ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

 

গত বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ছিলো দেশের পাইওনিয়ার অনলাইন সংবাদ মাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর অন্যতম অনলাইন প্রকাশনা ‘ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’ এর ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটি আয়োজন করে তাঁদের মূদ্রণ সংকলন ‘নগর নাব্য’ এর চলতি সংখ্যার বিষয়বস্তুকে ঘিরে নগর প্রধান বনাম নাগরিক সাংবাদিকদের মুখোমুখি প্রশ্নোত্তর পর্ব। যেখানে অন্যান্যের পাশাপাশি আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিলো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এর সদ্য পুনঃ নির্বাচিত মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর। কিন্তু যে কোনো কারণে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি মেয়র আইভী। তবে উপস্থিত থেকে নাগরিকদের নানান প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র জনাব সাঈদ খোকন। তাকে ধন্যবাদ এবং অভিবাদন।

‘নগর নাব্য’ এর চলতি সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের নানাবিধ নাগরিক সমস্যা ভিত্তিক রচনা দিয়ে। যেগুলি ইতোপূর্বে ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে অন্যান্য সিটি করপোরেশনের সমস্যার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমস্যা নিয়ে ‍দুটি রচনা ঠাঁই পেয়েছে। যার দু’টিরই রচয়িতা নিতাই বাবু।

নিতাই বাবুর সাথে আমার পরিচয় হতোনা যদিনা আমি বিডিনিউজ এর ব্লগে না লিখতাম। তিনি আমার পরে লেখালেখি শুরু করলেও তাঁর লেখার সংখ্যা আমার চাইতে অনেক বেশি। আমি অনিয়মিত হলেও তিনি বিরামহীন। পরস্পরের প্রকাশিত রচনার নীচে পাঠকদের মন্তব্য লেখার ঘরে মন্তব্য লেখার সূত্র ধরেই তাঁকে চিনি। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে যাওয়া নাগরিক সাংবাদিকদের মিলনমেলায় খুব কাছে থেকে তাকে দেখার এবং অনুধাবন করার সুযোগ ঘটেছিলো। সেই থেকে আমরা অভিন্ন হৃদয়।

নাগরিক সম্মাননা ২০১৭’ হাতে সতীর্থদের মাঝে গর্বিত নিতাই বাবু।

নিতাই বাবু সম্পর্কে যদি মূল্যায়ন করতে যাই তাহলে তিনি ধর্ম বিচারে সনাতনী অথচ সেকুলার। বয়সে প্রবীণ, পেছনের পুরোটা জীবন কেটেছে নিদারুণ অর্থকষ্ট এবং সামাজিক অমর্যাদায়। তিনি একজন সন্তান হারা পিতা। একমাত্র পুত্র সন্তানকে হারিয়েছেন; যে ছিলো কলেজ পড়ুয়া ছাত্র। ‘মায়ের শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে সিলিংয়ের সাথে ঝুলে ছেলেটি আত্মহত্যা করেছে, নাকি হত্যা করা হয়েছে ছেলেটাকে’- দীর্ঘ ৬ বছর কেটে যাওয়ার পরও পিতা জানেন না।

শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের চিমনীর কালো ধোঁয়ার মতোই এখনো মাঝে মাঝে উড়ে যায় নিতাই বাবুর দীর্ঘশ্বাস। ছেলেটা মাঝেমধ্যেই এটা সেটা বায়না করতো কিন্তু দিতে পারতেন না, তার ধারণা মাত্র ১০০ টাকা চেয়ে বাবার কাছে না পেয়ে অভিমানে ছেলেটি আত্মহত্যা করেছে, পিতা হিসেবে সেই ব্যর্থতার অনুশোচনা আজও তাকে কাঁদায়। তার চোখের জল গড়িয়ে যায় শীতলক্ষ্যার কালো জলে।

সন্তান হারানোর দুঃসহ স্মৃতি, বয়সের ভার, দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাত আর সমাজের অবহেলিত সংখ্যালঘুর তকমার জ্বালায় দিনে দিনে বধির হতে চলেছেন এই মানুষটি। চারপাশের অনিয়ম দেখতে দেখতে আজ তাঁর চোখ ঝাপসা। কালো লিকলিকে এই শরীরটা বুঝি আর বইতে পারছেনা যাপিত জীবনের ভার। তবুও…

তবুও বিস্মিত হতে হবে এই মানুষটার ঈর্ষা জাগানিয়া প্রাণশক্তি দেখে। কি করে যেন তিনি এতো দুঃখ, অপমান, সব কিছুকে অগ্রাহ্য করে আজও টিকে আছেন, সেও এক অপার রহস্য বটে।

