ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

‘বাঙালী জীবনে রমনী’ বইটি পড়ে শেষ করলাম। লেখক নীরোদ চন্দ্র চৌধুরী। বইটি লেখকের প্রকাশিত প্রথম বাংলা বই। প্রথম বেরিয়েছিল ১৯৬৮ সালে ভারতের কোলকাতা থেকে। আমি যে বইটি পড়লাম সেটা হল প্রথম বাংলাদেশ সংস্কারণ, ১৯৯০ সালে। তবে স্বীকার করতে কোন সংকোচ নেই যে, আমার পঠিত কপিটি আসল ছাপার নয়। এটা ঢাকার নীল ক্ষেতের পাইরাইটদের চোরা কপি। আসল বইটি থেকে ফটোকপি করে একটা বাঁধাই দিয়ে ওরা ফুটপাতে ছাড়ে। আসল বইটির দাম যেখানে ১৯৯০ সালের মনদণ্ডে ২০০ টাকা, সেখানে ২০১৬ সালে আমি ফুটপাথ থেকে সেটা মাত্র ১০০ টাকায় খরিদ করেছি। এমন বেশ কিছু বই স্বল্প মূল্যে কিনে আমি জ্ঞানেন্বেষণে চৌর্যবৃত্তিকে উৎসাহিত করেছি। চোরদেরও উপকার করেছি, নিজেরকেও জ্ঞানী বানাবার প্রচেষ্টারত আছি।

বইটি পড়া শুরু করেছিলাম ৬ মার্চ, ২০১৬ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ সুদানে আসার বিমানে উঠেই। কিন্তু আমার এক নাগাড়ে একটি বই পড়ার অভ্যাসও নেই, ফুসরতও নেই। কাজের ফাঁকে ফাঁকে, ঘুমের ফাঁকে ফাঁকে এবং অন্য বই পড়ার অবসরে বইটি শেষ করতে আজ ১১ মার্চ পড়ল। আর বইটিও নেহায়েত ছোট নয়। ২২২পৃষ্ঠার।

‘বাঙালী জীবনে রমনী’ লিখতে গিয়ে লেখক সেই সময়ের ইতিহাসের চেয়ে সহিত্যের আশ্রয় নিয়েছেন নিরবিচ্ছিন্নভাবে। বালাবাহুল্য, তার গোটা বইতে বঙিকমচন্দ্র আর রবীন্দ্রনাথের উদ্ধতির ছড়া ছড়ি। এর সাথে প্রাসঙ্গিক ভাবে এসেছে নবীন চন্দ্র,হেমচন্দ্র, ভারত চন্দ্র সেন প্রমূখ কবি মহাকবিরা। আমাদের ভাষার সাহিত্য আলোচনা করলে প্রাসঙ্গিক ভাবে সংস্কৃত সাহিত্য এসে যায়। তাই কালীদাসসহ অন্যান্য সংস্কৃত কবির কথাও আলোচনায় এসেছে অনায়াসেই।

নীরোদ চৌধুরীর ভাষায় বাঙালিররা প্রথাগতভাবেই কামের বুঝদার, প্রেমের নয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙালিরা প্রেম বুঝত না। তারা বুঝত কেবল কাম। তিনি ধেনোমদ তথা আমাদের ভাষায় বাংলা মদের স্বাদকে দিয়ে কাম, আর উচ্চতর স্বাদ সম্পন্ন বিদেশি মদ ‘কনিয়াক’ বা অন্যগুলো দিয়ে বুঝিয়েছেন প্রেম। বলা বাহুল্য আমি ব্যক্তিগতভাবে ধেনোমদও পান করিনি, আর কনিয়াকও স্পর্শ করিনি। তাই নীরোদ চন্দ্রের মদের উপমায় আমার ধারনা পরিষ্কার হয়নি। তবে দুই কালের দুই কবির কবিতার উদ্ধৃতি দিয়া তিনি কাম ও প্রেমের যে পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছেন, তা আমি বেশ বুঝেছি। তার মতে কাম হল এরূপ:

‘যত চাহে দিম ধন, দিব নানা আভরণ।
কোন মতে মোর সঙ্গেঁ বঞ্চে এক যামিনী’

আর প্রেম হল:
এত সূধা কেন সৃজিল বিধি, যদি আমারি তৃষাটুকু পুরিবে না।

কাম কেবল দৈহিক ব্যাপার। কিন্তু প্রেম দেহের অতিরিক্ত কিছু। কামের পরিণতি শুধুই গর্ভধারণ এবং বংশ বিস্তার। কিন্তু প্রেম জীবনকে আনন্দে পরিপূর্ণ করার জন্য ,উপভোগ করার জন্য। পশু পাখিও কামে আসক্ত। তাদেরও জৈব ধর্ম কাম। কিন্তু তাই বলে তারা প্রেম বর্জিত নয়। ‘বিশেষ করিয়া পাখীদের মধ্যে এই জীবধর্মের প্রকাশে যে সৌন্দর্য দেখা দিয়াছে তাহা অপরূপ। যদি পক্ষীবংশ বৃদ্ধি করাই একমাত্র উদ্দেশ্য হইত, তাহা হইলে গান বা পক্ষ সৌন্দর্যের কোন প্রয়োজন ছিল না’।

