ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম নিয়ে ভালই বিপাকে সরকার।একের পর এক সমালোচনার তীর ছুটছে সরকারের দিকে। ঘটনা শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে গড়িয়েছে। এই অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের কোন প্রয়োজন ছিল না যদি সমালোচকরা খাদ্য বিভাগের প্রাথমিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতেন । সরকারি কোন সংস্থাকে গম সরবরাহ না করে কাবিখা কর্মসূচীতে গম বরাদ্দের সিদ্ধান্ত ছিল অনেক বাস্তবসম্মত। কেনো? তা বলার চেষ্টা করছি।

একজন দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করা বন্ধুর জীবন কাহিনীর একটা গল্প শুনেছি। দিনে একবেলা, কখনো দেড় বেলা খেয়ে জীবন পার করা বন্ধুর ফুফু ছিল স্বচ্ছল। তা কৈশোরে যতটা না ফুফুর প্রতি ভালবাসা তার চেয়েও বেশি একটু খাবার লোভে ৫ কিমি রাস্তা হেঁটে ফুফুর বাড়ি যেত বন্ধুটি। ফুফুর ছিল অন্য বাতিক। ভাল তরকারি ছাড়া কাউকে খেতে বলতো না। ফলে বন্ধুর আশা তেমন পূরণ হতো না। দেখা গেল তিন দিন গেলে একদিন খাবার জুটত।তাতে বরং ক্ষতি। ১০ কিমি হাঁটার ফায়দা সে পেত না।তার তরকারির দরকার ছিল না। শুধু একটু ভাত হলেই সে খুশি ছিল।

আজ আমরা নিম্ম মধ্যম আয়ের দেশ। অনেকে হয়তো ভাবছেন যে গম পুলিশ খেতে পারবে না সে গম গরীব মানুষ খেতে পারবে কিভাবে?তারা বাস্তবতার বাইরে বাস করে। আমাদের অর্থমন্ত্রীর মতো কাগুজে সুখে বিশ্বাস করে। আজো ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট থেকে খাবার কুড়িয়ে খাওয়ার মানুষের অভাব নেই।সুখের কেচ্ছা প্রতিনিয়ত শোনালেই মানুষ সুখী হয় না। ভোর রাতে বাড়ির পাশে কুড়িয়ে পাওয়া কচু শাকের ভর্তা খেয়ে রোজা থেকে সন্ধ্যায় এক ঢোক পানি খেয়ে ইফতারি করা মানুষের সংখ্যা যে খুব কমেছে তা নয়। এই গরীব মানুষগুলোর পেট শক্ত। এরা পচা খেলেও এদের পেটে অসুখ হয় না, এদের মনোবল নষ্ট হয় না।আজ গম নিয়ে যে টানা হেঁচড়া শুরু হয়েছে তাতে দুর্নীতিবাজরা সুযোগ খুঁজবে।বেশি টাকায় আনা গম হয়তো কম টাকায় বিক্রি করে দেবে। আর এই গম কিনে নিয়ে বড় হাসপাতালে রোগীর খাবার হিসেবে সরবরাহ করা হবে নয়তো জেলখানার কয়েদিদের খেতে দেওয়া হবে।হয়তো কিছুদিন পর পরীক্ষা করার জন্য নমুনাও পাওয়া যাবে না।তখন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল কে কেউ গমরুল বলবে না, তিনি জোর গলায় বিএনপির দুর্নীতি নিয়ে কথা বলবেন ।

যেহেতু গরীবরাই এগুলো খাবে। তাই এই হাত ওই হাত করার কি প্রয়োজন? ঈদের আগে জরুরী ভিত্তিতে কাবিখা কর্মসূচী গ্রহণ করে পচা গম গরীবদের মাঝে বিতরণ করা হোক। অথবা এই গরীব মানুষগুলোকে না খাটিয়ে ভিজিএফ বা ভিজিডি কর্মসূচির মাধ্যমে গম বিতরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে গম যেন গরীবরাই পায়।মেডিকেল বা জেলখানায় খাদ্য সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারদের হাতে যেন না যায়।

অনেকে হয়তো ভাববেন গম কেলেঙ্কারির হোতাদের কি হবে? তাদের বিচারের কোন দাবিই করছি না। করে কি লাভ? শত শত জনদাবীর কোনটি পূরণ হয়েছে, শুনি? আজ আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রের আড়ালে জমিদারি শাসন ব্যবস্থায় অধীন যেখানে শাসকের ইচ্ছাই শেষ কথা। শাসক যদি বলে কর দিতে হবে আমরা দেব, শাসক যদি বলে আমরা সুখে আছি আমরা সুখে থাকার ভান করব।আর পচা গম খেতে বললে পরম তৃপ্তির সাথে গম খাব। যে জাতির মনন পচে গেছে, পচা জিনিসের গন্ধ সে পায় না।

জনপ্রিয় ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের রম্য ছড়া বা কবিতা “কী বললি? তুই খাবি না? এই গম তোর বাপ খাবে” এর মূল কথার সাথে আমি একমত নই। খাওয়ার অনুপযোগী এই গম খাওয়ার জন্য কাউকে জোর করতে হবে না বা ব্রাজিল কে সমর্থনের দোহাই দিতে হবে না। আজ ঘোষণা দেওয়া হোক ব্রাজিল থেকে আমদানীকৃত পচা গম জনগনের মাঝে বিনামুল্যে বা নামমাত্র মুল্যে বিতরণ করা হবে কাল দেখবেন গম নেওয়ার জন্য মানুষ সেহরী খেয়ে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছে। গম প্রত্যাশী জনতাকে সামাল দেওয়ার জন্য হয়তো নিরাপত্তা বাহিনীকেও ডাকতে হবে। লাঠিপেটারও প্রয়োজন হতে পারে। আমরা যে দস্তরমতে সুখী। এ যে আমাদের উন্নয়নের বেদনা।