১৬ ফেব্রুয়ারি অকুস্থলে ঢুকে প্রথমেই নিতাই বাবু। পরণে দুগ্ধ ধবল পোশাক। প্যান্ট শার্ট দুটোই সাদা। এ যেন কালো চামড়া ভেদ করে তাঁর অন্তরের দ্যুতিটাই ছড়িয়ে আছে এভাবে। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন। আমিও ভাবছি- নিতাই বাবু যখন এসেছেন সুতরাং আজকের উৎসব পরিপূর্ণ। আমাদের সবার শ্রদ্ধার, ভালোলাগার, ভালোবাসার মানুষ নিতাই বাবু। শত প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা আমাদের নিতাই বাবু। নিতাই বাবুর কথা ভাবলেই মনে হয় দুঃখ কীভাবে অবহেলা করতে হয়, খুব অল্প পরিসরে থেকেও কি করে জীবনকে রাজকীয় অনুভবে উপভোগ করতে লাগে।

নিতাই বাবু দীর্ঘদিন ধরে তাঁর প্রিয় শহর নারায়ণগঞ্জ নিয়ে বিডিনিউজ ব্লগে প্রচুর লিখেছেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি‘১৭ লিখেছেন-  নারায়ণগঞ্জের নগর ভবন সৌন্দর্য হারাচ্ছে ট্রাক আর ঠেলাগাড়ির কারণে!’ ২ ফেব্রুয়ারি’১৭ লিখেছেন ‘তল্লাশিতে বোঝা দায়- পুলিশ গাঁজা খোঁজে না হেরোইন?’ ২৭ জানুয়ারী’১৭ তারিখে প্রকাশিত লেখার শিরোনাম ছিলো ‘শীতলক্ষ্যা নদীর কুচকুচে কালো পানি।’ ২৫জানুয়ারী’১৭, এদিন প্রকাশিত হয়েছে- ‘ভিক্ষা করা খারাপ কাজ, বললেন এছাক মিয়া!’ এর আগে ৭ জানুয়ারি লিখলেন- স্কুলে পড়বে বড়লোকের সন্তান, গরীবের সন্তানরা মাঠে কাটবে ঘাস! ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে ‘ চৌধুরীবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে স্থায়ীভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরী!

২৪ ডিসেম্বর ২০১৬। এদিন প্রকাশিত হয়েছে ‘বেওয়ারিস কুকুরের আক্রমণ থেকে নারায়ণগঞ্জবাসীদের বাঁচাবে কে?’ ২২ডিসেম্বর২০১৬- ‘নাসিক নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণ ভাবে।’ ২১ ডিসেম্বর ২০১৬- ‘মেয়র আইভীর দুই নয়ন, নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন!‘ ১৪ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে লিখেছেন- ‘এরা স্বচ্ছল এবং স্বাবলম্বী ভিক্ষুক।’ ১৩ ডিসেম্বর২০১৬ প্রকাশিত হয়েছে ‘নারায়ণগঞ্জ ১০ নং ওয়ার্ডে নির্বাচনি হাওয়া।’ ০৮ ডিসেম্বর ২০১৬  তারিখে আবারো লিখলেন ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং নাগরিক প্রত্যাশা!

এর আগে লিখেছেন যথাক্রমে- ‘১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলস্ এর শ্মশানঘাট সংস্কার অত্যন্ত জরুরী’, ‘শীতলক্ষ্যা নদীতে বিষাক্ত কেমিক্যালের পানি এবং আমাদের মৃত্যু!’। ‘শহরের প্রাণকেন্দ্রে গড়ে ওঠা মরণব্যাধি বাসস্ট্যান্ড’, ‘নারায়ণগঞ্জের পাঠানটুলী গোরস্থানের কবর গেল পুকুরে।’

উপরের শিরোনামগুলো নারায়ণগঞ্জ এর নাগরিক সমস্যা নিয়ে নিতাই বাবুর রচনা থেকে নেয়া। এর বাইরেও অসংখ্য জাতীয়, আন্তর্জাতিক, ধর্ম প্রভৃতি বিষয় নিয়ে সমানে লিখে চলেছেন তিনি। তার দুটো লেখা আমার হৃদয় স্পর্শ করেছে। যার মধ্যে একটি ২৪ জানুয়ারি’১৭ প্রকাশিত ‘আশা ছিলো ইজতেমায় যাবো, কিন্তু যাওয়া হলোনা, এবং ১৮ জানুয়ারি ’১৭ তারিখে প্রকাশিত ‘এখনো পাইনি তোমার পোস্টমর্টেম রিপোর্টখানা, জানতে ইচ্ছে করে তোমার মৃত্যু রহস্য!

