ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
Flag_paris

ফেসবুক প্যারিস হামলায় ফ্রান্সের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য ফ্রান্সের পতাকায় প্রোফাইল ছবি রাঙানোর আহবানে ব্যাপক সাড়া পায়। হাজার হাজার মানুষ হাসিমুখে প্রোফাইল ছবিতে ফ্রান্সের পতাকার জলছাপ দেয়? যেন ফ্রান্সে কোন আনন্দ অনুষ্ঠান হচ্ছে, আমরাও আনন্দিত। আবার অনেকের দু:খ ভারাক্রান্ত ছবিও চোখে পড়ে। যা হোক, আমার আলোচনার বিষয় অন্য। শোক প্রকাশের অধিকার সবার আছে। আর শোক প্রকাশের ধরণ ব্যক্তি, জাতি, দেশভেদে ভিন্ন। কেউ গান গায়, কেউ কাঁদে, কেউ বা চুপ করে থাকে, অনেককে নাচতেও দেখা যায়।

এবার আসি মূল আলোচনায়।প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তনকারীদের দলে আমার পরিচিত, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকে আছেন।এদের একদলকে চিনি যারা বাংলাদেশ মালাউন(হিন্দু) মুক্ত হবার স্বপ্ন দেখে, আরেকদল আছে যারা ফিলিস্তিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরাইলের শত শত নারী- শিশুকে হত্যাকে সমর্থন করে, আছেন মানবতাবাদীও যারা মানব ধর্মকে নিজের ধর্ম বলে বলে বেড়ান আবার মসজিদে হামলায় মুসল্লী মারা গেলে তাদের ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি দেখা যায়।শিবসেনার কার্যক্রম সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবচেতন কিন্তু বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ এমন প্রগতিশীল মানুষেরাও আছেন প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তনকারীদের দলে। মোদ্দাকথা, আমরা সবাই মানবতাবাদী। প্রোফাইল ছবি ফ্রান্সের পতাকার রঙে শোভিত করাই তার প্রমাণ।

ফ্রান্সে ভয়াবহ হামলার পর ফ্রান্স ও বিশ্ব নেতাদের কাছে এটাকে সন্ত্রাসবাদের যুদ্ধকে বৈধতা দানের অনুষঙ্গ বলে মনে হয়েছে। তারা এই যুদ্ধকে আরো বেগবান করার জন্য ধনুকভাঙা পণ করেছেন। ভবিষ্যৎ বিশ্বকে আরো কত ধ্বংসের সাক্ষী হতে হয় কে জানে? অপরদিকে হামলার দায় স্বীকারকারী আইএস এই হামলাকে ধর্মযুদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন।এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরো কঠিনতর হামলার ঘোষণা দিয়েছেন। আমার কাছে দ্বিতীয় পক্ষের অভিমত কে যৌক্তিক মনে হয়েছে। আমাদের বর্তমান পৃথিবীতে যা চলছে তা ধর্মযুদ্ধ বৈ কিছুই নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প বইয়ে পড়েছি, একাত্তরে গল্প বইয়ে পড়ার পাশাপাশি অগ্রজদের কাছে শুনেছি, ভিয়েতনাম যুদ্ধ বলি আর উপসাগরীয় যুদ্ধ বলি জন্ম কোন যুদ্ধই পৃথিবীতে শান্তি নিয়ে আসতে পারেনি।জন্মের পর যখন বুঝতে শিখেছি তখন পৃথিবীকে বেশ শান্তিপূর্ণ মনে হলো। কিন্তু ২০০১ এ এসে পুরো পট পরিবর্তিত হতে থাকে।যুক্তরাষ্ট্রের আফগান হামলার কারণে বিশ্বে যে যুদ্ধাবস্থার সূচনা হয় তা আজ চূড়ান্তরূপ ধারণ করেছে। এক দেশ আরেক দেশকে যেভাবে পারমাণবিক বোমার ভয় দেখাচ্ছে তাতে মনে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ পারমাণবিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হয়ে কোন পক্ষ ক্ষান্ত হবেনা। বৈশ্বিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশগুলোকে আমেরিকা ও তার সহযোগীরা যেভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে তাতে এটাকে আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না বলে ধর্মযুদ্ধ বলাই শ্রেয়।

