ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 
বাবা মায়ের সাথে মেহেদি হাসান

পুরো শরীর ধিরে ধিরে পাথর রঙ ধারন করছে।পায়ের তালা ইতোমধ্যে পাথরের মতো জমাট বেধেছে। শরীরের ত্বক নরম হলেও দুর থেকে তাকালে জ্বলে যাওয়া  জমাট বাধা পাথর বলেই ধারনা জন্ম নিতে পারে। হাত দুটোর আংগুল গুলো গিলে ফেলছে এই চর্ম ঘাতক। পুরো মুখ এবং বুক পিঠের একটু অংশ ঠিক থাকলেও ঠোটোর দু’কোনে ফুসকুড়ি দানা বেধেছে।

উঠাবসা চলা ফেরায় ভয়াবহ এক যন্ত্রনায় প্রতিটি মুহুর্ত কাটছে শিশুটির। উতকন্ঠা বাবা মায়ের চোখে মুখে। পুরো শরীর জুড়ে বয়ে বেড়ানো এ যন্ত্রনা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওকে । রোগ অজ্ঞাত । বাংলাদেশের চিকিতসকেরা নানান পরিক্ষা নিরিক্ষা করেও কোন সিদ্ধান্ত জানাতে পারেননি।

 

বয়স ৮ বছর। ওর নাম মেহেদি হাসান। বাবা আবুল কালাম আজাদ পেশায় ভ্যান চালক । মা জাহানারা বেগম গৃহীনি। দু ভাই এক বোন । বড় ভাই জামিলের বয়স ১৭ বছর । সে একটি ইট ভাটায় লেবারের কাজ করে । বোন তারা বানু বয়স ১৮ । বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামে।

পুরো শরীরটাই অজ্ঞাত রোগটি গ্রাস করছে

জমি বলতে শুধু বসত ভিটা আর কিছু নেই । ভ্যান চালিয়ে যা রোজগার তাই দিয়ে চলে সংসার। সংসারে টানাপোড়েন থাকলেও তা পরিবারটিকে কাবু করতে পারেনি কখোনো। শুধু শিশু মেহেদির অজ্ঞাত এক রোগে যতটুকু নাস্তানাবুদ করে রেখেছে পরিবারটিকে।

বাংলাদেশের নওগা জেলার রানীনগর উপজেলার দোনা ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে পরিবারটির বসবাস।

 

মেহেদির বাবা আবুল কালাম আজাদ জানায়, ২০০৭ সালের ২৮ মে জন্ম নেয় তৃতীয় সন্তান মেহেদি।  জন্মের বারো দিনের মাথায় ফুসকুড়ির মতো কি যেন একটা শরীরে দেখা দেয়। শরিরীক গঠন ভালোই ছিলো।  তিন মাস যখন বয়স প্রায় ৭ পাউন্ড ছিলো ওজন। অনেক ফুটফুটে ছিলো দেখতে।

দেখে মনে হতে পারে কোন পাথর মুর্তী

সেসময়ে এই চর্ম রোগে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি তারা। ধিরে ধিরে তা এক সময় পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। দু’ পায়ের গোড়ালী থেকে ছড়িয়ে পরে পেট অবধি। হাতের আঙ্গুলের মাথা থেকে বুক পিঠ গ্রাস করে নেয় ছড়িয়ে পড়া চর্ম জাতীয় ব্যাধিটি।

 

তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন, সিমিত সাধ্যের মধ্যে ছুটতে থাকেন নানান জায়গায়। স্থানীয় নানামুখী চিকিতসকদের শরনাপন্ন হন। এ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি এমনকি গ্রামীন ঝাড়ফুক করেন । কিন্তু না, কিছুতেই আর নিয়ন্ত্রনে থাকেনা রোগটি। ততদিনে সহায় সম্বল যা ছিলো সবটুকুই শেষ। এবার মানুষের কাছে হাতপাতা। সন্তানকে তো সুস্থ্য করে তুলতে হবে। ভ্যান চালিয়ে টাকা জমিয়েও যেতে হয় চিকিতসকের কাছে। অর্থভাবে গত এক বছর থেকে চিকিতসা বন্ধ রেখেছেন।

শিশু মেহেদির সাথে প্রতিবেদক

সরেজমিনে দেখা গেছে, শিশু মেহেদির দুর্বিসহ কষ্টকর নিদারুন যন্ত্রনাদায়ক জীবনের চিত্র। নিষ্পাপ ছোট্ট শিশুটির চোখে মুখে কি এক ভয়াবহ আতঙ্ক!

