ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবটুকুই সরকার নিয়ন্ত্রণ করে না। যেটুকু নিয়ন্ত্রণ করে, সরকারের নীতির প্রতিফলন সেইটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

সরকারের ব্যবস্থার বাইরে যদি কোন শিক্ষা না চলত, তাহলে কওমী মাদ্রাসাকে নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য সহজ হত। কিন্তু আমার জানা মতে দেশের সব শিক্ষাকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা কিংবা করে না।

যেমন ধরুন ইংরেজি মাধ্যমের এ লেভেল, ও লেভেলের পড়াশোনা। এগুলোতে ব্রিটিশ সিলেবাসে হয়। এগুলোর পরীক্ষাও নেয় বিদেশিরা, পরীক্ষা হয় ব্রিটিশ কাউন্সিলে। দেশের মধ্যে যে হাজার হাজার ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল বা প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোর উপর কি সরকারের পূর্ণ কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ আেছ?  ঐ সব প্রতিষ্ঠানে বাংলা বা দেশি পাঠ্যক্রমে পাঠদান করা হয় না। এসব প্রতিষ্ঠানে চলে বিদেশি পাঠ্যক্রম। আবার এসব বিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত ফলাফল বা সার্টিফিকেটকে আমরা আবার স্বীকৃতিও দেই। তাহলে ইংরেজি বাস্তব জীবনে কাজ দেয় বলে কি ওদের সরকার প্রশ্রয় দিবে? দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি এসবের কিছুই তো ঐসব ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করছে না। তারা দেশের মধ্যে থাকলেও তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ক্যারিয়ার প্লানিং সব কিছুই তো পাশ্চাত্য সমাজের অনুকরণে হয়। সেখানে কি আমরা কোন কিছু মনে করি, আমরা কি মাইন্ড করি?

Jhalkathi-Madrasa

কওমি মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থা বহু পুরাতন। আধুনিক ব্যবস্থার সাথে এগুলো তাল মেলাতে পারে না। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যারা শিক্ষা লাভ করে বের হয়, তাদের আধুনিক জীবন বঞ্চনা করে, কিংবা তারা নিজেরাই এগুলোকে প্রত্যাক্ষাণ করে। দেশের উৎপাদন, অগ্রগতি, প্রগতি এসব কোন ক্ষেত্রেই তাদের অবদান আমরা চোখে দেখি না। কিন্তু এ দেশের সকল স্তরের, সকল গোষ্ঠীর ও সকল স্থানের মানুষ যা কিছু করে তার সবই কি উৎপাদানশীল, সবই কি প্রগতিতে অবদান রাখে? এই যে হাজার হাজার অশিক্ষত মানুষ, বিরাট অসচেতন জনগোষ্ঠী, কিংবা সামান্য অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন কৃষক, মজুর, শ্রমিক শ্রেণি তারা তো আধুনিক জীবনের সাথে অভ্যস্ত নয়, কিংবা প্রগতিতে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ করতে পারেন না। কিন্তু তাই বলে এরা কি আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি আর অগ্রগতিতে ফেলনা, সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।

কওমি মাদ্রাসা কিংবা মাদ্রাসায় যারা পড়েন, তো তো এ সমাজের আলাদা কোন জনপ্রাণী নয়। তারা আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যেই একীভূত হয়ে আছে। তারা শ্রমজীবী মানুষের মাঝেও আছে কৃষকদের মাঝেও আছে। তার বাইরেও এরা আমাদের সমাজের একটা গুরুত্বপর্ণ দায়িত্ব পালন করছে, এটা হল আমাদের ধর্মীয় আচারের অনেক বিষয় আমরা তাদের উপর নির্ভর করছি। এই যেমন মসজিদের ইমামগিরি, ইদাগাহের ইদের জামাত পড়ানো, আমাদের শহুরে জীবনের বাড়িটি উদ্বোধন করার জন্য মিলাদ পড়ান, আমরা মরে গেলে জানাজা পড়ান, আবার মরে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য দোয়া-খায়ের করা – এসব কি তারা করছে না? জুম্মার দিনে খুতবা পড়ান, বয়ান করা, রমজান মাসের তারাবির নামাজ পড়ান, আবার হাল আমলের ফ্যাসান খতমে তারাবির আয়োজন এসব কি ওরা করছে না? হ্যাঁ বলতে পারেন, এগুলো তো ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এগুলোতে যেমন উৎপাদনশীলতা নেই , তেমনি প্রগতিশীলতাও নেই। যদি নাই থাকে তাহলে এগুলো আমরা করছি কেন? এগুলো বাদ দিলেই তো হয়।

কিন্তু না, আমরা এগুলো বাদ দিতে পারি না। পৃথিবীতে মানুষ যখন আবির্ভূত হয়েছে, তখন থেকেই ধর্ম মানুষের মনে কোন না কোন প্রকারেই হোক আশ্রয় নিয়েছিল। ইহজাগতিকতায় প্রতিষ্ঠিত মানুষ দ্রুতই পরজগতের খোঁজ করে। এ পরজগতের ভাবনাগুলো মানুষ ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে প্রকাশ করে। কিন্তু আধুনিক মানুষ একই সাথে ইহজাগতিক ক্রিয়াকর্মে এমনভাবে জড়িত আর সেসব কর্মে কর্মবিভাজন এতটাই প্রবল যে তাদের পরজাগতিক কর্মকেও কর্মবিভাজন বা ডিভিশন অব লেইবারের মধ্যে ফেলতে হয়।

কওমী মাদ্রাসা, দাখিলি মাদ্রাসা তথা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের এ পারলৌকিক ভাবের বহিঃপ্রকাশের শ্রমবিভাজনের একটি উপাদান বা শাখা তৈরি করে মাত্র। এর অর্থ হল, এগুলো সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা পূরণ করছে। আমাদের সমাজটি ধর্মহীন নয়, অদূর ভবিষ্যতে এটা ধর্মহীন হয়ে পড়বে তাও আমরা কল্পনা করি না। তাই ধর্মীয় আচারগুলোর প্রয়োজনীয়তা এখন যেমন আছে ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। আর এ প্রয়োজন মেটাবার জন্য আমাদের কিছু প্রশিক্ষিত, দক্ষ জনগোষ্ঠীর দরকার কি পড়বে না? আর তাই যদি পড়ে, ধর্মীয় বিষয়ে পারদর্শী, আচার অনুষ্ঠান, পালন, প্রচার, বা পরিচালনার জন্য কিছু বিশেষ ব্যক্তির দরকার অবশ্যই আছে।

অনেকে বলবেন, কওমি মাদ্রাসাসহ ধর্মী শিক্ষার জন্য পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের পিছনের দিকে টানছে, দেশের জঙ্গিবাদের উত্থান, বিস্তৃতি ও স্থিতির জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই দায়ি। আমি তাদের সাথে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করি। যারা জঙ্গিবাদের অন্তর ইতিহাস পূর্ণভাবে জানেন না তারাই এ ধরনের মত পোষণ করেন। তাদের ধারণা যে জঙ্গিরা শুধু মাদ্রাসা, বিশেষ করে কৌমি মাদ্রাসার ছাত্র/শিক্ষক যারা আধুনিক শিক্ষার ছোঁয়া পায়নি। একটি সংকীর্ণ ও একপেশে সামাজিকীকরণই তাদের এমন ভ্রাতৃঘাতি, স্বজাতিঘাতি ও আত্মঘাতি হতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

কিন্তু জঙ্গি সম্পর্কে এ যাবৎকালের উদ্ধার, গ্রেফতার, প্রতিবেদন, গবেষণা প্রমাণ করে যে এ ধরনের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। জেএমবিসহ তাদের উপদলগুলোর যে সব সদস্য ইতোমধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে কিংবা যারা বোমা বিশেষজ্ঞ, কমপিউটার বিশেষজ্ঞ কিংবা অস্ত্র তৈরিতে ব্যূৎপত্তি অর্জন করেছে, তাদের একটি বড় অংশ হল আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তারা বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর ডিগ্রিধারী থেকে বিলাশবহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসনের নিয়মিত ছাত্র পর্যন্ত রয়েছে। এরা যেমন এসেছে নিতান্ত গরিব, মধ্যেবিত্ত পরিবার থেকে, তেমনি এসেছে উচ্চশিক্ষিত, ধনবান ও রুচিশীল পরিবার থেকেও। তাই মাদ্রাসা কিংবা সংকীণ অর্থে কওমি মাদ্রাসাকে জঙ্গিবাদের আঁতুড়ঘর মনে করার মধ্যে পূর্বসংস্কার থাকেত পারে, কিন্তু সত্যতা নেই।

পূর্বেই বলেছি, সরকার দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে না। তাই কওমি মাদ্রাসাকে নিয়ন্ত্রণ করাও তাদের জন্য হয়তো অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব হবে না। কিন্তু তাই বলে দেশের কোন জনগোষ্ঠীকেই সরকার উপেক্ষা করতে পারে না। আধুনিক রাষ্ট্র তার কার্যকলাপ বা দায়িত্বপালনের ধরন থেকেই তার নাগরিকদের ব্যক্তিগত এমনকি গোষ্ঠীগত বিষয়েও হস্তক্ষেপ  করে না। কারণ গণতন্ত্রে ব্যক্তি ও সংগঠন ্উভয়ের স্বকীয়তা স্বীকার করা হয়। আর আইনানুসারে সরকারও একটি ব্যক্তি। তাই এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির গোপনীয়তা বা স্বকীয়তায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

তাই, এমনভাবে সরকারকে কাজ করতে হবে যাতে এসব অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের মূল স্রোত থকে বিচিছন্ন হয়ে না পড়ে। সেটা সরাসরি নয়, ঘুরিযে ফিরিয়ে তাদের স্বকীয়তার হানি না ঘটিয়ে। যদি দেশের সকল শিশুর জন্য সাধারণ শিক্ষা মানসম্মত ভাবে নিশ্চিত করতে পারি, যদি সাধারণ শিক্ষা প্রকৃত পক্ষেই আমাদের মানুষ করে তোলে, আমাদের উৎপাদনশীল, প্রগততিপরায়ন করে তোলে তা হলে মানুষ সংকীর্ণ পথে হাঁটবে কেন? আর যদি পথটা সংকীর্ণই হয়, এটা প্রসস্ত করে দেয়ার দায়িত্ব সরকারের, সমাজের, আমাদের। কওমি মাদ্রাসাগুলো কিন্তু ছাত্রদের বেতন দিয়ে চলে না, সমাজের অনুদানে চলে। যদি সমাজ মনে করে এদের দরকার নেই, তারা অনুদান দিবেন না, এগুলো আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যাবে। জোর করে বন্ধ করতে হবে না।

যদি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল চলতে পারে, যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত, পালি, উর্দু , ফারসি কিংবা ইংরেজি বিভাগ থাকে তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে উর্দু, ফারসি পড়তে দোষের কিছু নেই। দোষ যদি কিছু থেকেই থাকে সেটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। যে বিদ্যা, কৌশল বা প্রযুক্তি আমাদের ইহলৌকিক কিংবা পারলৌকিক কোন উদ্দেশ্যই সাধন করতে পারে না, সেই বিদ্যা বা প্রযুক্তি কালের প্রবাহেই অচল হয়ে পড়ে। সমাজের প্রয়োজন না থাকলে কোন একদিন ঐ সব প্রতিষ্ঠান আপনা আপনিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।