ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও যদি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রমাণ দিতে হয় তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন- জাতির জন্যে এর চেয়ে দূর্ভাগ্যজনক এবং লজ্জাজনক কী হতে পারে? বিশ্বের দরবারে যেমন আমাদের গৌরব আছে তেমনি লজ্জাও আছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর প্রায় অর্ধশত বছর অতিক্রান্তের পরও মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই বাছাই করতে হয়, সেটাও তেমনি একটি লজ্জাজনক বিষয় বটে।

1237145_10202159419888591_400513184_n

(আমার বাবা এম এ খালেক এবং মা নুরজাহান বেগম।)

সপরিবারে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা যখন স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের হাতে চলে যায়, তখন থেকেই ভূলুন্ঠিত ও বিকৃত হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান ইতিহাস। ঠিক তখন থেকেই অনেক রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা সেজে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা নিয়েছে আর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার কপালে জুটেছে ভিক্ষার ঝুলি। অনেকেই অবহেলা অনাদরে চলে গেছেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। আর সে কারণেই সম্ভবত সর্বশেষ এই জরিপ।

সারা দেশের হাজার হাজার বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মতো আমিও একজন হতভাগ্য মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমার বাবার বয়স বর্তমানে প্রায় আশি। তাঁর নাম এম এ খালেক। (বাঘ মার্কা নিয়ে একসময় স্থানীয় সাংসদ পদে লড়েছিলেন বলে নোয়াখালীতে অনেকে তাঁকে বাঘ খালেক বলে চিনেন) মুক্তিযুদ্ধের সময় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকালে তিনি রাজাকারদের হাতে আটক হয়ে নোয়াখালী বেগমগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হানাদার ক্যাম্পে নির্মম অত্যাচার সহ্য করেছিলেন। সেখান থেকে বন্দী হিসেবে মাইজদী পিটিআই ক্যাম্পে স্থানান্তর করার সময় পালিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করেন।

তিনি নোয়াখালী জেলা বিএলএফ প্রধান মাহমুদুর রহমান বেলায়েত ওসি জোনের কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোশারেফ হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের দাপ্তরিক এবং তহবিল সংগ্রহের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। সেই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো বেতার যোগাযোগ উপকরণ ছিলোনা। আমার বাবা শীর্ষ কমান্ডারদের বিভিন্ন তথ্য, আদেশ, পরামর্শ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো বাইসাইকেল চড়েই বাবা প্রতিদিন শত মাইল পাড়ি দিতেন। বহুবার সশস্ত্র যুদ্ধের ট্রেনিংয়ের জন্য ভারতে যেতে চাইলেও তাঁকে কমান্ডাররা যেতে দেননি সাংগঠিক কাজে ব্যাঘাত ঘটবে বলে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রসদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি চাষীদের সাথে নিজেও ধান কেটেছেন, বস্তা কাঁধে নিয়ে পরিবহন করেছেন, বাজারে বিক্রি করেছেন এবং সেই টাকা তহবিলে জমা দিয়েছেন।

বাবা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের একজন ছিলেন বলে আমার চাচা প্রয়াত আবদুল হককে স্থানীয় খলিফারহাট ক্যাম্পে আটকে রেখে রাজাকার কর্তৃক অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিলো। পরবর্তিতে তাঁর শিক্ষক খলিফার হাট আলিয়া মাদ্রাসার তৎকালিন অধ্যক্ষ নুরুল আমিন আতিকী  মুচলেকা দিয়ে সেনা ক্যাম্প থেকে তাঁকে মুক্ত করেন। আমি ছিলাম তখন দুগ্ধপোষ্য শিশু। সুতরাং যা লিখছি আমার মা, বাবা, এবং প্রয়াত দাদা এবং চাচার কাছে শোনা।

শুনেছি, আমাদের বাড়ি আক্রমণ হবে জেনে মা আমাকে নিয়ে হায়দর মিয়ার হাট সংলগ্ন আমার নানার বাড়িতে চলে যান। নানার বাড়ি ছিলো বাজার সংলগ্ন। সেই বাজারেও পাক বাহিনী আগুন দেয়। তখন আমাকে নিয়ে আমার মা পাশের কেওড়া বনে  লুকিয়েছিলেন। জোঁকে মার সারা শরীর ছেয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু মা আমাকে বুকে চেপে এক কোমর পানিতে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে ছিলেন, যতক্ষণ না শত্রুবাহিনী এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত ছিলেন- তখন তাঁর হাত দিয়ে শত শত ‘মুক্তিযোদ্ধা সনদ’ সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু বাবা নিজের জন্য একটা ‘সনদ’ লিখে রাখেননি।