উপরোক্ত দুটি লেখার একটিতে সেকুলার নিতাই বাবুর পরিচয় পাওয়া যায়, আর পরেরটিতে বিধৃত হয়েছে সন্তানহারা এক পিতার নিদারুণ হাহাকার।

এ লেখাটি যখন লিখছি- তখন নিতাই বাবুর সর্বমোট পোস্ট এর সংখ্যা ১৫২, প্রকাশিত বিভিন্ন ব্লগে তিনি মন্তব্য করেছেন ১৬৪৩টি এবং মন্তব্য পেয়েছেন ১২৫৩টি।

তাঁর লেখার বিষয়বস্তুর মধ্যে অনেকাংশ জুড়ে আছে নারায়ণগঞ্জ শহরের পুঞ্জিভূত সমস্যা। আমরা আশায় ছিলাম ১৬ তারিখ মেয়র আইভী মুখোমুখি হবেন তারই নাগরিক লেখক নিতাই বাবুর। কিন্তু আশাহত হলেন নিতাই বাবু, সেই সাথে আমরাও। যে লোকটি দিনের পর দিন একাধারে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন নাগরিক যন্ত্রণার কথা লিখে গেছেন, আর সেগুলো নিরসনের দায়িত্ব এবং চাবিকাঠি যাঁর হাতে, সেই মেয়র আইভী সেদিন অনুপস্থিত!

আইভী সেদিন শুধু নিতাই বাবুকেই বঞ্চিত করেননি, বঞ্চিত হয়েছেন নিজেই। কারণ, সারা দেশে এবং দেশের বাইরের অসংখ্য নাগরিক সাংবাদিককে অতিক্রম করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ব্লগ এর বছরের শ্রেষ্ঠ ব্লগার তথা নাগরিক সাংবাদিক সম্মাননা পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জেরই কৃতি সন্তান নিতাই বাবু। সেই গৌরবান্বিত ও মহিমান্বিত মূহুর্তগুলো তিনি উপভোগ করতে পারলেননা।

নিতাই বাবুর কাজ নিতাই বাবু করে যাচ্ছেন বা যাবেন, কিন্তু যার কাছে তার এই আবেদন-নিবেদন, সেই মেয়র মহোদয় এর কাছে জানিনা এগুলি আদৌ পৌঁছে কিনা। যদি পৌঁছাতো তখন তার শুভার্থী বন্ধু হিসেবে আমাদের ভালো লাগতো, আর সার্থকতা পেতো নিতাই বাবুর পরিশ্রম, ভাগ্য খুলতো দূর্ভাগা নারায়ণগঞ্জ বাসীর।

মেয়র আইভী আসুন বা না আসুন, তাঁর আবেদন-নিবেদন মেয়রের কাছে পৌঁছাক আর না পৌঁছাক, আশা করি নিতাই বাবু কোনদিন থামবেননা। হতে পারে তার সাংবাদিকতা বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, হতে পারে তার লেখার জন্যে কেউ দুই টাকা সম্মানী দিবেন না, হতে পারে তার গলায় ঝুলে নেই অমুক পত্রিকা তমুক টেলিভিশনের আইডি কার্ড। নাইবা থাকলো হাতে দামি কোনো ল্যাপটপ কিংবা কম্পিউটার, একটা স্মার্টফোন তো আছে। সেটা দিয়েই তিনি লিখে যাবেন, নারায়ণগঞ্জের একজন সুনাগরিক হিসেবে, তার দায়িত্ব তিনি পালন করে যাবেন আমৃত্যু।

নিতাই বাবু সমগ্র নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নাগরিক দুর্ভোগ নিয়ে লিখে যে দায়িত্ব পালন করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর থেকে যে বিরল সম্মান বয়ে নিয়ে গেলেন নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্যে, আশাকরি নারায়ণগঞ্জবাসী এবং মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী তা অনুধাবন করতে পারবেন এবং তাঁকে সংবর্ধিত করবেন। যদি তা না হয়, নিতাই বাবুর অর্জনটুকু অনুধাবনের ক্ষমতাটুকু যদি তাদের না থেকে থাকে, তবে আর কিছু বলার নেই।

শুধু বলবো- ‘যতোদিন তিনি লিখবেন কেউ পড়ুক বা না পড়ুক, আমরা পড়বো, সাধুবাদ জানাবো, পিঠ চাপড়ে বলে যাবো- নিতাই দা আপনি এগিয়ে যান, আপনার জন্যে আমাদের অকুন্ঠ সম্মান, বিনত শ্রদ্ধা আর অফুরান ভালোবাসা।’