ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

১০ ফেব্রুয়ারি’১৭ শুক্রবার আমার ব্লগ জগতের বন্ধু জুলফিকার জুবায়ের এর সাথে অনানুষ্ঠানিক সংক্ষিপ্ত আড্ডায় মিলিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো। তিনি যদিও এসেছিলেন অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জরুরি আলাপ সারতে, কথার ফাঁকে যাপিত জীবনের নানা বিষয়ও উঠে এলো। আলোচনার উপরোক্ত অংশটি ছিলো প্রেম, বিয়ে এবং নারী-পুরুষের সম্পর্ককে ঘিরে। মানব-মানবির যাপিত জীবন সম্পর্কে জুলফিকার এর কিছু দৃষ্টিভঙ্গি দেখে আমি রীতিমতো মুগ্ধ। সেই সাথে ভালো লাগলো বিষয়ের প্রতি গভীর ভাবনা এবং বৈজ্ঞানিক স্বতঃসিদ্ধ ধারনার প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও বোধ দেখে। উদাহরণ টানলেন গেলো বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর বিডি ব্লগে প্রকাশিত আমাদের অপর সুহৃদ বন্ধু কাজী শহীদ শওকতের একটি রচনার।বিয়ে, নাকি আগে লিভ টুগেদার শিরোনামের উপরোক্ত আখ্যানে আমাদের বিডি ব্লগের অন্যান্য বন্ধু চমৎকার কিছু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন।

সন্ধ্যায় তিনি লিংকটি মেসেজ করলেন এবং অনুরোধ করলেন লেখাটি যেন পড়ি এবং যদি সম্ভব হয় মন্তব্য করি। আমি কাজী শহীদ শওকতের পুরো রচনাটি পড়েছি সেই সাথে কে কি মন্তব্য করেছেন সেগুলিও। দৃশ্যতঃ বিষয়টি নিয়ে বন্ধুরা তাদের নিজস্ব ভাবনা ও বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। কিন্তু আমার কাছে  মানব-মানবির সম্পর্কেকে ঘিরে জুলফিকার জুবায়ের এর মন্তব্যটাকে অনেক বৈজ্ঞানিক বলে মনে হয়েছে।

যদিও ধর্ম লিভ-টুগেদার বা সমাজ অস্বীকৃত যে কোনো যুগলবাসকে কখনো সমর্থন করেনি। তবে ধর্ম আসার আগের পৃথিবীটার কথা একবার ভাবুনতো? সেখানে কে কার বিয়ে পড়িয়েছে? যখন মোল্লা, ঠাকুর কিংবা পুরোহিত ছিলোনা। জৈবিক প্রয়োজনেই নারী পুরুষ মিলিত হয়েছে। যেখানে ভাই-বোন বাছ-বিচার ছিলোনা। ক্রমান্বয়ে যখন জৈব স্বার্থে কে কার একান্তই নিজস্ব নারী কিংবা পুরুষ হবে, সেই চিন্তা থেকে যখন ঝগড়া আর খুনোখুনি বাঁধতে শুরু করলো, তখন বাকিরা মিলে দল কিংবা গোত্রে শান্তি এবং শৃঙ্খলার স্বার্থে যার যার নিজস্ব যৌন সঙ্গি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।

বিয়ে প্রথমে একটা সামাজিক স্বীকৃতি, অতঃপর ধর্মীয় আচার বৈ কিছুই নয়। বিয়ের ধর্মাচারে জুটিটা যেন ভালো থাকে সৃষ্টিকর্তার কাছে এই  প্রার্থনার বাইরেতো কিছু দেখিনা। বিয়ে উপলক্ষ্যে পরিবার পরিজনকে আমন্ত্রণ করে উৎসব মূখর পরিবেশ সৃষ্টি করে বিপুল পদে ভূরিভোজনের আয়োজনটা আমার কাছে সবাইকে এক ধরণের ঘুষ প্রদানের মতো মনে হয়।মানেটা এই দাঁড়ায় যে- ‘আমরা এখন করবো, তোমরা কিছু মনে করতে পারবেনা’। বিয়ে অনুষ্ঠানে উদরপুর্তি শেষে আমন্ত্রিত অতিথিদের ঢেকুর এর শব্দ যেন প্রকারন্তরে এই ঘোষণাই করে যে- ‘আমাদের ডেকে খাইয়েছোতো- অতএব তোমরা দু’জনে রুম বন্ধ করে যা খুশী করতে পারো, আমরা কিছু মনে করবোনা।আমাদের না জানালে কিংবা না খাওয়ালে কিন্তু বিষয়টা অবৈধ.. হু..।’ হা হা হা।

