ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

দেশে বর্তমানে পুলিশ সদস্যের সংখ্যা প্রায় পৌনে দুই লাখ। বর্তমান সরকারের চলমান সংস্কার ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা অব্যহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পুলিশ সংগঠনটি বাংলাদেশের যে কোন একক সরকারী সংগঠনের চেয়ে জনবলের দিক দিয়ে তো বটেই অনেক কিছুর বিবেচনায় পুলিশই হবে দেশের বৃহত্তম সরকারি সংগঠন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান পুলিশ-অসদাচরণের বিষয়গুলো মানুষকে অনেকটাই ভাবিয়ে তুলেছে। এ ভাবনার মাঝে অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠতা, সত্যতা ও মঙ্গলচিন্তা আছে। যাদের ছাড়া আমরা চলতে পারি না, যে সরকারি সেবাদানকারী সংগঠন আধুনিক জীবনের একটি অপরিহার্য অনুসঙ্গ সেটা যদি আমাদের প্রত্যাশার অনুরূপ না হয়, তাহলে অনেক অর্থেই আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনযাপন কঠিন হয়ে ওঠে। তাই পুলিশ নিয়ে মানুষ স্বভাবতই মঙ্গলচিন্তায় বিভোর থাকবেন, পুলিশকে ভালো বাসবেন, পুলিশকে গালি দিবেন এবং এর উন্নতির জন্য সচেষ্ট হবে, জনমত গড়ে তুলবেন, সরকারকে তাগিদ দিবেন।

কিন্তু এর পরেও কথা থেকে যায়। বাংলাদেশের মানুষ কি আসলেই পুলিশ-বান্ধব না পুলিশ বিদ্বেষী? বিষয়টি নিয়ে বিস্তর বিতর্ক চলতে পারে। এক শ্রেণির নাগরিক আছেন যারা পুলিশকে কেবল সরকারের নির্যাতনকারী বাহিনী এবং আরো বেশি গোঁড়ারা পুলিশকে দেশ ও সমাজের জন্য নিষ্প্রয়োজনীয় বলেই মনে করেন। দু’চারজন আবার সকল বিদ্যা-বুদ্ধি আর বিবেক-বিবেচনার বালাই ঘুঁচিয়ে পুলিশকে সমাজের শত্রু বলেই প্রচার করেন। এই স্বল্পবুদ্ধির বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে তথাকথিত বিদগ্ধজনরাও রয়েছেন।

pic-20_149243

পাঠকদের বলে রাখা ভাল যে, পুলিশ সদস্যদের অসদাচরণ বা অপরাধকর্মকে বৈধতাদান কিংবা দায়মুক্তিদান আমার এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বরং আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং যে পুলিশের আমি সদস্য সেই পুলিশের সংগঠনের পক্ষেও পুলিশের যে কোন অপকর্মের ঘোর বিরোধী এবং অপরাধ বা অসদাচরণের সমুচিত শাস্তিদানই আমার কাম্য। কিন্তু শাস্তিদানের পূর্বে আমাদের একটি বিষয়ের ফয়সালা করতে হবে, একটি স্বতসিদ্ধকে স্বীকার করতে হবে যে পুলিশ সদস্যরাও মানুষ আর তারা সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই কেবল পুলিশ নয়, যে কোন সরকারি সংগঠনের সদস্যদের আমাদের এ বাঙালি সমাজের প্ররিপ্রেক্ষিতেই বিচার করা উচিত।

এখন আসুন আমরা দেখে নেই বাঙালি সমাজটা কেমন। ব্যাখ্যা করার দরকার নেই যে আমাদের সমাজ একটি অস্থির, অলস, দুর্নীতিপরায়ন, ক্ষমতার অপব্যবহারে অভ্যস্ত। সমাজের মানুষগুলো আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নির্বিশেষে প্রতিহিংসাপরায়ণ, হিংসুক, পরশ্রীকাতর, সময় মতো নিষ্ঠুর এবং প্রয়োজন মতো দয়াবান। আমাদের নিজেদের সম্পর্কে নিজেদের ধারণা বড় নিম্ন শ্রেণির। প্রতারণা, ছলনা, মিথ্যার মাধ্যমে স্বার্থ সিদ্ধ করা এক কথায় মানুষের মধ্যে যে সব দোষ থাকা সম্ভব আমাদের সমাজের মানুষগুলোর তার সবই আছে।

