ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

রাজন, একজন ড্রাইভারের সন্তান, পার্টটাইম সবজি বিক্রেতা। স্কুল থেকে ঝরে পড়া রাজন একজীবনে সর্বোচ্চ ফুলটাইম সবজি বিক্রেতা হতে পারত। কিন্তু দেশে-বিদেশে সাধারণ মানুষ থেকে বিখ্যাত মানুষের সহানুভূতি কোনদিনও পেত না। মরে গিয়ে আজ আলোচনায় রাজন। এসপি, ডিসি, মন্ত্রীর পদচারণায় মুখর রাজনের বাড়ি। রাজনের মাকে শান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বুকে টেনে নিচ্ছেন মন্ত্রী। এটা নি:সন্দেহে রাজনের পরিবারের জন্য বড় প্রাপ্তি।রাজন বেঁচে থাকলে কোনদিন তা সম্ভব হতো না।রাজনের পরিবার কে দেখে তার সমমানের অন্য পরিবার গুলোর অনেকে হয়তো ঈর্ষায় পুড়ছে। অনেকে নিজের সন্তানের এধরণের মৃত্যু কামনাও করে থাকতে পারেন।

একদিন ক্যাম্পাসে এক ছাত্রনেতা একজন রিকসা চালককে পেটাচ্ছিলেন। চালকের অপরাধ নেতার দলের এক কর্মীকে অপদস্থ করার প্রতিবাদে আকস্মিক ডাকা ধর্মঘট ভঙ্গ করেছে ঐ দরিদ্র চালক।যখন পেটাচ্ছিলেন ঠিক তখুনি একটি প্রাইভেট কার নেতার সামনে দিয়ে পার হয়ে যাওয়ার সময় কাদার ছিটায় সাজিয়ে দেয় নেতার সর্বাঙ্গ।পৃথিবীতে গরীবকে মারা সবচেয়ে সহজ। রাজনকে ঘাতকরা মারার সাহস করেছে কারণ রাজনের বাবা কপর্দকহীন গরীব। রাজনকে মারার ঘটনায় যারা চোখের জল ধরে রাখতে পারেন নি তারা দেশের আনাচে কানাচে গরীবকে মারার সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করলে হয়তো কেঁদে চোখের কোণে ঘা করে ফেলবেন অথবা একসময় এসব ঘটনাকে স্বাভাবিক মনে করে মেনে নিবেন। দ্বিতীয়টিই সাধারণত ঘটে।

একটি পুরাতন ঘটনা সবার সামনে নিয়ে আসছি। আজ থেকে ২/৩ বছরের পূর্বের ঘটনা। পুলিশের সদ্য সাবেক আইজিপির বাড়ির পাশে নির্মমভাবে পিটিয়ে, হাত পায়ের রগ কেটে দিয়ে হত্যা করা হয় রবিউল নামে এক যুবককে। তখন ফেসবুক ও স্মার্ট ফোনের এত ছড়াছড়ি ছিল না। তাই ভিডিও করে আপলোড করার সুযোগ ছিল না। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে বাড়ির পাশে ফেলে রাখে ঘাতকরা। উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া রবিউলের কলেজের সহপাঠীরা আন্দোলনে নামে। শোক সভায় পুলিশের কর্তার মুখে শুনেছি মাননীয় আইজিপি নির্দেশ দিয়েছেন দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করানোর জন্য। হয়েছেও তাই। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা মফিজ ও তার ছেলেকে প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের সাক্ষ্য অনুসারে গ্রেফতারও করা হয়। রবিউলের বিধবা মাকে বিভিন্নভাবে আপোস করানোর চাপ দেওয়া হয় অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে। মোটা অংকের অর্থ সহায়তার প্রস্তাবও করা হয়। কিন্তু পরামর্শ দাতাদের পরামর্শে অন্যের জায়গায় একটি কুঁড়ে ঘর তুলে জীবন যাপন করা একমাত্র সন্তান হারানো বিধবা মা সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। তখন আসামিরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। এখন জামিন নিয়ে সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরামর্শকরা কিছুদিন ঘুরে ক্লান্ত হয়ে রবিউলের মায়ের খোঁজ খবরও আর রাখছেন না।ছেলেকে হারিয়ে বাকি জীবন চলার যে অর্থ সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল তাও আর নেই এই গরীব মায়ের। উনি এখন কেমন আছেন তার খোঁজ কেউ রাখেনা।

রাজন এবং রবিউল হত্যাকাণ্ডকে তুলনামুলক আলোচনা করলে (দুটি মৃত্যুকে এভাবে তুলনা করার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি) রবিউলেরটাকে ভারী মনে হয়। রবিউল উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। আর কিছুদিন গেলে বিধবা মায়ের দু:খ লাঘবে ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু তাকে চুরি নয় খেলতে গিয়ে অভিযুক্তের ছেলেকে অপমান করার বদলা হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। রাজনের মতো রবিউল ফেসবুক, মিডিয়া, ইউটিউব, মন্ত্রী কাভারেজ পায়নি। রবিউলের মাও পায়নি কোন অর্থ সহায়তা।এখানেই রাষ্ট্রে ব্যর্থতা, সমাজের ব্যর্থতা, আমাদের সবার ব্যর্থতা।

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন আছে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কেউ আইন ভঙ্গ করলে শাস্তি পাবে এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশের আইন চলতে প্রভাবকের প্রয়োজন হয়। কেউ মারা গেলে মামলা না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ কিছু করতে পারছে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়।আবার কেউ মামলা করতে আসলে অভিযুক্ত কোন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পাতি নেতা হলেও উপরের অনুমতি নিতে হয়। পুলিশ জনগনের চাপে অথবা ভুল করে কোন প্রকাশ্য খুনে অভিযুক্তকেও গ্রেফতার করলেও টাকার জোরে সে জামিনে মুক্তি পায়।

সবদিক বিবেচনা করে রাজনকে ভাগ্যবান মনে হয়। রাজনের হত্যার বিচার পাওয়ার একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বাঘা বাঘা আইনজীবীরা রাজনের পক্ষে লড়ার ঘোষণা দিয়েছে। মানুষের চিল্লাচিল্লিতে সরকারের মন্ত্রীরাও সজাগ হয়েছে।বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ সহায়তা পেয়েছে রাজনের পরিবার, প্রবাসীরা তার পরিবার কে অর্থ সহায়তার জন্য ইভেন্ট খুলতে দেখলাম। কিন্তু রবিউল এবং অন্যান্য হাজার হাজার অসহায়দের কপালে সাধারণত কি ঘটে তা সবাই কম বেশি জানে।আইনের আশ্রয় পাবার অধিকার যদি চিৎকার করে আদায় করতে হয় অথবা টাকা দিয়ে কিনতে হয় অথবা সরকার দলীয় রাজনৈতিক সম্পৃক্তা থাকতে হয় তাহলে কল্যাণকামী এই রাষ্ট্রের কি দরকার ? বরং চলুন বর্বর যুগে ফিরে যাই। অন্ততপক্ষে আইনের শাসনের নামে এই ফাজলামো আমাদের দেখতে হবে না।