তা অনুমেয়।

ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোয় সবচেয়ে ভোগান্তির শিকার জন্য শান্তিনগর, মৌচাক-মালিবাগ ও মগবাজারে যাতায়াতকারী পথচারীরা। প্রায় তিন বছর ধরে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ চলছে। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি রাস্তার ওপর রাখায় আয়তনে ছোট হয়ে এসেছে অনেকটাই। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। শান্তিনগর টুইন টাওয়ার সংলগ্ন মূল সড়কেই জমে থাকে বৃষ্টির পানি। রাস্তার দুই পাশে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ম্যানহোল থাকলেও ঢাকনা নেই বেশির ভাগের। অথচ ওই সড়ক দিয়েই প্রতিদিন যাতায়াত করে অসংখ্য গণপরিবহন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানজট লেগেই থাকে। যাত্রীদের পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনে আটকা থাকা যাত্রীরা নেমে হেঁটে গন্তব্যস্থলে যাবেন তারও উপায় নেই। রাস্তায় হাঁটু পানি, ফুটপাতে দোকানের সারি। হাঁটার বিন্দুমাত্র জায়গা নেই। অবস্থা এমন- জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এসব এলাকায় আসতেই চান না অনেকে।

ঢাকার সবচেয়ে জনবহুল এলাকা ফার্মগেটকেও হকারমুক্ত করতে কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়। অভিযানের সময় ফুটপাত দখলমুক্ত হলেও ভ্রাম্যমাণ আদালত চলে যাওয়ার পরপরই পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। বিশেষ করে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে থেকে শুরু করে সেজান পয়েন্ট ও তেজগাঁও কলেজের সামনে ফুটপাত ও মূল সড়কের অর্ধেক দখল করে একটির পর একটি দীর্ঘ সারিতে বসানো হয়েছে দোকান। স্বস্তিতে হেঁটে যাওয়ার উপায় নেই।

ঢাকার অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত উত্তরার হাউস বিল্ডিং ও বিভিন্ন আবাসিক এলাকার মূল রাস্তার মাঝখানে দেখা গেল হকারদের ভ্যানের দীর্ঘ সারি। হকাররা ভ্যানে করেই বিক্রি করছেন নানা পসরা। উত্তরার বিভিন্ন সেক্টর ছাড়াও এ অবস্থা বিরাজ করছে আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডিতে। দেখা গেছে, রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে ইত্তেফাক মোড়, রাজধানী সুপার মার্কেট, ডিআইটি মোড়, দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত। দৈনিক বাংলার মোড় থেকে ফকিরাপুল পানির ট্যাঙ্কি হয়ে ফকিরাপুল মোড়। ফকিরাপুল মোড় থেকে নয়াপল্টন হয়ে কাকরাইল মোড়। পল্টন মোড় থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট, জিপিও, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, গুলিস্তান, ফুলবাড়ীয়া পর্যন্ত, পল্টন মোড় থেকে তোপখানা রোড হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাব, বিজয়নগর পর্যন্ত সড়কগুলোর দুই পাশে সারি সারি করে বসানো হয়েছে বিভিন্ন দোকানপাট। এ ছাড়াও রাজধানীর নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, আজিমপুর, লালবাগ, সদরঘাট, লক্ষীবাজার, তাঁতী বাজার, বাবু বাজার, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও রেলগেট, কমলাপুর, মুগদা, বাসাবো, মাদারটেক, রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুর, কাজীপাড়া, গাবতলী, শ্যমলী, আদাবরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে অসংখ্য দোকানপাট।

জানা গেছে, রাজধানীর এসব ফুটপাত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের হলেও বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণ করছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, প্রভাবশালী মহলসহ স্থানীয় মাস্তান প্রকৃতির কিছু লোক। প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছেন তারা। চাঁদার বড় একটি অংশ যায় দুই সিটির সম্পত্তি বিভাগের অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পুলিশের কতিপয় দুর্নীতিবাজ সদস্যের পকেটে।

ফুটপাত দখলে ‘প্রভাবশালী মহল’…

দুই সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে ১৬৩ কিলোমিটার ফুটপাতের মধ্যে ১০৮ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ফুটপাতই রয়েছে প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে। এছাড়া নগরীর ২ হাজার ২৮৯ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৫৭২ দশমিক ৪২ কিলোমিটার সরকার দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় বসেছে পণ্যের পসরা। পথচারীরা বিড়ম্বনায় পড়ছেন প্রতি পদে পদে।

রাজধানীর ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে পসরা সাজানো হকারদের কাছ থেকে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা পরিচয়ে ফুটপাতের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নানা ধরনের পণ্যসামগ্রীর দোকান থেকে তোলা হচ্ছে এই বিপুল পরিমাণ চাঁদার অর্থ। এই চাঁদার ভাগ পাচ্ছেন আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তা। একাধিকবার সিটি কর্পোরেশনের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও পরে আবারও ফুটপাত চলে যাচ্ছে হকারদের দখলে।