বইটিতে নীরোদ চন্দ্র বাঙালিদের নারী সম্পর্কিত যে ধ্যান-ধারণার কথা বলেছেন তা আদিতে ছিল অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ের ও খোলামেলা। কিন্তু পাশ্চাত্য প্রভাবে এ খোলামেলা ভাবের উপর আস্তরণ পড়ে যায়। মানুষ ভাষা ও ভাব প্রকাশে কৌশুলী হতে থাকে। আর এ সবই এমেছে ইংরেজি সাহিত্য থেকে বাঙ্কিম চন্দ্রের লিখনী তথা উপন্যাসের মাধ্যমে। তার মতে, The history of love in Bengali Hindu society is fairly well established. It was introduced from the West. (পৃষ্ঠা-166) । তার মতে, ‘প্রকৃত ভালবাসা শ্রদ্ধা ভিন্ন আসিতে পারে না। প্রণয়ী বা প্রণয়িনীর মনেই নীচতার আভাসমাত্র দেখিলেও প্রেম যেন সংকুচিত হইয়া যায়। ক্নিতু ব্যক্তিবিশেষের উপর শ্রদ্ধা ছাড়াও ব্যাষ্টিমুখীন শ্রদ্ধারও প্রয়োজন আছে। ভালবাসিবার জন্য, এমন কি ভালবাসার মহাত্ম বুঝিবার জন্যও পুরুষের দিক হইতে নারীকে শ্রদ্ধা করিবার একান্ত আবশ্যক আছে। ইহা ছাড়া প্রেম বা প্রেমের অনুভুতি আসিতে পারে না। নীরোদ চন্দ্র চৌধুরী বাঙালি লেখকদের মধ্যে সর্ব প্রথম বঙ্কিম চন্দ্রের মধ্যে এ শ্রদ্ধা পরিপূর্ণরূপে দেখতে পেয়েছিলেন।

বইটি পড়তে গিয়ে আমি যদিও লেখকের অনেক মতামতের সাথে ঐক্যমতে আসতে পারিনি, তবুও অনেক বিষয়ই আমার অভিজ্ঞতার সাথে সঠিকভাবে মিলে নিতে পেরেছি। আমার বাল্যকালেও আমার গ্রামের জীবনে আমার বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে আমি স্ত্রীদের শ্রদ্ধা করতে দেখিনি। তাই ভালবাসা বা প্রেমও দেখিনি। স্ত্রীকে তারা ‘তুই’ করে বলতেন। এই তুই কিন্তু ভাল বাসার তুই নয়; তাচ্ছিল্যের ‘তুই’ । আরো খোলাসা করে বললে বলতে হয়, চাকর বাকরদের প্রতি ছুড়ে মারা ‘তুই’ যা শুধুই শ্রদ্ধাহীন তিরস্কারের।

আমার বাল্যকালের ঘটনা। গ্রামের এক লোক তার বউয়ের মৃত্যুতে উচ্চৈঃস্বরে কান্না করেছিলেন। এ নিয়ে গ্রামে বেশ কিছু দিন ঐ বউ হারা ব্যক্তিটির উপর নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। আমি একজনের মন্তব্য শুনেছিলাম, ‘শালা, একটা ভাড়ুয়া। বউ মরার পর কান্নাকাটি করে’। অর্থাৎ বউয়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা পুরুষের সাজে না।বউ মরলে আনন্দ-ফুর্তি করতে হয়। বউ মরার অনেক উপকার আছে। এক বউ মরলে অতি সহজেই অন্য একটি বউ সংগ্রহ করা যায়। সে কালে তো বটেই, এমনকি এই কালেও একজন প্রৌঢ মানুষের কিশোরী-কুমারী বউ সংগ্রহ করা কোন ব্যাপারই নয়। আর এর সাথে তো আছে প্রথাগত যৌতুক। তাই প্রবাদ আছে,
‘ভাগ্যবানের বউ মরে, অভাগার গরু মরে’।

বস্তুত বাঙালিদের কাছে এখনও বউয়ের চেয়ে গাইয়ের দাম অনেক বেশি। আমি মনে করি নীরোদ চন্দ্র চৌধুরী সাহিত্য থেকে উদাহরণ দিয়ে যা বোঝাতে চেয়েছেন, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বাঙালি জীবনে রমণীর বর্ণনা আরো বেশি করুণ।(১১ মার্চ, ২০১৬, ইউএন হাউজ, জুবা, দক্ষিণ সুদান)