ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে যোগাযোগের জন্যে স্যোশাল মিডিয়ার গুরুত্ব ও প্রভাব অনস্বীকার্য। সারা পৃথিবীতি প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশও বাড়ছে। আমাদের দেশে ফেসবুক একটু জনপ্রিয় মাধ্যম। পারস্পারিক যোগাযোগ, বার্তা আদান-প্রদান, মতামত প্রদান, ছবি শেয়ারিং ইত্যাদি আরও অনেক সুযোগ সুবিধার জন্যে ফেসবুক ব্যবহারের জুড়ি নেই। নানা পেশা ও বয়সের মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করলেও আমাদের দেশে এই ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই তরুণ। যেহেতু ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই কম বয়সী তাই ফেসবুক ব্যবহার করার আগে এর নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন থাকা প্রয়োজন। যদি কেউ ফেসবুক ব্যবহারে অসতর্ক থাকে অথবা লাগামহীন হয় অথবা আসক্তিতে ভোগে, তাহলে এর পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। প্রতিটি প্রযুক্তির ন্যায় ফেসবুকেরও কিছু নেতিবাচক দিক আছে। নিচে কয়েকটি নেতিবাচক দিক তুলে ধরা হলো, যেন ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহারের আগে তরুণ প্রজন্ম সতেচন হতে পারে।

প্রথমত, একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য ফেসবুকে শেয়ার করা। আপনি হয়তো না বুঝেই ব্যাক্তিগত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফেসবুকে শেয়ার করছেন। আপনি নিজেও জানেন না কতটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আপনি করছেন। এর ফলে আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার বলতে আর কিছুই থাকছে না। আপনার সম্পর্কে আগ্রহী যে কেউই (ভুয়া আইডি ব্যবহার করে যিনি আপনার সম্পর্কে গোয়েন্দাগিরি করতে চাচ্ছেন) আপনার সম্পর্কে ধারণা করতে পারবেন এবং হীন উদ্দেশ্যে এই তথ্য ব্যবহার করতে পারবে। আপনাকে ব্ল্যাকমেইলও করতে পারবে।

Zahirbabor.com-1

.

দ্বিতীয়ত, ফেসবুককে স্রেফ একটি বিনোদনের মাধ্যম মনে করলে আপনি ভুল করবেন। এর সাথে জড়িয়ে আছে পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীদের এক বিশাল বাণিজ্য। একটু খেয়াল করলে দেখবেন আপনার ফেসবুক পেইজে যে বিজ্ঞাপণগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে, আপনার বন্ধুর ক্ষেত্রে একই বিজ্ঞাপন দৃশ্যমান হচ্ছে না। একেক জনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের ধরণ আলাদা। আপনার অগোচরেই আপনার ব্যাক্তিগত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ হয়ে আপনার উপযোগী (আগ্রহ, রুচি, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে) কিছু বিজ্ঞাপন আপনার পৃষ্ঠায় দৃশ্যমান হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই আপনি যাতে কিছু সুনির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার প্রতি আগ্রহী হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শেয়ার করা কোন কিছুই সার্ভার থেকে হারিয়ে যায় না। সব তথ্য তারা পুঙ্খানুপূঙ্খভাবে সংরক্ষণ করে এবং তাদের স্বীয় স্বার্থে এসব তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করে। তাদের বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ আছে- ব্যবহারকারীদের তথ্য উপাত্ত বিভিন্ন কোম্পানি, বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা ফার্ম, গোয়েন্দা সংস্থার কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। অভিযোগ সত্য অথবা মিথ্যা যাই হোক, ব্যক্তিগত কোন কিছু শেয়ার করার ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, ফেসবুক আসক্তি বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফেসবুক আসক্তি পিতামাতার জন্য একটি নতুন দুশ্চিন্তার বিষয়। অনেকেই অভিযোগ করেন- তাদের ছেলে মেয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে সারাক্ষণ ফেসবুক নিয়ে মেতে থাকেন, এমনকি রাত ১২টার পরেও ফেসবুকে সময় অতিবাহিত করেন। সন্তানের এই আসক্তি যে বাবা-মায়ের জন্যে কতটা উদ্বেগজনক, যার সন্তান এই সমস্যায় পড়েনি তাকে বলে বোঝানো যাবে না। রাতের বেলায় না ঘুমানোর ফলে ছাত্রছাত্রীদের কর্মদক্ষতা ও স্মৃতিশক্তি ক্রমশ লোপ পাচ্ছে। পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না বলে পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করছে। সন্তান একবার ফেসবুকে আসক্ত হয়ে গেলে তাকে এই আসক্তি থেকে উদ্ধার করা খুবই কঠিন। এক্ষেত্রে পিতা-মাতাকেই সতর্ক হতে হবে। আর নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কিছু করার থাকলে কালবিলম্ব না করে সরকারকে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