ফুটপাতের বেহালদশা…

মিরপুরের ১ নম্বর থেকে শুরু করে ১৪ নম্বর পর্যন্ত। আবার ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে পল্লবী পর্যন্ত সড়কের ফুটপাত দখল করে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে দোকানিরা। এছাড়া মিরপুর দশ নাম্বার গোল চত্বরে চারপাশের ফুটপাতে  ফলমুল কাপড় জুতা সহ বিভিন্ন দ্রব্র সামগ্রীর বিশাল বাজার। হাটার কোনো জায়গা নেই। ১০ থেকে ১, ১০ থেকে ১৪, ১০ থেকে ১১, কাজিপাড়ার দিকে দুই ধার। কাজি পাড়া, শেওড়া পাড়ার দুই পাশের ফুটপাত দখল করে নানান দোকানপাট। তালতলায় বিমান বাহিনীর যাদুঘরের আগের ফুটপাতে রীতিমতো নার্সারি বসে গেছে। মিরপুর ১ নম্বর থেকে মাজার রোড পর্যন্ত মূল সড়কের প্রায় অর্ধেকটা দখল করে পসরা সাজিয়ে ব্যবসা চলছে। আর শাহবাগের পাশেই আজিজ সুপার মার্কেট থেকে এলিফ্যান্ট রোডের সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড় পর্যন্ত সড়কের দু’ধারেই এখন ফুটপাত বাণিজ্যের দখলে। সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড় থেকে দক্ষিণে ঢাকা কলেজ হয়ে নীলক্ষেত পর্যন্ত সড়কটির ফুটপাতে আছে। গাউছিয়া থেকে এলিফ্যান্ট রোডের ভেতরের পুরো সড়কটিই দখলে নিয়েছে দোকানিরা।

গুলশান বনানীর অভিজাত এলাকায়ও ফুটপাতে অবৈধ দোকান বসছে। মালিবাগ থেকে রামপুরা সড়কেও আছে ফুটপাতের দোকান। কারওয়ানবাজারও প্রায় ফুটপাতের দোকানিদেরই দখলে। ফার্মগেট থেকে শুরু করে দক্ষিণে গ্রিন রোড,পশ্চিমে ইন্দিরা রোডের মাথা পর্যন্ত ফুটপাতের দোকানিরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গলি থেকে শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে, সোনালী ব্যাংকের সামনে থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়ক দোকানিদের নিয়ন্ত্রণে। বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর পাশ থেকে পুরানা পল্টন মোড় হয়ে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত সড়কের উত্তর পাশ, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের প্রায় পুরোটা, নবাবপুরে রোডসহ পুরান ঢাকার অলিগলির ফুটপাত দখল হয়ে গেছে।

ফুটপাত দখলের কারণে জ্যাম…

ফুটপাত ধরে মানুষ হাটার কথা থাকলেও সেখানে মানুষকে হাটতে হয় রাস্তা দিয়ে। আবার রাস্তায় পার্ক করা গাড়ির কারণে তিন ভাগের দুই ভাগ রাস্তাতে গাড়ি চলাচল করতে পারেনা। ফলে সৃষ্টি হয় জ্যাম।

উচ্ছেদের পর পরই দখল…

সম্প্রতি রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় ঢাকা দক্ষীণ সিটি কর্পোরেশনের উদেোগে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু লক্ষণীয় যে পরদিনই এলাকাটিতে একই চিত্র ফিরে আসে।

একই ভাবে ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি উদ্যোগে মালিবাগ-মৌচাকের ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। ভেঙে দেয়া হয় ফুটপাতের দোকানগুলো। কয়েকজন হকারকে আর্থিকভাবে জরিমানা করা হয়। চলে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ফিরে আসে আগের অবস্থায়।

ঢাকার সবচেয়ে জনবহুল এলাকা ফার্মগেটকেও হকারমুক্ত করতে কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়। অভিযানের সময় ফুটপাত দখলমুক্ত হলেও ভ্রাম্যমাণ আদালত চলে যাওয়ার পর পরই আগের অবস্থায় ফিরে আসে। বিশেষ করে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে থেকে শুরু করে সেজান পয়েন্ট ও তেজগাঁও কলেজের সামনে ফুটপাত ও মূল সড়কের অর্ধেক দখল করে একটির পর একটি দীর্ঘ সারিতে বসানো হয়েছে দোকান। স্বস্তিতে হেঁটে যাওয়ার উপায় নেই।

এলাকাবাসীরা জানান, উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার আগেই হকাররা খবর পেয়ে যান। বেশিরভাগ হকারই উচ্ছেদের খবর পেয়ে দোকানগুটিয়ে নেন। যারা থাকেন তাদের জরিমানা করা হয়। উচ্ছেদ অভিযান যদি সকালে হয় তাহলে সন্ধ্যার মধ্যেই আবার দোকানপাট বসে যায়।

উপসংহার…

রাজধানী ঢাকা শহরের ফুটপাত দখল সমস্যা এক দিনে কিংবা এক মাসে সমাধান করা যাবেনা। এর জন্যে সমন্বিত পরিকল্পনার  প্রয়োজন আছে। তা না হলে সামাজিক, আইন শৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক অস্থীরতার ঝুঁকি রয়েছে। ঢাকার ফুতপাত দখল এর পেছনে অনেক রাঘব বোয়ালরা জড়িত।পাড়ার মাস্তান, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন এমনকি অনেক এমপি, মন্ত্রী, সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারি এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কোনো কোনো অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ফুটপাত থেকে উপার্জিত অর্থের ভাগ পান বলে কথিত আছে। সুতরাং রাজধানীর ফুটপাতকে দখলমুক্ত করার জন্যে বিশদ পরিকল্পনার পাশাপাশি সরকারের নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।

(লেখাটি প্রস্তুতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য উপাত্ত সংকলন করা হয়েছে।)

slide