ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
10_Oishi_Court_121115_0003

কয়েকদিন ধরে ব্যাপারটা মাথায় জেঁকে বসেছে। মেনে নিতে পারছি না।খুব খারাপ লাগছে বাবা- মাকে খুন করার অপরাধে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া ঐশী রহমানের জন্য। তবে বেশী আঘাত পেয়েছি এই ঘটনায় আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিক্রিয়া পড়ে। আমি অতি সাধারণ নাগরিক। কিছুই করার সামর্থ্য নাই। কিছু প্রশ্ন ও খারাপ লাগা শেয়ার করতে তাই বিডিব্লগকে বেছে নিলাম।

ঢাকায় পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানকে হত্যার দায়ে তাদের মেয়ে ঐশী রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।এই রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ খুশি। কারণ তারা প্রত্যাশিত রায় পেয়েছেন।কারণ আদালত বলেছেন, আসামি ঐশীর বিরুদ্ধে মা-বাবাকে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। রায় ঘোষণার পর পিপি মাহবুবুর রহমান বলেন, এই রায়ে তিনি সন্তুষ্ট। ঘটনার পারিপার্শিকতা, আসামির স্বীকারোক্তি, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামতের সঙ্গে ঐশীর ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনাল সঠিক রায় দিয়েছেন, যা দৃষ্টান্তমূলক। এ রায়ের ফলে ছেলেমেয়েরা মাদকাসক্ত হতে নিরুৎসাহিত করবে।
অপরদিকে, ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, বর্তমানে সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা হয়েছে। এ সময় এমন একটি নৃশংস, জঘন্য ও হৃদয়বিদারক ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে বখাটে ও মাদকাসক্ত ছেলেমেয়েরা উৎসাহিত হবে। তাদের নিরুৎসাহিত করতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করাই বাঞ্ছনীয় বলে ট্রাইব্যুনাল মনে করেন।

বিজ্ঞ আদালত ও অভিজ্ঞ আইনজীবীরা যার যার মতো করে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন জাগে, মাদকাসক্তিকে নিরুৎসাহিত করার জন্য অন্য কোন মানবিক পথ কি খোলা ছিল না? হত্যাকাণ্ড সংঘটনের সময় ঐশীর বয়স ছিল ১৯ এর মতো অর্থাৎ সে ছিল সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ। এ বিষয়টা কি বিবেচনায় নেওয়া যেত না? আদালত বলেছেন, সময়সাময়িক অবস্থা বিবেচনা করে এই রায় দিয়েছেন। ভাল কথা। কিন্তু বাবা মায়ের কলিজার টুকরা ঐশী কি একদিনে বাবা মায়ের হন্তারক ঐশীতে পরিণত হয়েছেন? খুনী ঐশী তৈরি করার পেছনে আমাদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের কি কোন দায় নেই? দায় থাকলে, তাদের সবার শাস্তি শুধু ঐশীর উপর বর্তাবে কেনো? ইয়াবা বাণিজ্যের সাথে জড়িত যে প্রভাবশালীদের নাম প্রমাণসহ বিভিন্ন পত্রিকা, গোয়েন্দা রিপোর্টে এসেছে তারা বাংলার মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়াবে, আর তাদের কারণে সৃষ্ট ঐশীরা কেনো মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত ফাঁসির দড়িতে ঝুলে থাকবে? নাকি ঐশীকে ঝুলাতে পারলে কক্সবাজার রুটে ইয়াবা চালান বন্ধ হবে? ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কে কি জিজ্ঞাসা করেছেন বাবা মাকে খাওয়ানোর জন্যে এত ঘুমের বড়ি ঐশী কোথায় পেল? ঐশী কোন দোকান থেকে ঘুমের বড়ি কিনেছে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে? তাহলে ঐ দোকান বা অন্য ফার্মেসী গুলোর বিরুদ্ধে কি কোন ব্যুবস্থা নেওয়া হয়েছে? আজকের খুনী ঐশী তৈরির পেছনে অনেক নিয়ামকের ভূমিকা রয়েছে। আমরা শুধু ঐশীকেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর গিললে সেটা হবে রাষ্ট্রের অপরাধ।

সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ ঐশীকে দিয়েই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে কেন?দেশে অনেক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা,রাজনীতির নামে মানুষ হত্যা এবং আরো কত রকম হত্যা।ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা বা কাছাকাছি থাকা একজন হত্যাকারীকেও তো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা যায়নি যাতে অন্যরা মাদক পাচার, প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা ইত্যাদি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখেন। এই একটি হত্যাকাণ্ডে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে কি এ সম্পর্কিত সব অপরাধ নির্মূল হয়ে যাবে? প্রশাসনের চোখের সামনে অবাধে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে? মাসোহারার বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের অবাধে মাদক বিক্রির ম্যান্ডেট দান বন্ধ হয়ে যাবে?

আমার সাধারণ বিবেক বলে ঐশীর প্রতি এই নির্মম বিচার করা ঠিক হবে না।আমাদের রাষ্ট্র, বিচার বিভাগ মাদককে নিরুৎসাহিত করার জন্য ঐশীকে অন্যভাবে ব্যবহার করতে পারে। আমার মনে হয় ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেলা ঐশীর চেয়েও, জীবিত ঐশী এই সমাজ, রাষ্ট্রের মাদকবিরোধী অবস্থানের জন্য বেশি কাজ করতে পারবে।এক ঐশী হাজার হাজার ঐশীকে বলতে পারবে মাদকের সর্বনাশা প্রভাব সম্পর্কে।ফেরাতে পারবে তাদের বাবা মায়ের ভালবাসায় ভরা আপন বলয়ে।বয়স ও সার্বিক দিক বিবেচনা করে ঐশীকে একটা সুযোগ দেয়া যেতেই পারে। এক ঐশী সমাজ ও রাষ্ট্রকে পচিয়ে ফেলতে পারবে না। তবে রাষ্ট্র চাইলে ঐশীকে মাদক ধবংসের ভয়ঙ্কর অস্ত্র বানাতে পারে। এজন্য দরকার রাষ্ট্রের সদিচ্ছা । দরকার বিচারকের চোখের জল মিশ্রিত বিচার। সময় চলে যায়নি। আপিলে ঐশীর শাস্তির পরিমাণ কমিয়ে তাকে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির জন্য কাজ করার শর্তে নির্দিষ্ট মেয়াদ শাস্তির ভোগের পর মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। আইনে থাকতে হবে এমন নয়।বিচারকের বিবেক কেও তো আইনের উৎস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটা আমার সাধারণ সাধারণ মস্তিষ্কজাত চিন্তা। বিজ্ঞ বিচারক ও আইনজীবীদের হয়তো এর চেয়ে অনেক মানবিক পথ জানা আছে। তবে ফাঁসি দিয়ে ঐশীদের মনে ভয় ধরানোর চেয়ে এই সমাজটাকে ঐশীদের সুস্থভাবে ওঠার উপযোগী করে গড়ে তোলাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ বলে মনে করি।