আদিযুগ শেষ হলে যাকে আমরা সভ্য যুগ বলি তাতে নারী পুরষের এক সঙ্গে বাস, এই কেন্দ্রিক অপরাধ এবং শাস্তির বিষয়টি যখন এসে পড়লো, তখন বিয়েটা নথিভূক্ত বা চুক্তিবদ্ধ হওয়ার লিপিবদ্ধ নিয়মে পরিণতঃ হয়েছে। নারী এবং পুরুষ পরস্পর পরস্পরের কাছে আসে জৈবিক কারণেই। একই সাথে বন্ধু এবং যাপিত জীবনের সঙ্গী, অথবা অবলম্বন হিসেবে। বিয়ের পর দেখা গেলো জুলফিকার যুবায়ের এর ৬ষ্ঠ ধাপ পার হওয়ার পরেই কিন্তু দ’জুনের মধ্যে ভালোবাসাবাসির বা্ইরে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব নিকাশ শুরু হয়ে যায়। কোথাও মৃদু, কোথাও প্রবল আকারে সেখানে স্বামীর মনে ধারনা জন্মে যে- ‘এই মেয়েটাকে বিয়ে করা উচিত হয়নি আরও ভালো মেয়ে পাওয়া যেতো’ আর মেয়ের মনেও এই ধারণা জন্মে যে- ‘এই লোকটির কাছ থেকে আমি কিছুই পাইনি, সে আমাকে সুখী করতে পারেনি, আরও কতো ছেলে আগ্রহী ছিলো আমার জন্যে, তাদের মধ্যের একজনকে পেলে আরও ভালো হতো।’ যারা এই হিসাবের জায়গাটা সহ্য করে টিকে থাকতে পারেন তাদের বাহ্যত আমরা সুখি দম্পতি বললেও, তাদের ভেতরে না পাওয়ার বেদনা এবং অতৃপ্তিবোধটা কিন্তু অল্প-বিস্তর থেকেই যায়। একটা সময়ে অসহিঞ্চুরা বিবাহ বিচ্ছেদের দিকে এগিয়ে যায়, আবার কেউ পরমতকে সহ্য করে করে বাকি জীবন একসাথে কাটিয়ে দেয় সত্যি, কিন্তু অন্য নারী কিংবা পুরুষের প্রতি ভালো লাগা এবং ভালোবাসার ঘটনাটা ঘটতেই থাকে। ব্যাপারটা গোপন থাকলে কোনো সমস্যা থাকেনা, ধরা পড়লেই সেটা পরকীয়া কিংবা অবৈধ হয়ে যায়। লক্ষ্যণীয় যে, এই ঘটনাগুলো ঘটে বহুলাংশে ঘটে ব্যক্তির যাপিত জীবনের অতৃপ্তি থেকে, কিংবা কোথাও কোথাও বৈচিত্রের প্রয়োজনে, ভালো লাগা ভালোবাসার পৌণঃপুনিক সূত্র ধরে।

পরকীয়া এবং বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক বা লিভ টুগেদার আদিতেও ছিলো এখনও আছে। পাশ্চাত্বে এটা প্রকাশ্যে, তৃতীয় বিশ্বে অপ্রকাশ্যে। সব তর্কের উর্দ্ধে নারী পুরুষের নানা প্রক্রিয়ায় মিলনের এই প্রবণতাটা  সৃষ্টিকর্তার মহাপরিকল্পনার অংশ ছাড়া কিছুই নয়। বায়োলজিক্যালি শরীরে হরমোন নিঃস্বরণের ফলে-মানবী একে অপরের কাছে টানতে কিংবা কাছে আসতে বাধ্য থাকে।শরীরী প্রয়োজনে কাছাকাছি হওয়াটা তাদের কাম চরিতার্থের জন্যে যেমন সত্য, তেমনি সত্য – বিধাতার সৃষ্ট প্রাণীকুলের রক্ষা এবং বিস্তারের স্বার্থে। নারী পুরুষের ভালোলাগা, ভালোবাসা, প্রেম, বন্ধুত্ব যাই বলুননা কেন, সেটা একই ধরণের হরমন ঘটিত বহিঃপ্রকাশ এবং লক্ষ্য আর পরিণতি একটাই- সেটা যৌন মিলন।

সুতরাং বিয়ে থাকবে, প্রেম থাকবে, বন্ধুত্ব কিংবা পরকিয়া কিংবা লিভ টুগেদার সবই থাকবে, সবই সিদ্ধ পরমেশ্বরের সৃষ্টির রক্ষা এবং বিস্তারের মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে।

