ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

 

হরতালে দায়িত্ব পালনকালে একটি রাজনৈতিক দলের অংগ সংগঠনের তরুণ নেতাকর্মীদের সীমাহীন নৃসংশতার শিকারে পরিণত হয় রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর মকবুল হোসেন। আকস্মিক হামলার শিকার হয়ে তার সঙ্গীয় পুলিশ ফোর্স নিজেদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে তাদের দলনেতাকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর দুয়ারে। হামলাকারীগণ একলা পেয়ে মকবুলকে ইঁট-কাঠ-পাথর যা হাতের কাছে পেয়েছিল তা দিয়েই তার মাথাসহ পুরো শরীর থেঁতলে দেয়। তার সাথের সরকারি অস্ত্রটিও হামলাকারীগণ ছিনিয়ে নেয়।

 

পুলিশ সাবইন্সপেক্টর মকবুল মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে থাকে রাজপথে। তাকে বাঁচানোর জন্য তার পাশে নেই কোন সহকর্মী, নেই কোন সাধারণ মানুষ। এই অবস্থায়, বিপন্ন মানবতার সেবায় এগিয়ে আসে এক সাধারণ নারী। পথের পাশের ঝর্ণা বেগম। ঝর্ণাকে সহায়তা করে কিছু তরুণ-যুবক এবং মিডিয়াকর্মী। বলতে গেলে পুলিশ সহকর্মীদের জন্য নয়, একজন সাধারণ মানুষের জন্যই পৃথিবীতে এখনও বেঁচে আছেন পুলিশ অফিসার মকবুল হোসেন।

 

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত একজন পুলিশ সদস্যকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে তার জীবন রক্ষায় অসাধারণ অবদানের জন্য অতি সাধারণ নারী ঝর্ণা বেগমকে পুরস্কৃত করার প্রস্তাব করেছেন অনেকেই। মিডিয়াগুলো ঝর্ণাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগযোগ বিভিন্ন ওয়েব সাইটেও ঝর্ণা বেগমের অবদান প্রশংসিত হয়েছে।

 

ইতোমধ্যে রাজশাহী সিটি কপোরেশনের মাননীয় মেয়র ঝর্ণা বেগমকে তার অফিসে ডেকে ফুলেল সুভেচ্ছায় সিক্ত করেছেনে। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্তৃপক্ষ ঝর্ণার বেকারত্ব ঘোচানের প্রচেষ্টা গ্রহণ করছেন বলেও পত্রিকায় খবর এসেছে। কিন্তু এই সব কিছুর উপরে অনেকে ঝর্ণাকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করার প্রস্তাব করছেন। আমি তাদের প্রস্তাব সমর্থন করছি।

 

বলাবাহুল্য, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর অনেক দেশে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশকে সহায়তা ও বীরত্বপূর্ণ কর্তব্য পালনের জন্য সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা ও আপন সমাজকে আপন উদ্যোগে সুশৃঙ্খল বা অপরাধমুক্ত করার কাজে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই এই সব পুরস্কার প্রদান করা হয়ে থাকে।

 

আমরা উদাহরণস্বরূপ ব্রিটেনের পুলিশ বিভাগগুলো প্রবর্তিত বিভিন্ন ধরণের পুরস্কারের মধ্যে পুলিশ প্রধানদের এসোসিয়েশন কর্তৃক প্রদেয় ACPO Police Public Bravery Awards ও ডার্বিশায়ার পুলিশের Constabulary Award এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিব।

 

