ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

কিছু পুলিশ সদস্যের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠানটিকে দেশজুড়ে বিতর্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। নানা জন নানা কথা বলছে। তবে বরাবরের মতো নিষ্ঠুর সমালোচনার পরিমাণ বেশি।কিছু ঘটনার আলোকে পুলিশ বিতর্কে নিজেকে জড়াতে এই লেখা-

গতকাল একটা কাজে শনির আখড়া গিয়েছিলাম। আমি যেখানে বাস থেকে নামলাম সেখানে পুলিশের কয়েকটি ভ্যান দেখতে পেলাম।পুলিশ চট্রগ্রাম ছেড়ে আসা একটি বাসকে থামিয়ে বাসের ভেতরে তল্লাশি চালাচ্ছিল। আর বাসকে ঘিরে রেখেছে উৎসুক জনতা।ব্যাগে কোন নিষিদ্ধ সামগ্রী পেয়ে পুলিশ সদস্যরা যখন দুজন অপরাধীকে নিয়ে নামতে যাবে সাধারণ মানুষের ভীড়ে তখন পা ফেলানোর জায়গা নেই। দূরে সরে যাওয়ার জন্য পুলিশ অফিসারের করজোড় মিনতি মানুষের কানে যাচ্ছিল না।একজন পুলিশ সদস্য তখন এগিয়ে আসে। প্রথমে ভদ্র ভাষায় অনুরোধ,পরে প্রকাশ অযোগ্য ভাষায় গালি দিতে থাকে।গালিতে কাজ হয়। কিছু মানুষ দূরে সরে গেলে পুলিশ বক্সে রাখা ব্যাগ চেক করে ঐ যাত্রীদের দুটি ব্যাগ বের করে আনে। দূরে দাঁড়িয়ে একজন মানুষের মন্তব্য শুনলাম। পুলিশের মুখ এতো খারাপ!!!

জীবনে আর যাই হোক পুলিশ চেকের মুখে পড়িনি।মিরপুরে জঙ্গি আস্তানা খুঁজে পাওয়ার পর হঠাৎ বিভিন্ন চেকপোষ্টে পুলিশি তৎপরতা বেড়ে যায়। রাজবাড়ি থেকে ঢাকায় আসা বন্ধুকে রিসিভ করার জন্য শ্যামলী যাই। বন্ধুর হাত, ঘাড়, পিঠ মিলিয়ে তিনটা ব্যাগ।সাথে যুক্ত হয়েছে নিকট এক অনুজের বাড়ি থেকে পাঠানো পিঠা। রিক্সায় উঠে বসলাম,গন্তব্য শংকর। কৃষি মার্কেটের কাছাকাছি এলে একদল পুলিশ পথ রোধ করে। নাম, পেশা, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, গন্তব্য ইত্যাদি জানতে চাওয়ার পর আমাদের ব্যাগ চেক করতে চায়। আমি বললাম,” অবশ্যই করবেন”। এটা আপনাদের দায়িত্ব। প্রথমে বডি চেক করলো। কিযে চেক করলো আমি বুঝলাম না।আমি নিশ্চিত কোন অপরাধীর শরীরে থাকা কোন অস্ত্র বা নিষিদ্ধ দ্রব্য ঐ চেকে পাওয়া সম্ভব নয়।এরপর ব্যাগ। ব্যাগে হাত ঢুঁকিয়ে কোন মতে চেক। খাবার যে পাত্রে আছে সেটা চেক করতে গেলে আমি সতর্ক করে দিলাম তরল দ্রব্য আছে দেখবেন যাতে পড়ে না যায়। একবার চেক করার পর চারজন সদস্যের দুজন ক্ষ্যান্ত দিলেন। কিন্তু দুজন সদস্যের মধ্যে অতি উৎসাহ দেখলাম। তাদের মনে হলো মানিব্যাগ চেক করা হয়নি। মানিব্যাগ বের করে প্রত্যেক কাগজ,টাকা নেড়েচেড়ে দেখলেন কোন সন্দেহজনক দ্রব্য আছে কিনা? আমি এতক্ষণ তাদের সহযোগিতা করলাম কিন্তু তারা যখন আবার ব্যাগ চেক করতে যাচ্ছিল তখন বললাম,” আপনারা চেক পোষ্ট বসিয়েছেন, ডিটেক্টর কই? আর আমাদের এতো সময় নষ্ট করছেন কেনো? ” তখন টিম প্রধান এগিয়ে এলেন। আমাদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে, সময় নষ্ট করার জন্য দু:খ প্রকাশ করলেন। ২০ মিনিটের চেকিং শেষ হলো।আমরা আবার রওনা দিলাম।উল্লেখ্য, পাশ্ববর্তী আদাবর থানায় আমার পরিচিত এক মামা ছিল পুলিশ কর্মকর্তা।তার পরিচিতি বা অন্য কোন প্রভাবকের ভয় না দেখিয়ে আমি একটু ধৈর্য্য ধরাতে হয়তো শেষটা সুন্দর হয়েছে।

