ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

তনুকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হতে পারে। এসব হত্যাকাণ্ড আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। তনুর প্রতি ভালবাসা বা হত্যা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য আমি লিখছি না। কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা ও খারাপ লাগা শেয়ার করছি।

ধানমন্ডির ছায়ানট মিলনায়তনে বেশ কিছু প্রোগ্রাম দেখার সুযোগ হয়েছে। টিকেটবিহীন ও ফ্রি প্রোগ্রাম দেখতে গিয়ে মানুষের ঠেলাঠেলি ও হই হুল্লোড়ের কারণে আর ফ্রি দেখার শখ মরে গেছে। ফ্রির কথা বলছি হাজার টাকার টিকিট কেটে কোন প্রোগ্রাম দেখার সামর্থ্য আমার নাই। ছায়ানটের ফ্রি প্রোগ্রামে গিয়ে হলো নতুন অভিজ্ঞতা। অনেক দর্শক কিন্তু হলরুমে পিনপতন নীরবতা। যে বন্ধুটি বাইরের প্রোগ্রামে রবীন্দ্র সংগীত শুনলেও অর্ধ নগ্ন হয়ে নাচতে থাকে সেও সেখানে গিয়ে ভদ্র দর্শক হয়ে যায়।

নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম। ঢাকা শহরে তাই লেগুনা অথবা সিটি বাস ছিল আমার যাতায়াতের একমাত্র বাহন। সাধারণত ঢাকা শহরে লেগুনার এক পাশে ঠাসাঠাসি করে ৬ জন যাত্রীকে বসতে বাধ্য করা হয়। লেগুনার পেছনে বাঁদড়ঝোলা হয়ে যায় আরো পাঁচজন। কিন্তু ফার্মগেট থেকে লেগুনায় করে ক্যান্টনমেন্ট যাতায়াতের সময় হয়েছে বিরল অভিজ্ঞতা। লেগুনার হেলপারের হাতে পায়ে ধরে ভেতরে ৬ষ্ঠ যাত্রী হতে পারিনি অথবা হেলপারের সাথে দাঁড়িয়ে যেতে পারিনি।

ঢাকা শহরের বাস গুলোকে যেখানে ইচ্ছা সেখানে দাঁড়াতে বলে প্রাকৃতিক কার্য সেরে নিলেও বাস আপনাকে ছেড়ে যাবেনা অথচ ক্যান্টমেন্টে ঢুঁকলে এরা কেমন যেন ভদ্র হয়ে যায়। নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানো বা নামানোর কাজ করে না এবং অতিরিক্ত যাত্রী তোলে না।

এই হলো আমার পরিচিত ও কল্পিত সুশৃঙ্খল সেনানিবাস। সেনানিবাসের ভেতরে বাইক চালালে বা বাসে যাতায়াত করলে একটু বেশি নিরাপত্তা বোধ করি। মনে হয় কোন দুর্ঘটনা ঘটবেনা। তনু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে জীবন হারিয়েছে সেই নিরাপত্তা বেষ্টিত সেনানিবাস এলাকায়! কেমন যেন খটকা লাগছে? আসলে কী হয়েছে, কেন হয়েছে, কারা দায়ী আমরা জানতে পারব কি?

ছায়ানট বা সেনানিবাসের প্রসঙ্গ আনলাম পারিপার্শ্বিক পরিবেশ মানুষের মনোজগতে কত পরিবর্তন আনতে পারে তা বোঝানোর জন্য। অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়। তনু হয়তো আমার মতো বিশ্বাস করতো। কিন্তু আমাদের বিশ্বাসের জায়গাগুলো অবিশ্বাস্যভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে। সমাজ কেন নীরব?

প্রতি তিন মাস অন্তর কাজের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়তে হয় এমন একটা জব করি। আগের রাতেই ফেসবুকের নিউজফিডে সংবাদ টা চোখে পড়ে। সময় অভাবে দেখতে পারিনি। আজ কর্মস্থল থেকে ফিরে আমার অন্যতম প্রিয়জনের ফোন পাই। তনু হত্যার ব্যাপারটা তার মুখে শুনি। নেটে বসি এ সংক্রান্ত খবর গুলো পড়ার জন্য। ততক্ষণে মুশফিক ও মাহমুদুল্লাহের দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ের কারণে বাংলাদেশ এক রানে হেরে গেছে। দেশের সর্বাধিক প্রচারিত নিউজ পোর্টালে তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। তনুকে পাইনি। তারপর একে একে অন্যান্য নিউজ পোর্টালে খুঁজলাম। বিডিনিউজ শুধু গণজাগরণের ইমরান সরকারের প্রতিবাদের খবর প্রকাশ করেছে। কয়েকজন বিডিব্লগারের ব্লগে বিষয়টি উঠে এসেছে। আরো খুঁজে বিবিসির ওয়েব সাইটে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত সংবাদ পেলাম। কয়েকটি নিউজ পোর্টালে তো ক্রিকেটের প্রতিটি বল নিয়ে নিউজ করতে দেখলাম। অথচ ক্ষেত্র ও ঘটনা সংঘটনের ধরন বিবেচনায় এটি লিড নিউজ হতে পারতো। কিন্তু হয়নি। কেনো হয়নি? এর দুটি কারণ থাকতে পারে।