আর আমেরিকান সম্রাজ্যবাদের নব্য কৌশল আইএস। আলকায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের হন্তারক দাবীদার আমেরিকা জানে আল কায়েদার ভয় আর বিশ্ববাসীকে দেখানো ঠিক হবেনা কারণ আলকায়েদা নির্মূলে তাদের হত্যাকাণ্ডকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এমনকি তাদের সহযোগীরাও আর সমর্থন করছে না। তাই বিশ্বকে আইএস জুজু দেখানোর পায়তারায় নেমেছে। এই অপকৌশলের স্বীকার আজকের বাংলাদেশ, ফ্রান্স তথা পুরো বিশ্ব। নিজেদের মধ্যে অন্তঃকলহে লিপ্ত মুসলমানরা তা বুঝতে পারছেনা এমনকি জ্ঞানবিজ্ঞানের শীর্ষে অবস্থান কারী ইউরোপীয়রা তা বুঝেও না বোঝার ভান করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ যুদ্ধের পর পুরো পৃথিবীতে ধর্মীয় বিভাজন আজ প্রকট আকার ধারণ করেছে।আজ এক ধধর্মাবলম্বী আরেক ধর্মাবলম্বী কে সন্দেহের চোখে দেখে।নিজ ধর্মের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল নির্দেশাবলীকে অবলম্বন করে প্রত্যেক ধর্মে সৃষ্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠী উপগোষ্ঠী আজ অন্য ধর্মের প্রতি সরাসরি বিষেদগার,বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে শারীরিক আঘাত ইত্যাদি ছোট কর্মে লিপ্ত হচ্ছে।আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তো সন্ত্রাসবাদের নামে ধর্মযুদ্ধে হাজার হাজার নিরীহ নারী পুরুষ, ধর্ম বুঝতে অসহায় শিশু ধর্মসন্ত্রাসের নিষ্ঠুরতায় জীবন দিচ্ছে। আজ আমরা আর মানুষ নই। আজকের পৃথিবীর হোমো সেপিয়েন্সরা দুই ভাগে বিভক্ত। ১. ধার্মিক ২. অধার্মিক অথবক নাস্তিক। ধার্মিকরা আবার বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদী, জৈন ইত্যাদি। এরা এক পক্ষ আরেক পক্ষকে পাপী ও পথভ্রষ্ট ভাবে। নিজেদের অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবতে গিয়ে, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য এরা অন্যপক্ষকে ধ্বনংস করাকে নিজেদের কর্তব্য জ্ঞান করে। তাই আমরা আজ পৃথিবী বিচার করি ধর্মের মানদণ্ডে।

আজ ইসরাইলে হামলা হলে মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা মারাহাবা বলে স্বস্তি প্রকাশ করি। আবার ফিলিস্তিনে হামলা হলে আমাদের মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ হয়, আমরা ইসরাইলের ইহুদীদের ধ্বংস কামনা করে আল্লাহর কাছে চোখের জলে প্রার্থনা করি। আবার সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা করলে আমরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাই। ধর্ম আমাদের বিবেককে আচ্ছন্ন করে রাখে। আমরা সৌদিআরবের অন্যায় কে অন্যায় বলতে কুণ্ঠিত হই।একটি ছোট মুরগি জবাই করার দৃশ্য যে নারী সহ্য করতে পারেনা চাপাতির কোপে রক্তাক্ত নাস্তিক ব্লগারের নিথর দেহ দেখে তাকে সন্তুষ্টির হাসি হাসতে দেখেছি।

ধর্মের নামে মুসলিমদের হত্যা করা তো ইসরাইলি শাসগোষ্ঠীর কাছে অবশ্যপালনীয় ধর্মীয় আদেশ বলে মনে হয়। এই আদেশ পালন করতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে আর মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে ধর্মবিদ্বেষের বীজ।

পৃথিবীতে সবচেয়ে শান্তির ধর্ম নাকি বৌদ্ধ ধর্ম। জীব হত্যা মহাপাপ হলেও মুসলিম হত্যা পূণ্যের মধ্যে পড়ে মিয়ানমারের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কাছে। শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের সহ্য করতে হয় হত্যা নির্যাতন সহ অসহনীয় অত্যাচার।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার দাবিতে আমরা জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখছি।বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনাকেও আমরা সাম্প্রদায়িকতার আভরণে জড়িয়ে প্রচার করছি।কিন্তু ভারতের শিবসেনার ‘ঘরে ফেরাও কর্মসূচি ‘ অথবা মুসলমানদের গরু খাওয়ার অপরাধে মেরে ফেলার মতো ঘটনা আমাদের মনে এতটুকু দাগ ফেলতে পারেনা। আমরা বরং হিন্দু সিনেমার কালোত্তীর্ণ মান নিয়ে আলোচনা করতে ব্যস্ত।

