ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ব্লগ সংকলন: সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড

 

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১২ তারিখে। চাঞ্চল্যকর এই জোড়াখুনের রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্তকারীগণ এখনও হিমসিম খাচ্ছে। মিডিয়া জগতের সুপরিচিত এই সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকাণ্ড দেশে-বিদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যেও সৃষ্টি করে উদ্বেগ বাড়ায় মিডিয়াকর্মীদের। ফুসে ওঠে সাংবাদিক সমাজ। তেজগাও থানা পুলিশ থেকে এই মামলার তদন্তভার দ্রুত মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ন্যাস্ত করা হয়। কিন্তু তদন্তে অগ্রগতি নিয়ে অসন্তুষ্ট সাংবাদিকগণ বিষয়টি আদালতে নিয়ে যায়। আদালতও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করে তদন্তকারীদের দিকনির্দেশনা দেন। অবশেষে আদালতের নির্দেশ মতো এই মামলার তদন্তভার র‌্যাবের উপর অর্পিত হয়। র‌্যাবের তদন্ত শাখার জনৈক সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার বর্তমানে মামলাটির তদন্তকার্য পরিচালনা করছেন। বলা বাহুল্য, ডিএমপি এর ডিবি তদন্ত করে ১৮ এপ্রিল, ২০১২ পর্যন্ত। ডিবি তদন্ত করে মাত্র ৬৬ দিন। র‌্যাবের তদন্ত এই পর্যন্ত চলেছে ৩০০ দিন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই মামলার সঠিক রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি।

পৃথিবীতে সংঘটিত সকল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হবে, এমন কোন সূত্র নেই। পাশ্চাত্য দেশগুলো তাদের উন্নত তদন্ত-কৌশল ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সংঘটিত সকল অপরাধ উদ্ঘাটনে সফল হয় না। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে সেদেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের হার ৬৩.৮০% । এর সরল অর্থ দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভু-সীমায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে ৩৬% হত্যার কোন কুল কিনারাই করতে পারে না সে দেশের পুলিশ [1]। একই অবস্থা ব্রিটিশ পুলিশগুলোর। এক্ষেত্রে জাপান পুলিশ বিস্ময়কর সাফল্য প্রদর্শন করলেও তাদের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। জাপানে শুধু অপরাধ উদ্ঘাটনই নয়, সেদেশের ফৌজদারি অপরাধে সাজার হার প্রায় ১০০%।

কিন্তু তার মানে এই নয় যে বিস্ময়কর জাপান পুলিশ সব অপরাধ, বিশেষ করে সকল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হয়। উদাহরণ স্বরূপ এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। ১৯৯৪ সালে জাপানের আইওকাশিরা উদ্যানে একটি ময়লার ঝুড়িতে এক তরুণ প্রকৌশলীর ২৪ টুকরায় খণ্ড বিখণ্ড লাশ উদ্ধার হয় [2]। সাম্প্রতিক ইতিহাসে জাপানের জনগণ এর মতো কোন বিভৎস হত্যাকাণ্ডের খবর শোনেনি। সবিশেষ গুরুত্ব বিবেচনায় জাপান পুলিশের সবচেয়ে চৌকশ একটি দলকে নিয়োগ করা হয় এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে। এই তদন্ত দলটি এতটাই চৌকশ ছিল যে পরবর্তীর্তে জাপানের পাতাল রেলে বোমা বিষ্ফোরণের ঘটনা ঘটলে এই টিমের অধিকাংশ সদস্যকে সেই বোমা-বিষ্ফোরণ ঘটনার তদন্তকাজে নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু এত চৌকশ হওয়া সত্ত্বেও জাপান পুলিশের এই দলটি প্রায় ১৫ বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন তদন্ত করেও এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তই পরিত্যাক্ত হয়েছে। রূপকথার সাফল্যের জাপান পুলিশের ডায়েরিতে এই হত্যাকাণ্ড আজো ব্যর্থতার কলঙ্ক।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় পুলিশ তো বটেই, এমনকি, সেদেশের চৌকশ ফেডারেল পুলিশও হাজার হাজার অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটনে অহরহই ব্যর্থ হচ্ছে। এফবিআইয়ের ইতিহাসের পাতা জুড়ে এ জাতীয় ব্যর্থ তদন্তের তালিকা রয়েছে। তবে আমরা একটি সাম্প্রতিক কালের ঘটনা উল্লেখ করব।

২০০১ সালে আমেরিকার সিয়াটল শহরের ফেডারেল আইনজীবী টমাস সি. ওয়েলস হত্যার ঘটনাটি উল্লেখ করা যায়। দীর্ঘ ১৩ বছরের তদন্তে সে দেশের পুলিশ অপরাধী তো দূরের কথা এখন পর্যন্ত একজন সাক্ষ্যিকেও তারা শনাক্ত করতে পারে নি। কার্যত হতাশ এফবিআই কর্তৃপক্ষ এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দলে দুজন মাত্র অফিসার রেখে অন্যদের অন্যান্য আশুগুরুত্বের তদন্তে নিয়োজিত করেছে [3]।