আমার এক আত্মীয়া তার একজন বোনসহ ভোর রাতে বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসায় ফিরছিল। পুলিশের টহল টিম তাদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং শেষে তার ফোন নম্বর চেয়ে নেয় যাতে রাস্তায় কোন সমস্যায় পড়েছে কিনা তা জানতে পারে। অতি দায়িত্ববান ওই অফিসার তার দায়িত্ব আরো দীর্ঘদিন পালন করেছে। সকাল,সন্ধ্যা, রাত, মধ্যরাত এমন কোন সময় নেই সে খোঁজ নেওয়ার জন্য ফোন দিত না। পুলিশ অফিসারের দায়িত্ব পালনে বিরক্ত হয়ে আমার ওই আত্মীয়া আমার কাছে জানতে চায় “এর কি সমাধান?” আমি বলি, ” সে পেশায় পুলিশ কিন্তু আমাদের সমাজেরই একজন। তোমাকে আরো অনেকে ডিস্টার্ব করে কিন্তু পুলিশের ডিস্টার্ব তোমার কাছে বড় মনে হচ্ছে। যেহেতু তুমি তাকে বুঝিয়ে বলাতেও কাজ হয়নি একটা ওয়ে আছে পুলিশের বড় কোন কর্তার ভয় দেখানো।”আমার জেলায় কর্মরত পুলিশের এক বড় কর্তার নাম ও পদবির কথা ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে জানিয়ে দিলে তিনি সে যাত্রায় নিবৃত্ত হন।

কিছুদিন আগে সংসদ ভবনের গেটে পুলিশ ও এক ব্যক্তির কথাকাটি দেখলাম। ঐ ব্যক্তির গলায় আইডি কার্ড ঝুলানো। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে ঢুঁকতে দিতে রাজি,কিন্তু বিপত্তি তার সাথে থাকা এক মেয়েকে নিয়ে।মেয়েটিকে ঢুঁকতে না দেওয়ায় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়,ধাক্কাধাক্কিতে গিয়ে ঠেকল। পুলিশের সদস্যরা ওনাদের অনুরোধ করেছেন অপর গেট দিয়ে পাস নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার জন্য। এটাই তাদের অপরাধ।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনুপাতে পুলিশের সংখ্যা খুবই কম। তাই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশের জনগনের সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন। আমরা কতটুকু পারছি সে সহযোগিতা করতে। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বনিম্ম পর্যায় পর্যন্ত কেউ সুযোগ পেলে পুলিশকে পচাতে ছাড়ি না। আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুলিশের সদস্যদের গোপালী বলে সম্বোধন, সাবেক বিরোধীদলীয় চিপ হুইপের পুলিশকে দেখে নেওয়ার হুমকি, বর্তমান অনেক এমপির পুলিশের পুলিশ কর্মকর্তাকে হেনস্থা করার সংবাদ আমাদের সকলের জানা। ক্ষমতাসীন দলের পাতি নেতাকেও পুলিশ আইন মেনে চলার অনুরোধ করলে তার ইগোতে লাগে।পুলিশ চেকপোষ্ট বসিয়ে কাউকে চেক করলেও দোষ, আবার যদি কোন বোমা হামলা বা অন্য কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সংঘটিত হয় তখনো পুলিশ কেন চেক পোষ্ট বসিয়ে সবাইকে চেক করেনি তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।ধরা যাক, হোসেনী দালানে বোমা হামলার ঘটনার কথা। পুলিশ যদি সেখানে আগত প্রত্যেক মানুষকে চেক করতো তবে সংবাদ পত্রের শিরোনাম হতো” নিরাপত্তার নামে পুলিশের বাড়াবাড়ি” আবার যেহেতু বোমা হামলা হয়ে গেছে তখন শিরোনাম” পুলিশের নিরাপত্তা থাকা সত্বেও বোমা হামলা”। আমরা পুলিশের কোন কাজেই সন্তুষ্ট নয়। আমাদের পুলিশ কোন কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করা মানেই আমি চোর বা এই গোছের কেউ নই। পুলিশ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। কাউকে সন্দেহ হলে জিজ্ঞাসাবাদ, এমনকি ৫৪ ধারায় গ্রেফতারও করতে পারে। একথা বা কাজ আমরা মেনে নিতেই পারিনা। তাই পুলিশ কাউকে থামতে বললে বা চেক করতে চাইলে আমাদের প্রথম কথা”আমি অমুক দলের নেতা,আমি অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র,আমি অমুক ব্যাংকের কর্মকর্তা, আমি অমুক অফিসারের শ্যালক” ইত্যাদি।আমরা ভুলে যাই একমাত্র রাষ্ট্রপতি ছাড়া বাংলাদেশের আর কোন পদবি বা সম্পর্ক পুলিশের চেকিংয়ের আওতামুক্ত নয়।হাতে অস্ত্র থাকলে নিরীহ মানুষও পশুপক্ষীর দিকে তাকায়। পুলিশ কে আমরা দেখে নেওয়ার হুমকি দেই,পুলিশ হয়তো অপেক্ষা না করে সাথে সাথে দেখে নেয়।আমার মনে হয় ৫০% বাড়াবাড়ি এভাবে হয়। যতই ট্রেইনিং বা উপদেশ দেওয়া হোক না কেন, কিছু ঘাঁড় ত্যাড়া পুলিশ বা সাধারণ মানুষ থাকাই স্বাভাবিক। আমরা শুধু পুলিশকেই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে বলি,আমরা নিজেরা কতটুকু সচেতন বা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল?

