ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

ছেলেবেলায় একটা প্রবাদ শুনেছিলাম, ‘সকালের হাওয়া হাজার টাকার দাওয়া’। নির্মল ও বিশুদ্ধ বায়ুর গুরুত্ব বোঝাতে এ প্রবাদ ব্যবহার করা হয়। বাতাস আমাদের জীবনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ; তা বলে শেষ করা যাবে না। পানির অপর নাম জীবন, কিন্তু পানির চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাতাস। কারণ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন দুই থেকে চার লিটার পানি পান করতে হয়, অন্যদিকে আমাদের ফুসফুসের জন্য প্রয়োজন দুই হাজার লিটার নির্মল বাতাস। তাছাড়া পানি পানের বিরতি রয়েছে। অন্তত এক ঘন্টা পানি পান না করলে কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু এক মিনিট নিশ্বাস বন্ধ করে বেঁচে থাকা দুরূহ। কিন্তু সেই বাতাস যদি দূষিত হয়, বিষাক্ত হয়, তবে নিশ্বাসের সঙ্গে সেটাও আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে। অর্থাৎ নিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিদিন আমরা অনেক ক্ষতিকর পদার্থ শরীরের ভেতর গ্রহণ করছি।

গত বছর দেশের ১১টি স্থানের বাতাস পরীক্ষা করে জানা গেছে, বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন-মনোক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ভোলাটাইল অর্গানিক কমপাউন্ড, পার্টিকুলেট ম্যাটার বা বস্তুকণা ও সালফার ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব ক্ষতিকর উপাদানের ফলে ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগ (এজমা/হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট), হৃদরোগ ও স্ট্রোক, চর্মরোগ ও শ্বাসনালীর অন্যান্য রোগব্যাধি বাড়ছে। এছাড়া ইতোমধ্যে যারা এসব রোগে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের মৃত্যুঝুঁকিও ক্রমশ বাড়ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে বায়ু দূষণের উৎসগুলো স্পষ্ট হয়েছে। ঢাকার বাতাস বিষিয়ে তোলা ধোঁয়া এবং ধুলোর ৫৮% আসে শহরের চারপাশে এবং ভেতরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ইটভাটা থেকে, ১৮% পথের ধুলো থেকে, ১০% যানবাহন থেকে, ৮% বিভিন্ন কারখানার জ্বালানী থেকে, এবং ৬% অন্যান্য উৎস থেকে। যদিও এ তথ্য নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যানবাহনজনিত দূষণ আরো বেশি। তাছাড়া এতে অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি, যার প্রধান কারণ ধূমপান ও রান্না। তবু বায়ুদূষণের প্রভাব বিভিন্নভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন, গত বছরের শীতে ঢাকায় ঠান্ডা কম অনুভূত হয়েছে। বর্ষাতেও বৃষ্টির অভাব লক্ষ্য করা গেছে।

আমার প্রিয় শহর ঢাকা ব্যস্ত নাগরিকদের শহর। ব্যস্ততা এত বেশী যে নিজের সন্তানের জন্য একটু সময় বের করা দুষ্কর। ৪০০ বছর ঐতিহ্যের এই শহর আজ বিশ্বের দশটি নিকৃষ্টতম শহরের মধ্যে অষ্টম স্থান করে আছে। ঢাকার বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত। পরিবেশ বাচাও আন্দোলন (পবা) এর এক গবেষণায়ও এমন তথ্য পাওয়া যায়।

এ তো গেল আমাদের দেশের কথা। বর্তমানে সারা বিশ্বে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বিগত তিন মিলিয়ন বছরের মাঝে সর্বোচ্চ, এবং এটা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনটা গত ৬৬ মিলিয়ন বছরে দেখা যায়নি। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে এর প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। উচ্চ মাত্রার দূষণের ফলে রাজধানী বেইজিং সহ চীনের ২৩টি শহরে উচ্চ সতর্কতা (রেড এলার্ট) জারি করা হয়েছিল। গত বছর বেইজিং-এ তিন হাজার ছোট-বড় ও মাঝারি আকারের শিল্পকারখানা বন্ধ করা হয়, যেগুলো বায়ূদূষণের জন্য দায়ী ছিল। বন্ধ রাখা হয়েছে সড়কের সব ধরনের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ। ভারতের নয়া দিল্লিতে বায়ু দূষণরোধে যান চলাচলের ক্ষেত্রে জোড়-বিজোড় পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।