এর আগে বহুবার যাচাই বাছাই হয়েছে। একবার নাম আসে তো আরেকবার আসেনা। অথচ তিনি ‘ সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা বহুমুখী সমবায় সমিতি ‘ গঠন করে বহু ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধাকে খাস জমি পাইয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের নামে এক ইঞ্চি জায়গা নেননি। নোয়াখালীতে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল এর আহবায়ক হিসেবে কাজ করার জন্যেও কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল থেকে তাঁর নামে চিঠি এসেছিলো একবার। পরবর্তিতে বিরোধী পক্ষ আরেকটি কমিটি করায়। বলা প্রয়োজন নোয়াখালী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল এ বরাবরই দুটি গ্রুপ সক্রীয়। একটি বিএনপি পন্থী আরেকটি আওয়ামিলীগপন্থী এবং চরম পরিহাস এইযে- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যে দলই আসুকনা কেন, নোয়াখালীতে বিএনপি পন্থীরাই সব সময় শক্তিশালী। আমার বাবা সব সময়ই এইসব প্রতিক্রীয়াশীলদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন; কারণ, তিনি আওয়ামীলীগ করেন এবং তিনি বঙ্গবন্ধুর অন্ধ ভক্ত। এই বৃদ্ধ বয়সেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনলে আবেগে তাঁর শরীর থরথর করে কাঁপে, গামছা দিয়ে চোখ মোছেন। যতদিন বঙ্গবন্ধুর বিচার হয়নি তিনি কেঁদেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্য হওয়ার পরেও তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াতে দেখেছি।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হয়ে গেছে, এখনও তিনি মুক্তিযোদ্ধার সনদ পাননি। তাঁর সহযোদ্ধাদের অনেকেই আজ পরপারে। কথিত আছে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ একাত্তরে রাজাকার ছিলেন বা রাজাকার পরিবারের সদস্য ছিলেন। তারাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সব সময় কোনঠাসা করে রেখেছেন, আর অনেক রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধা সাজিয়ে রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন এবং এখনও করছেন।

শৈশবের একটি স্মৃতিকথা মনে পড়ছে। তখন মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আহাদ চৌধুরী। বাবা শুনলেন কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি দেয়া হচ্ছে। তিনি জেলা কমান্ড থেকে একটি ফরম সংগ্রহ করে আমাকে পাঠালেন নোয়াখালীর তৎকালিন মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার মোজাম্মেল হক মিলন এর কাছে প্রতি স্বাক্ষর নিতে। নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদ মার্কেট এর একটি দোকানে বসা অবস্থায় তাঁকে খুঁজে পেলাম, তাঁর সাথে বসেছিলেন ‘রফিক‘ নামক একজন ব্যক্তি যিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবী করেন এবং ঘটনার ক’মাস আগেও ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতি নিয়ে বাবার পেছনে পেছনে ঘুরতে দেখেছি। তারও আগে এই লোকটি প্রবাস থেকে বাবাকে চিঠি লিখতেন, তার কষ্টের প্রবাস জীবনের কথা জানাতেন। বাবা তাকে অভয় দিতেন, দেশে এসে কাজ করার জন্যে উপদেশ দিতেন। একদিন তার একটি চিঠি এলো তৎকালীন মাইজদীর থানা কাউন্সিল সংলগ্ন আমাদের টিনের ভাড়া বাসায়। সেখানে তিনি লিখেছিলেন ‘ভাই, আমি দেশে আসতেছি, আসার সময় ছেলেদের জন্যে একটি রঙ্গিণ টিভি নিয়ে আসবো।’ চিঠি পড়ে আমাদের সে কি আনন্দ! মনে পড়ে আমরা পুরো চিঠির ওই একটি অংশ বারবার পড়তাম আর উল্লাসে মেতে উঠতাম।

এক সময় রফিক কাকা এলেন ঠিকই, কিন্তু রঙিন টিভিটা আর এলোনা। বাবা তাকে সাথে রেখে নানা কাজে লাগাচ্ছিলেন। আমরা খুব অবাক হয়েছিলাম .. একটা লোক কথা দিয়ে কেন কথা রাখলোনা? আজ আমাদের প্রতিটি ভাইবোনের আলাদা বাসায় রঙ্গিণ টিভি। কিন্তু শৈশবে দিনের পর দিন উদ্বেগ, উচ্ছাস নিয়ে অপেক্ষায় থাকার পর ওই  টিভিটা না পাওয়ার কষ্টটা আজও ভুলতে পারিনি।