যদি দুর্নীতির কথা বলি, তাহলে দুর্নীতিতে আমাদের একটি বড় ঐতিহ্য আছে। ধর্ম-বর্ণ, শিক্ষা-দীক্ষা, ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে আমরা দুর্নীতির প্রতি অসম্ভব মাত্রায় দুর্বল। রাস্তার ভিক্ষুক থেকে শুরু করে দেশের এক নম্বর ব্যক্তিটিও এখানে দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে। সাম্প্রতিক কালের আমাদের রাষ্ট্রনায়কদের প্রায় সবার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ আছে। কেউ কেউ আবার এ জন্য আদালত কর্তৃক শাস্তিপ্রাপ্তও হয়েছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ আর হালাল উপায়ে অর্জিত অর্থের মধ্যে এখানে কোন বাছ বিচার করা হয় না। আমাদের সমাজ দুর্নীতিবাজতে পরিত্যাগ করে না, তাদের ঘৃণা করে না। বরং এখানে দুর্নীতিবাজদের অনেকটাই আদর্শিক স্থান দখল করে। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের বিপরীতে একজন সৎ ব্যক্তি এ সমাজে অনেকটাই এক ঘরে, অচল এবং সেকালে। আমরা দুর্নীতির একটি বৃহৎ সংস্কৃতিতে অবগাহণ করি। আমাদের বাচ্চারা এখানে দুর্নীতির বাতাসে নিঃস্বাস গ্রহণ করে, বড় হয়, বিকশিত হয়, দুর্নীতির চর্চা করে ও এর মাধ্যমেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়।

শ্রেণি হিসেবে পুলিশ একটি বিশেষ শ্রেণির নাগরিক। কারণ ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, আইনী রক্ষাকবজ আর সাংগঠনিক নীল জালের আবরণে সুরক্ষিত থাকায় পুলিশ সমাজের অন্য যে কোন শ্রেণির নাগকির বা সরকারি কর্মচারীদের চেয়ে অসদাচরণ বা অপরাধের ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু তাই বলে সমাজের অন্য শ্রেণির মানুষগুলো তাদের চেয়ে কোন অংশেই কম যায় না। আমরা সাম্প্রতিক কালে পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু খবরের শিরোনামের দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।

১. পিরোজপুরে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ইমাম গ্রেফতার
2. যৌন হয়রানি: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত
3.গুলি ছুড়ে তুলে নিয়ে স্কুলছাত্রীকে বিয়ে যুবলীগ নেতার
৪. তিন তলা থেকে ফেলে দেওয়া হলো এক ছাত্রকে
৫.মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছেলে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার
৬. ঢাকায় ছাত্র ধর্ষণের অভিযোগ, মাদ্রাসা শিক্ষক আটক
৭. মায়ের স্বীকারোক্তি: নিহের ওড়না পেঁচিয়ে স্বাশরোধ করে সন্তানদের খুন
৮. জামালপুরে সন্তানকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যার চেষ্টা

৯. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ
১০. রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি সাবেক উপাচার্যসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জসিট অনুমোদন
১১. দুর্নীতির অভিযোগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার
১২.খুলনায় বিসিএস’র ভুয়া পরীক্ষার্থী গ্রেফতার
১৩. ফেনসিডিলসহ মেজর গ্রেপ্তার
১৪. রাজধানীতে অস্ত্র ও মাদকসহ ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেপ্তার
১৫. দুর্নীতির দায়ে অতিরিক্ত জেলা জজ সিরাজুল চাকরিচ্যুত: তিন বিচারকের বিষয় প্রক্রিয়াধীন
১৬. ঘুষের ৫০ হাজার টাকাসহ উপসচিব গ্রেফতার
১৭. দুর্নীতির মামলায় রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী গ্রেফতার
১৮. ঠাকুরগাঁওয়ে সহকারী শিক্ষককে পেটানোর অভিযোগে প্রধান শিক্ষক গ্রেফতার
১৯. জালিয়াতির মাধ্যমে ৭৬টি মামলায় ১০৬ জন আসামিকে কারাগার থেকে মুক্ত করানোর মামলায় আদালতের দুজন কর্মচারীসহ পাঁচজনকে ১৪ বছর করে কারাদণ্ড
২০. ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ নেয়া পাঁচ সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল

উপরের উদাহরণগুলোতে কেবল পুলিশ ভিন্ন অন্যান্য শ্রেণির মানুষদের অস্বাভাবিক আচরণগুলো তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশকে বাদ দেয়া হয়েছে এ জন্য যে পুলিশের অসদাচরণের খবর ভিন্ন কোন পত্রিকাই বের হয় না। সত্যমিথ্যা, উদ্দেশ্য প্রণোদিত যাই হোক না কেন এটা আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা। এখন যদি আমরা অন্যান্য খবরগুলো বিশ্লেষণ করি তবে দেখব এ দেশের বা সমাজের এমন কোন অংশ কিংবা এমন কোন শ্রেণির মানুষ নেই যারা দুর্নীতি বা ক্ষমতার অবব্যহারসহ অন্যান্য প্রকার বিভাগীয় বা ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থেকে মুক্ত। এর অতি সরল অর্থ হল, এ সমাজ যাদের লালন করে, যেভাবে লালন করে তার উঠতি সদস্যরা ঠিক তেমনিই আচরণ করবে। কিন্তু পুলিশের কোন সদস্য যখন কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে তখন পুলিশকে আর মানুষ মনে করা হয় না। তারা হয়ে যায় নিখাদ পুলিশ।

কিন্তু বাস্তবতা হল, পুলিশও মানুষ। সমাজের অন্যান্য মানুষগুলো যেমন তাদের পছন্দমত কোন পেশায় যোগ দিয়েও তাদের স্বকীয়তা বজায় রাখে, পুলিশ সদস্যরাও তেমনি। কেবল পুলিশের সদস্য হওয়া কিংবা এক শ্রেণির উর্দি পরা এবং আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে পেশার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণগ্রহণ কিংবা পেশার উপ-সংস্কৃতি গ্রহণ করার ফলে কোন পুলিশ সদস্য সমাজের আর দশটা মানুষ থেকে খারিজ হয়ে যায় না। কারণ উপরের উদাহরণসমৃদ্ধ খবরগুলো সেটাই প্রমাণ করে। মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসর শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, প্রশাসনের আমলা, সশস্ত্রবাহিনীর কমিশনড অফিসার, বিচার বিভাগের বিচারক, পরিকল্পনা বা নির্মাণ-বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের কেউই তাদের মানুষ হিসেবে অর্জণ করা সদগুণ, বদগুণ বা অস্বাভাবিক আচরণগুলোর উপর কার্যকরী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই পুলিশ সদস্যরাও যদি সেরূপ ব্যর্থ হয় তবে তাদের মানুষ থেকে খারিজ করে পুলিশ নামের একটি স্বতন্ত্র অভিধায় ভূষিত করার সম্পূর্ণ অযৌক্তিকই শুধু নয়, অমানবিকও বটে।

তবে পুলিশ নিয়ে মানুষের একটি বিশেষ প্রত্যাশা আছে, যা অন্য শ্রেণির পেশাদারদের নিয়ে নেই। পুলিশদের অতিমানুষ হিসেবেই সমাজ কল্পনা করতে পছন্দ করে।

আমাদের প্রত্যাশা হল, পুলিশ নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু যে সমাজ থেকে পুলিশ সদস্যদের বাছাই করা হয়, সেই সমাজটি যেমন নিরপেক্ষও নয়, তেমনি ন্যায্যও নয়। পুলিশের আচরণ সমাজের পক্ষপাতিত্ব ও পূর্বসংস্কারেরই প্রতিফলন। এই পূর্বসংস্কারগুলোকে কেউ কেউ আমরা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করি, কেউ কেউ আবার তার বৈধতা খন্ডণের প্রচেষ্টা চালাই।

(Kappeler et al; Forces of Deviance – Understanding the Dark Side of Policing)

প্রসঙ্গত বলা যায়, পুলিশে এমন কোন বিধান নেই কিংবা পেশাদারী আদেশ নেই যা পুলিশ সদস্যদের অমানবিক হওয়ার তাগিদ দেয়া হয়। বরং তার উল্টোই করা হয়। প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা, নিযুক্তি সব স্থানেই পেশাদার হবার তাগিদ দেয়া হয়, অপেশাদার শাস্তি দেয়া হয়। তাই আদর্শস্থানীয় পুলিশ সদস্যরা কেবল মানুষই নয়, মানুষের চেয়েও অনেক বেশি মানবীয় সদগুণাবলী সম্পন্ন হওয়ার কথা।

.
সূত্র/উদ্ধৃতি
১/ We need the police to do their work fairly and equitably, but officers are drawn from a society that is neither fair nor equitable. Parts of our fascination with police misconduct is the fact that it often reflects the biases and prejudices of society—prejudices that some of us try to justify, and other try to deny. (forward) Kappeler et al; Forces of Deviance – Understanding the Dark Side of Policing.