ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাস্থ্য

 
160125-aedes-aegypti-mosquitos-1718_ddc14204976cc1a83d32a304a5ff81b0.nbcnews-fp-1200-800

এডিস মশা (ছবিঃ ইন্টারনেট)

চিকনগানিয়ার আদ্যপান্ত

সম্প্রতি ঢাকায় মাহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে চিকনগানিয়া জ্বর। আমার অনেক ফেইসবুক বন্ধুও এর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। প্রশ্ন হল হঠাত কোথা থেকে আবির্ভাব হলো এই চিকনগানিয়া জ্বর? কয়েক বছর আগে এ নামে কোন জ্বর আছে অনেকে সেটা জানতো না। ১৯৫২-৫৩ সালে পূর্ব আফ্রিকার দেশ তাঞ্জানিয়ায় প্রথমবারের মতো এ জ্বর সনাক্ত হয়। গত পঁয়ষট্টি বছরে আফ্রিকা থাকে এই জ্বর বিভিন্নভাবে এশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা এবং আমেরিকার প্রায় ৬০ টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০০৫-২০০৬ সালে এই জ্বর ভারতীয় উপমহাসাগরের বিভিন্ন দ্বীপে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পরে যাতে প্রায় তিন লাখ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ২৩৭ জন মানুষ মারা যায়। এ দ্বীপগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের লা রিইউনিয়ন দ্বীপও ছিলো। একি সময়ে এটা ভারতের মূল ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়। ২০১৪ সালে ফ্রান্সের মারতিনিক দ্বীপে প্রায় এক লাখ চুয়াল্লিশ হাজার মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৩৭ ভাগ) এই জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং এর ফলে ৪৭ জন মারা যায়। বাংলাদেশে এ জ্বরের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে ২০০৮ সালে রাজশাহী এবং চাপাই নবাবগঞ্জে। এর পরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ জ্বরের রোগী পাওয়া গেছে।

চিকনগানিয়া জ্বর ভাইরাস জনিত। মাকন্দেই (তাঞ্জানিয়ার একটা ভাষা) ভাষায় ‘চিকনগানিয়া’ অর্থ ‘যা বাঁকা করে দেয়’। কঙ্গোতে এ জ্বরকে বলা হয় ‘বুকা-বুকা’ যার অর্থ ‘ভেঙ্গে যাওয়া’। এরকম নামের কারণ হল এই জ্বর হলে শরীরের গিরায় গিরায় এতো ব্যথা হয় যে রোগীর নড়তে-চড়তে ভীষণ কষ্ট হয়। বাংলায় এটাকে অনেকে ল্যাংড়া জ্বর বলে ডেকে থাকেন।

ডেঙ্গির মত চিকনগানিয়া ভাইরাসের বাহক হল এডিস মশা। এডিসের দুটি প্রজাতি এর বাহকঃ এডিস এজিপ্টি (Aedes aegypti) এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস (Aedes albopictus) । সংক্রমিত মশার কামড়ের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। এর জীবনচক্র এরকমঃ মশা-মানুষ-মশা। মানবদেহে প্রবেশের পর চিকনগনিয়া ভাইরাস মশার কামড়ের স্থানে বংশবিস্তার করে এবং পরে ধীরে ধীরে রক্তের মাধ্যমে লিভার এবং অস্থিসন্ধিতে ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমণের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে সময় লাগে ২ থেকে ৪ দিন এবং এর পরে হঠাত করে কাঁপুনিসহ প্রচণ্ড জ্বর চলে আসে। জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বাতের ব্যথার মতো জয়েন্টে জয়েন্টে ভয়ঙ্কর ব্যাথা। মাথা ব্যাথা ও আলোক সংবেদনশীলতাও থাকতে পারে। চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণের ফলে লাল রঙের র‍্যাশও দেখা দিতে পারে। এজন্য অনেকে এটাকে ডেঙ্গি জ্বর মনে করে। জ্বর সারতে সময় লাগে সাধারণত এক থেকে দু সপ্তাহ, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যথা সারতে সময় বেশী লাগে। এটা মাস থেকে বছরেও গড়াতে পারে। ফ্রান্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় ৫০ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে মাংশপেশী এবং অস্থিসন্ধিতে ব্যাথা ৬ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো। অনেক সময় কয়েক বছর এ ব্যাথা থেকে যায়। সংক্রমণের চুড়ান্ত পর্যায়ে প্রতি মিলিলিটার রক্তে ভারাইসের সংখ্যা প্রায় দশ কোটির মত হয়ে থাকে। তবে জ্বর সেরে গেলে রক্তে আর ভাইরাস থাকে না। চিকনগনিয়া জ্বর ডেঙ্গির মত ততোটা প্রাণঘাতী নয়। প্রতি এক হাজের এ জ্বরে ১ জন মারা যায়। বেশী ঝুঁকিতে থাকে শিশু, বৃদ্ধ, ও ডায়াবেটিক রোগীরা। এ জ্বরে একবার আক্রান্ত হলে আর দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নাই।