 

বেড়ে উঠার সময় সর্ম্পকে মেহেদির মা জানান, স্কুলে ভর্তি করা হলেও সহপাঠিদের শারিরীক ও মানষিক নিপিড়নের ফলে প্রিয় সন্তানের স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এর পর মাদ্রাসায় পাঠানো হলেও সেখানে আর এক সমস্যা তৈরি হয়। মাদ্রাসায় মাওলানারা পড়াতে চায় না – যায়না মেহেদির কাছে । গ্লাস প্লেট ভিন্ন করার কথা জানায়। কিন্তু এতোকিছুর পরও থাকা হয়না মাদ্রাসায়। শেষে অশ্রুজলই ফিরে আসতে হয় সেখান থেকে। চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় পড়ালেখা। খাওয়া গোসল কিছুই করতে পারেনা মেহেদি, মায়ের সাহায্যেই সব কিছু করতে হয় ।

 

আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, পাড়া-প্রতিবেশি সকলেই এড়িয়ে চলতে থাকে। দুরে দুরে রাখে। জটিল এ ব্যধিতে মেহেদির শরীর থেকে এক প্রকার গন্ধ ছড়াতে থাকে। আক্রান্ত স্থানগুলোও দিন যতই যেতে থাকে আরো ভযাবহ রুপ ধারন করতে থাকে। চিকিতসকরা স্থানগুলো নরম রাখতে এক প্রকার ক্রিম ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

 

মা জাহানারা বেগম আরো জানান, যখন মহেদি গর্ভে ছিলো নিয়মিত স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরীক্ষা করাতে যেতেন । তবে সেখানে কোন  চিকিতসার আধুনিক যন্ত্রাপাতি ছিলোনা। ডাক্তার আপা দেখে দিতেন। পরামর্শ দিতেন। তিনি বলেন, তার আরো দুটি সন্তান পুর্বে জন্ম নেয়ায় তিনি এসময়কাল সর্ম্পকে সচেতন ছিলেন। ওদের কারো এরোগের কোন উপসর্গ নেই। ওরা পুরোপুরি সুস্থ্য সবল।

 

শিশু মেহেদির মায়ের করুন আকুতি- সন্তানের সুচিকিতসার জন্য সকলের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

 

নওগা জেলার রানীনগর উপজেলার স্থানীয় ৩ নং গোনা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান  মো: আবুল হাসনাত খান হাসান অজ্ঞাত রোগটি সর্ম্পকে সিভিল সার্জনের সাথে কথা বলেছেন তবে রোগটি সর্ম্পকে কিছু জানা যায়নি। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে তিনি খোজ খবর রাখছেন।

 

নওগা জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান জানান, সরকারী পর্যায়ে সুচিকিতসার জন্য তিনি উদ্যোগ নেয়ার চেস্টা করবেন।

 

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোছা: মাজেদা ইয়াসমীন জানান, রোগটি অজ্ঞাত হওয়ায় এর সঠিক সিকিতসা নিয়ে জটিলতার সৃস্টি হয়েছে। তবে সঠিক ভাবে রোগ ণির্নয় করা প্রয়োজন বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন।

 

নওগা জেলা সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা: মো: এমদাদুল হক জানান, মেহেদি হাসানের রোগটি একটি বিরল ঘটনা। এ রোগে আক্রান্ত শিশু মেগেদির সুচিকিতসার জন্য তিনি চর্ম রোগ বিশেষজ্ঞ কাছে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন।

 

Bangladesh Contributor
Individual Member :