ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

হলিক্রস স্কুলের শিক্ষক ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে এমন ভুল হবেনা মর্মে প্রত্যয়্ন করলেও সবাইকে নিজের বিশ্বাসের কথা জানিয়ে দিয়েছে যে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের জন্য দায়ী পোষাক। বিডিব্লগের কয়েকজন সচেতন ব্লগারকেও দেখলাম বিভিন্ন পোষ্টে নারীর পর্দাকে দায়ী করে সরাসরি অথবা একটু ঘুরিয়ে মন্তব্য করেছেন। সাম্প্রতিক পত্রিকায় আসা কিছু ধর্ষণ ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক-
১। হবিগঞ্জে ৫ম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ, যুবক গ্রেপ্তার (শিশু)
২।নৌকায় ধর্ষণের শিকার কর্মজীবী নারী, ২ মাঝি গ্রেপ্তার
৩।ঢাকার রাস্তায় গারো তরুণীকে গাড়িতে তুলে দলবেঁধে ধর্ষণ
৪। না’গঞ্জে বাসে গণধর্ষণ: আরেকজন গ্রেপ্তার
৫। শিশুকে ধর্ষণ গ্রেপ্তার ১(দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু)
৬। সাত বছরের এতিম শিশু ধর্ষণের শিকার
৭।মুন্সীগঞ্জে শিশু ধর্ষণ
৮।ঘরে ঢুকে ধর্ষণের পর কিশোরীকে হত্যা
৯।কিশোরগঞ্জে শিশুকে ধর্ষণ, শিক্ষক আটক
১০। সিঁদ কেটে ঢুকে মা-বাবাকে বেঁধে দুই মেয়েকে ধর্ষণ
১১।ছাত্রীকে ধর্ষণ, মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেপ্তার
১২। কিশোরগঞ্জে ইমাম কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ
১৩। কালিয়াকৈরে প্রতিবন্ধীকে গণধর্ষণের পর জোরপূর্বক বিয়ে
১৪।নিজ ঘরে গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূ
১৫। শিশু ধর্ষণ: ৩ সন্তানের জনক গ্রেফতার
১৬। চাঁদপুরে ধর্ষণ মামলায় বৃদ্ধের যাবজ্জীবন
আরো অনেক আছে। আমি শুধু দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি পত্রিকা থেকে বাছাই করে অল্পকিছু শিরোনাম তুলে ধরলাম।

কই শিশু, কিশোরী, যুবতী, মধ্যবয়সী, বিধবা, প্রতিবন্ধী,চাকরীজীবী কেউ তো রক্ষা পাচ্ছে না। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা কে আজ নিরাপদ? ধর্ষকের দলে বখাটে থেকে শুরু করে শিক্ষক, ইমাম, তিন সন্তানের জনক, বৃদ্ধ, বিদ্যালয় কমিটির প্রধান, দারোয়ান, গাড়ি চালক, বন্ধু, প্রেমিক, নিকটাত্মীয়, সন্ত্রাসী ইত্যাদি কোন শ্রেণীর প্রতিনিধি নেই? বাস, নৌকা, ট্রাক,হাসপাতাল, বিনোদন পার্ক, ডাক্তারের চেম্বার,কর্মক্ষেত্র ,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি নিজ ঘর কোথায় ধর্ষণের শিকার হয়নি নারী? একটি জাতীয় পত্রিকা গত মে পর্যন্ত ৩০ টি ধর্ষণ ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখে ১৫ টিতেই ভিকটিম শিশু। তবুও একদল পড়ে আছে পোষাক নিয়ে। নারীকে পোষাকে পেঁচিয়ে ঘরে বন্দি করে রাখাকেই সমাধান ভাবছে তারা? তাদের সমাধান মেনে নিয়ে নারী বোরকা পড়ে বেড়ালেও তারা বোরকার খাঁজে ধর্ষণের কারণ খুঁজে বেড়াবে।