চতুর্থত, ফেসবুক ব্যবহারকারীরা নিজেদেরকে অন্যের তুলনায় কম সুখী মনে করেন। ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে- দীর্ঘদিন ফেসবুক ব্যবহারের ফলে মানুষের মধ্যে অতৃপ্তি অথবা না-শুকরিয়া তৈরি হতে পারে। ২০১৩ সালে বিখ্যাত Plos One জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা রিপোর্টে Ethan Kross ও তার সহযোগীরা খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, মানুষ যত বেশি ফেসবুকে  সময় কাটাচ্ছে সে তত বেশি নিজেকে অসুখী মনে করছে। তারা দেখিয়েছেন- মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ালেও ফেসবুক ব্যবহার চূড়ান্ত পরিণামে মানুষকে অসুখী করছে।

H. G. Chou এবং তার সহযোগী Edge ২০১২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রবন্ধে খুব সুস্পষ্টভাবে বলেছেন- ফেসবুক ব্যবহারকারীরা নিজেদেরকে অন্যদের তুলনায় কম সুখী মনে করে। ফেসবুকে অধিকাংশ মানুষই তার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোকে ক্যামেরায় ধারণ করে ফেসবুকে শেয়ার করে। আইফেল টাওয়ারের সামনে আপনার বন্ধুর একটি সুন্দর ছবি দেখে আপনার মনের মধ্যে সেখানে না যেতে পারার এক ধরনের অতৃপ্তি তৈরি হতে পারে। ক্রমাগত অন্যের আনন্দের মুহূর্তগুলো দেখতে দেখত আপনি নিজেকে অসুখী মনে করতে পারেন। ফেসবুকে মানুষ যতটা না নিজের দিকে তাকায়, তার চেয়ে বেশি তাকায় অন্যের দিকে।

পঞ্চমত, ফেসবুক ব্যবহারকারীরা ধীরে ধীরে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠে। ফেসবুক ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজের সাফল্যে, আনন্দমুহূর্ত অথবা ভ্রমণের গল্প খুব অনায়েসেই শেয়ার করতে পারে। এর মাধ্যমে অনেক মানুষ নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করে এবং সামাজিকভাবে তার অবস্থানকে একটু উপরের দিকে তুলতে চায়। নিজেকে অন্যের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু সমস্যা হলো, সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তা না করে বায়বীয় প্রচারের দিকে ব্যবহারকারীদের মনোযোগ অনেক বেশি। ফলে অনেক ব্যবহারকারী (সবাই নয়) মনের অজান্তেই এক ধরনের বায়বীয় অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সূক্ষ্ম ঈর্ষাবোধে লিপ্ত হয়।

গবেষণা রিপোর্টও একই কথা বলছে। Buxmann and Krasnova ২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন- আরেকজনের সাফল্যের কাহিনী, ভ্রমণ, ছবি ইত্যাদি দেখে ব্যবহারকারীরা ক্রমশ ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠছে।

ষষ্ঠত, অতিমাত্রায় ফেসবুক ব্যবহার মানুষকে বিচ্ছন্ন ও অসামাজিক করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষ কতটা সামাজিক হচ্ছে- এই বিতর্ক আজ সারা পৃথিবীব্যাপী। অতিমাত্রায় এসব মাধ্যমে সময় কাটানোর ফলে মানুষ ক্রমাগত বিচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে, জনসমুদ্রে থেকেও মানুষের মধ্যে এক ধরনের একাকীত্ব তৈরি হচ্ছে। বায়বীয় যোগাযোগ বাড়লেও, তার গুনগত মান নিয়ে আমরা সবাই সন্দিহান। বন্ধুর তালিকায় শত শত বন্ধুর নাম কিন্তু বিপদে পড়লে খুব কম বন্ধুকে পাশে পাওয়া যায়। বাকীরা শুধু দুঃখিত কমেন্টস দিয়ে বন্ধুর প্রতি দায়িত্ব পালন করেন। কয়েকটি লাইক আর কমেন্টস করলেই বন্ধুদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বন্ধুদের সুখে-দুঃখে বিপদে আপদে তার পাশে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কিছু করতে পারার নামই প্রকৃত বন্ধুত্ব। অন্যের প্রয়োজনে আমরা যদি মমতা ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত না করতে পারি এত বন্ধুর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করাটাও একধরনের অর্থহীন কাজ।