যে এফবিআই ১৯৬৮ সালে কৃঞ্চাঙ্গ মানবাধিকার নেতা মার্টিন লুথার কিং এর হত্যাকারী জেমস রয় কে গ্রেফতারের জন্য সারা বিশ্বব্যাপী ৩,০১৪ জান অফিসার নিয়োগ করেছিল; এই এজেন্টগণ সারা বিশ্বে ৫ লক্ষ মাইল রাস্তা পরিভ্রমণ করেছিল; মাত্র দুই মাসের মাথায় লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে রয়কে গ্রেফতার করা পর্যন্ত যে এফবিআইয়ের মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ১৪ লক্ষ ডলার [4] সেই এফবিআই তার দেশের অভ্যন্তরে একজন ফেডারেল আইনজীবীর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে আজ প্রায় ১৩ বছর ধরে হাবুডুবু খাচ্ছে।

বাংলাদেশ পুলিশের এই ক্ষেত্রে পারঙ্গমতার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরা সম্ভব নয়। কারণ, পুলিশের সাফল্য-ব্যর্থতার সুর্নিদিষ্ট ইতিহাস কেউ রাখে না। তবে উন্নত দেশগুলোর তদন্তকার্য পর্যালোচনান্তে আমাদের দেশে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর বলে পরিচিত কিছু মামলাগুলোর দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে চাঞ্চল্যকর বলে পরিচিত খুব কম সংখ্যক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে বাংলাদেশ পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে। তবে তারা এজন্য পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করেছে। উদাহরণ হিসেবে আমরা সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত সৌদি পররাষ্ট্র দফতরের কূটনীতিক খালাফ হত্যা, বক্ষব্যাধী হাসপাতলের ডক্তার নারায়ন চন্দ্র দত্ত নিতাই হত্যা, গুলশানের হক পেইন্টার্সেও মালিক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ফজলুল হক, আব্দুল গণি রোডের নিশাত বানু হত্যা, গ্রীন রোডের ঠিকাদার জিয়াউল ইসলাম রিপন হত্যাসহ সংঘটিত প্রায় সকল হত্যাকাণ্ডের সফল রহস্য উদ্ঘাটনে বাংলাদেশ পুলিশ, বিশেষ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ভাগের সাফল্য উল্লেখ করতে পারি।

এ কথা সঠিক যে ৬৬ টি দিন তদন্ত করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্তৃপক্ষ সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে বলার মতা কোন সাফল্য অর্জন করতে পারে নাই। কিন্তু তদের তদন্ত যে একেবারে সাফল্য-শূন্য ছিল এটা বলা যাবে না। প্রকৃত সাফল্যের জন্য পুলিশের দক্ষতার বাইরেও যে জিনিসটি মহামূল্যবান তা হল, পর্যাপ্ত সময়। একটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে এক মাস বা দুই মাস সময় আপাতত পর্যাপ্ত মনে হলেও তা সব হত্যাকাণ্ডের জন্য পর্যাপ্ত নয়। সাগর-রুনি দম্পত্তির হত্যাকারীগণ হয়তো খুবই সতর্ক। হয়তো তারা তাদের অপরাধের আলামত সমূহ সতর্কভাবেই গোপন করতে পেরেছে। আবার এও হতে পারে যে রহস্য উদ্ঘাটনে যে সকল তথ্য-সূত্র প্রয়োজনীয় বা জট খোলার জন্য সহায়ক, মেধা-মনন আর অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তদন্তকারীগণ এর কাছাকাছি ঘুর পাক খাচ্ছেন, কিন্তু এটা সঠিকভাবে উপলব্ধিই করতে পারছেন না।

ডিবির ৬৬ দিন আর র‌্যাবের ৩০০ দিনের তদন্তে এখন পর্যন্ত সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। তবে এই ঘটনার রহস্য যে পুলিশের কাছে একদম অজানাই থেকে যাবে এমনটি বলার সময় এখনও আসেনি। আবার সেই সাথে এটাও হলফ করে বলা যাবে না যে তদন্তকারীদের হাজারো ব্যর্থ তদন্তের তালিকায় এটিও যুক্ত হবে না। তবে সব কিছর ঊর্ধ্বে আমাদের ধৈর্য্যশীল হতে হবে। বর্তমানে র‌্যাবের তদন্তকারী কর্মকর্তা একজন অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসার। পুলিশের বিভিন্ন দফতে বিশেষ করে অপরাধ তদন্ত বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে তিনি শত শত জটিল মামলার তদন্ত সাফল্যেও সাথে সম্পন্ন করেছেন। পর্যাপ্ত সময় পেলে এক্ষেত্রেও তিনি তার সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ প্রদর্শনে সক্ষম হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করতে পারি।

সূত্রাবলীঃ
[1] http://www.statista.com/statistics/194200/crime-clearance-rate-in-cities-in-the-us/
[2] http://en.wikipedia.org/wiki/Inokashira_Park_dismemberment_incident
[3] http://en.wikipedia.org/wiki/Thomas_C._Wales
[4] A Policeman Ponders (Memories and Melodies of a Varied Life) by Mahmood Bin Mohammad; A.P.H. Publishing Corporation 5, Ansari Road, Daria Ganj New Delhi-110002; ISBN-81-7648-026-6