বাংলাদেশের নারী নির্যাতন বা ধর্ষণ ঘটনায় পুলিশের নামটি আসবে এটা অবধারিত। কখনো মামলা না নেওয়ার অবহেলার অভিযোগ, কখনো দূর্বল তদন্তের অভিযোগ, আবার ভিকটিম কে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি থেকে শুরু জোর পূর্বক আপোষ করানোর অভিযোগ। সাম্প্রতিক আলোচিত ধর্ষণ ঘটনায় হাইকোর্ট রুল পর্যন্ত দিয়েছে পুলিশের নামে। আর আমরা সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে রথী মহারথী কেউ বাদ নেই পুলিশ সমালোচকের তালিকা থেকে ।পুলিশের দোষ বর্ণনা করলে যত হাততালি পাওয়া যায় অন্য ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায় না। একজন বিডি ব্লগার তো মাইক্রোবাস ধর্ষণ ঘটনায় পুলিশের অংশ গ্রহণের সম্ভাবনাও খুঁজে পেয়েছেন।।সেদিন ধর্ষণ মামলায় শাস্তির পরিমাণ কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একজন অতি পরিচিত আইনজীবী দূর্বল তদন্ত প্রতিবেদন কে দায়ী করেন।আইনজীবীদের আরো অভিযোগ পুলিশ আসামির সংখ্যা বাড়িয়ে সব আসামির কাছে টাকা আদায় করে।কিন্তু একবারো নিজের দায়বদ্ধতার কথা বলেননি।একজন লোক হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে একজন আইনজীবীর সাথে কথোপকথন টা এরকম হতে পারে-
“স্যার, আমাকে বাঁচান”।
“কেনো কী হয়েছে?”
“ আমার নামে ৩ বছরের শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে।”
“ ও আচ্ছা, আপনি কি সত্যিই ধর্ষণ করেছেন?”
“ জ্বি স্যার, মেয়েটি খুব ফুটফুটে । লোভ সামলাতে পারিনি।”
“ সমস্যা নেই। মামলা জটিল কিন্তু খেয়ে ফেলতে পারব। কিছু টাকা বেশি লাগবে।”
“মানি ইজ নো প্রবলেম।যত লাগে আমি দেবো।মন্ত্রীর ভাগ্নের বন্ধু আমরা পরিচিত। চাইলে সে আপনাকে সাহায্য করবে।”
“ তাহলে তো আরো ভালো হয়।মন্ত্রী লাগবেনা এমপি কে দিয়ে থানায় একটা ফোন দিলে কাজ টা সহজ হবে।”
এরপর সরকার পক্ষের আইনজীবীর খোঁজ, যে ডাক্তারের অধীনে মেয়েটির চিকিৎসা চলছে তার খোঁজ, মামলার সাক্ষীকে আদালতে হাজির না করার ব্যবস্থা,বিভিন্নভাবে মামলাটিকে ঝুলিয়ে রাখার কৌশল অবলম্বন ইত্যাদি প্রক্রিয়া অবলম্বন করে ১৪ বছর পর মামলার রায় আসামী নির্দোষ।দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডে আইনজীবীরা অভিযুক্তদের আইনি সহায়তা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।আমাদের দেশে এই দৃষ্টান্ত তো নেই ই ; দিন শেষে বলির পাঁঠা পুলিশ। এই প্রক্রিয়ার ডাক্তারদের ধর্ষণের আলামত খুঁজে না পাওয়ার দায়ও আছে।এসব ঘটনায় শাস্তি ঘোষণার এখতিয়ার বিচার বিভাগের।মামলা জটের কথা বলে বিচার প্রক্রিয়াকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখার দায় অস্বীকার করতে পারবে না বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে বলে আদালত অবমাননার ভয়ে অনেকে অনেক কিছু জেনেও হয়তো কিছুই বলতে চায় না।স্পর্শকাতর বিবেচনায় ধর্ষণ মামলাগুলোকে বিচারের জন্য আলাদা ট্রাইবুনালের গঠনের দাবির প্রতি সরকারের কর্ণপাত না করার কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে ।পরিবার, পুলিশ, কৌঁসুলি, ডাক্তার, বিচারবিভাগ , সরকার, রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইত্যাদি সব পক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যাপারটিতে পুলিশকে মনে হয় বেশি দোষারোপ করা হচ্ছে।তবে এই ঘটনায় পুলিশের দায়িত্বই বেশি। কেনো বেশি এই প্রশ্নের সব চেয়ে ভালো উত্তর পেয়েছি শ্রদ্ধেয় লেখক আব্দুর রাজ্জাকের একটি লেখায়। তিনি বলেছেনঃ
তবে একটা কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে পুলিশ হল সকল অপরাধের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক। সাধারণভাবে কোন সমস্যার প্রাথমিক অবস্থায় মানুষ পুলিশের কাছে আসেননা । পুলিশের কাছে যখন কোন মানুষ আসেন তখন তিনি তার সর্বস্ব খুইয়েই আসেন। তাই পুলিশ যদি তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে মানুষের আর যাবার কোন স্থান থাকে না। `People call the police when everything else has failed’. একই ভাবে, মাতা-পিতা, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, কর্মক্ষেত্রের পরিচালক সবাইকে অতিক্রম করে যৌন হয়রানির অভিযোগ করতে যখন কোন নারী থানায় আসেন, তখন তিনি থাকেন সবচেয়ে অসহায়। এমতাবস্থায় এ অসহায় নারীগুলোর নির্যাতনের প্রতিকার করতে না পারলে পুলিশ কেবল সাংবিধানিক, আইনি বা পেশাগত দায়িত্বকেই অবহেলার দোষে দায়ি হবে না, তারা অনৈতিকতার দোষেও দুষ্ট হবে। পুরো সমাজ যদি বখে যায়, পুলিশকে সমাজের অনুরূপ নয়; বিরূপ হতে হবে। এটাই জনগণের প্রত্যাশা।[যৌন হয়রানির প্রতিকারঃ পরিবার যেখানে বৈরি, পুলিশ সেখানে কতটা বন্ধু?]
তাই অতীতে ওঠা অভিযোগ গুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশের যথাযথ ভূমিকা পালন করাই অভিযোগকারীদের অভিযোগে পানি ঢেলে দেওয়ার একমাত্র উপায়।