চিকনগানিয়া জ্বরের নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। কোন প্রতিষেধক বা টিকা এখনো বাজারে আসেনি। তবে বিজ্ঞানীরা ওষুধ এবং টিকা আবিষ্কারের জন্য কাজ করছেন। মূলত আফ্রিকা এবং এশিয়ার অনুন্নত দেশগুলোতে এর প্রকোপ বেশী হওয়ায় ২০০০৫-২০০৬ সালের আগে এটি নিয়ে তেমন গবেষণা হয়নি। ফ্রান্সের দ্বীপগুলোতে এ জ্বরের আক্রমণ হওয়ার পর মূলত এটা পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কারণ হয় এবং এটা যেহেতু এখন আমেরিকা, ইতালিসহ অনেক উন্নত দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই উন্নতমানের গবেষণা চলছে। সম্প্রতি দুটি টিকা গবেষণার শেষ পর্যায়ে আছে। খুব শীঘ্রই বাজারে আসার সম্ভাবনা আছে।

এ জ্বরের প্রধান চিকিৎসা হল বিশ্রাম। জ্বরের জন্য শুধুমাত্র প্যরাসিটামল খাওয়া যাবে। পূর্ণ বয়স্কদের দিনে ৫০০ মিলিগ্রামের আটটা ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে। কিন্তু একবারে দুটার বেশী খাওয়া যাবেনা এবং এক ডোজ থেকে আরেক ডোজের ব্যবধান হতে হবে কমপক্ষে চার ঘন্টা। ডেঙ্গির সাথে কিছু লক্ষণের মিল থাকায়, এ জ্বর ডেঙ্গি না এটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এস পিরিন বা অন্য কোন গ্রুপের ব্যাথার ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।

চিকনগানিয়া যেহেতু মশাবাহী রোগ, তাই এর প্রতিরোধের উপয়ায় হল মশার কামড় থেকে বাঁচা। এডিস মশা দিনে কামড়ায় (বিশেষ করে সকালে এবং পড়ন্ত বিকেলে) তাই দিনের বেলা মশা কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। হাত পা ঢাকা থাকে এমন জামা পরিধান করতে হবে। মশার বংশবিস্তার রোধে ব্যাবস্থা নিতে হবে। চিকনগানিয়ায় কেউ আক্রান্ত হলে তাকে মশার কামড় থেকে বাঁচা বাঞ্ছনীয়। কারণ, রোগের একিউট স্টেজে (৩-১০ দিন) রোগীর রক্তে প্রচুর ভাইরাস থাকে, এবং এর ফলে যে মশা রোগিকে কামড়াবে তা অন্যকে কামড়ালে রোগ ছড়িয়ে পড়বে। যৌনমিলনের মাধ্যমে বা সন্তান প্রসবের মাধ্যমে বা মায়ের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ানোর কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

আসুন আমরা ভয় না পেয়ে সচেতন হই, মশার কামড় থেকে বাঁচি, এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করি। আল্লাহ্‌ আমাদের সহায় হোন।

(বি.দ্রঃ Dengue এবং Chikungunya শব্দ দুটির সঠিক ইংরেজি উচ্চারণ হল যথাক্রমে ‘ডেঙ্গি’ এবং ‘চিকনগানিয়া’ । আমি ইংরেজি উচ্চারণ ব্যাবহার করেছি)

মোঃ আজিজুর রহমান শামীম
পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন এবং সহকারী অধ্যাপক, ফার্মেসী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রেফারেন্সঃ
1. Schwartz, Olivier, and Matthew L. Albert. “Biology and pathogenesis of chikungunya virus.” Nature Reviews Microbiology 8.7 (2010): 491-500.
2. WHO (http://www.who.int/mediacentre/factsheets/fs327/en/)
3. CDC (https://www.cdc.gov/chikungunya/index.html)