আর পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ প্রাণি মানুষ নয় খ্রিষ্টান। লাখো লাখো মুসলিম মারা যাকগে কোন সমস্যা নেই।মুসলিমরা তাদের হাজার বছরের আবাস হারিয়ে আশ্রয় লাভের আশায় সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সলিল সমাধি হোক, তাতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু একজন খ্রিষ্টানও মরতে পারে না। শার্লি এবদোর ১৭ কিংবা প্যারিসের ১৩২ জন ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, পাকিস্তান বা সিরিয়ার লক্ষ লক্ষ মুসলমানের চেয়েও দামি। তাই চলুন প্রতিবাদ জানাই, নির্মম প্রতিশোধ নিই।কারণ খ্রিষ্টানরা সবাইকে মারতে পারে, ওদের কে মারার অধিকার কারো নেই।

আরো সকল ধর্মের হানাহানি, ঘাত- প্রতিঘাত দেখে একপক্ষ হাত তালি দিতে থাকে। ওদের হাত তালি দেওয়া থামে না। কারণ ওদের কাছে মনে হয় ধর্মই সকল নষ্টের মূল। আর ওদের তত্বকে ব্যবহারিক ভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা। এতেই তারা খুশি। মন্দিরে হামলা হলেও এরা হাসে, মসজিদে হামলা হলেও এরা হাসে, গির্জা বা প্যাগোডায় হামলাও এদের তত্ত্ব প্রমাণের সুযোগ করে দেয়। কারণ যারা মরছে তারা ধার্মিক, মানুষ তো মরছে না। এরা নিজেদের নাস্তিক বলে। তবে নাস্তিকদের প্রকারভেদ আছে।স্বধর্ম বজায় রেখে এরা কেউ মুসলিম নাস্তিক, কেউ হিন্দু নাস্তিক, কেউ বা খ্রিষ্টান নাস্তিক।কেউ আবার গালিবাজ ও ধর্মদ্বেষী নাস্তিক। এরা ধর্মের উচ্ছিষ্ট। এভাবেই আমাদের পৃথিবী ধার্মিক প্রবণ ও মানবতাহীন হয়ে যাচ্ছে।

ধর্ম পৃথিবীর বাস্তবতা। একে অস্বীকার করে অথবা রক্ষা করতে গিয়ে বা শ্রেষ্ঠত্ব দিতে গিয়ে যদি পৃথিবী মানবশূণ্য হয়ে যায় তবে তো ধর্মের অস্তিত্বই থাকবে না। কারণ ধর্মের অস্তিত্ব মানুষের মনে, মানুষের বিশ্বাসে।মনুষ্যবিহীন ধর্ম কল্পনা করা যায় না। আবার বিশ্বাস যেমন অধিকার, অবিশ্বাস করাটাও অধিকারের মধ্যে পড়ে। ধর্ম -অধর্ম,ধর্ম-ধর্ম, বিশ্বাস – অবিশ্বাসের দ্বন্ধ যদি মানব জাতির ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তবে ধর্ম তার হাজার বছরের আকর্ষণ হারাতে বাধ্য। মানুষের মর্যাদাকে অস্বীকারকারী কোন বিমূর্ত ধারণা শান্তির ধর্মের তকমা পেতে পারেনা।তার চেয়েও ভাল প্রাচীন কালে ফিরে যাওয়া,যখন ধর্মযুদ্ধ নামক নিষ্ঠুর ধারণার অস্তিত্ব ছিল না। তাই শুধু পতাকা দিয়ে দেহ না মুড়িয়ে, মানবতার জন্য দরদ হৃদয়ে ধারণ করা দরকার। তখন শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে এই যুদ্ধের প্রয়োজন হবেনা। পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের জন্য যখন আমরা হৃদয়ে কান্না অনুভব করব,শুধু তখনই আমরা সভ্য বলে নিজেকে দাবি করতে পারব।