সপ্তমত, শুধু সমাজ জীবনেই নয়, পারিবারিক জীবনেও ফেসবুকের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফেসবুকে বুঁদ হয়ে থাকার কারণে অনেকেই তার পরিবারকে ঠিক মতো সময় দেন না। এমনও দেখা যায়- ড্রইং রুমে পরিবারের সবাই উপস্থিত থাকলেও কেউ কারো সাথে কথা বলছে না, মনোযোগ দিচ্ছে না। সবাই ফেসবুকে ব্যস্ত। অর্থাৎ আমরা ক্রমাগত সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মকেন্দ্রিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছি। পরিবার ও সমাজের মধ্যে বাস করেও আমরা একা। বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট বা শিথিল হওয়ার পেছনে ফেসবুক এখন একটি কারণ। পাশ্চাত্যে স্যোশাল মিডিয়া ও দাম্পত্য সম্পর্কের উপর অনেক গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় দেখা গেছে– একান্ত ব্যাক্তিগতভাবে কেউ যখন ফেসবুক ব্যবহার করে, তখন তাদের জীবনসঙ্গীরা কিছুটা ঈর্ষাবোধ ও সন্দেহ করে। মাঝে মধ্যে হস্তক্ষেপও করে। ২০১০ সালে Krafsky and Krafsky রচিত Facebook and Your Marriage গ্রন্থে এই বিষয়গুলো খুব চমৎকারে তুলে ধরেছেন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘদিন অতিমাত্রায় ফেসবুকে সময় কাটানোর ফলে ঘুমের সমস্যা, বিষন্নতা, হতাশা, একাকীত্ব, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং একঘেয়েমি জনিত মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ ফেসবুকে সময় কাটানোর ফলে শারীরিক সমস্যাও তৈরি হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, মেরুদন্ড-পিঠে ব্যাথা ও চোখের ক্ষতিসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা হতে পারে। দেহ ও পেশির পর্যাপ্ত সঞ্চালন হয় না বলেই এই সমস্যাগুলো হতে পারে।

নেতিবাচক দিক ছাড়াও ফেসবুকের অনেক ভালো দিক আছে। একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই নির্ভর করছে- আমরা কিভাবে ফেসবুক ব্যবহার করছি তার উপর। পাশ্চাত্যে শক্তিশালী সাইবার আইন থাকার পরও মানুষ ফেসবুকের মাধ্যমে লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত হচ্ছে। অবশ্য বিচারও হচ্ছে। আমদের দেশে সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা নেই। এখানে যে কেউই অন্যেকে হেয় করতে পারে, স্পর্শকাতর অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে, একান্ত ব্যাক্তিগত বিষয় অনলাইনে প্রচার করতে পারে।

ফেসবুকসহ অন্যান্য স্যোশাল মিডিয়ায় অবাধ স্বাধীনতার নামে এখানে এক ধরনের অনাচার চলছে। তাই ব্যবহার বান্ধব একটি নীতিমালা থাকা উচিত। স্বয়ং ফেসবুকের সদর দপ্তরেও ফেসবুক ব্যবহারের নীতিমালা আছে। সেখানে কিছু নির্দিষ্ট সময়ে ব্যক্তিগতভাবে কেউ ফেসবুকে সময় কাটাতে পারে না। এবং কর্মকর্তাদের ফেসবুক ব্যবহারে যতেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করা হয়। পৃথিবীর অনেক প্রতিষ্ঠান অফিস চলাকালীন সময়ে কর্মকর্তাদের ফেসবুকে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছেন। কেননা এর মাধ্যমে কর্মকর্তাদের প্রচুর সময় নষ্ট হয়।

আমাদের দেশেও বহু শিক্ষার্থী ফেসবুকে প্রচুর সময় নষ্ট করছে। রাত জেগে ফেসবুক ব্যবহারের কারণে বহু ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। রাত জেগে ফেসবুক ব্যবহার করাকে আমরা ব্যক্তি স্বাধীনতা হিসবে স্বীকৃতি দিয়েছি। কিন্তু এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করে যে বহু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়টি আমরা দেখেও না দেখার ভান করছি। প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীন পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও আমরা যখন ইতিবাচকভাবে তা ব্যবহার করতে পারি না, তখই উত্তরণের উপায় নিয়ে বিকল্প চিন্তা আমাদের সুস্থ মননে বার বার উঁকি দেয়। বিবেক সম্পন্ন চিন্তাশীল মহল এবং আমাদের দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারকরা এই বিষয়টি অবশ্যই একটু ভেবে দেখবেন।

রেফারেন্স:

১. Kross E, Verduyn P, Demiralp E, Park J, Lee DS, et al. (2013) Facebook Use Predicts Declines in Subjective Well-Being in Young Adults. PLoS ONE 8(8): e69841. doi:10.1371/journal.pone.0069841

২. Chou, H. G., Edge, N. (2012). They are happier and having better lives than I am: the impact of using Facebook on perception toward others’ lives. Cyberpsychology, Behavior, and Social Networking.

৩. Buxmann, P., & Krasnova, H. (2013, February). Envy on Facebook: A Hidden threat to users’ life satisfaction. 11th International Conference on Wirtschaftsinformatik. Leipzig, Germany: Wirtschaftsinformatik

৪. Krafsky, K. J. & Krafsky, K. (2010). Facebook and Your Marriage. Maple Valley, WA: Turn the Tide Resource Group, LLC.