ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

তিন লাখ নাকি ত্রিশ লাখ বিতর্ক এখন তুঙ্গে। মাঝে কিছুদিন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান প্রেম নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ এবং তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেশীয় ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশের হিড়িক পড়ে যায়।আদালতের নিষেধাজ্ঞা আমাদের তারেক রহমানের সেই ভিত্তিহীন ইতিহাস শোনার ও জানার সুযোগ নষ্ট করে দেয়।সংখ্যা নিয়ে আমি কোন মতামত দিতে চাই না।এ নিয়ে অনেক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।অনেকে বলেছেন বঙ্গবন্ধু মুক্তির আগেই সংখ্যাটি প্রচলিত,অনেক R.J Rummel এর পরিসংখ্যান ভিত্তিক গবেষণার কথা বলেছেন, শর্মিলা বোসের লেখারও উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ। কেউ নির্মোহ থেকে এ সংক্রান্ত কলাম,ব্লগ পোষ্ট, বই পড়লে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবে বলে আমি মনে করি।

বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। প্রচন্ড হতাশাবাদীরাও হয়তো আশায় বুক বেঁধেছিলেন এ সফর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।মাননীয় খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর দীর্ঘায়িত হচ্ছে দেখে আওয়ামীলীগ নেতারা অনেক বোগাস কথা বললেও আমি ভেবেছিলাম বিএনপি হয়ত সংগঠনকে গোছানো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক কোন বৈপ্লবিক চিন্তা নিয়ে হোমওয়ার্ক করছে। অপেক্ষায় ছিলাম দেশনেত্রীর দেশে ফেরা এবং সংবাদ সম্মেলনে আশা জাগানিয়া কিছু কথা শোনার জন্য।কিন্তু হায়!!! বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী একি শোনালেন ? স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর ওনার মনে হলো দেশে আজ মানুষ বলছে শহীদের সংখ্যা ত্রিশ লাখ। এটা নিয়ে বিতর্ক আছে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতাদের একটা সুবিধা আছে। তারা সত্য বা মিথ্যা যাই বলুক না কেন কিছু মোসাহেব পেয়ে যান তাদের বক্তব্যকে বাহবা দেওয়ার জন্য।নেতারা কা বললে মোসাহেবরা কাউয়া বোঝেন, নেতারা মৃদু ধমক দিতে বললে ক্যাডাররা ট্রিগারে চাপ দিয়ে মাথার খুলি উড়িয়ে দেন। এই হলো আমাদের ক্যাডার ও মোসাহেব ভিত্তিক রাজনীতির প্রকৃত চিত্র।

যাহোক নেত্রী বলেছেন আর মোসাহেবরা তো ঠোঁট বাড়িয়েই আছেন। এতে আবার প্রভাবক হিসেবে আছে আগামী কাউন্সিল।গয়েশ্বর চন্দ্র তো এর সাথে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আহাম্মকির নমুনাও যোগ করলেন।মোসাহেবদের কাতারে বিদগ্ধ সমালোচক, বই লেখক, কলাম লেখ,মুক্তিযোদ্ধা কেউ বাদ নেই। যারা এত বছর যাবত বিভিন্ন বইয়ে ত্রিশ লাখ শহীদের কথা বলেছেন তাদেরও আজ মনে হলো না ত্রিশ লাখ বিতর্কিত। এটা নিয়ে গবেষণা দরকার। আমার প্রশ্ন হলো একটা বিতর্কিত ও অপ্রমাণিত তথ্য ওনারা লেখায় দিয়েছেন বা বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন কিন্তু ব্রাকেটে ব্যাখ্যা বা মতান্তর বা লেখার শেষে টীকা যুক্ত করেননি কেনো? এই ভুল ভাঙতে ওনাদের বেগম খালেদা জিয়ার একটি উক্তি বা লন্ডন সফর প্রয়োজন হলো কেনো?

অনেকে খালেদা জিয়াকে ডিফেন্ড করার জন্য নানা কথা বলছেন। অনেককে বলতে শুনলাম উনি গবেষনা করার কথা বলেছেন। ওনার বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজ দেখে একটু ভাবুন তো ওনার অভিব্যক্তি কি বলে? তাচ্ছিল্য নাকি তথ্যানুসন্ধান? আর উনি কথাটা বলেছেন ১৭ ডিসেম্বর। বিজয়ের মাসকে উনি কেনো বেছে নিলেন? উনি তো একজন রাজনীতিক। মানুষের আবেগ তো ওনার সবচেয়ে ভাল বোঝার কথা? ওনার কথায় কি শুধু আওয়ামীলীগই আঘাত পেয়েছে নাকি কিছু মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী সাধারণ মানুষও আঘাত পেয়েছে? যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে যখন পাকিস্তানের সাথে আমাদের সম্পর্ক খুব খারাপ অবস্থায় আছে তখন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওনার এই বক্তব্য কতটুকু সময়পোযোগী? উনি ৪৫ বছর ধরে অপেক্ষা করছেন আর কিছুদিন অপেক্ষা করলে কি হতো?ওবার শাসনামলে উনি কেন এটা নিয়ে কোন উদ্যোগ নিলেন না?