মাঝে মাঝে মনে হয় বাবার মুক্তিযুদ্ধের সনদটাও যেন সে রকম একটা ‘রঙ্গিন টিভি’ হয়ে গেছে। সেদিন ভাঙ্গা সাইকেল চালিয়ে পুরো শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে ইউনিট কমান্ডার মিলন চাচাকে খুঁজে বের করেছিলাম। সালাম দিয়ে বিষয়বস্তুটি জানানোর পর খেঁক করে উঠলেন পাশে থাকা ‘রফিক কাকা’। আমাকে বললেন- ‘এই… তোর বাবা কবে মুক্তিযুদ্ধা আছিলো? কোন ফ্রন্টে যুদ্ধ করছে, তোর বাবা অস্ত্র চালাইছে?’ আমার শিশু বুকটা তখন ধক করে উঠেছিলো। এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা ছিলোনা যে- অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করলে কি করে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়? সত্যিই তো, বাবা কোন ফ্রন্টে যুদ্ধ করেছিলেন, তিনি কোন অস্ত্র চালিয়েছিলেন, এসব তো আমি জানিনা। এক বুক জ্বালা নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। সত্যি বলতে কি এই জ্বালাটা বহুদিন ধরে বুকের ভিতরে সুপ্ত ছিলো। মাঝে মাঝেই শিশু মনে জ্বালা ধরাতো। কিন্তু বাবাকে প্রশ্ন করে বিব্রত করতে চাইনি। অনেক দিন পর সেই জ্বালা কিছুটা হলেও নিভেছিলো.. যখন জানতে পারি বাবা ছিলেন একজন সংগঠক, এবং এও বুঝতে পেরেছিলাম যে- একটা শক্ত দক্ষ সাংগঠনিক শক্তি পেছনে কাজ না করলে এতো বড়ো যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ী হওয়া সম্ভব ছিলোনা।

সেদিন রফিক কাকাকে উত্তরটা দিতে পারিনি। আজ দিতে ইচ্ছে করছে- ‘সংগঠক হয়ে আমার  বাবা যদি মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে থাকেন, তাহলে প্রয়াত সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ মনসুর, কামারুজ্জামান, তোফায়েল আহমেদ, এইচটি ইমাম, এমনকি মাহমুদুর রহমান বেলায়েত এর মতো হাজারো সংগঠক, মুখপাত্র, কন্ঠযোদ্ধা কিংবা স্বাধীনতার ঘোষক এবং বাঙালির স্বাধীকার সংগ্রামের মূল হোতা ও সংগঠক বঙ্গবন্ধু নিজেও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। মুক্তিযোদ্ধা নন সেই সব মানুষ যারা সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, খাবার দিয়েছিলেন, শত্রুর হাতে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন, অত্যাচার-নির্যাতন সয়েছিলেন, পাক হানাদেরদের কাছে আব্রু বিসর্জন দিয়েছিলেন, গোয়েন্দাবৃত্তি করেছিলেন, অপারেশনে পথ দেখিয়েছিলেন, নথিপত্র সম্পাদন করেছিলেন, দেশে এবং বিদেশে যোগাযোগ, প্রচার ও প্রকাশনার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তারা মুক্তিযোদ্ধা নন, তাদেরকে সনদও দেয়া যাবেনা। কারণ, তাঁরাতো রণাঙ্গণে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি।’

একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার বাবা রাষ্ট্রের কাছে কোনো সুবিধা চাননা, আমরাও চাইনা। আমরা তাঁর আট ছেলেমেয়ে আল্লাহর রহমতে সবাই শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। আমার বাবা আমাদের মধ্যে ৫ ভাইবোনকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্য করিয়েছেন, বাকিরাও সেই পথে। আমরা কারও সহযোগিতা ছাড়াই এ পর্যন্ত এসেছি। আমরা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্র থেকে কোনো সুযোগ নেইনি, চাইও না। শুধু চাই সেই গর্বের অংশীদার হতে। যে আশায় আমার বাবা এখনও বেঁচে আছেন, শুধু চান গৌরবজ্জ্বল সেই কাজের যৌক্তিক স্বীকৃতি, যে গৌরব বয়ে বেড়াবে তাঁর বংশধরেরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

লেখকঃ গণমাধ্যমকর্মী।