পুলিশ নিয়ে আমার মনেও ক্ষোভ আছে। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে পুলিশের অশালীন ভাষার প্রয়োগ। বিশেষ করে সমাজের দরিদ্র শ্রেণির মানুষের সাথে অশালীন ভাষার বেশী প্রয়োগ হয়।এই অশালীন ভাষা প্রয়োগ করার কারণে সমাজের এই অসচেতন শ্রেণি পুলিশকে শ্রদ্ধার চোখে না দেখে ১০ টাকার পুলিশ মনে করে। হয়তো এ ধরনের কোন এক পরিস্থিতিতে চায়ের দোকানির গায়ে আগুন লেগে যায়। এটা অসাবধনতা বা দুর্ঘটনা বলে মনে হয়।একজন চায়ের দোকানিকে মেরে পুলিশের কি লাভ? এটা তো নজরুল হত্যার মতো বড় অংকের লেনদেন নয়। কিছু পুলিশ সদস্যের হঠাৎ করে “তুই” সম্বোধন খুবই বিরক্তিকর। জানিনা কেন ওনারা এমন করে? এটা ওনাদের পাবলিক ডিলিংয়ের কৌশল কিনা? সংশ্লিষ্টরা ভাল বলতে পারবেন।

পুলিশ বাহিনী নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে।বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ডিএসিসি কর্মকর্তাকে নির্যাতন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে হেনস্থা, সর্বশেষ চা বিক্রেতার মৃত্যু। সমালোচনার যৌক্তিক কারণ আছে। কিন্তু সমালোচনা হওয়া উচিৎ গঠনমূলক।বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জনসংখ্যা ও পুলিশ অনুপাত, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান,আবহাওয়া ইত্যাদি মাথায় রেখে আমাদের দেখতে হবে এই ধরণের ঘটনার হার কেমন।শুধু সমস্যা নিয়ে নয়, এর সমাধান নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন। এ ধরনের সর্বব্যাপী সমালোচনা এই বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দিতে পারে, তাদের মাঝে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের ব্যর্থতার দায় যতটা না পুলিশের তার চেয়েও বেশী রাজনৈতিক নেতৃত্বের বা অন্য সহায়ক নিয়ামকের। কিন্তু সব দায় এসে পুলিশের উপর বর্তায়।পুলিশের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা দাবি করছেন পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত অপরাধের দায় তাঁরা নিবেন না। আমার মনে হয় এগুলোকে ব্যক্তিগত অপরাধ বলে লঘু করার কোন উপায় নেই ।তাই যেসব সদস্যের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি তাদের যথাযথ কাউন্সেলিং বা চিকিৎসার ব্যবস্থা, প্রয়োজনে গোয়েন্দা তদারকি করা পুলিশ প্রশাসনেরই দায়িত্ব।

পুলিশ নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে একথা যেমন সত্য, এর সমাধান বের করার মতো মাথা আমাদের দেশে আছে এটাও তেমনি সত্য। প্রয়োজন সদিচ্ছা।পুলিশ শুধু সেমিনারের বক্তব্যে জনগনের বন্ধু না হয়ে বাস্তবে জনগনের বন্ধু হয়ে উঠুক।রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পুলিশ প্রশাসন এবং জনগনের সামগ্রিক ভূমিকা এক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজন।