ক্যাটেগরিঃ অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড - ব্লগ সংকলন, ধর্ম বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
40_Avijit+Roy_Murder_260215_0002

একুশের বই মেলা থেকে বের হওয়ার পর মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, লেখক ও প্রকৌশলী অভিজিৎ রায়কে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করেছে। এ সময় তার সাথে তার স্ত্রীও ছিল। তাকেও আহত করা হয়েছে। অভিজিৎ হত্যার পর আনসারউল্লাহ বাংলা টিম নাকে একটি চরমপন্থি জঙ্গি গ্রুপ নাকি ফেইসবুকে স্টাটাস দিয়ে এর দায় স্বীকার করেছে। অনেক ব্লগ বা ফেইসবুক পাতায় নাকি উল্লাস প্রকাশও করা হয়েছে।

 

ব্লগার ও অভিজিৎ ভক্তরা এটাকে জঙ্গিদের কাজ বলেই মনে করছেন। ইতোপূর্বে এভাবে আরো কয়েকজন ব্লগার নিহত হয়েছিল। এ হত্যাকাণ্ড তারই ধারাবাহিকতা বলেই অনেকে মনে করছেন। কিন্তু পূর্বের ব্লগারদের চেয়ে বর্তমানের ব্লগার অভিজিৎ নানা দিক দিয়েই আলাদা ও বিশিষ্ট। তিনি কেবল একজন ব্লগার বা লেখকই নন। তিনি একজন প্রকৌশলী, একজন মেধাবী বাংলাদেশি। তিনি সাধারণ ইন্জিনিয়ার নন। তিনি ইন্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও বটে।

 

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের তদন্তও তাই একটা স্বকীয়তা পেতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের এফবিআই দিয়ে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার নাকি সে প্রস্তাবে ইতিবাচন সাড়াও দিয়েছে।

 

ব্লগারদের হত্যা শুরু হয় আহম্মদ রাজিব হায়দার শোভনকে দিয়ে। ২০১৩ সালের ১৫ ফ্রেব্রুয়ারিতে তাকে মীরপুরের পলাশ নগরে তার বাসার একটু দূরে দুর্বৃত্তরা জবাই করে হত্যা করে। তারপরেও কয়েক ব্লগারের উপর হামলা চালান হয়েছে। সর্বশেষ ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ তে একুশের বই মেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অভিজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রাজিব, অভিজিৎসহ অনেক ব্লগারকে নাস্তিক বলা হচেছ। কোন কোন ব্লগার তাদের লেখনির মাধ্যমে দাবী করেছেন কিংবা প্রমাণও করেছেন যে তারা নাস্তিক। কিন্তু নাস্তিক হলেই তাকে খুন করতে হবে — এমন বিধান তো নেই। তাছাড়া নাস্তিকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে কোন আইনও নেই। নাস্তিকতা একটি মানসিক বিষয়। এটা বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের বিষয়। কোন ব্যক্তির বিশ্বাস যদি কোন ক্ষতিকারক আচরণ বা কাজের মধ্যে না পড়ে তাহলে সেটা আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য হয় না। আইনের ভাষায়  অসৎ ইচ্ছা যদি কাজে পরিণত না করা হয় বা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা না হয়, তাহলে সেই অসদিচ্ছার জন্য কাউকে শাস্তি দেয়া যায় না।

 

কিন্তু নাস্তিক মানে কি? আমার মতে, নাস্তিক মানে হল সেই ব্যক্তি যিনি সৃষ্টি কর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। এ অর্থে যারা কোন না কোন ধর্মে বিশ্বাস করেন, তাদের নাস্তিক বলতে পারি না। ধর্মেরও আবার অনেক প্রকারভেদ আছে। কোন কোন ধর্ম একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করে, কোন কোন ধর্ম বিশ্বাস করে বহু ঈশ্বরে। কোন কোন ধর্মে আবার ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। হিন্দু ধর্মালম্বীগণ মূর্তিপূজক। তারা মূলত বহু ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। তবে এদের মধ্যে বহুত্বের মধ্য দিয়ে একের গুণগান করার অনেক গোষ্ঠীও রয়েছে। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানগণ এক ঈশ্বর বা একজন আল্লাহতে বিশ্বাস করেন। তবে এ তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মের মধ্যেও বাহ্যিক আচারে বহুবিধও তফাৎ রয়েছে। মুসলমানরা যেখানে বিশ্বাস কর আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তার কোন শরীক নেই, তিনি নিজে যেমন জন্মগ্রহণ করেননি, তেমনি তিনি কাউকে জন্মও দেননি। তবে তিনি সব কিছুই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু খ্রিস্টানদের মধ্যে আবার যিসুকে ঈশ্বরের পুত্র বলে দাবি করা হয় যা ইসলামের মৌলভিত্তির পরিপন্থি।

 

যদি আস্তিকতাকে ক্ষুদ্রতর অর্থে ব্যাখ্যা করি, তাহলে বলতে হবে যিনি কোন নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাস করেন না তাকেই নাস্তিক বলতে হবে। এক্ষেত্রে মুসলমানের দৃষ্টিতে, খ্রিস্টান কিংবা ইহুদির দৃষ্টিতে মুসলমানগণ নাস্তিক হতে পারে। এক্ষেত্রে আমার বিশ্বাসের যারা অনুরূপ নন, তারাই নাস্তিক।

 

এক্ষেত্রে বিশিষ্ট নাস্তিক প্রয়াত আহম্মদ শরীফের নাস্তিমতের একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। একবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আড্ডায় এক লোক ফোন করে আহম্মদ শরীফের কাছ থেকে জানতে চাইলেন, তিনি নাস্তিক কেন? প্রফেসর আহম্মদ শরীফ ফোনে লোকটিকে বললেন, আপনি কোন ধর্মের লোক। লোকটি বললেন, তিনি মুসলমান। আহম্মদ শরীফ বললেন, আপনি কি খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাস করেন? লোকটি বললেন, না। আহম্মদ শরীফ লোকটিকে বললেন, আপনি কি হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করেন? লোকটি না বললেন। এভাবে আহম্মদ শরীফ লোকটিকে ইহুদি ধর্মের কথাও বললেন। কিন্তু লোকটি এ চারটি প্রধান ধর্মের তিনটিতে বিশ্বাস করেন না বলে জানালেন। এর পর আহম্দ শরীফ বললেনে, আপনি চারটি ধর্মের মাত্র একটিতে বিশ্বাস করেন। এক্ষেত্রে অন্য তিনটি ধর্মের বিশ্বাসের তুলনায় আপনি তিনভাগের একভাগ আস্তিক। অন্য ধর্মের লোকগুলোও তাই। আপনার থেকে আমার পার্থক্য হল, আমি এ ধর্মগুলোর কোনটাই বিশ্বাস করি না। তাই আমি চারভগের চারভাগই নাস্তিক। নাস্তিকতার মাত্রায় আপনার চেয়ে আমি শুধু এক মাত্রা বেশি।

 

প্রফেসর আহম্মদ শরীফের এ যুক্তি হয়তো অনেকে মেনে নিবেন না। আমিও মানি না। কিন্তু সংকীর্ণ ধর্ম বিশ্বাস উগ্রপন্থিদের ঠিক এমনই ধারণা দেয়। তিনি ছাড়া বা তার ধর্ম ছাড়া অন্যগুলো ধর্মই নয় এবং তার ধর্মের বাইরে যারা তারা কতলযোগ্য। কিন্তু ধর্মের মহাত্ম এত সংকীর্ণ নয়। এক ধর্ম অন্য ধর্মগুলোর অস্তিত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারে না। আবু জেহেলের ধর্মের সাথে মহানবীর(স) ধর্মের যে পার্থক্য ছিল এবং আবুজেহেলের ঈশ্বর ভাগাভাগির প্রস্তাবে মহানবি বিনয়ের সাথে নারাজি দিয়েছিলেন, সুরা কাফেরুনই তো তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। আবু জেহেলের ধর্ম আবু জেহেলের কাছেই থাক; আর আমার ধর্ম আমার কাছে। যদি আবু জেহেলের ধর্ম উৎকৃষ্ট বা সত্য না হয়, তাহলে সেটা আপনা আপনিই বিলুপ্ত হবে। এর জন্য আবু জেহেলকে কতল করতে হবে না। আমাদের মহানবি(স) মক্কা বিজয়ের পরেও আবু জেহেলকে কতল করেননি। তার করুণ হলেও স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়েছিল। আর আবু জেহেলের বিশ্বাসও পরাজিত হয়েছিল। এখন সে পৃথিবীর ইতিহাসে একজন ধীকৃত ও গোমরাদের একজন।
অনেকে মনে করেন, নাস্তিকগণ আস্তিকদের ধর্ম নষ্ট করে। তাদের বিশ্বাস বা ইমানে আঘাত দিয়ে তা দুর্বল করে দেয়। এ মতের লোকদের বলব, আমি একজন আস্তিক। কিন্তু নাস্তিকদের কোন কর্মেই আমার আস্থা বা বিশ্বাসের উপর কোন আঘাত করতে পারে না। আমি মনে করি, একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের পরিচালিত করছেন এবং তিনি আমাদের স্বাধীন চেতনা দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন।  তার বিরুদ্ধে নাস্তিকদের কোন যুক্তিই আমার বিশ্বাসকে টলাতে পারে না। দু একজন নাস্তিক দু চার কথা বললেই বা লিখলেই যদি আমার বিশ্বাস টলমল করে, তাহলে আমি একজন দুর্বল প্রকৃতির লোক। শয়তানের প্ররোচনায় কিছু পাপের কাজ যে করি না, তা নয়। কিন্তু তাই বলে শয়তান আমাকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকেই ভুলিয়ে দিবে এমন বোধ কখনও হয়নি।

 