এক, বাংলাদেশ ও ভারতের টান টান উত্তেজনার ম্যাচের নিউজ বাদ দিয়ে পাবলিক এই নিউজ খাবে না।

দুই, ঘটনা সংঘটনের ক্ষেত্র সেনানিবাস।

আমার কাছে দ্বিতীয়টিকে অধিক শক্তিশালী মনে হয়। তানাহলে ২০ মার্চের ঘটনা, ২২ মার্চ জানলাম থোরা থোরা, ২৩ মার্চ চুপ, নিউজও দায়সারা। অন্য ঘটনা গুলোর ক্ষেত্রে মিডিয়াকে যেভাবে সোচ্চার হতে দেখেছি, এক্ষেত্রে ততটাই নির্বিকার।আচ্ছা, এতে দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতো? অভাগী তনু!!! মিডিয়ার এই যুগে সামান্য মিডিয়া কাভারেজও তোর জুটলো না? মরলি তো এমন জায়গায় মরলি?

বিবিসির নিউজ থেকে যতটুকু জেনেছি তনু থিয়েটার নাট্য কর্মী। ফেসবুকে তনুর যে ছবিটি ঘুরে বেড়াচ্ছে তাতে তনুকে হিজাব পরিহিত দেখাচ্ছে। হিজাব পড়ে এমন মেয়েকে পর্দার দোহাই দিয়ে দিয়ে ধর্ষণ করে কেউ পার পাবে না। অনেক নারী নেত্রীকে এই টোনে কথা বলতে দেখছি। তারা কি একটি গোষ্ঠীকে মেসেজ দিচ্ছে তোমরা তো পর্দা পর্দা করো দেখো পর্দানশীল মেয়ে ধর্ষিত হচ্ছে অতএব প্রতিবাদ করো। নাকি পরোক্ষভাবে ওই গোষ্ঠীর চিন্তার প্রতি সমর্থন দিচ্ছে যে মেয়েরা ধর্ষিত হয় বেপর্দার কারণে হয়। এটা তাদের প্রাপ্য।

তনু ফেসবুক আক্রমণ থেকে বেঁচে গেছে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের কারণে। নতুবা নাট্যকর্মী হিজাব পরিহিত তনুর জন্য হাজারো ফতোয়া এবং এই ধর্ষণের সওয়াব নিয়ে আমরা অনেক বাণী শুনতাম। এদিক থেকে মেয়েটি ভাগ্যবতী। মিডিয়াও কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। অত্যন্ত তনুর বাবা-মাকে একটু কম শুনতে হবে তনুর চরিত্র খারাপ ছিল তাই এই পরিণতি?

বারবার বলি। আবারো বলছি। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ বা ফেসবুক বা ব্লগে দুলাইন লিখে প্রতিবাদ করার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিজের ঘরে সন্তানদের শেখানো নারীদের সন্তান উৎপাদনের মেশিন বা যৌন লিপ্সা নিবৃত্তের হাতিয়ার না ভেবে মানুষ ভাবা উচিৎ।

তনু হত্যার বিচার চাই না। আরো অনেক তনুর জীবন উৎসর্গও যদি এই সমাজটাকে বদলাতে পারে তবে মরুক আমার আরো শত বোন। সমাজটাকে নারীদের জন্য বসবাস উপযোগী দেখে যেতে চাই। যাতে আমার যদি কোন কন্যা সন্তান হয় বলতে পারি তোমরা যে সুন্দর সমাজ দেখছো এটার জন্য জীবন দিয়ে গেছে হাজারো বীরাঙ্গনা। আর কত জীবনের বিনিময়ে অসভ্য পুরুষ শাসিত সমাজ নারী -পুরুষ উভয়ের জন্য সভ্য সমাজে পরিণত হবে?