পশু-পাখীদেরও জৈব তাড়না আছে, সঙ্গী নিয়ে খুনোখুনীও আছে, তেমনি তাদের সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত ‘ডিফল্ট’ ধর্মও আছে, কিন্তু ধর্মগ্রন্থ নেই এবং বিয়ে কিংবা কাবিনানামাও নেই। নেই যৌনরাগের চিকিৎসা কিংবা চিকিৎসক। তাদের মধ্যে ধর্ম নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি কিংবা মারামারিও নেই, খাবার সঙ্গী, আশ্রয় ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তেমন ঝগড়াঝাটি হতে দেখিনা। সঙ্গমের আনন্দের লক্ষ্যেই তারা মিলিত হয়, কে কতজনের সাথে কতবার মিলল, সে হিসাব কেউ রাখেনা। বাচ্চা দেয়ার পর সন্তান শুধু মাকেই চেনে, আর মাও জানেনা তার সন্তানের প্রকৃত পিতাটা কে? তাই বলে মানুষের পক্ষে যৌনাচারকে সর্বজনীন করে নেয়া সম্ভব নয়। কারণ পশুপাখির বাইরে মানুষের ব্রেইনের একটি অংশ বেশী এবং সেখানে বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, শিক্ষা, প্রজ্ঞা, মন, সর্বোপরি মান এবং হুশ আছে বলেই সে মানুষ।

যৌনতা নিয়ে মানুষ যাতে চুড়ান্ত সমস্যা বাঁধিয়ে না ফ্যালে সে কারণেই স্বমেহন।আর পরম বুদ্ধিমান এবং ভবিষ্যতদ্রস্টা সৃষ্টিকর্তা নারীর যৌনাঙ্গের বাইরেই এমন ব্যবস্থা রেখেছেন যাতে সে সহজেই একাই কাম দমন করতে পারে, একই সাথে পুরুষেরও রয়েছে সেই সুযোগ। প্রকৃতি, বয়স, সঙ্গ, দর্শন শ্রবণে মানুষের শরীরে যৌন হরমনের নিঃসরণ ঘটে, সেটা প্রশমনের বিকল্প পদ্ধতিও প্রাকৃতিক। একবার ভাবুনতো এই একটা ব্যবস্থা না থাকলে অবস্থাটা কি দাঁড়াতো? শৃঙ্খলা, শান্তি এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে স্থিতাবস্থা রক্ষার স্বার্থে যতোখানি যৌন আকাঙ্খাকে প্রশমিত রাখা যায়, ততটাই মঙ্গল। সমকামের বিষয়টি এই পরিসরে নাইবা আনলাম। জেনে রাখুন- পশুপাখিদের মধ্যেও অনেকে সমকামি।

প্রেম ছিলো, আছে এবং থাকবে একাধিক, বহুভাবে, বহু সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়। স্বামী-স্ত্রীতে, প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে, মানব এবং মানবির মাঝে। কিয়া আর পরকিয়ায়, সমাজ সমর্থনবিহিন কিংবা সার্টিফিকেট বিহিন সহবাসে। প্রেম আদি, প্রেম অনন্ত। মহান স্রষ্টার মহাসৃষ্টির অগোচরে লুকিয়ে আছে একে অপরের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বা প্রেম। এই গ্রহ-নক্ষত্র, সৌরজগত, ছায়াপথ মহাবিশ্ব অন্তহীন প্রেমের টানে ধাবমান। একটা নির্দিষ্ট মহাকাল শেষে গ্রহ নক্ষত্ররাও মিলিত হয়। তাদের সংঘর্ষ কি মিলনে তৈরী হয় নতুন গ্রহ উপগ্রহ, ধুমকেতু, উল্কা, গ্রহানু। সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তার এই মহাপ্রেম যেদিন শেষ হয়ে যাবে, সেদিনইতো মহাপ্রলয়। কিয়া আর পরকীয়া, বৈধ অবৈধের হিসাবটা করে মানুষ, ঈশ্বর নয়। মানুষ যখন এইসব বিষয় নিয়ে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয় কিংবা মাথার ঘাম পায়ে ফ্যালে, ঈশ্বর তখন শুধু মুচকি হাসেন। পরমেশ্বরের বিচারে যা প্রাকৃতিক, যা অপরের জন্যে অহিতকর,  তাই সুন্দর এবং শ্বাশতঃ ও পরমতম কাম্য।