আরো একটি কথা এখানে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। এ জগতে নাস্তিকরা খুবই সংখ্যালঘু। নাস্তিকের ভান করেও অনেকে নাস্তিক হতে পারে না। তৎকালে কমিউনিস্ট গুরুরা নাস্তিক হওয়াকে সাম্যবাদের প্রথম সোপান বলে মনে করতেন। কিন্তু চাইলেই কি কোন মানুষ তার এত দিনের লাতিত বিশ্বাসকে হাওয়ায় মিলিয়ে দিতে পারে? কমিউনিস্ট গুরুদের শিষ্যরা অনেকেই তাই নাস্তিকতার ভান করতেন। শুনেছি, ভারতের কমুউনিস্ট কমরেডগণ তাদের মার্কস-লেনিনের বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে নাকি মহা শক্তির দেবী কালীমূর্তি লুকিয়ে লুকিয়ে রাখতেন। অন্যদের অগোচরে সেই মূর্তির পূজাও করতেন। তাই নাস্তিকদেরও নাকি জাতপাত আছে। হিন্দু নাস্তিক, মুসলিম নাস্তিক কিংবা ইহুদি নাস্তিক।  তবে এরা যতই নাস্তিক হউক না কেন, ঠেলায় পড়লে আল্লাহ বা ভগবানের নামটি  তাদের জিহব্বার ডগায় সঠিক সময়েই উঠে আসে। আল্লাহ গো! মরে গেলাম গো! ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

তাই আমি মনে করি, সংখ্যালঘু নাস্তিকগণ সংখ্যাগুরু আস্তিকদের জন্য কোন হুমকি নয়। যারা নাস্তিকদের হুমকি মনে করেন, তারা আসলে নিজেরাই দুর্বল কিংবা নিজের কোলে ঝোল টানা দলের সদস্য। হুমকি যদি কেউ মনে করে, তারা অন্য কারণে তা মনে করে। কারণ আস্তিক মানেই ভাল মানুষ নয়। চোর, ডাকাত, মাস্তান, বাটপাড়, ঘুসখোর, মদখোর, চাঁদাবাজ, মাগীবাজ এদের মধ্যে নাস্তিক নেই বললেই চলে। হাজার খুনের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীও সৃষ্টি কর্তার কাছে ক্ষমা চেয়েই ফাঁসির রসি গলায় তোলে। তাই যারা নাস্তিক নিধনের ফতোয়া দেন, তারা আসলে ধর্ম নয়, অন্য কিছুতে আসক্ত। মানুষের কাছে একটি মাছির দুটো পাখার যে মূল্য আছে, স্রষ্টার কাছে এ গোটা পৃথিবীর দাম তার চেয়েও কম। ক্রমবর্ধমান এ মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও পরিচালক স্বয়ং আল্লাহ। আর আমাদের শুধু পৃথিবী কেন, গোটা সৌর জগৎটাই একটা বিন্দুর নিযুত কোটি ভাগের অংশ মাত্র। তাই আল্লাহর এ পৃথিবীতে দু চার জন নাস্তিক হেঁটে বেড়ালে আল্লাহর কি আসে যায়?

 

স্রস্টাকে অস্বীকার করার শাস্তি তো স্বয়ই স্রষ্টাই দিবেন। তাই পৃথিবীতে নাস্তিকতার বিচারের ভার সর্বজ্ঞ আল্লাহর উপরই ছেড়ে দেয়াই উচিৎ নয় কি?। তবে হ্যাঁ,  যুক্তি দিয়ে নাস্তিকের মতবাদকে খণ্ডানোর প্রচেষ্টা অবশ্যই করা দরকার। কিন্তু অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে যুক্তি যেন কোনভাবেই পেশী শক্তিতে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে সেটা হয় বিশৃঙ্খলা।

 

শুনেছি, নাস্তিকরা নাকি বহু সংখ্যক ব্লগ খুলে তাদের মতবাদ প্রচার করছে। কিন্তু আমি বলি, ব্লগের জগৎটা তো নাস্তিকরা মৌরসী পাট্টা নেয়নি যে আস্তিকরা সেখানে ঢুকতে পারবে না। পূর্বেই বলেছি যে নাস্তিকদের চেয়ে আস্তিকগণ সংখ্যা গরিষ্ঠ। আস্তিকরা শুধু সংখ্যায় নয়, তাদের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতাও রয়েছে। কেননা, এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে নাস্তিক রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটেনি। রাষ্ট্র তার জন্মলগ্ন থেকেই ধর্মে বিশ্বাসী শাসককুল দ্বারা শাসিত হচেছ। আধুনিক রাষ্ট্রের শাসকগণ কেউ বাইবেল হাতে, কেউ কোরান হাতে কেউ বা অন্যকোন ধর্মগ্রন্থের উপর হাত রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার শপথ নেন। কোন কোন রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে ধর্মীয়। তাই আস্তিকদের সাথে নাস্তিকরা পারে কি করে?

 

নাস্তিকরা যদি একটি ব্লগ খোলে, তারা যদি একটি বই বের করে, তারা যদি একটি পত্রিকা বের করে, আস্তিকরা তো লক্ষ লক্ষ বই বের করতে পারে। তাই নাস্তিক ব্লগের বিপরীতে আস্তিক ব্লগ খোলা হোক। নাস্তিকদের মতবাদকে মতবাদ দিয়েই পরাস্ত করা হোক।