রাজধানীতে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বেড়ে যাওয়া, বৃষ্টিপাত না থাকা, মগবাজার এলাকায় ফ্লাইওভারের কাজ, মেট্টো রেলের চলমান কাজসহ প্রায় সব জায়গায় বিভিন্ন রকম নির্মাণ কাজ চলছে। গাবতলী হতে সদরঘাট পর্যন্ত বেড়িবাধ এর রাস্তার আশেপাশে প্রচুর ধুলো তৈরি হয়, একই সাথে ইট ভাঙ্গার কাজ। রাস্তার ধুলো দূর করতে পানি ছেটানো হচ্ছে না। প্রচুর বাতাস থাকায় বহুতল নির্মাণাধীন ভবন থেকে ধুলোবালি বাতাসে ভেসে আসছে। এ সব কারণে বাতাসের একিউআই মাত্রা সহনশীল হচ্ছে না।’

প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, আমাদের দেশের প্রখ্যাত নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ এবং বিএসএমএমইউয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক প্রাণগোপাল দত্ত বলেছেন, বাংলাদেশে প্রায় ৭০ লাখ হাঁপানি রোগী রয়েছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি হলো শিশু। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু বায়ুদূষণজনিত কারণে প্রতিবছর ঢাকা শহরে প্রায় ১৫ হাজার রোগীর অকালমৃত্যু ঘটে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এই বায়ুদূষণের প্রকোপ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায় তখন এসব হাঁচি, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগীরা হাজার অ্যান্টিবায়োটিক, ইনহেলার ও বিভিন্ন পদের ওষুধ খেয়েও কোনো কাজ হয় না, কারণ তাদের এ সমস্যার জন্য দায়ী ঢাকার বাতাস।

ধূমপান বায়ুদূষণের একটি অন্যতম কারণ। আপনি একটু কল্পনা করেন প্রতিদিন ঢাকা শহরের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ ধূমপান করছে, যারা করছে তারা প্রতিদিন অন্তত পাঁচটি করে খায়, তাহলে হিসাব দাঁড়াল কত? আড়াই কোটি সিগারেট। বাস্তবে এ সংখ্যা বেশি হবে, কম হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনগুলো আইন অনুযায়ী ধূমপানমুক্ত রাখা সম্ভব হলে পরোক্ষ ধূমপানের কবল থেকে নারী শিশুসহ অধূমপায়ীদের রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এক একটা গাছ আপনার চারপাশে থাকা মানে এক একটা অক্সিজেনের ফ্যাক্টরি আপনার চারপাশে থাকা, আপনার সন্তান বুক ভোরে নিঃশ্বাস নেবে। আমরা সরকারিভাবে কিংবা বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে ঢাকা শহরের ফুটপাতের যে ফাঁকা জায়গা বা আইল্যান্ড রয়েছে, সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধী বৃক্ষ লাগাতে পারি, যাতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।
আমাদের নিজেদের স্বার্থে এই ঢাকা শহরের বাতাস নির্মল রাখতে হবে, এর জন্য সেটা হলো সচেতনতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা খুবই প্রয়োজন। শুধু আইন করে এই দূষণ রোধ করা সম্ভব নয়। আমাদের প্রতিটি বাড়ির ছাদে গাছ লাগানো উচিত। ঢাকা শহরের প্রতিটি ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাতে হবে, নির্মাণকাজ চলার সময় তা ঢেকে রাখতে হবে, পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে, রাস্তা খোঁড়ার সময় তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে, স্টিল, রিং-রোলিং কারখানা, ইটের ভাটা, সিমেন্ট কারখানার বস্তুকণা যেন পরিবেশে সরাসরি আসতে না পারে সে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেড়ে উঠুক নির্মল স্বাস্থ্যকর পরিবেশে। আমাদের পরমায়ু বৃদ্ধির জন্য নির্মল বায়ু নিশ্চিত হোক।

slide