পুলিশ প্রধানদের এসোসিয়েশনের গণ-সাহসিকতার পুরস্কার ব্রিটেনের সকল পুলিশ বিভাগগুলোই প্রতি বছর দিয়ে থাকে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অন্যান্য কাজে পুলিশকে সাহসিকতাপূর্ণ সহযোগিতার জন্য সাধারণ জনগণ এই পুরস্কার পেয়ে থাকেন। অসাধারণ সাহসিকতার জন্য স্বর্ণ পদক এবং অপেক্ষাকৃত কম সাহসিকতার জন্য রৌপ্য পদক দেওয়া হয়। সেই সাথে পুরস্কার প্রাপ্তকে একটি সনদপত্রও দেওয়া হয়। পুলিশ বিভাগের বিভিন্ন ইউনিটের কমান্ডারগণের সুপারিশের ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতি বছর এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।

 

অন্যদিকে ডার্বিশায়ার কনস্টেবুলারি পুরস্কারটি হল ডার্বিশায়ার পুলিশের নিজস্ব উদ্যোগ। পুলিশের সাথে সহযোগিতা ও অপরাধ প্রতিরোধ কাজে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ডার্বিশায়ারের যে কোন সাধারণ মানুষ এই পুরস্কার পেতে পারেন। পুরস্কারধারীকে একটি সনদপত্র দেওয়া হয়। এমনকি যারা সর্বোচ্চ পুরস্কার পান না, কিন্তু পুরস্কারের জন্য মাঠ পর্যায়ের কমান্ডারগণ কর্তৃক যাদের নাম পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করা হয়, তাদেরও একটি করে ধন্যবাদ পত্র প্রেরণ করা হয়। এর বাইরেও ব্রিটেনের পুলিশ বিভাগগুলো জনসাধারণের জন্য অন্যান্য বহুবিধও পুরস্কারের আয়োজন করে।

 

সাহসিকতা প্রদর্শন ও অপরাধ প্রতিরোধে অবদানের জন্য বাংলা ভূখণ্ডে যে পুলিশ বা সরকার কর্তৃক পুরস্কার প্রদান করা হয় না তা কিন্তু নয়। বরং আইন-শৃঙ্থলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ ইত্যাদি কাজের জন্য সাধারণ মানুষকে পুরস্কৃত করার নজির আমাদের বর্তমান পিআরবিসহ অন্যান্য আইন-বিধিতেই রয়েছে। পিআর বি এর ১০৫১ ও ১০৫২ নম্বর রেগুলেশনে এই সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে।

 

অনেকে শুনে আশ্চর্যান্বিত হবেন, সেই সময় ( ১৯৪০ দশকে) একজন নিরস্ত্র খুনি, দস্যু, ডাকাত কিংবা অস্ত্রধারী অন্য যে কোন ধরনের অপরাধীকে গ্রেফতারের জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার প্রদানের নিয়ম ছিল। অন্যদিকে অস্ত্রসহ একজন ডাকাতকে গ্রেফতারের জন্য ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারের নিয়ম প্রচলিত ছিল। এতদভিন্ন পুলিশি কাজে সহযোগিতার জন্য ইন্সপেক্টর জেনারেলকে সাধারণ জনগণকে সার্টিফিকেট প্রদানের জন্যও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। শুনেছি, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও এ ব্যবস্থাটি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে না হলেও স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমানে আমাদের দেশে এই ব্যবস্থাটির প্রচলন নেই। পিআরবি এর প্রাচীন রীতিটি ক্রমান্বয়ে আমাদের দেশের পুলিশ বিভাগ থেকে একদম উঠে গেছে।

 

বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগে গোপন তথ্য সংগ্রহ বা ক্রয়ের জন্য সোর্স নিয়োগ করা হয়। এই জন্য কিছু অর্থও বরাদ্ধ থাকে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ গোপন বিষয়। অপরাধের গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য এটার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু কোন জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ রাখতে গেলে শুধু গোপন তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থাই যথেষ্ঠ নয়। যখন কোন দেশের নাগরিকগণ প্রকাশ্য ঘোষণা ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পুলিশের কাজে সহযোগিতা করে ও সমস্যা সমাধানে পুলিশের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে, তখনই সেই দেশ বা সমাজ প্রকৃতপক্ষে নিরাপদ হয়। পুলিশের কাজে সহযোগিতা বা অপরাধ প্রতিরোধে সাহসিকতার জন্য জনসাধারণকে স্থানীয় পর্যায়ে ও কেন্দ্রীয়ভাবে পুরস্কার প্রদান সরকার কর্তৃক পুলিশ-অপুলিশ নির্বিশেষে সকল মানুষকে নিরাপদ সমাজ গঠনে অবদান রাখার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে।