এই বিতর্ক নিয়ে যখন নানা জনে নানা কথা বলছেন তখন আমি অপেক্ষায় ছিলাম গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যের আশায়।শ্রদ্ধেয় জাহেদ ভাই তার একটি লেখায় একটি ভিডিও লিঙ্ক শেয়ার করেছিলেন। তাতে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্য এবং বক্তব্যের পেছনে যুক্তি শোনার সুযোগ হয়।২০০৬ সালে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয় সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র মিলনায়তনে। ঐ কনভেনশনে আমি জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে প্রথম দেখি। ওনার সংক্ষিপ্ত অথচ জ্ঞানগর্ভ একটি বক্তব্যে আমার মতো শত শত তরুণকে উদ্দীপ্ত করেছেন। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদানে অর্জিত এই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি তরুণদের আহবান জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বিএনপির পক্ষে বেশ সোচ্চার। আন্তর্জাতিক মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনালে তিনি অবমাননার দায়ে শাস্তিও পেয়েছেন। আমার একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তিনি ২০০৬ এর অবস্থানেই অটল থাকবেন। কিন্তু নাহ!! তিনিও স্রোতে গা ভাসিয়ে আমাকে হতাশ করলেন।

ইতিহাস বিকৃতি ও সংকুচিত করার যে হলি খেলায় আমরা মেতেছি তার কোন শেষ দেখছিনা। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় তথ্য বাতায়নে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অংশে ১ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের তালিকায় জিয়াউর রহমানের নাম দেখলাম না।খুব অসম্পূর্ণ লাগল।মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি দাবীদার আওয়ামীলীগ কেন জিয়াউর রহমানের নাম মুছে দিতে চাচ্ছে। ২৭ মার্চ কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষনার পাঠক হিসেবে,১ নং সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের অবদান অস্বীকার করে লিখিত বাংলাদেশের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলে আমি মনে করি।

 

আর বিএনপি যে মিথ্যাচারের সূচনা করেছে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক, সর্বশেষ দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি দাবি করে তার বৈধতা দেওয়ার জন্য তাদের আরো হাজার হাজার মিথ্যা বলতে হবে।আমরা হয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এভাবে পড়ব-

বাংলাদেশ একসময় পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল।পশ্চিম পাকিস্তানিরা এদেশের প্রতি কিছুটা বিমাতাসুলভ আচরণ করত। বাংলাদেশের জনগনের মাঝে স্বাধীনতার স্পৃহা জন্ম নেয়।পাকিস্তানি শাসকরা এদেশের কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। তখন বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতা তৎকালীন সামরিক অফিসার জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ, ১৯৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।পাকিস্তানি সরকারের সাথে যোগসাজস করে তৎকালীন পাকিস্তানপ্রেমী আওয়ামী সভাপতি শেখ মুজিব পাকিস্তানে গিয়ে নিরাপদ জীবন যাপন করে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানপ্রেমী তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতাদের সমন্বয়ে একটি সরকার গঠিত হয়। কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন এই সরকারের অত্যাচারে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে গেলে আবারো এগিয়ে আসে সামরিক বাহিনী। তারা পাকিস্তানপ্রেমী অবৈধ সরকার প্রধান শেখ মুজিব কে হত্যা করে।১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে সূচিত হয় নতুন অধ্যায়।এদিন সিপাহী ও জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বহুদলীয় গণততন্ত্রের স্বপ্ন দ্রষ্টা জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী দশা থেকে মুক্তি পায়।কিছুদিনের মধ্যে তিনি দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।বাংলাদেশ ও এদেশের মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে।

এতে পাকিস্তানি বন্ধুরা খুশি হবে। কারণ গণহত্যার কথা উল্লেখ থাকবে না। যে তিন লাখ মারা গেছে এখন দাবি করা হচ্ছে তা চুয়াত্তরের দূর্ভিক্ষে খাইয়ে দেওয়া যাবে।জামাত খুশি হবে কারণ জামাতের বিচ্ছিন্নতাবাদী তত্ব কূলে পানি পাবে।আর সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে জিয়াউর রহমানের বিদেহী আত্মা।ভুল রাজনৈতিক হিসাবের কারণে আওয়ামীলীগ তো তার মুক্তিযোদ্ধা সত্তাকে অপমান করেছেই, তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এতটুকু ছাড় দেয়নি।

ইতিহাসের পার্শ্ব নায়ককে নায়কের ভূমিকা দিতে গেলে তাতে নায়ক – পার্শ্বনায়ক কারো ভূমিকাই সঠিকভাবে তুলে ধরা যায় না।বিএনপির সামনে তাই দেশের মুক্তিযুদ্ধ, শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি অপমানসূচক শব্দতীর নিক্ষেপ ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই।যে কঠিন ফাঁদে তারা পা দিয়েছে তা থেকে মুক্তি এতো সহজ নয়।