ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 
shazek+(4)

আমাদের দেশে ২৭টি টিভি চ্যানেল সক্রিয়, রয়েছে কয়েকশ দৈনিক পত্রিকাসহ কয়েক হাজার অনলাইন পত্রিকা। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো আছেই। দেশে যে কোনো ঘটনা ঘটলে কোনো না কোনো মিডিয়ায় সেটা আসেই।

কিছুদিন আগে হাওড়ে বাঁধ ভেঙ্গে পানি প্লাবনে বিপুল পরিমাণ ফসল ডুবে যায়, ক্ষতি হয় কয়েক লক্ষ কৃষকের। গণমাধ্যমে যথারীতি এ নিয়ে হৈ চৈ পড়ে যায়। কিন্তু লক্ষণীয় ছিলো এই যে- সরকারের ঘুম ভাঙতে বেশ সময় লেগে যায়। বিরোধী দলের নেতা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো সরকারদলীয় রাজনীতিবিদ কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে সেখানে যেতে অন্তত গণমাধ্যমে দেখিনি। এরপরে সংবাদমাধ্যমের এক প্রশ্নের জবাবে সরকারি দলের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বললেন- আমাদের দলীয় এবং সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ উপদ্রুত অঞ্চলে নিয়মিত যাচ্ছেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছেন। প্রশ্ন হলো ওই তৎপরতার খবর এতোগুলো টিভি চ্যানেল, পত্র-পত্রিকা এমনকি সোস্যাল মিডিয়ার চোখ কীভাবে এড়ালো? একজন সরকার দলীয় ব্যক্তি একটি টকশোতে বলেই ফেললেন- মিডিয়া হাওড়ের ঘটনাকে অতিরঞ্জিতভাবে প্রকাশ করছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা কি সেটা দেশের সচেতন ব্যক্তিমাত্র জানলেও দায়িত্বশীলদের এইসব কথা বার্তায় আমরা যারপরনাই বিস্মিত হয়েছিলাম।

এরপরে তো থলের বিড়াল আস্তে আস্তে বেরুতে শুরু হলো, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা নিজ মুখেই স্বীকার করলেন তাদের ব্যর্থতার কথা। বিরোধী দলের নেতা বললেন- এলাকাটিকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হোক। ত্রাণমন্ত্রী যদিও বলেছেন- এমন কিছু হয়নি যাতে এলাকাটিকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা যায়। তথাপি রিলিফের চাল নিয়ে তিনি ঠিকই ছুটলেন। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। যদিও বন্যায় কিংবা খাদ্যাভাবের কারণে কারো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবুও ওখানে ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে হবে- এটুকু বুঝতে দায়িত্বশীলরা অনেক কালক্ষেপন করেছেন।

তেমনি একটি দুর্যোগ এখন পাহাড়ে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক উপত্যকার ৪৫টি গ্রামের ৫০০টি পরিবারের ২৫০০ মানুষ নিদারুন খাদ্যাভাবের শিকার। সাজেক উপত্যকাটি জুম্ম আদিবাসি পরিবেস্টিত একটি দুর্গম এলাকা। এই অঞ্চলের মানুষ প্রধানত জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। এই এলাকায় বছরে প্রায় ৮-৯ মাস জুম চাষ হলেও পরবর্তি কয়েকমাস চাষবাবাদ হয়না, ফলে ওই সময়টাতে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। এ বছরে এই অঞ্চলে জুম চাষ খুব একটা ভালো হয়নি। উপরন্ত বাঁশের মতো প্রধান বিক্রয়যোগ্য উপাদানের দাম অতি অল্প হয়ে পড়ায় সেটা বিক্রী করে খাবার কেনার সামর্থ কমে গেছে জুম্ম জনগোষ্ঠীর। দুর্গম এলাকা হওয়ার কারণে প্রতি কেজি চালের দাম সেখানে ১৩০ টাকারও বেশী। চিকিৎসা, সুপেয় পানি, বস্ত্র, শিক্ষার মতো অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নেই বললেই চলে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার হাতে অস্ত্র জমা দিয়ে পাহাড়ের বিপথগামিরা এক সময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলো। পাহাড়ের মানুষ আশান্বিত হয়েছিলো যে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তারা রাষ্ট্রের সব সুযোগ সুবিধা পাবে। কিন্তু সে আশা যে পুরোমাত্রায় পূরণ হয়নি তার নজির দুর্ভিক্ষপীড়িত সাজেক উপত্যকা।

আমাদের একটা দুর্ভাগ্য যে মানবিক যা কিছু চাহিদা, তার সব কিছৃ আমাদেরকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছেই চাইতে হয়, বাকিরা যেন মানুষ নয়, মনও নেই তাদের। আর্তপীড়িতের জন্যে তাদের প্রাণ কখনো কাঁদতে দেখিনা। যেন নিজে বাঁচলে বাপের নাম।

কিন্তু আপনি তো বাংলার দুঃখি মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, তাই আপনার কাছে চাওয়া। হাওড়ে যখন বন্যা দেখা দিয়েছিলো তখন আপনি সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন ত্রাণ নিয়ে। আপনার বলিষ্ঠ পদক্ষেপে রংপুরের মঙ্গা এখন ইতিহাস। দেশকে আপনি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ  করেছেন। আপনি বলেছেন দেশের একজন মানুষ না খেয়ে মরবে না। তাই, সাজেকের মানুষও আশা করে তাদের জন্যে খাবার নিয়ে এবং সাজেকসহ পাহাড়ের সব জায়গায় খাদ্যাভাব দূরীকরণের কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে আপনিই পাশে দাঁড়াবেন।

একজন প্রকৃতিপ্রেমী প্রধানমন্ত্রীকে আমরা যেমন দেখেছি সাগরের বেলাভূমিতে পা ভেজাতে, ঠিক তেমনি দেখতে চাই সাজেকের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য প্রানভরে উপভোগ করতে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অপরূপা সাজেক ক্ষুধার্ত উদরে তাকিয়ে আছে আপনার দিকে, কবে আসবেন আপনি?