 

অধুনা বাংলাদেশ পুলিশ অপরাধ প্রতিরোধে জনগণের সাথে কার্যকর অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করেছে। এই পুলিশি ব্যবস্থায় সাধারণ জনগণ পুলিশের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজেদের এলাকার অপরাধ প্রতিরোধ করে থাকে। এই ক্ষেত্রে অনেক সময় তাদের জীবনের ঝুঁকিও নিতে হয়। অনেক স্থানে সাধারণ মানুষ স্ব-উদ্যোগে অপরাধ প্রতিরোধ বা মানুষকে অপরাধীদের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন বাজি রাখে।

 

অন্যদিকে, বিবেকের তাড়নায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়েই অনেক সাধারণ মানুষ তাদের সামনে সংঘটিত অপরাধকর্মকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করে। এই তো গত ৬ এপ্রিল, ২০১২ তারিখে ঢাকার রাইন খোলার চিড়িয়াখানা রোডে কয়েকজন গৃহবধূকে ছিনতাইকারীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন দিলেন ৪০ বছর বয়স্ক হযরত আলী । আর সর্বশেষ নৃশংস রাজনৈতিক হামলাকারীদের বাঁচালেন পথের পাশের ঝর্ণা বেগম সহ কয়েকজন সংবাদকর্মী।

 

বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যগণ অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত, আসামী গ্রেফতারসহ অন্যান্য সেবাধর্মী কাজে অসাধারণ অবদান রাখার জন্য প্রতি বছরই বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম) ও প্রেসিডেন্ট পুলিশ মেডেল (পিপিএম) পেয়ে থাকেন। এই মেডেল প্রাপ্তি তাদের যেমন বিপুল সম্মান এনে দেয়, তেমনি বয়ে আনে কিছু না কিছু অর্থনৈতিক সুবিধাও। কিন্তু একই কাজের জন্য অসাধারণ অবদান রাখার জন্য সাধারণ জনগণের জন্য কোন পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই। পুলিশ সদস্যরা তাদের প্রাত্যহিক কর্তব্যের অংশ হিসেবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকেন। এই ঝুঁকি বিবেচনায় এনে সরকার তাদের জন্য সামান্য হলেও কিছু না কিছু ঝুঁকি ভাতার প্রচলন করেছে। আবার অসামান্য অবদানের জন্য তাদের সাহসিকতা বা সেবাদানের স্বীকৃতি স্বরূপ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও দেওয়া হয়। কিন্তু যে হযরত আলী অপরাধ প্রতিরোধের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন, যে ঝর্ণা বেগম একজন মৃতপ্রায় পুলিশ সদস্যকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে আনলেন রাষ্ট্র বা সমাজের পক্ষ থেকে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হল কিভাবে?

 

এমতাবস্থায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ, পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টিসহ অন্যান্য কাজে অধারণ অবদানের জন্য সাধারণজনগণকে পুলিশ পদক কিংবা অন্য কোন পুরস্কার প্রদানের প্রচলনের বিষয়টি পুলিশ নেতৃত্ব ও সরকারের নীতিনির্ধারকগণ সঙ্গতভাবেই বিবেচনা করতে পারেন। (১৯ এপ্রিল, ২০১৪)

সূত্রাবলী:

১,http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2013-04-02/news/341655

২.https://www.policingtoday.co.uk/Courage_honoured_at_ACPO_awards_22518.aspx

৩.  http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2012-05-05/news/255143