জরিপ পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সবচেয়ে বিতর্কিত একটি বিষয়। সিপিডি, টিআইবি প্রভূতি সংস্থা কর্তৃক উপস্থাপিত জরিপ পরিসংখ্যান আওয়ামীলীগ ও বিএনপি পালাক্রমে প্রত্যাখ্যান করে যাওয়ার ইতিহাস সবার জানা। জরিপের নিজের জন্য সুনাম বয়ে আনা অংশটুকু আমরা প্রচার করে বেশি সুখ পাই। নিজের বিপক্ষে যাওয়া অংশটুকু পর্যালোচনারও প্রয়োজন বোধ করিনা। শ্রদ্ধেয় আব্দুর রাজ্জাক তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন দেশের ৯৫ শতাংশ নারী মনে করেন, পুলিশি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে হেনস্তার শিকার হতে হয়। যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৪ শতাংশ নারী এ ব্যাপারে কোথাও অভিযোগ করা দরকার বলে মনে করেন না। উত্তরদাতাদের ৬৫ শতাংশ মনে করেন, পুলিশ অভিযোগকারীকেই দোষারোপ করে। ৫৭ শতাংশের মতে মামলা নিতে পুলিশ গড়িমসি করে, ৫৩ শতাংশের মতে অভিযোগ করে কোনো ফল পাওয়া যায় না। আর পুলিশ কর্তৃক পুনরায় হয়রানির আশঙ্কায় ৩০ শতাংশ নারীই কোনো অভিযোগ করেন না। কিন্তু তিনি শিরোনাম করেছেন “যৌন হয়রানির প্রতিকারঃ পরিবার যেখানে বৈরি, পুলিশ সেখানে কতটা বন্ধু?” আমি বা আমরা হলে শিরোনাম নিশ্চিত ভিন্ন হতো যেমন করেছে প্রতিবেদন প্রকাশকারী পত্রিকাটি।পত্রিকায় যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তার শিরোনাম ছিল, পুলিশি হেনস্তার ভয়ে ৮৪ শতাংশ নারী থানায় যেতে চান না’ ।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল শের-ই-বাংলা, খুলনা, সিলেট এম এ জি ওসমানী, রংপুর ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২ হাজার ৩৮৬ জন ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের ঘটনায় চিকিৎসা নিতে আসেন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে পাঁচ হাজার তিনটি। রায় ঘোষণা হয়েছে ৮২০টি, শাস্তি হয়েছে ১০১ জনের। শতকরা হিসাবে রায় ঘোষণার হার ৩ দশমিক ৬৬ এবং সাজা পাওয়ার হার দশমিক ৪৫ শতাংশ। আজ সরকারের পদস্থ কোন কর্মকর্তা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কল্পে তাঁদের পদক্ষেপ নিয়ে বলতে গিয়ে হয়তো বলবেন তাঁরা ২২ হাজার ৩৮৬ জন নারীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু এতো সংখ্যক ঘটনার বিপরীতে মামলার সংখ্যা, রায় ঘোষণা, শাস্তির প্রদানের হার ইত্যাদি নিয়ে আদৌ কোন ফলো আপ করেছেন কিনা সে ব্যাপারে কিছুই বলতে চাইবেন না। যাহোক পরিসংখ্যান বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেনা- কিছু কম অথবা বেশি। কিন্তু নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন গুলোর চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা দেশে বিরাজ করছে একথা না মানার লোক পাওয়া যাবেনা। এই পরিসংখ্যান কে আমলে নিয়ে সরকার সহ সংশ্লিষ্ট সবপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পরিস্থিতির উন্নতি দ্রুতই হবে এ কথা হলফ করে বলা যায়।

জনাব কাজী রাশেদ ‘আমি লজ্জিত,আমি পুরুষ বলে‘ শিরোনামে একটি পোষ্টে সকল পুরুষকে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে শামিল হতে বলেছেন। আমি মনে করি রাস্তায় নামার চেয়ে ঘরে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ধর্ষকরা এলিয়েন নয়। আমাদেরই ভাই, বাবা, দাদা, মামা, চাচা ইত্যাদি। নারীকে শুধু বাচ্চা উৎপাদনের মেশিন ভাবার মধ্যযুগীয় মনোভাব থেকে সরে এসে মানুষ হিসেবে ভাবার শিক্ষাটা পরিবার থেকেই দিতে হবে। বলছিনা কোন পরিবারই এই শিক্ষা দেয় না। কিন্তু বাইরের অসৎ সঙ্গে পরিবারের সৎ শিক্ষাটা অকেজো হয়ে যায়। তাই প্রত্যেক পরিবার শিক্ষা দিলে আমার মা-মেয়ে-বোন যেমন বাইরে গেলে আমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারব , তেমনি অন্যের মা-মেয়ে-বোন নির্যাতিত হওয়ার ঘটনায় আমাকে রাস্তায় এসে প্রতিবাদ করতে হবে না। আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মশুদ্ধিই পারে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে।